ঢাকা, রবিবার, ২ আষাঢ় ১৪২৬, ১৬ জুন ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

১০ গ্রামের মানুষের দিন পার হচ্ছে মুড়ি ভেজে

অলোক সাহা : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৫-১৯ ২:১৮:১৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৫-২৩ ৬:১৬:১৩ পিএম
Walton AC 10% Discount

ঝালকাঠি সংবাদদাতা: ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার ১০টি গ্রামের মানুষের দিন পার হচ্ছে মুড়ি ভেজে।

নলছিটির এই ১০ গ্রামের মুড়ি সুস্বাদু ও কেমিক্যালমুক্ত হিসেবে সুপরিচিত।

প্রতিদিন এ গ্রামগুলো থেকে ২/৩ শ’ মণ মুড়ি দেশের বিভিন্নস্থানে যায়। রমজানের চাহিদা মেটাতে বাড়তি শ্রম দিতে হচ্ছে মুড়ি প্রস্তুতকারী পরিবারগুলোকে।

নলছিটি উপজেলার দপদপিয়া ইউনিয়নের তিমিরকাঠি, জুড়কাঠি, ভরতকাঠি, দপদপিয়া,  রাজাখালি, বুড়িরহাটসহ ১০টি গ্রামের ৫ শতাধিক পরিবার বংশানুক্রমে মুড়ি ভেজে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। সুস্বাদু কেমিক্যালমুক্ত মিষ্টি মুড়ি হিসেবে সমাদৃত এসব গ্রামের মুড়ি।

এই গ্রামগুলো এখন তাদের আসল নাম হারিয়ে মুড়িপল্লী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। আমনের বিশেষ কয়েকটি জাতের ধান প্রক্রিয়াজাত করে  এ মুড়ির চাল তৈরি করা হয়। এখানকার মুড়িতে কোন প্রকার রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়না বলে এ মুড়ি স্বাস্থ্যসম্মত।

গোটা রমজানজুড়ে এখান থেকে প্রায় কোটি টাকার মুড়ি বিক্রি হয় বলে জানিয়েছেন পাইকাররা।

মুড়ির কারিগরদের নিজস্ব পুঁজি না থাকায় পাইকারদের কাছ থেকে দাদন নিতে বাধ্য হয়। আর এ কাজে পরিবারের সবাই কম বেশি সহায়তা করলেও লাভের বেশিরভাগ ই যায় পাইকারদের পকেটে।

রোজার মাসকে সামনে রেখে বেড়েছে মুড়ির চাহিদা। উৎসবের আমেজে এসব পরিবারে এখন মুড়ি ভাজার ধুম পড়েছে। একটু বাড়তি লাভের আশায় পরিবারের বৃদ্ধ ও শিশুরাও মুড়ি ভাজার কাজে বাড়িয়ে দিচ্ছে সহযোগিতার হাত।

সরেজমিনে দেখা গেছে, যারা একটু  আর্থিক সচ্ছল তারা নিজেরা বাজার থেকে ধান কিনে আনে। তারপর বিশেষভাবে প্রক্রিয়াজাত করে চাল তৈরি করে মুড়ি ভেজে নিজেরাই বাজারজাত করে। আবার যারা আর্থিকভাবে অসচ্ছল তারা আড়তদারদের কাছ থেকে বিনামূল্যে চাল আনে। এই চাল দিয়ে মুড়ি ভেজে আড়তে সরবরাহ করে। এতে তাদের লাভ কম হয়।

প্রতিদিন একজন গড়ে ৫০ কেজি চাল ভাজতে পারে। যেখান থেকে ৪২-৪৩ কেজি মুড়ি পাওয়া যায়। এখানকার মুড়ি ৭৫ টাকা কেজি দরে পাইকারি এবং ৮৫ টাকা খুচরা বিক্রি হয়।

তিমিরকাঠির ভূইয়া বাড়ির মুড়ির কারিগর নাছির উদ্দিন বলেন, ‘রোজার শুরু থেকেই আমাদের মুড়ি ভাজার ব্যস্ততা বেড়ে যায়। মেশিনে ভাজা মুড়ির চেয়ে আমাদের হাতে ভাজা মুড়ির চাহিদা বেশি। পাইকাররা যে পরিমাণের মুড়ি চায় আমরা তা দিতে পারি না।’

একই গ্রামের ফাতেমা বেগম বলেন, ‘আমাদের টাকা নেই, এ জন্য অন্যের মুড়ি ভাজি। সেখান থেকে প্রতিবস্তায় ৪০০ টাকা পাই তা দিয়ে কোনো মতে আমাদের সংসার চলে। স্বামী মারা যাবার পরে সন্তানদের নিয়ে মুড়ি ভেজেই সংসার চালাই। তবে সরকারের পক্ষ থেকে যদি আমাদের আর্থিক সহযোগিতা করা হতো তাহলে ভাল হতো।’

নামমাত্র মজুরিতে দিনরাত খেটে পাইকারদের হাতে মুড়ি তুলে দেন শ্রমিকরা। এত খাটুনির পরও এ শিল্পে দেখা দিয়েছে নানা সমস্যা । মেশিনের মাধ্যমে রাসায়নিক মিশ্রিত মুড়ি অপেক্ষাকৃত কম খরচে তৈরি করে কম মূল্যে বাজারজাত করার কারণে এই গ্রামবাসীর রোজগারের পথের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব মুড়ি সহজ উপায়ে সার মিশিয়ে তৈরি হয়। স্বাস্থ্যের জন্য এগুলো খুবই ক্ষতিকর।

এছাড়া স্থানীয় পাইকার ও আড়ৎদারদের দৌরাত্ম্য তাদের লাভ থাকছে সামান্যই। সেসব মুড়ি বিক্রির জন্য এখানে গড়ে ওঠেছে আড়ত। একটু স্বচ্ছল লোকেরা নিজেরাই বাজার থেকে ধান কিনে তা বিশেষভাবে প্রক্রিয়াজাত করে চাল তৈরি করেন। তারপর মুড়ি ভেজে নিজেরাই বাজারজাত করেন।

স্থানীয় এরকম একটি প্রতিষ্ঠান মেসার্স খান ব্রার্দাস।  কথা হয় খান ব্রার্দাসের মালিক শহিদুল ইসলাম খান শফিকের সঙ্গে। তিনি জানান, বেশির ভাগ মেশিনে ভাজা মুড়িতে ক্ষতিকারক রাসায়নিক মেশানো হয়। ফলে তা থেকে রাসায়নিকের গন্ধ আসে। হাতে ভাজা মুড়ি সম্পূর্ণ স্বাস্থ্য সম্মত ও সুস্বাদু। এ  মুড়িতে খরচ একটু বেশি, তাই দামও একটু বেশি পড়ে। সারা বছরই আমাদের এখানকার মুড়ির চাহিদা থাকে। তবে রোজা এলে চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

এ বছর সরকার  চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করায় পাইকার ও শ্রমিরা মহাখুশি।  সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে এ মুড়ির গ্রাম গুলোকে বাণিজ্যিক মুড়ি উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে দাবি জানিয়েছেন মুড়ি পল্লীর শ্রমিকরা।

নলছিটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশ্রাফুল ইসলাম বলেন, ‘মুড়ির গ্রামগুলোকে বাণিজ্যিকীকরণ করে আরও অধিক উৎপাদন এবং এ পেশায় ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসবেন বলে আমরা মনে করি। বিষয়টি সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নজরে এনে পৃষ্টপোষকতা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে বলে জানান তিনি।

ঝালকাঠি বিসিকের উপ-ব্যাবস্থাপক শাফাউল করিম জানান, জেলার মুড়িপল্লীর পরিবারগুলো অত্যন্ত দরিদ্র। তারা বিসিক থেকে ঋণ নিতে চাইলে তাদের সহায়তা করা হবে।



রাইজিংবিডি/ ঝালকাঠি/১৯ মে ২০১৯/অলোক সাহা/টিপু

Walton AC
     
Walton AC
Marcel Fridge