ঢাকা, শুক্রবার, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ২৪ মে ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

পানি বন্ধ করে নামিবিয়ায় গণহত্যা চালিয়েছে জার্মানি

শাহেদ হোসেন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৭-০১-২৮ ৭:১৭:২৬ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০১-৩০ ২:০০:৩৬ পিএম
বন্দি হেরেরো মানুষ
Walton AC

শাহেদ হোসেন : বিশ শতকে বিশ্বের প্রথম গণহত্যা চালিয়েছিল জার্মানরা। তবে সেটা নিজেদের দেশে নয়। ১৭ শতকের শেষ থেকে যাদেরকে অসভ্য আর বর্বর বলে আখ্যা দিয়ে আসছিল সেই আফ্রিকার দেশ নামিবিয়ায়। নিজেদের দখলদারিত্ব টিকিয়ে রাখতে প্রায় এক লাখ মানুষকে হত্যা করেছে তারা। পানি ও খাবার সরবরাহ বন্ধ করে, শারীরিক মানসিক নির্যাতন ও ধর্ষণ করে এবং নির্বাসনে পাঠিয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে নামিবিয়ার হাজার হাজার নারী-পুরুষ ও শিশুকে। দক্ষিণ-পশ্চিম আফ্রিকায় পরিচালিত এই গণহত্যাকে সুকৌশলেই চেপে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন ইউরোপের ইতিহাসবিদরা।

১৮৮৪ সালে আফ্রিকায় উপনিবেশ স্থাপন শুরু করে জার্মানি। উপনিবেশবাদীদের প্রধান অস্ত্র ধর্মকে ব্যবহার করেই নামিবিয়ায় প্রবেশ করেছিল তারা। প্রথমে দেশটিতে প্রবেশ করল পাদ্রি, তারপর ব্যবসায়ী এবং সবশেষে সৈন্যসামন্ত। রেইনিশ মিশনের একজন পাদ্রী সেখানে নামা উপজাতির প্রধান জোসেফ ফ্রেডারকে বুঝিয়ে শুনিয়ে লুদেরিৎস নামের এক জার্মান ব্যবসায়ীর সঙ্গে দুটি চুক্তি করান। চুক্তি অনুযায়ী এই ব্যবসায়ী আঙ্গবা পেকুয়েনা উপসাগরের প্বার্শবর্তী অঞ্চল এবং ২০০ মাইল দীর্ঘ উপকূলবর্তী ভূখণ্ডের দখল পান। পরবর্তী সময়ে জার্মানরা নামাদের জন্মভূমির পুরোটাই দখল করে ফেলে।

১৮৯৪ সালে থিওডর লিওতেইনকে দক্ষিণ-পশ্চিম আফ্রিকার গভর্নর করে পাঠান জার্মান সম্রাট। তিনি বিনা রক্তপাতে উপনিবেশ বিস্তারের নীতি গ্রহণ করেন। স্থানীয়দের কাছ থেকে নামমাত্র মূল্যে জমি কিনে সেসব জায়গা জার্মান বসতি স্থাপনকারীদের দেওয়া হয়। বসতি গড়া জার্মানরা অস্ত্রের জোরে স্থানীয় নারীদের তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ ও নির্যাতন করতো। প্রতিবেশী নামিবিয়দের গৃহপালিত পশু জোর করে নিয়ে যেতো এবং কৃষিকাজ ব্যহত হয় এমন সব কর্মকাণ্ড করতো।

হেরেরো উপজাতির লোকরা অনেকটা বিপদে পড়েই জার্মানদের কাছে আশ্রয় চেয়েছিল। মূলতঃ পশুপালনই ছিল তাদের প্রধান জীবিকা। ওই সময় হেরেরোদের নেতা ছিলেন কামাহারেরো। প্রতিবেশী খোয়েসেইন গোত্রের শাখা খোইখোই গোত্রের নেতা হেনরিক উইটবোর নেতৃত্বে বারবার হামলা চালানো হচ্ছিল হেরেরোদের ওপর। তাই বাধ্য হয়েই নিজের গোষ্ঠীকে বাঁচাতে জার্মান সম্রাটের ঔপনিবেশিক গভর্নরের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করেন কামাহারেরো। তবে বাস্তবে তিনি জার্মানদের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পাননি। উল্টো দিনের পর দিন জার্মানরা হেরেরো নারী ও কিশোরীদের তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করত। এ ব্যাপারে গভর্নরের কাছে বারবার অভিযোগ জানিয়েও কোনো কাজ হয়নি। শেষ পর্যন্ত ১৮৮৮ সালে এ চুক্তি বাতিল করা হয়। তবে দুই বছর পর আবারও এ চুক্তি কার্যকর করা হয়।



সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে লেফটেনেন্ট জেনারেল লোথার ভন ত্রোথা (বা থেকে চতুর্থ)


জার্মানরা ১৯০৩ সাল নাগাদ নামিবিয়ায় হেরেরোদের ১ লাখ ৩০ হাজার বর্গকিলোমিটার জায়াগার মালিক বনে যায়। আফ্রিকা উপকূল থেকে জার্মান উপনিবেশের ভেতরে দ্রুত ও সহজে যাতায়াতের জন্য রেলপথ নির্মাণের উদ্যোগ নেয় তারা। এর জন্য তারা গোপনে হেরেরোদের অঞ্চলটিকে দুই ভাগ করে ফেলার পরিকল্পনা করে। ১৯০৩ সালে হেরেরোরা যখন এটি জানতে পারে তখন তারা ক্ষোভে ফেটে পড়ে। হেরেরোদের ক্ষেপে ওঠার আরো একটি কারণ ছিল জার্মানদের ঋণ জালিয়াতি ও ঋণের টাকা জবরদস্তিমূলক আদায়। সহজ-সরল হেরেরোদের ভুলিয়ে ভালিয়ে ঋণ দিত জার্মান বসতি স্থাপনকারীরা। চড়া সুদের কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই সেই অর্থ বহুগুন হয়ে যেত। গভর্নর থিওডর লিওতেইন বিষয়টি লক্ষ্য করে ঘোষণা দেন, ১৯০৩ সালের মধ্যে হেরেরোদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ে সক্ষম না হলে বসতি স্থাপনকারী জার্মানদের ঋণচুক্তি বাতিল করা হবে। এরপরই ঋণের অর্থ আদায়ে তৎপর হয়ে ওঠে জার্মান বসতি স্থাপনকারীরা। সামান্য অর্থের জন্য হেরেরোদের গবাদি পশুগুলোকে জোর করে নিয়ে যেতে শুরু করে তারা।

১৮৯০ সালে কামাহারেরোর ছেলে স্যামুয়েল গোত্রপতি হন। তিনি অন্যান্য গোত্রের নেতাদের সঙ্গে জার্মানদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য গোপনে বৈঠক করেন। ১৯০৪ সালের ১২ জানুয়ারি বিদ্রোহ ঘোষণা করে স্যামুয়েল ও তার বাহিনী। ওই দিনই তারা ১২৬ জন জার্মানকে হত্যা করে।

এ খবর জার্মানিতে পৌঁছার পর সম্রাট কাইজার মেজর লিওতেইনকে সামরিক দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেন। তার স্থলাভিষিক্ত করা হয় লেফটেন্যান্ট জেনারেল লোথার ভন ত্রোথাকে। পশ্চিম আফ্রিকায় আসার সময় ভন ত্রোথা সঙ্গে নিয়ে আসেন ভারী অস্ত্রে সজ্জিত ১৪ হাজার যোদ্ধা আর হেরেরোদের সমূলে উৎখাতের পরিকল্পনা।

বাক্সে ভরা হচ্ছে হেরেরোদের মাথার খুলি


১১ জুন ত্রোথার সেনারা ওয়াটারবার্গে ৩ থেকে ৫ হাজার হেরেরো যোদ্ধাকে ঘিরে ফেলে। আধুনিক অস্ত্রের মুখে বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারেনি হেরেরোরা। পলাতকদের মরুভূমির দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয় । নিরস্ত্র হেরেরোদের ওপর জার্মান বাহিনীর নৃশংতার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন তাদের পথ প্রদর্শক জ্যান ক্লটি। তিনি বলেছেন, ‘ওয়াটারবার্গে হেরেরোরা যখন পরাজিত তখন আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। যুদ্ধের পর হেরেরো নারী, পুরুষ আর শিশুরা জার্মান সেনাদের হাতে ধরা পড়ে। তাদেরকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হচ্ছিল অথবা পঙ্গু করে ফেলা হচ্ছিল। এদের ওপর নির্যাতন শেষে জার্মান সেনারা পলায়নরত হেরেরোদের ধাওয়া করে। পথে নিরস্ত্র ও একেবারেই সাধারণ হেরেরো লোকজন, যারা কেবল তাদের গবাদি পশু নিয়ে এলাকা ছেড়ে যাচ্ছিল, তাদেরকে গুলি করে অথবা বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়।’

হেরেরো যোদ্ধাদের ওমাহেকে মরুভূমির দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যায় ত্রোথার সেনারা। মরু এলাকা তাদের আর ফিরতে দেয়া হয়নি। দিনের পর দিন খাদ্য ও পানীয়ের অভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে শুরু করে হেরেরোরা। অভিযোগ রয়েছে, মরু এলাকায় যে কয়টি কূপ ছিল জার্মান সেনারা কৌশলে সেগুলোতে বিষ প্রয়োগ করেছে। 

ইতিহাসবিদদের মতে, ওমাহেকে মরুভূমিতে পানিশূণ্যতায় মারা গেছে ৬০ হাজার হেরেরো। বেঁচে যাওয়া মাত্র এক হাজার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে হেরেরো নেতা স্যামুয়েল মরুভূমি পাড়ি দিয়ে ব্রিটিশ অধিভুক্ত এলাকা বেচুনাল্যান্ডে পৌঁছাতে সক্ষম হন।

ফাঁসিতে ঝুলানো হয়েছে হেরেরো পুরুষদের


এদিকে ত্রোথার নির্দেশে পেছনে পড়ে থাকা প্রায় ১৫ হাজার হেরেরোকে বন্দি শিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়। এর আগে ত্রোথা নির্দেশ দিয়েছিলেন, পুরুষদের যেন দেখামাত্র গুলি করা হয়। আর নারী ও শিশুদের যেন মরুভূমির দিকে হাকিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়, যাতে তাদের হত্যা করতে কোনো গুলি খরচ করতে না হয়। নারীদের হত্যার পেছনে ত্রোথা আরো একটি কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। ওই সময় জার্মান সেনারা হেরেরো তরুণীদের সমানে ধর্ষণ করতো। পরে তাদের কাউকে হয়তো বাঁচিয়ে রাখা হতো আবার কাউকে ছেড়ে দেয়া হতো। ত্রোথা চাননি, এই নারীদের গর্ভে জার্মান সেনাদের সন্তান জন্ম নিক।

২ অক্টোবর হেরেরোদের দেশ ছাড়ার আদেশ জারি করেন ত্রোথা। তিনি এতে লেখেন, ‘আমি জার্মান সেনাদের মহান জেনারেল এই চিঠি হেরেরো জনগণের প্রতি পাঠাচ্ছি। হেরেরোরা এখন আর জার্মানদের কোনো বিষয় নয়। হেরেরো জাতিকে অবশ্যই এই দেশ ছাড়তে হবে। যদি তারা না ছাড়ে তাহলে কামানের মুখে আমি তাদেরকে এটি করতে বাধ্য করব। বন্দুকসহ কিংবা বন্দুক ছাড়া যে কোনো অবস্থাতেই কোনো হেরেরোকে জার্মান সীমান্তের মধ্যে পাওয়া গেলেই গুলি করে হত্যা করা হবে।’

৫ নভেম্বর গভর্নর থিওডর লিওতেইনকে লেখা এক চিঠিতে ত্রোথা লেখেন, ‘আমি এই আফ্রিকান উপজাতিদের খুব ভালোভাবে চিনি। এরা একেবারেই অসভ্য ও সহিংস। এই সহিংসতা দমনে ভয়ঙ্কর পদক্ষেপ গ্রহণের নীতি আমার আগেও ছিল এখনো আছে, যদিও তা নির্মম হয়। আমি রক্তের নদী আর অর্থের স্রোত বইয়ে বিদ্রোহী উপজাতিদের ধ্বংস করে দিয়েছি। আর এই পরিশোধনের মাধ্যমেই নতুন কিছু বের হয়ে আসতে পারে।’

নির্যাতিত-নিপীড়িত হেরেরোদের পাশে কোনো জার্মানই এগিয়ে আসেনি। বরঞ্চ ত্রোথার নির্মমতার পক্ষে চ্যান্সেলর ভন বুলোর কাছে সেনাপ্রধান কাউন্ট ভন সিলিফেন বলেছিলেন, ‘পুরো হেরেরো সম্প্রদায়কে বিলুপ্ত করে দেয়া কিংবা তাদেরকে দেশ থেকে বের করে দেয়ার ব্যাপারে জেনারেল ভন ত্রোথা যে যুক্তি দেখিয়েছেন তার বিপক্ষে আপত্তি করা কঠিন। সিলিফেন উল্টো পরামর্শ দিয়েছিলেন হেরেরোদের কাছে যেন জবরদস্তি শ্রম আদায় করা হয়, যা দাসপ্রথার বিকল্প রূপ।

লেফটেনেন্ট জেনারেল লোথার ভন ত্রোথা


নির্যাতন শিবিরে বন্দি হেরেরোদেরকে  গবেষণাগারের গিনিপিগের মতো ব্যবহার করেছেন জার্মান জিন বিজ্ঞানী ইউজেন ফিশার। তিনি দেখাতে চেষ্টা করেন, সেনাদের ধর্ষণে হেরেরো নারীদের গর্ভে জন্ম নেয়া শিশুরা শারীরিক ও মানসিকভাবে জার্মান পিতার মতো উৎকৃষ্ট হয় না। আর তার এই গবেষণার ফলাফল নিয়ে লিখেছেন, ‘দ্য প্রিন্সিপালস অব হিউম্যান হেরিডিটি অ্যান্ড রেস হাইজিন’ বইটি। সুস্থ সবল বন্দিদের দেহে আর্সেনিক ও আফিমের নির্যাসসহ বিভিন্ন ওষুধ প্রয়োগ করতেন বোফিঙ্গার নামে এক চিকিৎসক। পরে তিনি অপারেশন করে তার ওষুধের প্রতিক্রিয়া দেখতেন। আরেক জার্মান প্রাণিবিজ্ঞানী লিওপার্ড সুলৎজ জানিয়েছেন, পরীক্ষা চালানোয় মৃত বন্দিদের দেহের বিভিন্ন অংশ স্তুপ হয়ে থাকতো। একে তিনি স্বাগতই জানাতেন। হেরেরোরা জাতিগতভাবে নিকৃষ্ট- এটা প্রমাণের জন্য নিহতদের তিনশ খুলি পাঠানো হয় বার্লিনে বিজ্ঞানীদের কাছে।

ঐতিহাসিকদের মতে, ১৯০৮ সাল নাগাদ হেরেরো জনগোষ্ঠী ৮০ হাজার থেকে কমে মাত্র ১৫ হাজারে এসে ঠেকে। অর্থাৎ চার বছরে ৬৫ হাজার হেরেরোকে হত্যা করেছে জার্মান সেনারা।

১৯০৫ সালে জার্মান উপনিবেশবাদীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে নামা উপজাতি। নামাদের আত্মসমর্পণ করতে কঠোর ভাষায় চিঠি লেখেন ত্রোথা। তিনি এতে হেরেরোদের উদহারণ হিসেবে নিয়ে আসেন এবং আত্মসমর্পণ না করলে সমূলে নামাদের বিনাশের হুমকি দেন। ১৯০৭ সালে নামারা আত্মসমর্পণ করে। এরপর তাদের ওপর নেমে আসে জার্মানদের অমানবিক নির্যাতন। বন্দিদের শার্ক আইল্যান্ডের বন্দি শিবিরে পাঠানো হয়। নির্যাতন আর মৃত্যু এখানে এতোই বেশি ছিল যে, পরবর্তী সময়ে এর নাম হয়ে যায় ডেড আইল্যান্ড। অনাহার, নির্যাতন, আর রোগে শোকে এক মাসে এখানে মারা যায় ২৫২ জন বন্দি। মাত্র তিন বছরের মাথায় নামা জনগোষ্ঠী ২০ হাজার থেকে ৯ হাজারে নেমে আসে।

তথ্যসূত্র :

১. বিবিসি।
২. দ্য জার্নাল।
৩. PEACE PLEDGE UNION.
৪. THE KAISER'S HOLOCAUST: GERMANY'S FORGOTTEN GENOCIDE AND THE COLONIAL ROOTS OF NAZISM BY DAVID OLUSOGA.



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৮ জানুয়ারি ২০১৭/শাহেদ/শাহনেওয়াজ

Walton AC
     
Walton AC
Marcel Fridge