ঢাকা, রবিবার, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ২৬ মে ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

‘দেশিয় সফটওয়্যার কোম্পানির অগ্রাধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করবো’

মনিরুল হক ফিরোজ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৩-২২ ৮:০৯:৩১ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৩-২২ ৮:২৪:১৪ পিএম
লুনা শামসুদ্দোহা
Walton AC

বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ডেস্ক : বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নারীরা আসবেন, তারা অবদান রাখবেন এমনটি বোধ হয় এক সময় কারো ভাবনাতেই ছিল না। কিন্তু সেই বৃত্ত ভেঙে অনেক আগেই নারীরা তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তা ও ব্যবসা করার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। এক ধরনের পেশাদারিত্ব তৈরি করে নিজেদের মর্যাদাপূর্ণ জায়গায় নিতে সক্ষম হয়েছেন। আর তাই মেধা, নেতৃত্ব, দক্ষতা দিয়ে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে তারাও হয়ে উঠেছেন অনন্য একজন।

ঠিক তেমনি একজন লুনা শামসুদ্দোহা। যিনি স্বপ্ন দেখেন বাংলাদেশ প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে কেবলই এগিয়ে যাচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নারী উদ্যোক্তা ও নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন লুনা শামসুদ্দোহা। তিনি বাংলাদেশ উইমেন ইন আইটির (বিডাব্লিউআইটি) এর সভাপতি। দেশের খ্যাতনামা সফটওয়্যার কোম্পানি দোহাটেক নিউ মিডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান। সম্প্রতি তিনি জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান হয়েছেন। সুপরিচিত এই তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা প্রযুক্তিতে বিশেষ অবদান রাখায় আন্তর্জাতিক সম্মাননা পেয়েছেন। প্রযুক্তি খাতে নারীদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং নারীর ক্ষমতায়ন বৃদ্ধির কারণে গ্লোবাল উইমেন ইনভেন্টরস অ্যান্ড ইনোভেটরস নেটওয়ার্ক (গুইন) সম্মাননা পেয়েছেন। ২০০৫ সালে তিনি সুইস ইন্টারঅ্যাকটিভ মিডিয়া সফটওয়্যার অ্যাসোসিয়েশন (সিসমা) পান।

প্রযুক্তি খাতে নারীদের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধিতে ১৯৯২ সালে পল্টন লেনে মাত্র দুজন কর্মী নিয়ে ‘দোহাটেক’-এর যাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানে শতাধিক মেধাবী কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার কাজ করছেন। শুরুতে কনটেন্ট ম্যানেজমেন্টের কাজ করে ‘দোহাটেক’। এক সময় ডাব্লিউএইচও, ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের হয়েও এই কাজটি করেন তারা। বর্তমানে তাদের কর্মপরিধি প্রসারিত হয়েছে আমেরিকা, কানাডা, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশে। বাংলাদেশে ই-গভর্নেন্স তৈরির ক্ষেত্রে ‘দোহাটেক’ বিরাট ভূমিকা পালন করছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তারাই ভোটার এনরোলমেন্ট সফটওয়্যার তৈরি করে, যে ধারাবাহিকতায় সবার জন্য ন্যাশনাল আইডি কার্ড তৈরির বিশাল কর্মযজ্ঞ এ দেশে সম্ভব হয়েছে। ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট বা ই-জিপিতেও ‘দোহাটেক’-এর অবদান অসামান্য। বাংলাদেশ সরকারের এমপ্লয়মেন্ট জেনারেশন ফর দ্য পুওরেস্ট (ই-জিপিপি) প্রকল্পের এমআইএস সিস্টেমও ‘দোহাটেক’-এর অবদান। এসব কাজের নেতৃত্বেই থেকেছেন লুনা শামসুদ্দোহা। সম্মুখ সারিতে থেকে তিনিই সব সময় নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন।

সফটওয়্যার উদ্যোক্তা হিসেবে দেশে এবং বিদেশে তিনি একজন পরিচিত মুখ। শুধু তাই নয়, দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে একীভূত করার কৃতিত্বও তার। তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে অনেক উচ্চতায় নিতে চান তিনি। একই সঙ্গে এ খাতে নারীর সম্পৃক্ততা বাড়াতে তিনি অঙ্গীকারবদ্ধ। আর সেজন্যই হয়তো দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অন্যতম শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠন বেসিস নির্বাচনে এবার প্যানেল ঘোষণা করেছেন তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিশিষ্ট নারী উদ্যোক্তা লুনা শামসুদ্দোহা। তার প্যানেলের নাম ‘উইন্ড অব চেইঞ্জ’। তবে বেসিসের কার্যনির্বাহী কমিটির ৯টি পদের বিপরীতে ৮ জন প্রার্থী নিয়ে এই প্যানেল গঠন করা হয়েছে। এই ৮ জনের সবাই জেনারেল ক্যাটাগরিতে নির্বাচন করবেন। অ্যাসোসিয়েট ক্যাটাগরির একটি পদের জন্য কোনো প্রার্থী প্যানেলটিতে নেই।



নারীর ক্ষমতায়ন, বেসিস নির্বাচনসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা হয় লুনা শামসুদ্দোহার সঙ্গে।

প্রশ্ন : তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নারীদের সংশ্লিষ্ট করতে সরকারের কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত?
লুনা শামসুদ্দোহা : সরকারের অবশ্যই কাজ করার আছে। দেশেও সরকার কিন্তু বসে নেই। এই প্রযুক্তির অবকাঠামো কিন্তু সরকার বানিয়েছে। আমাদের দেশে যে প্রযুক্তি ইকো-সিস্টেম সেটাও সরকারের তৈরি করা। কারণ শুধু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এটা করা সম্ভব নয়। ট্যাক্স কমাচ্ছে, এ সবই করছে সরকার। এটাকে ব্যবহার করে আমরা যদি মেয়েদের আনতে পারি তবেই সফলতা। আমরা শুধু দেখি নাই, নাই, নাই। কিন্তু যেটুকু আছে সেটার ব্যবহার করতে আমরা পারি না। আমাদের এখন ৭ দশমিক ২ শতাংশ গ্রোথ। এখানে যে মেয়েদের অবদান নেই সেটাতো কেউ অস্বীকার করতে পারবে না।

প্রশ্ন : দোহাটেকের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান আপনি। এই প্রতিষ্ঠানটিকে আজকের অবস্থানে আনতে কোন ধরনের বাধা এসেছে কী?
লুনা শামসুদ্দোহা : দোহাটেককে আজকের অবস্থানে আসতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। কারণ অনেকবার ফেল করেছি। আবার দাঁড়িয়েছি। অনেক কাজ পাইনি, কিন্তু যেকাজ পেয়েছি সেটাতে ফেল করিনি। কেউ নিজের খাবার প্লেটে করে সাজিয়ে দেয় না। নিজে নিজে সেটা করে নিতে হয়। নিজে জেনে, বুঝে, এগিয়ে, সবার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে কাজ করছি। এটা একটা তৃপ্তির যে, আমাকে কেউ না দিলেও আমি একটা জায়গায় প্রতিযোগিতা করে কাজ নিতে পারছি, সেটা সফলভাবে করতে পারছি। এই চিত্র শুধু যে দেশে তা নয়, আমরা বাইরের দেশেও অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠানকে পিছনে ফেলে কাজ পেয়েছি, সেগুলো সফলভাবে করেছি। এটা আসলে কাজের যোগ্যতা। কোম্পানির যোগ্যতায় এটা করা।

প্রশ্ন : নারীদের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি কর্মক্ষেত্রের চ্যালেঞ্জগুলো কী?
লুনা শামসুদ্দোহা : এ এক মহাচ্যালেঞ্জ। আর এমন চ্যালেঞ্জ হাজারোটা রয়েছে। প্রথম কথা হলো, যদি অনেক উপর থেকে বলি তবে বলতে হয়, মেয়েরা কম্পিউটার সায়েন্স, ইঞ্জিনিয়ারিং খুব কম পড়ে। এটাকে অনেকেই ছেলেদের লেখাপড়া ভাবে। সেখানে একটা বাধা রয়েছে। তারপর মেয়েরা যাও পড়ে, তাতে ছেলেদের তুলনায় ক্যারিয়ারে যায় না। এটাও হয়। খুব কম মেয়ে দেখা যায় পড়ালেখা শেষে কাজ করতে আসে। এটাও সামাজিক চ্যালেঞ্জ। অনেকেই মেয়েদের রাতের বেলায় আসা যাওয়া, কাজ করাকে স্বাভাবিকভাবে নেয় না। এটা এখনো আমাদের দেশে হচ্ছে। এখনো সামাজিক বাধাটাই সবচেয়ে বড় বাধা। এসব সামাজিক বাধা অতিক্রম করে তাদের কাজে নিয়ে আসা চ্যালেঞ্জের।

প্রশ্ন: কর্মক্ষেত্রের বাইরে পারিবারিক জীবনে আপনি নিজেকে কতটা সফল মনে করেন?
লুনা শামসুদ্দোহা : আামদের একমাত্র মেয়ে রীম শামসুদ্দোহা। মা-বাবাকে দেখে মেয়ে তথ্যপ্রযুক্তিতে এলেও মা-বাবার প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হননি। নিজেই ‘যেতে চাও ডটকম’ (jetechao.com) নামে একটি ওয়েবসাইট চালু করেছে। যেখানে ঢাকা শহরের বিভিন্ন ইভেন্টের আপডেট খবরাখবর থাকে। মেয়ের এ উদ্যোগ আগামীতে বড় ধরনের সাফল্য পাবে বলে আশাবাদী।

প্রশ্ন : বেসিসের নির্বাচনে বিজয়ী হলে কোন কোন বিষয়ে অগ্রাধিকার থাকবে?
লুনা শামসুদ্দোহা : আমি সেই ১৯৯৪ সাল থেকে শিখে আসছি, এখনও শিখছি। এখন শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিক কোম্পানির সঙ্গেও প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকছি। আমার এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে বেসিসের কাজে লাগাতে চাই। আমি যেভাবে নিজের কোম্পানিকে এগিয়ে নিয়ে গেছি সেভাবে বেসিসের সদস্যভুক্ত কোম্পানিগুলোকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। বেসিস যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে তৈরি হয়েছিল সেই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থেকে অনেকটাই সরে গেছে। আমি বেসিসের সেই ভিত্তি, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই। ফোকাস ইনিশিয়েটিভ ও যথাযথ রিসার্চ করে সেটা যদি সবার সঙ্গে শেয়ার করা যায় তাহলে সকলেই উপকৃত হবে। তাই এটি আমার অন্যতম লক্ষ্য হবে। এছাড়া সচিবালয়কে শক্তিশালীকরণেরও উদ্যোগ নেয়া হবে। এটি অনেকটা পরিবারকে সামলানোর মতো। তাই আমার নিজের পরিবার বা প্রতিষ্ঠানগুলোকে যেভাবে সামলেছি বা এগিয়ে নিয়েছি ঠিক সেভাবেই বেসিস সচিবালয়কে পরিচালনার উদ্যোগ নেয়া হবে। আমার আরেকটি লক্ষ্য হলো, বিদেশি কোম্পানির আধিপত্য কমানো। বিদেশি কোম্পানি বাংলাদেশে কাজ করবে সেটা সমস্যা নয় বা আমরা স্বাগত জানাই। তাদের কাছ থেকে আমরা শিখবো। তাই বলে তাদের আধিক্য বা সব কাজ তারা করবে এটা মানা যায় না। আমরা লোকাল সফটওয়্যার তৈরি করে বিদেশে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কাজ করছি। সব জায়গায় টেকনোলজি এক, আমাদের দেশিয় কোম্পানিগুলোর সক্ষমতা রয়েছে, তাহলে আমাদের দেশে কেন দেশি কোম্পানিকে বাদ দিয়ে বিদেশি কোম্পানিকে কাজ দেওয়া হচ্ছে? এই বিষয়টাতেও আমার ফোকাস থাকবে। আমাদের প্রশিক্ষণও বিদেশিদের দেওয়া হচ্ছে। আমরা প্রয়োজনে বিদেশি পরামর্শক রাখবো, তাই বলে দেশের প্রশিক্ষণ বিদেশিদের দিতে চাই না। এই বিষয়েও কাজ করতে চাই।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২২ মার্চ ২০১৮/ফিরোজ

Walton AC
     
Walton AC
Marcel Fridge