ঢাকা, শনিবার, ৬ কার্তিক ১৪২৪, ২১ অক্টোবর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

বঙ্গবন্ধু মরে নাই...

কেয়া চৌধুরী : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৫-০৮-১৪ ৩:১৮:০১ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৮-১০ ১২:৩৮:৪৯ পিএম

|| কেয়া চৌধুরী ||

দুই সপ্তাহ আগে মাও সে তুং-এর দেশ চীন ঘুরে দেখলাম, চীন তার ফার্স্ট প্রেসিডেন্ট মাও সে তুং-এর রাজনৈতিক আদর্শ কীভাবে জাগ্রত রেখেছে। চীন বর্তমান প্রেক্ষাপটে এশিয়ার শুধু বৃহত্তম আয়তনের দেশই নয়, অধিক জনসংখ্যার দেশই নয়, তথ্য-প্রযুক্তি ও ব্যবসা বাণিজ্যে আজ বিশ্বে নেতৃত্ব দেওয়া একটি দেশ। আর এমনই একটি দেশের স্বপ্ন একদিন দেখেছিলেন মাও সে তুং। তার দীর্ঘদিনের রাজনীতির দর্শন ও নেতৃত্ব চীনকে আজ শুধু অগ্রগতি ও উন্নয়নের দেশ হিসেবেই গড়ে তোলেনি বরং মানবাধিকার ও সমতাভিত্তিক মানবিক শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করেছে।

সমতা ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে গোটা জাতিকে মাও একসূত্রে আনতে পেরেছিলেন। আর এটাই মাও-এর রাজনীতির অর্জন। তবে চীনের জনগণও তাদের নেতা মাও-কে বুঝতে পেরেছিলেন, মাও-এর আদর্শকে গ্রহণ করার মতো প্রবল ইচ্ছা সে দেশের জনগণের যেমন ছিল, তার প্রতিও ছিল দৃঢ় বিশ্বাস। সে কারণেই দেশ গড়ার প্রত্যয়ে দৃঢ় মানসিকতায় একটি গোটা জাতি গড়ে উঠতে পেরেছে।

মানবাধিকার, সমতা প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘ সংগ্রামে মাও সে তুং-কে দীর্ঘ কারাবাসে থাকতে হয়নি বা ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলতে হয়নি, নিহত হতে হয়নি নির্মমভাবে, সপরিবারে। তারপরও মাও সে তুং তার দেশের জনগণের হৃৎপিণ্ডে স্পন্দিত একটি জাগ্রত নাম। চীন তাদের আদর্শবান নেতা মাও সে তুং-কে যথাযথ মর্যাদা দিতে জানে। চীনের বিভিন্ন স্থান ঘুরে আমার মনে হলো, চায়নিজরা তাদের রাজধানী বেইজিং-এর তিয়ান আনমেন স্কয়ারে সুবিখ্যাত প্রাচীরে মমি করেই তাদের প্রিয় নেতা মাও সে তুং-এর দেহকে সংরক্ষণ করেনি বরং দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিটি কাজে মাও সে তুং-কে জড়িয়ে রেখে তারা এক ধরনের তৃপ্তি পায়। সে কারণে অনেকটা অবাক হয়েই উপলব্ধি করলাম ‘মিউজিন অফ চায়না’ এর থরে থরে সাজানো স্মারকে মাও-কে যেভাবে দেখেছি তার বিপরীতে একশ বছরের পুরাতন ঐতিহ্যবাহী রেস্টুরেন্ট ‘ডাক রোস্ট’ এর দেয়াল ভরা ছবিতে, তরুণ তরুণীর হাল ফ্যাশনের ব্রেসলেটে, এমনকি ছোট্ট শিশুর গলায় শক্তির প্রতীক লকেটেও মাও-কে খুঁজে ফেরে চাইনিজরা। ব্যস্ত জীবনে চায়নাবাসির মাও-এর প্রতি এই ভালবাসার আয়োজন কোনো রাষ্ট্রীয় আয়োজন নয়। এই আয়োজন চায়নিজদের প্রতিটি হৃদয়ের আন্তরিকতার আয়োজন।

বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যার মধ্য দিয়ে দুইশ বছরের পরাধীনতার ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল মীর জাফর। গ্লানি, বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস মুছে ফেলে নতুন করে বাংলার জমিনে স্বাধীনতার স্বপ্নের ভীত গড়েছিলেন শেখ মুজিব। বাংলার মানুষকে পরাধীনতা থেকে মুক্ত করতে শেখ মুজিব তার গোটা জীবনের সমস্ত মেধা, শ্রম নিয়োগ করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে যে আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে উঠেছিল তার মধ্যে সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।

তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে তিনি লিখেছেন : ‘একজন মানুষ হিসেবে সমগ্র মানব জাতি নিয়েই আমি ভাবি। একজন বাঙালি হিসেবে যা কিছু বাঙালির সঙ্গে সম্পর্কিত তাই আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। এই নিরন্তর সম্পৃক্তির উৎস ভালবাসা, অক্ষয় ভালবাসা, যে ভালবাসা আমার রাজনীতি এবং অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে।’

এমন মানসিকতার কারণেই মানুষের মনের আকুতি শেখ মুজিব ছুঁতে পারতেন। মনের এই শক্তিতে বঙ্গবন্ধু সেদিন বাংলার সাত কোটি মানুষকে জাগ্রত করতে পেরেছিলেন স্বাধীনতার মন্ত্রে। এ জন্য তাকে অনেক বেশি দায় শোধ করতে হয়েছিল। বিশ্ব ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুই একমাত্র নেতা যিনি নিজ জীবন ফাঁসির মঞ্চে সপে দিয়ে রচনা করেছিলেন বাংলার লাল-সবুজের গর্বিত স্বাধীনতার ইতিহাস।

সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের পোড়া মাটিতে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিকে উপহার দিয়েছেন পবিত্র সংবিধান। যে সংবিধানে বাংলার সাধারণ মানুষের অধিকারের কথা বলে। মানবাধিকারের কথা বলে, সমতাভিত্তিক এক মানবিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার কথা বলে। ১৯৭২ এর ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমরা আজ এমন এক সংবিধান রচনা করতে যাচ্ছি, যেখানে বাংলার জনগণের অধিকারের কথা লেখা থাকবে, যাতে করে বাংলার মানুষের অধিকার নিয়ে কেউ কোনদিন ছিনিমিনি খেলতে না পারে।’
যে নেতা তার নাগরিকের মৌলিক অধিকার সংবিধানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করেছেন সেই নেতার স্বাভাবিক মৃত্যুর অধিকারটুকু নাগরিক বা জাতি হিসেবে আমরা দিতে পারিনি!

বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে বীরের জাতিতে প্রতিষ্ঠা করেছেন মুক্তি সংগ্রামের মাধ্যমে। পোড়ামাটির দেশ বাংলাদেশে তখন কিছু না থাকলেও স্বাধীনতা অর্জনের যে অহংবোধ আমরা অর্জন করেছিলাম, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে সাড়ে তিন বছরের মাথায় আমরা বিশ্বের দরবারে আবারও কলঙ্কিত জাতিতে পরিচিত হলাম। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ঘটনা আমাদের এই জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জার বিষয়। আদৌ কি জাতি হিসেবে এই দায় থেকে আমাদের মুক্তি মিলবে কোনো দিন?

বোধ করি, তা কখনই হবার নয়। কারণ, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার নীল নকশা কোনো ভিনদেশি রাষ্ট্র বা শত্রু করেনি। যে খুনিরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে, হত্যা করেছে দুধের শিশু রাসেলকে তারা সকলেই জানত বঙ্গবন্ধুর হৃদয়ের বিশালতা। তারা এও জানত, বঙ্গবন্ধু কখনো স্বপ্নেও ভাবেননি স্বদেশের মাটিতে তাকে কেউ হত্যা করতে পারে। বঙ্গবন্ধু বাংলার সাত কোটি মানুষকে নিজ পরিবারের সদস্যের মতই জানতেন। আজ ইতিহাস থেকে জানতে পারছি, জাতির পিতাকে যারা হত্যা করেছে তাদের সকলেরই অহরহ যাতায়াত ছিল ধানমন্ডির ৩২ নাম্বারে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে। তাদের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক কলহ, কর্মক্ষেত্রের খুঁটিনাটি সমস্যারও সমাধান দিতেন বঙ্গবন্ধু। আমাদের কলঙ্কিত অধ্যায়ের সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতা হলো, এই ক্ষমতালোভী খুনিরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেই থেমে যায়নি। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আদর্শকে, তাঁর রেখে যাওয়া কাজগুলো স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় সকল স্তরে নিষিদ্ধ করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম। ‘শেখ মুজিব’ যার নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে সাত কোটি মানুষ স্বাধীনতার মঞ্চে জাগ্রত হয়েছিল, যার অনুপস্থিতিতেও শুধু ‘শেখ মুজিব’ নামের শক্তিতেই একটি জাতি তার সর্বস্ব উৎসর্গ করেছিল, নিরস্ত্র জাতি পরিণত হয়েছিল সশস্ত্র জাতিতে, সেই মহান নেতার নামটি পঁচাত্তরের পর নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।  

শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করার মধ্য দিয়ে বাংলার মাটি থেকে তার নাম মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। জন্ম দেওয়া হয়েছে একটি কলঙ্কিত ইতিহাসের। যে নেতার নামের শক্তিতে একটি জাতি তার জাতীয়তাবাদের ভীত রচনা করেছে, সেই নামের ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে একটি প্রজন্মের কাছে। জাতীয় বীর হিসেবে পুরস্কৃত করা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বাঙালির ইতিহাসকে কলঙ্কিত করার নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে সুবিধাপ্রাপ্ত খন্দকার মোসতাক ও জিয়াউর রহমান।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতিকে একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে একটি ভীতের উপর দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন। অর্থাৎ স্বাধীনতা, নৈতিকতা, শিক্ষা, দেশপ্রেম ও আদর্শের উপর দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জিয়াউর রহমান অবৈধ ক্ষমতার মাধ্যমে জাতির কাছে তুলে ধরলেন এক ভিন্ন ধারার রাজনীতি। যে রাজনীতির মূল ভীত ছিল অর্থ, অস্ত্র ও ক্ষমতা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে দেশপ্রেমের চেতনা জলাঞ্জলি দিয়ে ইংরেজ ও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর মতই রাজনীতির নামে বাংলাদেশে লুটেরার রাজত্ব কায়েম করেন জিয়াউর রহমান। নতুন প্রজন্মের হাতে বঙ্গবন্ধু যে কলম তুলে দিয়েছিলেন সেই কোমল হাতে জিয়াউর রহমান অস্ত্র তুলে দিলেন সচেতনভাবে।
ইনডেমনিটি আইন করে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের রক্ষা করার ব্যবস্থা করা হলো।

রাজনৈতিকভাবে প্রতিহিংসায় মত্ত হয়ে বিএনপি রাজনীতি করে যাচ্ছে পঁচাত্তরের পর থেকে আজ পর্যন্ত। ৭৫ সালের পর থেকে একটি প্রজন্ম নির্মল বিশুদ্ধ রাজনীতি থেকে দূরে সরে গেছে। তারা কখনই জানতে পারেনি দেশের জন্য জাতির পিতার ত্যাগের কথা। জানতে পারেনি, কী নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল তাকে ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের।
দেড়শ কোটি মানুষের দেশ চীনে মাও সে তুং-কে চীনারা লালন ও ধারণ করতে পেরেছে, আদর্শের ভীত রচনা করতে পেরেছে, মাও-কে অনুসরণ করে জাতীয় চরিত্র গঠন করতে পেরেছে। আর এই বাংলাদেশে আমরা এখনও পারিনি বঙ্গবন্ধুকে গোটা জাতির আদর্শের ভীত হিসেবে গ্রহণ করতে। এই দীনতা জাতি হিসেবে আমাদেরকে দুর্বল করে। যে নেতা তার সর্বোচ্চ ত্যাগের বিনিময়ে সৃষ্টি করেছেন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। সেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে যদি সকল রাজনীতির ঊর্ধ্বে রেখে আমরা ধারণ করতে পারতাম তাহলে জাতি হিসেবে আমরা অনেক বেশি সমৃদ্ধ হতাম। আমাদের আরো অনেক বেশি অর্জন হতো। উন্নত একটি দেশ গড়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক আগে লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারত।

দুঃখজনক হলেও সত্য, জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে কিছু দুর্বল ব্যক্তিত্বের রাজনীতিক সস্তা রাজনীতি করে যাচ্ছেন। ভূয়া জন্মদিন উদযাপন করে শেখ মুজিবকে খাটো করতে চাইছেন। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, শেখ মুজিবুর রহমান কোনো সাধারণ নাম নয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই বাঙলার সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি।

বিশ্বের মানচিত্রে যে লাল-সবুজ পতাকার বাংলাদেশ, তার অপর নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জাতির পিতার শাহাদাৎবার্ষিকীতে, এ দেশের জাতীয় শোক দিবসে তাঁর প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও ভালবাসা।


লেখক : সংসদ সদস্য


রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৪ আগস্ট ২০১৫/শাহনেওয়াজ/তাপস রায়
 

Walton
 
   
Marcel