ঢাকা, রবিবার, ৭ কার্তিক ১৪২৪, ২২ অক্টোবর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

সু চিকে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে

আলী নওশের : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৯-২১ ১২:০৫:২৬ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৯-২১ ১২:০৫:২৬ পিএম

মিয়ানমারের রাখাইনে সেনাবাহিনীর বর্বর হত্যা-নির্যাতনের কারণে গত মাস থেকে দলে দলে রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। এ পর্যন্ত কক্সবাজারে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় সোয়া চার লাখ। এর আগে বিভিন্ন সময়ে এসে বাংলাদেশে অবস্থান করছে আরো প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা। এই বিপুলসংখ্যক শরণার্থীর আশ্রয়, খাদ্য, চিকিৎসা প্রদানে হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ। মিয়ানমার সরকার রাখাইনে হত্যা-নির্যাতনের বিষয়টি অস্বীকার করে আসছে। সে দেশের ডিফ্যাক্টো প্রধান অং সান সু চিও তাদের সমর্থন করছেন। দেশটির সেনাবাহিনী যখন অভিযানের নামে –নিষ্ঠুর নির্যাতন, হত্যাকাণ্ড চালিয়ে আসছিল, তখন সু চি এটিকে 'সন্ত্রাস দমন' আখ্যা দিয়ে প্রকারান্তরে মিয়ানমার বাহিনীর প্রশংসা করেছেন।

তবে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তীব্র সমালোচনা ও চাপের মুখে সু চি অবশেষে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়ে কথা বলেছেন। কিন্তু তিনি যে ভাষণ দিয়েছেন তাতে রোহিঙ্গা সংকটের বাস্তব সমাধানে আশাবাদী হওয়ার মতো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। রাখাইনে রোহিঙ্গাদের হত্যা-নির্যাতন, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে তাদের দেশত্যাগে বাধ্য করার জন্য মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ন্যুনতম সমালোচনাও করেননি তিনি। বরং দাবি করেছেন, ৫ সেপ্টেম্বরের পর রাখাইনে কোনো ধরনের অভিযান চালানো হয়নি। তিনি রাখাইন থেকে মুসলমানদের পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার কথা স্বীকার করলেও বক্তৃতার কোথাও তাদের ‘রোহিঙ্গা’ হিসেবে উল্লেখ করেননি।

তার বক্তব্যে প্রতীয়মান হয়, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মতো সু চিও রোহিঙ্গাদের জাতি হিসেবে স্বীকার করেন না। তাদের মিয়ানমারের নাগরিক মনে করেন না। অথচ এ সংকটের মূলে রয়েছে জাতিবিদ্বেষ। সু চি যদি রোহিঙ্গাদের জাতি হিসেবে স্বীকার করে না নেন, তাহলে এর সমাধান হবে কীভাবে? যদিও তিনি তার ভাষণে বলেছেন, নব্বই দশকে করা প্রত্যাবাসন চুক্তির আওতায় বাংলাদেশে থাকা শরণার্থীদের যাচাইয়ের মাধ্যমে ফিরিয়ে নিতে প্রস্তুত। কিন্তু তার এ বক্তব্যের মধ্যে বেশ ফাঁক রয়েছে। কারণ পালিয়ে আসা চার লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে কীভাবে যাচাই-বাছাই করা হবে তা অস্পষ্ট। অন্যদিকে এর আগে আসা প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গার ভাগ্যে কী ঘটবে সে বিষয়েও খোলাসা করেননি।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে পরিস্থিতি দেখার জন্য রাখাইন পরিদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন সু চি। এ ব্যাপারে সহযোগিতারও আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। একইসঙ্গে বলেছেন, কোফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে তার সরকার কাজ করবে। তার এসব বক্তব্য ইতিবাচক হলেও এর বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় থাকছে। কেননা মিয়ানমারে ক্ষমতার মূল চাবিকাঠি সামরিকবাহিনীর হাতে। সম্প্রতি মিয়ানমারের সেনাপ্রধান সে দেশের নাগরিকদের প্রতি রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ‘ঐক্যবদ্ধ’ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এ অবস্থায় বাংলাদেশসহ বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ সংকট সমাধানে সু চির কাছে সুস্পষ্ট ও বলিষ্ঠ বক্তব্য প্রত্যাশা করেছিল।

সু চি নিজ দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘকাল গৃহবন্দি থেকেছেন। এজন্য সারা বিশ্বে নন্দিত হয়েছেন তিনি। ভূষিত হয়েছেন নোবিল শান্তি পুরস্কারে। আর আজকের নির্যাতিত রোহিঙ্গা মুসলমানরা সেদিন তার আন্দোলনকে সমর্থন দিয়েছে। অথচ আজ রোহিঙ্গারা যখন মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাতে বর্বর নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, তখন তিনি তাদের সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসা দূরে থাক ন্যুনতম সহানুভূতিও প্রকাশ করেননি। সবার প্রত্যাশা ছিল, সু চির দল ক্ষমতায় আসার পর রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার নিশ্চিত হবে। রাখাইনে প্রতিষ্ঠিত হবে আইনের শাসন। কিন্তু আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে দেখছি, তার শাসনামলে রোহিঙ্গাদের দুর্ভোগ বরং আরো বেড়েছে।

ভাষণে সু চি রোহিঙ্গাদের ‘যাচাই করে’ ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু এই যাচাইয়ের কাজ করা হবে কিসের ভিত্তিতে? তাদের নাগরিকত্বের সনদ নেই, কোনো পরিচয়পত্রও নেই। ফলে বিষয়টি নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে মিয়ানমার, বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মিলে ত্রিপক্ষীয়ভাবে এই যাচাইপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। এক্ষেত্রে সু চির যদি আন্তরিকতা থাকে, তাহলে তিনি এ প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে যথাযথ উদ্যোগ নেবেন।

আমরা মনে করি পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি। সুপারিশে রয়েছে, মিয়ানমারের ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন সংশোধন এবং এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান আন্তর্জাতিক রীতিনীতি বিবেচনায় নিতে হবে। আমাদের প্রত্যাশা এ বিষয়টি যথাযথভাবে সম্পন্ন করা হবে। ওই সুপারিশে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা প্রদান, অবাধে চলাচলের অধিকারসহ অন্যান্য মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে। তবে সব কাজই হতে হবে জাতিসংঘের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে। আমাদের প্রত্যাশা বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় উদ্যোগে অচিরেই কেটে যাবে রোহিঙ্গা সংকট।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭/আলী নওশের

Walton
 
   
Marcel