ঢাকা, রবিবার, ৭ কার্তিক ১৪২৪, ২২ অক্টোবর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:
রোহিঙ্গা সংকট

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ দিকনির্দেশনামূলক

আলী নওশের : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৯-২৪ ২:১০:২৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৯-২৪ ২:১০:২৩ পিএম

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭২তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বর্বরতার চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি রাখাইনে রোহিঙ্গাদের নির্যাতন হত্যা, ধর্ষণ ও আগুন দিয়ে ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার মতো আন্তর্জাতিক অপরাধের চিত্র তুলে ধরেন বিশ্ব নেতাদের সামনে। বাংলাদেশ কোন পরিস্থিতিতে কয়েক লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিতে বাধ্য হয়েছে সে বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি। বাংলায় দেওয়া তার এ ভাষণ ছিল আবেগঘন এবং একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকটসহ বিশ্বব্যাপী অভিবাসন ও শরণার্থী সমস্যা মোকাবেলার প্রশ্নে দিকনির্দেশনামূলক।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে পাঁচ দফা প্রস্তাবও দিয়েছেন। তিনি অনতিবিলম্বে মিয়ানমারে সহিংসতা ও ‘জাতিগত নিধন’ বন্ধ করা, মিয়ানমারে জাতিসংঘের মহাসচিবের নিজস্ব একটি অনুসন্ধানী দল পাঠানো, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সব সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা বিধান এবং এ লক্ষ্যে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে সুরক্ষা বলয় গড়ে তোলা, রাখাইন রাজ্য থেকে জোরপূর্বক বিতাড়িত সব রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে তাদের নিজ ঘরবাড়িতে প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা ও কফি আনান কমিশনের সুপারিশমালা দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার জন্য বলেছেন।

গত প্রায় এক মাসে সোয়া চার লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশের কক্সবাজারে এসে আশ্রয় নিয়েছে। এর আগে বিভিন্ন সময়ে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ। এই নয় লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে দীর্ঘ সময় ধরে লালন-পালন করতে গিয়ে বাংলাদেশকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অর্থনীতি। সেই অবস্থা বর্ণনা করে বিশ্বনেতাদের কাছে রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত ও স্থায়ী সমাধান দাবি করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে তিনি তার ভাষণে যেসব দেশ শরণার্থী সংকটে রয়েছে, তাদের এবং শরণার্থীদের প্রতি সহমর্মী হয়ে সব ধরনের শরণার্থী সংকট সমাধানে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মানবিক দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

সাধারণ পরিষদে আবেগাপ্লুত ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান এবং প্রতিনিধিদের উদ্দেশে বলেছেন, এ মুহূর্তে আমার চোখে বারবার ভেসে উঠছে ক্ষুধার্ত, ভীতসন্ত্রস্ত এবং নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের মুখচ্ছবি। আমি মাত্র কয়েক দিন আগে আমার দেশের কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া কয়েক লাখ রোহিঙ্গার সঙ্গে দেখা করে এসেছি, যারা ‘জাতিগত নিধনে’র শিকার হয়ে আজ নিজ দেশ থেকে বিতাড়িত। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্যমতে, গত তিন সপ্তাহে বাংলাদেশে ৪ লাখ ৩০ হাজার শরণার্থী এসেছে। জাতিগত নিধনের শিকার এসব রোহিঙ্গা হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমারে বসবাস করে আসছে।

বস্তুতঃ শরণার্থী সমস্যা শুধু বাংলাদেশে নয়। বিভিন্ন দেশে এ সমস্যা বিরাজমান। তাই এটি এখন এক বড় আন্তর্জাতিক ইস্যু। প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান বিশ্বের সব অঞ্চলের সব শরণার্থীর নিজ দেশে স্বাভাবিক জীবনের নিশ্চয়তা বিধানের ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা রাখবে বলা যায়। বিশ্বনেতাদের আলোচনায়ও ঘুরেফিরে আসছে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিধন ও লাখ লাখ রোহিঙ্গার দেশত্যাগের কথা।

জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে যে সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছেন তা বিপুলভাবে প্রশংসিত হয়েছে।  অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ যেভাবে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়েছে, তা প্রায় নজিরবিহীন। তাদের আশ্রয় দেওয়ায় বিশ্বনেতারা বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করে সংকটের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ ও রোহিঙ্গাদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

আমরা মনে করি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া এই পাঁচ দফা প্রস্তাব বাস্তবায়নের ওপরই রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। রোহিঙ্গা সমস্যা যেহেতু এই অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে, সেহেতু আঞ্চলিক শান্তির স্বার্থেও বিষয়টি দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ দরকার। প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে কফি আনান কমিশনের সুপারিশমালার পূর্ণ বাস্তবায়ন চেয়েছেন। বস্তুত এটাই রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান। এখন বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো গেলেও সেটি স্থায়ী সমাধান নয়। কেননা রোহিঙ্গাদের প্রতি মিয়ানমার সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না হলে আবারও একই রকম পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭/আলী নওশের

Walton
 
   
Marcel