ঢাকা, রবিবার, ২ পৌষ ১৪২৫, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:
নিরাপদ সড়ক আইন

যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে

আলী নওশের : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৮-০৯ ৯:৩৮:০০ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৯-১৯ ১:৪৬:৪৯ পিএম

রাজধানীতে বাসচাপায় শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট স্কুল ও কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করে। তাদের ব্যাপক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। এখন সংসদ অধিবেশনে এই আইন উত্থাপন করা হবে এবং সর্বসম্মতভাবে পাস হলে তা আইনে পরিণত হবে। কিন্তু অনুমোদিত এই আইনে নিরাপদ সড়ক কতটা কার্যকর বা বাস্তবায়িত হবে তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন পর্যবেক্ষক মহল।

সড়ক পরিবহন ক্ষেত্রে বাংলাদেশে যে এক নৈরাজ্যজনক অবস্থা বিরাজ করছে তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। রাজধানীসহ সারাদেশে প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে চলে ট্রাফিক আইন ভাঙার প্রতিযোগিতা। সড়ক দুর্ঘটনার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে ১৩তম। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সপ্তম। সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রতিনিয়তই দুর্ঘটনায় হতাহত ও নানা রকম অনাকাঙ্খিত ঘটনার খবর আমরা দেখতে বা শুনতে পাই। তাই নিরপদ সড়কের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্নভাবে বলা হচ্ছিল। দিয়া-করিমের মৃত্যুর পর এ বিষয়টি অনেক জোরালোভাবে সামনে চলে আসে এবং কোমলমতি শিক্ষার্থীরা সোচ্চার হয় নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠার দাবিতে।

অনুমোদিত এই আইন অনুযায়ী বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে দুর্ঘটনা প্রমাণিত হলে দোষী ব্যক্তি অর্থ্যাৎ চালকের সর্বোচ্চ পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ডসহ অর্থদণ্ড অথবা উভয়দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আইনে পরিবহন মালিককেও দায়বদ্ধতার আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া দুর্ঘটনাকবলিত যানবাহন ও চালক-হেলপারের ওপর হামলা করা যাবে না বলেও বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি চালকের শিক্ষাগত যোগ্যতা ন্যূনতম অষ্টম শ্রেণি পাস হতে হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালালে সর্বোচ্চ ৬ মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান করা হয়েছে। কেউ এই অপরাধ করলে তাকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার করা যাবে। বর্তমানে এই অপরাধে তিন মাসের কারাদণ্ড বা পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা রয়েছে। আইনে কতিপয় ধারায় সংঘটিত অপরাধ অজামিনযোগ্য রাখা হয়েছে যা ইতিবাচক দিক।

তবে বহুল আলোচিত এই সড়ক পরিবহন আইনে জনদাবির যথাযথ প্রতিফলন ঘটেনি বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। যাত্রী কল্যাণে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের নেতাসহ সুশীল সমাজের দাবি ছিল সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। এ আইনে আগে দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত বা প্রাণহানির জন্য সর্বোচ্চ সাজা ছিল তিন বছরের কারাদণ্ড। এ ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের জনদাবি ছিল সর্বোচ্চ সাজা ১০ বছর বা তারও বেশি করার। এমনকি হাইকোর্টেরও নির্দেশনা ছিল সাত বছর করার। প্রত্যাশা ছিল, বিদ্যমান আইনের চেয়ে প্রস্তাবিত আইন অনেক বেশি কঠোর হবে। কিন্তু সর্বোচ্চ সাজা পাঁচ বছরের কারাদণ্ড করায় যাত্রীদের স্বার্থ রক্ষা হয়নি বলে মনে করছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা।

খসড়া আইনে বেপরোয়া গাড়ি চালনার জন্য জরিমানার সীমা উল্লেখ করা হয়নি। এটি বিচারাধীন মামলার বিচারকের ওপর ছাড়া হয়েছে। আর বেপরোয়া গাড়ি চালানোর মাধ্যমে মৃত্যু হলে তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় এটা ইচ্ছাকৃত ছিল তবে দণ্ডবিধি ৩০২ ধারা অনুযায়ী তার বিচার হবে। এর জন্য শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু এটি নির্ভর করবে তদন্তের ওপর। তদন্ত যদি সুষ্ঠু হয় এবং এর রিপোর্ট ও চার্জশিট যথাযথ হয় তবে অপরাধীর উপযুক্ত সাজা হতে পারে। এজন্য তদন্ত যারা করবেন তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি।

অনুমোদিত আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, দুর্ঘটনায় কেবল চালকের সাজার কথা বলা হয়েছে। অবশ্য এটি ঠিক যে, আমাদের দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রে চালকের অদক্ষতা, বেপরোয়া গাড়ি চালনা, অসুস্থ প্রতিযোগিতা ইত্যাদির কারণেই দুর্ঘটনা ঘটে বেশি। তবে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য সবসময় কেবল চালকই দায়ী নয়, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, ভুল সিগন্যাল, অসতর্ক যাত্রী-পথচারী, সড়কের পাশে হাটবাজার ইত্যাদিও কম দায়ী নয়। প্রশিক্ষিত চালকেরও অভাব রয়েছে। তা ছাড়া বিআরটিএসহ ট্রাফিক বিভাগের অব্যবস্থা, ঘুষ-দুর্নীতিও এর জন্য অনেকাংশে দায়ী। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের দায়বদ্ধতা এবং সাজার প্রশ্নটি চলে আসে। সুতরাং এসব বিষয়েও নজর দেওয়া প্রয়োজন।

অবশ্য এ আইনের ফলে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত হয়ে যাবে এমনটি মনে করার কারণ নেই। আইন প্রণয়নের চেয়ে আইনের যথাযথ প্রয়োগের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে এ বিষয়ে জোরালো দৃষ্টি দিতে হবে। আর আইন চূড়ান্ত করার আগে আরো ভালভাবে যাচাই এবং ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের মতামত নিয়ে প্রয়োজনীয় সংশোধন করার পর সে অনুযায়ী বাস্তবায়ন করতে হবে। আইন অনুযায়ী যথাযথ পদক্ষেপ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে দুর্ঘটনা কমে আসবে এবং নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠা হবে এমনটিই প্রত্যাশা আমাদের।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৯ আগস্ট ২০১৮/আলী নওশের/শাহনেওয়াজ

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC