ঢাকা, রবিবার, ৭ কার্তিক ১৪২৪, ২২ অক্টোবর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

ঢাকা অ্যাটাক: বাংলা চলচ্চিত্রে জবরদস্ত আক্রমণ

ইয়াসিন হাসান : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-১০-১১ ২:৩৫:৩৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-১০-১১ ৭:০৯:২২ পিএম
ঢাকা অ্যাটাক সিনেমার একটি দৃশ্য

ইয়াসিন হাসান: চলচ্চিত্র একটি ক্যানভাসের মতো। চিত্রকর যেমন রং-তুলির আঁচড়ে ক্যানভাস রাঙিয়ে তোলেন, তেমনি একজন নির্মাতা অভিনেতা ও অভিনেত্রীদের নিখুঁত অভিনয়ের মাধ্যমে বড় পর্দায় তার ভাবনাকে রাঙিয়ে তোলেন। এখানে শুধু অভিনেতা ও অভিনেত্রীর উপস্থিতিই থাকে না। উপস্থিত থাকে আরও অনেক চরিত্রের এবং অন্যান্য শিল্পেরও বটে। যেমন নৃত্য, গীত, শব্দ ইত্যাদি। তাদের প্রত্যেকের মেলবন্ধনে গড়ে উঠে একটি চলচ্চিত্র।  

বর্তমানে বাংলাদেশের টক অব দ্য কান্ট্রি ‘ঢাকা অ্যাটাক’। দীপংকর দীপনের ঢাকা অ্যাটাক- অ্যাকশন থ্রিলার চলচ্চিত্র। বাংলাদেশের পুলিশ ও তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে বাস্তবসম্মত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে এই চলচ্চিত্রে। দীপংকর দীপন  প্রথম ছবিতেই বাজিমাত করেছেন। পরিচালনায় মুন্সীয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। পুলিশদের পরিশ্রম, দেশপ্রেম, ত্যাগ, সাহসিকতা ফুটিয়ে তুলেছেন, ঠিক যেমন করে চিত্রকর ফুটিয়ে তোলে তার চিত্রকর্ম। এবার চলুন, সিনেমাটি সম্পর্কে আলোচনা করা যাক।

গল্প এবং সংলাপ: সানী সানোয়ার পুরো গল্পটা সাজাতে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন। প্রথম থেকে শেষ মিনিট পর্যন্ত ছবিটি না দেখলে গল্প বোঝা সম্ভব নয়। পাশাপাশি সংলাপ নির্বাচনও ছিল দারুণ! যতক্ষণ ছবি চলেছে, ততক্ষণ বড় পর্দায় পূর্ণ মনোযোগ রাখা অত্যাবশ্যক ছিল। একটু পরপরই মনে হয়েছে এরপর কী হবে? কীভাবে হবে? পরিস্থিতি সামলে নিতে পারবেন তো আরেফিন শুভ? মাহিয়া মাহীর পরবর্তী স্টেপ কী হবে? প্রতিটি সময় ধাঁধায় থাকতে হয়েছে। চিরাচরিত বাংলা ছবির মতো এখানে কিছুই অনুমান করা যায়নি। মূল কাহিনি ঠিক রেখে কিছুক্ষণ পরপর ঘটনা পরিবর্তনের মাধ্যমে এমন উত্তেজনাপূর্ণ ছবি বাংলাদেশের দর্শকরা খুব কমই দেখেছেন। ফলে ২ ঘণ্টা ২৮ মিনিটের ছবিতে দর্শক একটুও বিরক্ত হবেন না।

চিত্রনাট্য: ক্যামেরার কাজ, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক, গানের উপস্থিতি এক কথায় সবকিছু ছিল এক সুতোয় গাঁথা। কোনো জায়গায় কোনো হেরফের চোখে পড়েনি। ছবিটির সিনেমাটোগ্রাফি সুন্দর! চিত্রনাট্য ছিল ফ্রেম টু ফ্রেম। চট্টগ্রামে গভীর বনে কিছু দৃশ্যে ধারণ করা হয়েছে। লোকেশন পছন্দতেও মুন্সীয়ানা দেখিয়েছেন নির্মাতা। থ্রিলার ছবির মূল আকর্ষণ অ্যাকশন। ছবির অ্যাকশনগুলোও দারুণ! চিরাচরিত বাংলা ছবিতে যে গুলির শব্দ ব্যবহার করা হতো সেই শব্দ এখানে নেই। ব্যবহার করা হয়েছে আসল গুলি এবং বোমার শব্দ। তবে দোয়েল চত্ত্বর বোমায় উড়িয়ে দেয়ার ভিএফএসটা আরেকটু ভালো হতে পারত।   

অভিনয়: মূল নায়ক আরেফিন শুভ এ ছবি দিয়ে ঢালিউডে স্থায়ীভাবে নিজের আগমন-বার্তা ভালোভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন। তার প্রতিটি এক্সপ্রেশন রিয়েলিস্টিক ছিল। শুভর শারীরিক ভাষা, এক্সপ্রেশন আগের থেকে হাজার গুণ উন্নত হয়েছে এবং মনে হচ্ছে শাকিব খানকে টক্কর দেয়ার মতো কাউকে পেল বাংলাদেশ।

সোয়াত বাহিনীর প্রধান হিসেবে অভিনয় করা এবি এম সুমন ছিলেন পারফেক্ট- একশতে একশ। তার শারীরিক গঠন পুরোটাই সোয়াত বাহিনীর সদস্যদের মতো। ছবিতে অভিনয়ের আগে যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকাণ্ড ও তাদের জীবন নিয়ে পড়াশোনা করেছেন তা তার চলন এবং সংলাপের ধরণ দেখে স্পষ্ট হয়েছে। একবারও মনে হয়নি তিনি রিয়েল লাইফে সোয়াটের সদস্য নন!

মাহিয়া মাহীর একটি ছবি এর আগে দেখা হয়েছিল। ওই ছবিতে মাহিয়া মাহীর অভিনয়ে এতটাই বিরক্ত হয়েছিলাম যে, হল ছেড়ে বেরিয়ে যেতে দ্বিতীয়বার ভাবিনি। তবে এবার ভিন্ন মাহিয়াকে দেখলাম। বোঝা যাচ্ছিল সাংবাদিক চরিত্রে অভিনয়ের জন্য মাথার ঘাম পায়ে ফেলেছেন। কোনো ন্যাকামি ছিল না। বাড়তি কোনো অভিনয়ও করেননি। তবে তার এক্সপ্রেশনে আরও উন্নতির প্রয়োজন।

এবিএম সুমনের স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করা নওশাবার হাল্কা আহলাদ এবং প্রেম ছবিটিতে বাড়তি রং দিয়েছে। যে রঙে ঢাকা অ্যাটাক রাঙিয়ে দিয়েছে। সন্তানসম্ভবা প্রতিটি স্ত্রী এ সময় চান তার স্বামী সব সময় ছায়ার মতো পাশে থাকুক। কিন্তু সোয়াত দলের প্রধান এবিএম সুমনের সেই সময় কই! দেশের জন্য তো নিজের সবচেয়ে আনন্দময় মুহূর্তটাও বিসর্জন দিয়েছেন! মন কাড়া অভিনয় করেছেন নওশাবা।

আরেফিন শুভ, মাহিয়া মাহী ও এবিএম সুমনের কথা আলোচনা হলেও সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে খলনায়ক চরিত্রে অভিনয় করা তাসকিন রহমানকে নিয়ে। হরিণ চোখের তাসকিন ছবিতে এনেছেন পূর্ণতা। ভিলেন হিসেবে ছিলেন দুর্দান্ত। দুর্বোধ্য, ভয়ংকর, ক্ষীপ্র, উড়ন্ত তাসকিন এক কথায় আন্তর্জাতিক মানের।

বিজ্ঞাপন: ছবিটি স্পন্সর করেছে স্কয়ার টয়লেট্রিজের পণ্য কুল। তাই ছবির কিছু জায়গায় কুলের শেভিং ক্রিম ও বডি স্প্রে ব্যবহার করা হয়েছে। বিয়ষটি অনেকের কাছে দৃষ্টিকটু মনে হয়েছে। তবে আমি এর প্রতি সমর্থন জানাই। কারণ স্পন্সর  প্রতিষ্ঠান কাড়ি কাড়ি অর্থ বিনোয়োগ করছে। কিছুটা মাইলেজ তারা প্রত্যাশা করতেই পারে। প্রত্যাশা পূরণ হলে স্পন্সর মানি আরও বাড়বে। বাড়বে ছবির মান। শুধু একটি কোম্পানি না তখন একাধিক কোম্পানি চলচ্চিত্রে বিনিয়োগে আগ্রহী হবে। 

প্রচার: মুক্তির আগেই মার্কেটিং টিম দারুণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। ছবিটি সবার কাছে পৌঁছে দিতে যা যা করা প্রয়োজন তা করেছেন। মিডিয়া কভারেজও পেয়েছে দারুণ। টিভি, পত্রিকা, অনলাইন পত্রিকার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও সরগরম ছিল ঢাকা অ্যাটাক। নায়ক-নায়িকা ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকেও ছবির প্রচার করেছেন। সারাদেশে ছবির পোষ্টার ছাপাতেও কার্পণ্য করেননি।

করণীয়: ছবিতে নেই কোনো নোংরামি। নেই কোনো বাজে সংলাপ। একটি আইটেম সং দেখানো হয়েছে যেটা না হলে ছবিটি ফ্যাকাসে মনে হতো। আইটেম সং বাছাইয়ের জন্য পরিচালক ধন্যবাদ পাবার প্রাপ্য। দীর্ঘ সময় নিয়ে ভালো একটি ছবি উপহার দিয়েছেন নির্মাতারা। তাদের নিরলস পরিশ্রম সার্থক। এবার কাজটা আমাদের। গাঁটের কিছু টাকা খরচ করুন। হলে গিয়ে ছবিটি দেখুন। নির্মল বিনোদন পাবেন। একটি নিশ্চয়তা দিতে পারি, ছবিটি শেষ হওয়ার পর হাসিমুখে বলতে পারবেন- ‘সুপার মুভি।’ চলচ্চিত্রটি দেখতে একবার হলেও হলে যান।

ভুল-ত্রুটি: ১) ছবির পোষ্টারে দেখা গিয়েছিল মাহিয়া মাহী ফটো জার্নালিস্ট। স্টিল ক্যামেরা হাতে মাহিয়া মাহীর বিচরণ। কিন্তু ছবিতে দেখা যায় মাহিয়া মাহী শুধুই সাংবাদিক।

২) ছবিতে আরেফিন শুভর পোশাকগুলো ছিল দুর্দান্ত। তবে ছবির কিছু দৃশ্যে তার ছোট-চুল, একটু পরেই আবার বড়-চুল দেখানো হয়েছ। বিষয়টি দৃষ্টিকটু লেগেছে।

৩) ছবির শেষ অংশে দেখানো হয়, বোমা ফাটানোর জন্য রিমোট কন্ট্রোল হাতে তাসকিন। সত্যি বলতে রিমোট কন্ট্রোলটা দেখতে খেলনার মতো লেগেছে। বিষয়টি কিছুটা হলেও দৃষ্টিকটু ছিল।

৪) পাশাপাশি শেষ দিকে বলা হয়েছে, যে স্কুলে বোমা ফাটানো হবে সেখানে উপস্থিত আছে দশ হাজার শিক্ষার্থী। কিন্তু দেখে মনে হয়েছে আনুমানিক পাঁচশ শিক্ষার্থীর উপস্থিত আছে স্কুল মাঠে।

৫) ছবিতে বোমা বিস্ফোরণ দেখানো হয়েছে। ভিএফএক্সের কাজটা আরেকটু ভালো হতে পারত। যেহেতু বিদেশী অনেক টেকনিশিয়ান ব্যবহার করা হয়েছে। এখানেও ভিএফএক্সের কাজটা আরো যত্ন নিয়ে করা যেত।

৬) বসুন্ধরার স্টার সিনেপ্লেক্সে যারা ছবি দেখেছেন এবং ভিতর থেকে যারা খাবার কিনে খেয়েছেন তাদের একটি অভিজ্ঞতা শেয়ার করছি। স্টাফরা পপকর্ণ দিচ্ছিল ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াসের প্যাকেটে। একজনের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি এ মুহূর্তে ফাস্ট এন্ড ফিউরিয়াস দেখানো হচ্ছে না! ঢাকা অ্যাটাকের মার্কেটিং টিম চাইলে পপকর্ণের প্যাকেটের মাধ্যমেও ছবির প্রচারণা করতে পারতেন। স্টার সিনেপ্লেক্সে যারা ছবি দেখেন শতকরা ৬০ ভাগ দর্শকের প্রধান চাহিদাই পপকর্ণ। তাহলে বুঝুন প্রচার আরও কতটা পেত। 

নাম্বার: হাত খুলে নাম্বার দিলে দশে নয় দেয়া যাবে। তবে সঠিক বিবেচনায় দশে আট দেয়াই শ্রেয়।

অপেক্ষা ২০১৯ সালের: নির্মাতারা ছবির শেষ অংশে ঘোষণা দিয়েছেন, অপেক্ষা ২০১৯। বলার অপেক্ষা রাখে না অসাধারণ এ ছবিটির সিকুয়্যাল আসতে যাচ্ছে। অপেক্ষা ঢাকা অ্যাটাক পার্ট-টু দেখার।

‘বেঁচে থাকতে চাইলে পালা’-খুবই ভালো, সময় উপযোগী এবং সতর্কতামূলক একটি বার্তা। অন্তত দেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কিংবা জঙ্গীবাদের যে ঘটনাগুলো যারা ঘটাচ্ছে কিংবা ঘটানোর চেষ্টা করছে তাদের জন্য বিশেষ এক বার্তা। ধন্যবাদ ঢাকা অ্যাটাক টিম। জয় বাংলা।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১১ অক্টোবর ২০১৭/ইয়াসিন/তারা

Walton
 
   
Marcel