ঢাকা, সোমবার, ১০ আশ্বিন ১৪২৪, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

বার্লিন প্রাচীর এখনো দেশে দেশে

হাসান মাহামুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৮-১৩ ৮:২২:০৫ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৮-১৩ ১১:৪৩:০৭ এএম

হাসান মাহামুদ : আরো তিন বছর আগে জার্মানিতে বার্লিন প্রাচীর পতনের রজত জয়ন্তী পালন করা হয়। বার্লিন প্রাচীর ডিঙাতে গিয়ে যারা প্রাণ হারিয়েছেন তাদের স্মরণ করা হয় শ্রদ্ধাভরে। কিন্তু এতো বৃহৎপ্রাচীরের ধ্বংসাবশেষ তো আর নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি। প্রাচীরের টুকরো ছড়িয়ে আছে বলা চলে সারা বিশ্বেই। এমনকি একবার জার্মানির এক গবেষক বলেছিলেন, প্রাচীরের টুকরো জার্মানিতে যে পরিমাণ আছে, তার থেকে বেশি আছে যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে।

বলা হয়, প্রায় তিন দশক জুড়ে অটল দাঁড়িয়ে থাকা ওই প্রাচীর ভেঙে ফেলার সময় থেকেই টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সারা দুনিয়ায়। কথাটাকে রূপক হিসেবে নিলে, প্রাচীর ছড়িয়ে আছে দুনিয়ার কোণায় কোণায়। বার্লিন প্রাচীরের জন্য এমন ৫৪ হাজার কংক্রিট-স্ল্যাব বানানো হয়েছিল প্রাচীরের পশ্চিম জার্মানি অংশের জন্য।

১৯৬১ সালের আজকের এই দিনে (১৩ আগস্ট) বার্লিন প্রাচীর নির্মাণকাজ শুরু হয়। পূর্ব ও পশ্চিম বার্লিনের মধ্যে এ প্রাচীর নির্মিত হয়। পূর্ব জার্মানির নাগরিকরা যাতে পশ্চিম জার্মানিতে প্রবেশ করতে না পারে সে জন্য তখন পূর্ব জার্মান সরকার এই প্রাচীর নির্মাণ করে। ১৯৮৯ সালে ইউরোপে সমাজতন্ত্রের পতনের ফলে বার্লিন প্রাচীরের পতন ঘটে এবং দুই জার্মানির আবার একত্রিত হওয়ার পথ সুগম হয়। সুদীর্ঘ ২৮ বছর এটি পশ্চিম বার্লিন থেকে পূর্ব বার্লিন এবং পূর্ব জার্মানির অন্যান্য অংশকে পৃথক করে রেখেছিল। সরকারি হিসাব অনুযায়ী এ সময়কালে প্রাচীর টপকে পশ্চিম বার্লিন যাওয়ার চেষ্টাকালে ১২৫ জন প্রাণ হারান। এখন এ প্রাচীর শুধু ইতিহাস।

বার্লিনে যেসব পর্যটক ঘুরতে যান সম্ভবত তাদের মুখে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়, বার্লিন প্রাচীরের কথা। জার্মানদের কাছে এই প্রাচীর এক দুঃসহ অতীতের স্মৃতি ভরা হলেও পশ্চিমা দেশগুলো ও দুনিয়ার অন্য অনেক অংশের মানুষেরাই এই প্রাচীরের টুকরোগুলোকে দেখেন ‘গণতন্ত্র, নাগরিক অধিকার ও পুবের ওপর পশ্চিমের বিজয় চিহ্ন’ হিসেবে।

কিন্তু আক্ষরিক প্রাচীরের কথা যদি বাদ দেই, তাহলে কূটনৈতিক কারণে বিভিন্ন দেশের মধ্যে দিনের পর দিন যেসব দ্বিপাক্ষিক স্বার্থজড়িত ‘অদৃশ্য প্রাচীর’ তৈরি হচ্ছে সেগুলোর সংখ্যা নেহাতই কম নয়। এরই মধ্যে একজন জ্যোতিষি তো তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধেরই পূর্বাভাস দিয়ে রেখেছেন। কিন্তু দেয়াল তৈরি হয়ে যাচ্ছে।

১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীর ভেঙে দেওয়ার আগে বিশ্বে তখনও ১৬টি বড় বড় দেয়াল ছিল। দেয়ালগুলো বিভিন্ন দেশের সীমান্তে নির্মিত এবং সীমান্তে অবৈধ যাতায়াতে বাধা হয়ে আছে। তবে ২০১৬ সালে, কুইবেক ইউনিভার্সিটির গবেষক এলিজাবেথ ভ্যালেট জানিয়েছেন, বিশ্বে দেয়ালের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৬৬টিতে।

বর্তমান বিশ্ব আরেকটি প্রাচীরের সন্মুখীন হতে যাচ্ছে বোধ করি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নির্বাচনী প্রচারণায় মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর প্রতিশ্রুতি পালনে কাজও শুরু করেছেন। কাজ শেষ হলে পৃথিবীতে সীমান্ত দেয়ালের সংখ্যা দাঁড়াবে ৬৭টিতে। তবে এখন ৬৬টি দেয়াল থাকলেও বড় দেয়ালের সংখ্যা হলো ১০টি।

এর মধ্যে হাঙ্গেরি, মরক্কো অধিকৃত পশ্চিম সাহারা, সৌদি আরব-ইরাক, ইসরায়েল-পশ্চিম তীর, যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো, গ্রিস-তুরস্ক, উত্তর আয়ারল্যান্ড, স্পেন-মরক্কো সীমান্ত, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত (কাঁটাতার) এবং সাইপ্রাসের প্রাচীরগুলো উল্লেখযোগ্য। এসব সীমানা প্রাচীর বা দেয়াল শুধু ব্যবধান করে রাখছে না, বিভিন্ন সময়ে কেড়ে নিচ্ছে জনগণের প্রাণও।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার বা ২ হাজার ৫৪৫ মাইল দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমানা। কাঁটাতার দিয়ে দু’দেশের সীমানা আলাদা করা। কিন্তু সীমান্তে কিছুদিন পরপরই হত্যাকাণ্ড ঘটে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের মধ্যে ১৯৭১ সালের পর থেকে এ নিয়ে কয়েকশ’ বৈঠক ও আলোচনা হয়। কিন্তু সমস্যার আর সমাধান হয়নি।

আশু এই সমস্যা সমাধানে দু’দেশের নীতিনির্ধারকদের উদ্যোগী হওয়া জরুরী। কারণ, সীমান্ত প্রাচীর কখনো সুফল বয়ে আনে না, উতপ্ত সীমান্ত কখনো উন্নতি ত্বরান্বিত করে না। এ জন্য প্রয়োজন নিয়ন্ত্রিত সীমান্ত পরিস্থিতি, শান্ত পরিবেশ।

বিশ্বে ভৌগোলিক প্রাচীরের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, সে হারেই যেন বেড়ে চলেছে সর্ম্পকের প্রাচীরও। আমরা বিভিন্ন দেশের মধ্যে সুসর্ম্পক কামনা করছি। পাশাপাশি আরো কামনা করি, বাংলাদেশের সীমান্ত সমস্যা যেন শিগগিরই নিরসন হয়, বাংলাদেশের অদৃশ্য বার্লিন প্রাচীর যেন শিগগিরই নিশ্চিহ্ন হয়।

লেখক: সাংবাদিক।

 

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৩ আগস্ট ২০১৭/হাসান/শাহনেওয়াজ

Walton Laptop