ঢাকা, শনিবার, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২৬ মে ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

ফারমার্স ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণে উদ্যোগ

কেএমএ হাসনাত : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৮-০২-১০ ৯:৫৯:৪২ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০২-১৩ ৯:৫৫:৫৩ এএম

কেএমএ হাসনাত : ফারমার্স ব্যাংক মূলধন ঘাটতি পূরণে সরকারি সহায়তা পেতে যাচ্ছে। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকে এ বিষয়ে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এ বিষয়ে সম্মতি দিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সভাপতিত্বে এ বৈঠকে ফারমার্স ব্যাংকের মূলধন যোগানোর বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে।

এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী রাইজিংবিডিকে বলেন, ব্যাংকটির অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। এই ব্যাংকের জন্য কিছুটা একটা তো করতেই হবে। কোনো ব্যাংককে সরকার দেউলিয়া হতে দিতে পারে না। কারণ, তা হবে যেকোনো দেশের জন্য ভয়ঙ্কর।

বিভিন্ন দুর্নীতি আর অনিয়মে জর্জরিত বেসিক, সোনালী, জনতা ও রূপালী ব্যাংকর মতো সরকারি ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পূরণ করেছে সরকার। মূলধন ঘাটতি পূরণে প্রতিবছর বাজেট থেকে এই ব্যাংকগুলোকে হাজার হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।

এবার এই প্রথমবারের মতো দুর্নীতির কারণে দেউলিয়ার হওয়ার উপক্রম ফারমার্স ব্যাংককে তহবিল যোগান দিতে যাচ্ছে সরকার। এই কাজটি করানো হচ্ছে সরকারি আর্থিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) মাধ্যমে। এই প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগ দিচ্ছে সরকারের আরো চারটি ব্যাংক। এই ব্যাংকগুলো হচ্ছে- সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংক। এই চার ব্যাংক ও আইসিবি মিলে ফারমার্স ব্যাংকের ১ হাজার ১০০ কোটি টাকার শেয়ার কিনতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে শেয়ার কেনার বিষয়ে এই পাঁচ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা দুই দফা বৈঠকও করেছে।

সূত্র জানায়, ফারমার্স ব্যাংকের শেয়ার কেনার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার জন্য আগামী মঙ্গলবার একটি বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিতব্য বৈঠকে ফারমার্স ব্যাংকের শেয়ার কেনার বিষয়টি অনুমোদন দেওয়া হতে পারে বলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও আইসিবি সূত্রে জানা গেছে।

ফারমার্স ব্যাংককে উদ্ধারের জন্য সরকার কোনো বেইল আউট প্যাকেজ নিচ্ছে কি না? এ প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, কিছু একটা করতেই হবে। তবে যেহেতু এটি একটি বেসরকারি ব্যাংক, তাই এই পদ্ধতিটিও হবে সেভাবে। সরকার কোনো ব্যাংককে ধ্বংস হতে দিতে পারে না।

জানা গেছে, দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে চরম মূলধন ঘাটতি থাকা ফারমার্স ব্যাংকের পরিচালকরা এর আগেও এক দফা বৈঠক করে পাবলিক প্লেসমেন্টের মাধ্যমে বাজার থেকে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা উত্তোলনের প্রচেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে কোনো সাড়া না পাওয়ায় সেই উদ্যোগ সফল হয়নি। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকেও রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকগুলোকে পরামর্শ দেওয়া হয় এই ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণে তারা যেন উদ্যোগ নেয়। শুধু তাই নয়, ফারমার্স ব্যাংককে ৫০০ কোটি টাকার বন্ড ছাড়ারও অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহিউদ্দীন খান আলমগীর এই ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাতা। ২০১৩ সালের ৩ জুন ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করা ব্যাংকটির বর্তমান অবস্থা বেশ নাজুক। অবস্থা এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে, ব্যাংকটি তাদের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে পারছে না। সরকারের রাখা জলবায়ু তহবিলসহ আরো বেশ কয়েকটি বিশাল অঙ্কের টাকা এই ব্যাংক ফেরত দিতে অপারগতা প্রকাশ করেছে।

ফারমার্স ব্যাংক সম্পর্কে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বলতে বাধ্য হয়েছে, ‘ব্যাংকটি সমগ্র ব্যাংকিং খাতে সিস্টেমেটিক রিস্ক (পদ্ধতিগত ঝুঁকি) সৃষ্টি করছে, যা আমানতকারীদের আস্থা নষ্ট করতে পারে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে ফারমার্স ব্যাংকে ১৩টি অনিয়ম খুঁজে পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি ছিল বড় ধরনের অনিয়ম। অনিয়মের মধ্যে রয়েছে- ব্যাংকের নিজস্ব ঋণ নীতিমালা অনুসরণ না করে গ্রাহকদের ঋণ সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। ব্যাংক কর্তৃক ঋণের অর্থের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত না করে গ্রাহকদের উদ্দেশ্যবহির্ভূত খাতে অর্থ স্থানান্তরে পরোক্ষভাবে সহায়তা করা হয়েছে। গুরুতর অভিযোগের মধ্যে রয়েছে- অস্তিত্ববিহীন/সাইনবোর্ড সর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের অনুকূলেও ঋণ দেওয়া। ঋণ নিয়মাচার লঙ্ঘন করে ব্যাংকের পরিচালকসহ অন্য ব্যাংকের পরিচালদেরও ঋণ দেওয়া হয়েছে। এখানে শেষ নয়, অপর্যাপ্ত ও ত্রুটিযুক্ত জামানতের বিপরীতে ঋণ মঞ্জুর করা হয়েছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে এ ব্যাংক সম্পর্কে মন্তব্য করা হয়েছে, ‘ক্রমবর্ধমান অনিয়ম প্রতিরোধ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার উন্নতি এবং ঋণ নিয়মাচার শৃঙ্খলা আনয়ন অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ায় আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার লক্ষ্যে গত ২০১৬ সালের ১৩ জানুয়ারিতে ব্যাংকটির পরিচালান পর্ষদে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে একজন পর্যবেক্ষক নিয়োগ করা হয়। তবু পরিস্থিতির লক্ষ্যণীয় উন্নতি হচ্ছে না।’

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ‘গত এক বছর ধরে ব্যাংকটির তারল্য সংকট রয়েছে এবং বর্তমানে তা তীব্র আকার ধারণ করেছে। ব্যাংকের মূল তারল্য পরিমাপক সূচক তথা বাংলাদেশ ব্যাংকে রক্ষিত নগদ জমা (সিআরআর) সংরক্ষণে ব্যাংকটি ক্রমাগতভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। ২০১৭ সালের এপ্রিল হতে বর্তমান সময় পর্যন্ত ব্যাংকটি সিআরআর সংরক্ষণে ব্যর্থ হচ্ছে। শুধু তাই নয়, ব্যাংকটি দায় পরিশোধের সক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছে। সাধারণ আমানতকারী এবং বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রচলিত হারের চেয়েও উচ্চ সুদে আমানত গ্রহণ ও অর্থ কর্জ করে বর্তমানে ব্যাংকটি টিকে আছে। ব্যাংকের ৫৪ শাখার মধ্যে ২৮টি শাখা লোকসানে রয়েছে।’

এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের আর্থিক খাত এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণে সরকার ফারমার্স ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছে। এই চেষ্টার অংশ হিসেবেই মূলধন যোগান দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৭/হাসনাত/রফিক

Walton Laptop
 
   
Walton AC