ঢাকা, রবিবার, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২৭ মে ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:
দার্জিলিংয়ের পথে-০৩

দার্জিলিংয়ের পিস প্যাগোডা, রক গার্ডেন

উদয় হাকিম : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৮-০৫-১৫ ১২:৩৮:৫২ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৫-১৫ ৪:০৪:১৯ পিএম
দার্জিলিংয়ের পিস প্যাগোডা। ছবি: লেখক

উদয় হাকিম : রাতের দার্জিলিং। সত্যিই অপরূপ! দেখেছিলাম আগের রাতে। মিরিকের দূর পাহাড় থেকে। যেন রাতের আলোয় হাজারো জোনাকির নাচন। আরো কাছ থেকে মনে হয়েছিল পাহাড়ের গায়ে আলোর দেয়ালী। সে এক অন্যরকম সৌন্দর্য্য।

দার্জিলিং দেখার তৃষ্ণা বাড়িয়েছিল সে দৃশ্য। উঁচু পাহাড়ের ঢালে অগুনতি চায়ের গাছ। সবুজের সমারোহ। মসৃণ পাইন গাছের সারি। পাহাড়ের শরীরে ছোট ছোট বাড়ি। আহা এমন দৃশ্য! তর সইছে না। ঘরে আর কতক্ষণ বসে থাকতে পারি।

সকাল বেলা লুচি, আলুর দম খেয়ে সোজা গাড়িতে। ঘড়িতে তখন সাড়ে ৯টা। ১৫ জন দুই জিপে। গাইড পার্থ বাসনেত জানালেন দিনের কর্মসূচি।

প্রথমে পিস প্যাগোডা। যার আরেক নাম জাপানিজ টেম্পল। বৌদ্ধ উপাসনালয়। উঁচু নিচু পাহাড় বেয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই শান্তির উপাসনালয়ে হাজির।

পিস প্যাগোডার প্রবেশ পথটা সুন্দর। চারদিক নীরব। শান্তি শান্তি ভাব। অনেকটা বাংলাদেশের নেত্রকোনার সুসং দূর্গাপুরের রানিক্ষ্যং চার্চের মতো। যার পূর্বপাশ দিয়ে বয়ে গেছে সুমেশ্বরী নদী। এখানে অবশ্য কোনো নদী নেই। নেই আশেপাশেও। তবে প্যাগোডায় প্রবেশের প্রথম ভবনটা আমার কাছে রানিক্ষ্যং এর প্রথম ভবনের মতো মনে হলো। ছোট্ট দোতলা ভবন। পরিপাটি। সামনে কিছু শোভা গাছ। দুটি সিংহের মূর্তি। উপরে পিংক কালার। মূল ভবন সাদা। প্রশাসনিক ভবন এটি। এর ডান পাশে ছোট্ট একটি ফুলের বাগান। ছোট-বড় নানান জাতের ফুল ফুটে আছে।

রক গার্ডেন ঝরনা


প্যাগোডায় ঢুকে আমি মগ্ন এর সৌন্দর্য্যে। তখন ফিরোজ, মামুন, মিলটন ব্যস্ত ক্যামেরা নিয়ে। কোনো ট্যুরে গেলে এই তিনজনের মাথায় কেবল ছবি, ক্লিক, লোকেশন, পোজ এইসব। আরেকটা বিষয় না বললেই নয়। এরা যে লোকেশনেই যাবে মিনিমাম তিন চারটা টি শার্ট-গেঞ্জি নিয়ে যাবে। লোকেশন কিংবা ব্যাকগ্রাউন্ড পাল্টে গেলে ড্রেসও চেঞ্জ করে ফেলে। তিন জনে ৩টা করে নিলেও এরা সেটা ৯টা বানিয়ে ফেলে। কীভাবে? এরটা ও পড়ে, ওরটা এ।

খেয়াল করলাম একটা লোকেশন ওরা মিস করছে। বাগানের বর্ণিল ফুলগুলোকে ফোরগ্রাউন্ডে রেখে ব্যাকগ্রাইন্ডে চমৎকার কয়েকটি পাইন গাছ। ইংরেজরা এর উচ্চারণ করে ফাইন ট্রি। সত্যিকার অর্থেই ফাইন দেখাচ্ছে। মামুনকে ইয়ার্কির মতো ধমক দিয়ে আমার দিকে ক্যামেরা তাক করতে বাধ্য করলাম। পরে দেখলাম ছবিটা সত্যিই দুর্দান্ত হয়েছে। ধন্যবাদ মামুন।

ওদিকে আমি যখন আশেপাশের খাদ, ঘরবাড়ি আর গিরিখাদ দেখতে ব্যস্ত; টিমের অন্যরা তখন মগ্ন সেলফি নিয়ে। কিছু বলার নেই। এরা সেলফি জেনারেশন। সেলফি ফোবিয়ায় আক্রান্ত।

খানিকটা দূর থেকে দেখছিলাম পিস প্যাগোডার মূল গম্বুজ। পুরোটা শান্তির রং সাদায় মোড়া। সামনের চত্বর, সিঁড়ি শ্বেত পাথরের। দার্জিলিংয়ে এসে একটা জিনিসের প্রেমে পড়ে গেছি। সেটা হলো ওই পাইন গাছ। অনেক কবির লেখাতেও এই হ্যান্ডসাম গাছটির বর্ণনা শুনেছি। ইউরোপে গিয়েও দেখেছি। কিন্তু দার্জিলিংয়ে এসে যেন নতুন এক স্মার্ট ট্রিকে দেখতে পাচ্ছি। ওই যে শ্বেত পাথরের সিঁড়ির কথা বলেছি, এর পাশেই বয়সী পাইন গাছের সুন্দর উপস্থিতি। দেখতে দেখতে আকাশ মেঘে ঢেকে গেল। চোখের সামনে উড়ে এসে জুড়ে বসল মেঘ। কুয়াশার মতো দ্রুত ঢেকে দিয়ে গেল প্যাগোডার দৃশ্যপট। সময় কম। কেটে পড়লাম ঝটপট।

দার্জিলিংয়ের পাহাড়গুলো একটু বেশিই উঁচু। যতটা ভেবেছিলাম তারচেয়ে বেশি। ভয়ংকর সেই রাস্তা ধরে একবার উঠছিলাম, নামছিলাম, বিপদজনক বাঁক নিচ্ছিলাম। আধা ঘণ্টার রাস্তা পেরিয়ে পৌঁছলাম রক গার্ডেনে। এটা মনে হলো শহরের উত্তর প্রান্তে। পাশের উঁচু পাহাড় থেকে নিচের রক গার্ডেন দেখতে ভারি সুন্দর।

রক গার্ডেন ঝরনার সামনে লেখক


উত্তরের সুউচ্চ পাহড় থেকে নেমে এসেছে ঝরনা। কলধ্বনি শোনা যাচ্ছিল দূর থেকে। পাথুরে পথ বেয়ে নেমে আসা ওই ঝরনাই স্পটটির মূল আকর্ষণ। পাশ দিয়ে বাঁধানো পথ, সিঁড়ি আর সেতু। ওসব ধরেই ওপরে উঠতে হয়। অনেক পর্যটক আসেন এখানে। বিশেষ করে, প্যাকেজ ট্যুরে যারা আসেন তাদের তালিকায় এটা থাকবেই।

লোকজন ঝরনার সামনে ছবি তুলছিল। তুলছিলাম আমরাও। বাঁধানো পথ আর সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছিলাম। ঝরনার একপাশ থেকে আরেকপাশে যেতে ছোট ছোট সেতু। তার ওপরে নানান পোঁজে ছবি তুলছিলেন তারা। তারা কারা? ওই যে তিন জনের নাম বলছিলাম।

ভাবছিলাম অন্য কথা। এরকম ঝরনা আমাদেরও আছে। গেলো ফেব্রুয়ারিতে কেওক্রাডং গিয়েছিলাম। বগা লেক থেকে পায়ে হেঁটে কেওক্রাডং যাওয়ার পথে দুটি ঝরনা। একটি লতা ঝরনা। অন্যটি চিংড়ি ঝরনা। লতার জলধারা অতি ক্ষীণ। কিন্তু চিংড়িতে ভালো জল ধরে। আর নাফাখুমে তো অনেক পানি। সে সব জায়গাগুলো এরকম করে সাজানো যায়। কথায় বলে, মানি বিগেটস মানি। টাকায় টাকা আনে।

গাইড পার্থ জানালেন, দার্জিলিং শহর সমুদ্র রেখা থেকে ৮ হাজার ৪০০ ফুট ওপরে। আর এই রক গার্ডেন ৪০০০ ফুট ওপরে।
 

রক গার্ডেন ঝরনায় পর্যটকদের ভিড়


যতটা সম্ভব ওপরে চলে গিয়েছিলাম। নিচে তাকালাম। পাখির চোখে দেখছিলাম পুরো রক গার্ডেন। পরীর মতো পাখা থাকলে সোজা শা করে নিচে নেমে যেতাম। ওপরে ওঠার আগে রাস্তার দক্ষিণে একটা জায়গা দেখেছিলাম। বড় ঝরনাটার দক্ষিণ পাড়ে। অনেক নিরিবিলি। বনের ভেতরে কাঠের গুঁড়ির পড়ে থাকার মতো বসার জায়গা। আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম ওখানে যাবো। তাই করলাম। ও হ্যাঁ, গার্ডেন যেহেতু; কিছু অর্কিড ফুল লতাগুল্ম তো থাকবেই। আছে এখানেও। সেসব দেখে ধীরে ধীরে নিচে নেমে এলাম। স্টিলের পাটাতন বসানো ব্রিজ পার হয়ে গেলাম অন্য পাড়ে। আগে দেখা সেই জায়গাটাতে গিয়ে দাঁড়ালাম। ততক্ষণে স্থানীয় এক তরুণ এসে বসেছেন সেখানে। আমার পছন্দের জায়গাটায় ছেলেটা বসেছে। কিছুটা রাগ হওয়ার কথা। হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল- ছেলেটার চয়েজ আছে বটে! এই জায়গাটা কেবল আমার আর তার পছন্দ। কারণ আর কেউ নেই এদিকটায়।

সাহেল ছিল ওপারে। জোরে ডাকলাম। সাহেল এ পাশে চলে আসেন। সাহেল আসলে ওই তরুণ চলে গেল। মোবাইল ফোনটা সাহেলকে দিয়ে বললাম ছবি তুলতে। কিন্তু মনমতো হচ্ছিল না। সাহেলের ছবি তুলে ফ্রেম বুঝিয়ে দিলাম। একটু পর জনি আর সাইফুলও এলেন। ওদের নিয়ে বনের ভেতর দিয়ে ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছিলাম। নিখাঁদ প্রকৃতির মধ্যে বুক ভরে শ্বাস নিলাম।

রক গার্ডেন থেকে ফিরছিলাম। সবাই জিপের কাছে চলে এসেছি। নেই কেবল নুরুল। জনি এসে বললেন, স্যার আমাদের টিমের মধ্যে নুরুল ভাইয়ের কোনো রোল (ভূমিকা) নেই। বিষয়টা ভাবিয়ে তুলল আমাকে। চিন্তা করছি- নাস্তা কিংবা খাওয়ার টেবিলে সবার পরে নুরুল। গাড়িতে উঠতে সবার পেছনে। শপিং করতে গেলে তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। সত্যিই তো! এবার দুটি ক্রিকেট টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছিল ওয়ালটন। প্রথমটি ২০ ওভারের করপোরেট ক্রিকেট। তাতে চ্যাম্পিয়ন। পরে ১০ ওভারের ক্রিকেট। তাতেও চাম্পিয়ন। যার উপহারস্বরূপ এই অফিসিয়াল ট্যুর। কিন্তু ১০ ওভারের টুর্নামেন্টে বল কিংবা ব্যাট করার সুযোগ হয়নি অনেকেরই। তাদের মধ্যে নুরুলও একজন! সবাইকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম, বলেনতো আমাদের ট্যুরে কোন লোকটার কোনো রোল নেই?

** সড়ক পথে ঢাকা থেকে শিলিগুড়ি

** পৌঁছলাম স্বপ্নের দার্জিলিং



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৫ মে ২০১৮/অগাস্টিন সুজন/সাইফ

Walton Laptop
 
   
Walton AC