ঢাকা, শনিবার, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১৭ নভেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

চলতি মাসেই বাড়ি ভাড়া নেয় জঙ্গিরা

গাজী হানিফ মাহমুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-১০-১৭ ৯:৪৫:৪৫ এএম     ||     আপডেট: ২০১৮-১০-১৭ ৪:২০:৪৭ পিএম

নরসিংদী সংবাদদাতা : নরসিংদীর শেখেরচরের ভগীরথপুর এলাকায় জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে ঘিরে রাখা বাড়িটিতে অপারেশন সমাপ্ত ঘোষণা করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে মাধবদীর গাঙপাড় এলাকার বাড়িতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখনো অভিযান শুরু করেনি। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভগীরথপুর এলাকায় চলতি মাসে বাড়িটি ভাড়া নেয় জঙ্গিরা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, শেখেরচরের ভগীরথপুর এলাকার জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালিয়ে একজন পুরুষ ও একজন নারীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। আর মাধবদীর গাঙপাড় এলাকার জঙ্গি আস্তানার ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, প্রাথমিকভাবে জঙ্গিদের আত্মসমপর্ণের আহ্বান জানানো হয়েছে। যদি তারা আত্মসমর্পণ না করে তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অ্যাকশনে যাবে।

ভগীরথপুরের জঙ্গি আস্তানার বাড়িটি ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক থেকে ৩০০ মিটারের মধ্যে। সেখান থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরত্বে অন্য জঙ্গি আস্তানা মাধবদীর ছোট গদাইরচরের (গাঙপাড়) বাড়িটি। নিলুফা ভিলা নামের এই সাততলা বাড়ির মালিক আফজাল হোসেন।

শেখেরচরের ভগীরথপুর এলাকার জঙ্গি আস্তানায় এ মাসের ৫-৭ তারিখের মধ্যে জঙ্গিরা ভাড়া নেয় বলে বাড়ির মালিক পুলিশকে জানিয়েছেন। ভগীরথপুরের জঙ্গি আস্তানা পাঁচতলা বাড়িটির মালিক বিল্লাল হোসেন নামের এক কাপড় ব্যবসায়ী।

ওই বাড়ির পাঁচতলার ভাড়াটিয়া সাইফুল ইসলাম শাহেদ বলেন, ‘আমার পাশের ফ্ল্যাটেই ওই দুইজন থাকতেন। তাদের পরিচয় আমি জানি না। তবে দুইজনের বয়স ২৫-৩০ বছরের মধ্যে। বাসা ভাড়া নেওয়ার পর তাদের সঙ্গে আমার একদিন দেখা হয়েছে। সম্ভবত তারা চলতি মাসের ৫-৭ তারিখে বাসা ভাড়া নেয়। ভাড়া নেওয়ার পর পরই বাড়িওয়ালা বিল্লাল ভাই তাদের কাছে একাধিকবার জাতীয় পরিচয়পত্র চেয়েছিল। কিন্তু তারা শুধু কালক্ষেপণ করে যাচ্ছিল।’

সাইফুল ইসলাম শাহেদ আরো বলেন, ‘তাদের ঘরে দুয়েকটি কাপড়ের ব্যাগ ও দুটো খাবারের প্লেট ছাড়া আর কিছুই ছিল না। তারা সাধারণত ঘর থেকে তেমন বের হতেন না। কেউ কথা বলতে চাইলে অনেকটা এড়িয়ে যেতেন। এসব ঘটনায় আমার কিছুটা সন্দেহ হয়েছিল। পরে আমি ৯৯৯ কল করব ভাবছিলাম। এরই মধ্যে গতকাল সোমবার সন্ধ্যার পর পুলিশ বাড়ি ঘেরাও করে ফেলে ও রাত আনুমানিক ৩টার দিকে আমাদের সরিয়ে দেয়।’

বিল্লাল হোসেনের বাড়ির দুইতলার একটি ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া অপু দেবনাথ বলেন, ‘রাত ৮টার দিকেই বাড়ির সামনে পুলিশ চলে আসে। আমরা কোনো কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। এলাকা হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে যায় এবং সবার মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছিল। এরই মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সবাইকে যার যার ঘরে ঢোকে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। পরে রাত ৩টার দিকে আমাদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।’

সোমবার নব্য জেএমবির আস্তানা সন্দেহে নরসিংদীর মাধবদী ও শেখেরচরে দুটি বাড়ি ঘিরে রাখে ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ইউনিট (সিটিটিসি)। মঙ্গলবার সকাল ১০টায় বিল্লাল মিয়ার বাড়িতে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতায় সিটিটিসি ও সোয়াত টিম অভিযান শুরু করে। ছয় ঘণ্টার এই অভিযান শেষ হয় বিকেল ৪টায়। অভিযান শেষে এক নারী ও এক পুরুষের লাশ উদ্ধার করা হয়। তবে তারা পুলিশের গুলিতে মারা গেছে নাকি নিজেরা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে মারা গেছে, তা নিশ্চিত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

বিকেল ৪টায় ভগীরথপুরের বাড়িটিতে চালানো অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন সিটিটিসি প্রধান মনিরুল ইসলাম। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘অভিযানে নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাদের কাছ থেকে একটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। আর ছোট গদাইরচরের জঙ্গি আস্তানায় আপাতত আমরা জঙ্গিদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়েছি। যদি তারা আত্মসমর্পণে রাজি না হয় তাহলে আমরা দিনের আলোয় অপারেশন শুরু করব।’

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ভাষ্য, গোয়েন্দা তৎপরতায় পুলিশের সিটিটিসি ইউনিট নিশ্চিত হয়, নরসিংদীর মাধবদী থানার ভগীরথপুর ও ছোট গদাইরচর এলাকায় পৃথক দুইটি বাড়িতে আলাদা দুইটি জঙ্গি আস্তানা রয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে গত সোমবার সন্ধ্যার পর পুলিশের সিটিটিসি ইউনিট, নরসিংদী জেলা ও মাধবদী থানা পুলিশ বাড়ি দুটি ঘেরাও করে। রাতের মধ্যে পুলিশের সোয়াত টিম, এলআইসি টিম, বোমা নিষ্ক্রীয়করণ দল, র‌্যাব, সিআইডিসহ জেলা ও বিভিন্ন থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে। তারা অভিযানের অংশ হিসেবে প্রথমে বাড়ি দুটির অন্যান্য ইউনিটের বাসিন্দাদের সরিয়ে নেয়। পরে সকাল ৬টার দিকে ঘটনাস্থলের ৫০০ গজের মধ্যে ১৪৪ ধারা জারি করে স্থানীয় প্রশাসন। পাশাপাশি মাইকিং করে কাউকে বের না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এর পরই সকাল সাড়ে ৮টার দিকে দুই বাড়ির গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি ও দুটি অ্যাম্বুলেন্স এনে রাখা হয়।

পরে মঙ্গলবার সকাল ১০টায় নরসিংদীর দুটি আস্তানা পরিদর্শন করেন সিটিটিসির প্রধান মনিরুল ইসলাম। এর পরই তার নেতৃত্বে শুরু হয় চূড়ান্ত অভিযান। তারা প্রথমে ভগীরথপুরের বিল্লাল হোসেনের বাড়িতে অভিযান চালান। সেখানে জঙ্গিদের প্রথমে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো হয়। পরে ভেতর থেকে থেমে থেমে গুলিবর্ষণ শুরু হলে সিটিটিসি ও সোয়াট টিম প্রথমে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। পরে গুলিবর্ষণ করে।

এর আড়াই ঘণ্টার মধ্যে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. জাবেদ পাটোয়ারী জঙ্গি আস্তানা পরিদর্শনে আসেন। তিনি আসার কয়েক মিনিটের মধ্যে বেশ কয়েকটি গুলির শব্দ হয়।

পরে আইজিপি বলেন, ‘জঙ্গিরা আত্মসমর্পণ না করায় অভিযান চালানো হচ্ছে। নরসিংদীর ভগীরথপুরের জঙ্গি আস্তানায় চালানো অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে “গর্ডিয়ান নট”। নিয়ম অনুযায়ী সেখানে অপারেশন পরিচলানা করা হচ্ছে। তাদের প্রথমে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো হয়। এতে সাড়া না পাওয়ায় প্রথমে টিয়ারশেল ও পরে গুলিবর্ষণ করা হয়। এ সময় তারাও পাল্টা গুলি করে।’

আইজিপির ঘটনাস্থল ত্যাগের পর বেলা আড়াইটার দিকে বেশ কয়েক রাউন্ড টানা গুলিবর্ষণের শব্দ শোনা যায়। পরে বিকেল ৪টার দিকে সিটিটিসির প্রধান মনিরুল ইসলাম ভগীরথপুরের অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।




রাইজিংবিডি/নরসিংদী/১৭ অক্টোবর ২০১৮/গাজী হানিফ মাহমুদ/সাইফুল

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC