ঢাকা, শুক্রবার, ১ পৌষ ১৪২৪, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

সার্থক ডিজিটাল ছবি ঢাকা অ্যাটাক || ছটকু আহমেদ

ছটকু আহমেদ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-১০-১৩ ৪:৩৬:৫৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-১০-১৪ ৮:১০:০৬ এএম

স্প্ল্যাস মাল্টিমিডিয়া, বাংলাদেশ পুলিশ পরিবার কল্যাণ সমিতি লি. ও থ্রি হুইলার লি. প্রযোজিত ও দি অভি কথাচিত্র প্রযোজিত ‘ঢাকা অ্যাটাক’কে বলা যায় একটি সত্যিকার অর্থে ডিজিটাল ছবি। ডিজিটাল ছবির যে রকম এডিটিং, সাউন্ড, ক্যামেরার কাজ, ব্যাক গ্রাউন্ড মিউজিক, লোকেশান প্রয়োজন  এই ছবিতে তার কমতি কিছুই নেই। ছবিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী সবই ডিজিটাল চলচ্চিত্রের উপযোগী করে নির্মীত। সানি সানোয়ারের কাহিনি ভাবনা নিয়ে পরিচালক দীপংকর দীপন-এর মেকিং এই গল্প অনুযায়ী অনবদ্য। কোনো ভুলভ্রান্তি খুঁজতে আতশি কাচের প্রয়োজন নেই। যৎসামান্য যা আছে তা এই ধরনের ছবির জন্যে মার্জনীয়।

এই একটা ছবি যার প্রতিটি শিল্পীই চরিত্রানুযায়ী সু-অভিনয় করেছেন। শুভর অভিনয় অনেক মার্জিত এবং পরিমিত। বাংলাদেশে যে ভালো পরিচালক, ভালো প্রযোজক এবং বলিষ্ঠ অভিনেতা ও কলাকুশলী আছেন এই ছবি তার প্রমাণ। এই ছবি দেখতে গিয়ে বারবার মনে হয়েছে বিদেশি হলিউডের কোনো অ্যাকশান ছবি দেখছি আর এটাই এই ছবির সবচেয়ে বড় ড্রব্যাক। কোনো কারণেই এটি পরিপূর্ণ একটা বাংলাদেশি ছবি হয়ে উঠতে পারেনি। মেকিং-এ মুন্সীয়ানা দেখাতে গিয়ে মাঝে মাঝেই সাধারণ দর্শকের কাছে ছবির গল্প অবোধ্য হয়ে গেলেও শিক্ষিত শ্রেণির দর্শক সহজেই বুঝে নিয়েছেন এটা একটা পুলিশি গল্প। গল্প নিয়ে বলার কিছু নেই। কারণ এই ছবিতে পুলিশি কর্মকাণ্ড ছাড়া আর কোনো গল্পই ভিত্তি তৈরি করতে পারেনি। যথারীতি খুনখারাপি, রক্তপাত দিয়ে শুরু এই গল্পেও কোনো ব্যতিক্রম নেই। কাহিনির ভাবনার সাথে যে গল্পের গাঁথুনির চুলচেরা বিশ্লেষণ দরকার সেটা এখানে অনুপস্থিত।

স্কুলের বাসের সামনে কে বোম রেখেছিল তার খোঁজ জানার জন্যে পুলিশের বিশেষ সোয়াত টিম শহর থেকে বান্দরবান পর্যন্ত দলবল নিয়ে চষে ফেলল আর হঠাৎ করেই সেই গল্প ছেড়ে তাসকিনকে নিয়ে আসা হলো শেষে এবং পুরো ছবিতে তার কোনো রেখাপাত না করেই ওয়াদুদ সাহেব তার সব ইতিহাস বলে দিলেন। তাহলে বান্দরবান পর্যন্ত এত খোঁজার কি দরকার ছিল? কাহিনির প্রধান চরিত্র শুভ পুরো ছবিতেই পুলিশি কর্মকাণ্ডে লিপ্ত আর পুলিশও যে একটা পরিবারের সদস্য সেটা শুভর চরিত্রে টোটালি অনুপস্থিত। যে কারণে অল্প কাজ করেও মন্দ চরিত্রে তাসকিন বেশি সমাদৃত হয়েছে দর্শকের কাছে। সোয়াত টিমের সদস্য সুমনের পরিবারে গর্ভবতী বউ দেখানো হয়েছে বলেই শুভর চরিত্রে পরিবার দেখানো সমুচিত মনে করেনি। আর পরিবার মানে শুধু বউ না- ভাই-বোন, বাবা-মা এটাও আমাদের মনে রাখতে হবে। গর্ভবতী বউয়ের কাছে নিজের বাবা-মা, ভাই-বোন তো নাই-ই বউয়েরও মা-বাবা, ভাই-বোন কেউ নেই। পুলিশ এতটা ফ্যামেলি ছাড়া বসবাস করে বলে আমার মনে হয় না।

ছবির মেকিং এত চোখ ধাঁধানো যে দুই-তিন জায়গায় বোম ফিট করলেই যে ছবির নাম ‘ঢাকা অ্যাটাক’ হয় না এটা মনেই হয়নি। এই ছবি এত ভালো হয়েছে যে, এইসব ছোটখাট ভুল এই ছবির জন্যে ‘ভুল’ বলেই মনে হয়নি। আমি এবং দর্শক অনেকদিন পর একটা বাংলাদেশি ভালো মেকিংয়ের ছবি পেয়েছি এটাই যথেষ্ট। গান যেগুলি আছে বিশেষ করে কাওয়ালিতে যে গানটা- সেটা যদিও সিনেমেটিক তবু একটু ভিন্ন ধরনের। আর অরিজিৎ সিং-এর গানটা ওর আর সব গানের মতোই ব্যতিক্রম কিছু নেই। বোম ডিসপোজালের ব্যপারটা খুব নিখুঁত করার চেষ্টা করা হয়েছে এবং যে সিনেমেটিক টেনশান তৈরি করা হয়েছে তাও সার্থক। কারণ বোম ডিসপোজালের পর দর্শক খুশি হয়ে তালি বাজিয়েছে আর এ কারণেই বাস্তবের চেয়ে সিনেমা বেশি হৃদয়গ্রাহি হয়ে থাকে বলে আমার ধারণা।

এই ছবিতে ক্লাইমেক্সের পর এন্টি-ক্লাইমেক্স আছে। আমাদের অনেক বোদ্ধা পরিচালক মাঝে মাঝেই আমাকে বলে থাকেন, একই রকম ক্লাইমেক্স দুটো করবেন না ভাই, দর্শক পছন্দ করবে না। কিন্তু এই ছবিতে একই বোম ডিসপোজাল দিয়েই ক্লাইমেক্স, এন্টি-ক্লাইমেক্স দুটো করা হয়েছে এবং দুটোই দর্শক গ্রহণ করেছে। কারণ এটাই ছিল গল্প। গল্পর মধ্যে যদি দশটাও একই দৃশ্য থাকে তবে দর্শক পছন্দ করতে বাধ্য। অনেকে ভেবেছিল প্রেগনেন্ট বউটার স্বামী মারা যাবে আর ঠিক তখনই তার সন্তান ভুমিষ্ট হবে- এমন টুইস্টয়েও কাহিনিকার যাননি। এমন কি মাহিয়া মাহির পঁচা চরিত্রটাকে দিয়ে একটা টুইস্ট করে ভালো একটা টার্নিং দিতেও চেষ্টা করেননি। তিনি সহজভাবে বোঝাতে চেয়েছেন যে, দেখ, কী করে পুলিশ বোম ডিসপোজাল করে দেশবাসীকে রক্ষা করে ও জীবন বাজি রেখে সন্ত্রাসী ধরে। ব্যাস। গল্পে কোনো উপদেশ নাই, কোনো মোরাল নাই। দরকারও নাই। দর্শক ছবি দেখতে এসেছে তাকে সন্মোহন করে দুই ঘণ্টা হলে রেখে দেই। আর তা করতে পারলেই ছবির সার্থকতা। কে ছবি দেখে কী শিখল- দিস ইজ নট দ্য হেডেক।

ছবির আরেকটা গুণ- এই ছবিতে ফালতু কমেডি নেই। যতটুকু আছে খুবই সফিসটিকেটেড। এবং সবচেয়ে বড় গুণ বাংলা ভাষার বিকৃতি কোথাও চোখে পড়েনি। তবে নায়ক-নায়িকা মিল দেবার জন্যে হঠাৎ মাহির শুভর প্রতি প্রেম উথলে ওঠা আর শেষ দৃশ্যের সংলাপে দশ হাজার ছাত্রছাত্রী বলে দর্শক না হাসানোই ভালো ছিল।

তারকাবহুল এই ছবিতে অভিনয় করেছেন হাসান ইমাম, আলমগীর, আফজাল, শতাব্দী ওয়াদুদ, শিপন, সুমন, তাসকিন, আরেফিন শুভ ও মাহিয়া মাহি এবং আরো অনেকে। যে চরিত্রে যেখানে যার প্রয়োজন সেখানে তাকে নিতে কার্পণ্য করেননি পরিচালক ও প্রযোজক। এদের নিয়ে বেশি কচলায়নি যা আমরা সাধারণত বড় শিল্পী পেলে করে থাকি- এটা পরিচালকের মুন্সীয়ানা। টাইটেল প্লেটে এবং পোস্টারে কলাকুশলীর নাম এত ক্ষীণ করে দেওয়া যে, চোখে ধারণ করা কষ্টসাধ্য ছিল বলে তাদের সব নাম উল্লেখ করা সম্ভব হলো না।

পরিশেষে একটা কথা না বললেই নয়, এটা এই ছবি প্রসঙ্গে নয় তবে বাংলাদেশের ছবি বাঁচিয়ে রাখা প্রসঙ্গে। এক নির্মীয়মান ছবির প্রযোজক ও পরিচালক আমাকে এসে বলল- ভাই আমরা মনেপ্রাণে চাই সব বাংলাদেশি ছবি হিট হোক কিন্তু হিট হলেই শিল্পীরা যেভাবে তাদের রেট বাড়ায় তাতে মনে হয় এই ছবি যেন তার জন্যেই চলেছে। এখানে পরিচালক কাহিনিকার প্রযোজক বা অন্য টেকনিশিয়ানের কোনো ভূমিকা নেই। এটা ঠিক না। আমরা আমাদের মেধা দিয়ে, টাকা দিয়ে, চিন্তা-ভাবনা দিয়ে ছবি বানাই আর ছবির প্রধান শিল্পী তার ফায়দা লুটে নেন-এটা ঠিক না। আর একটা কথা বলেছেন আরেক প্রযোজক- ছবি হিট হলেই যে সব শিল্পী রেট বাড়ায়, ছবি ফ্লপ হলে তাদের দেয়া টাকা ফেরত নেয়ার একটা সিস্টেম চালু করা যায় কিনা ভেবে দেখতে। তাহলে আমাদের লোকসানের বোঝাটা একটু কমতো।

আমি সমগ্র শিল্পীর বিরুদ্ধে কথা বলছি না। বলছি কিছু শিল্পীর আকাশচুম্বী পারিশ্রমিকের সাথে তাদের অমানবিক সিডিউল জটিলতার কথা। সবারই পারিশ্রমিক একটা সহনীয় মাত্রায় নিয়ে এলে এখন এই সংকটকালে বেশি বেশি ছবি নির্মাণের রাস্তা প্রশ্রস্ত হবে। ঢাকা অ্যাটাকের ছবির নন প্রফেশনাল তিন প্রযোজক অনেক সলভেন্ট। তাই তারা পেরেছেন প্রায় তিন বছর ধরে টাকা বিনিয়োগ করে একটা ছবি বানাতে। কিন্তু আর যারা প্রফেশনাল প্রযোজক রেগুলার ছবি বানান তারা এত বছর টাকা লগ্নী করে বসে থাকতে পারবেন না। ঢাকা অ্যাটাক অনেক স্পন্সর পেয়েছে এবং ইদানিংকালের ছবিগুলোর মধ্যে অনেক ছবি ভালো দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে। তবু বৃহস্পতিবার দুপুরের শোতে মধুমিতায় যে দর্শক সংখ্যা দেখেছি তাতে যে যাই বলুক সত্যিকার অর্থে এই ছবির কস্ট ফেরত নেওয়া কষ্টসাধ্যই হবে। 

লেখক: চিত্রপরিচালক ও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী চিত্রনাট্যকার

 

 


রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৩ অক্টোবর ২০১৭/তারা

Walton
 
   
Marcel