ঢাকা, রবিবার, ৯ আশ্বিন ১৪২৪, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

এখানে আলো আসে দরজা দিয়ে

শাহেদ হোসেন : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৫-১৫ ২:৪৪:২৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৫-১৫ ৬:২৫:২৩ পিএম
জাহ্নবী উচ্চ বিদ্যালয়ের মূল ভবন

শাহেদ হোসেন : কবি-সাহিত্যিক বলেন আর প্রকৌশলীই বলেন, সবাই সূর্যালোকের প্রবেশের জন্য জানালা খুলে দেওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু টাঙ্গাইলের সন্তোষে জাহ্নবী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতারা উল্টো পথেই হেঁটেছেন। ১৮৭০ সালে তৈরি ভবনটিতে তারা কোনো জানালাই রাখেননি। একতলা ভবনটিতে সংকীর্ন জানালার পরিবর্তে তৈরি করা হয়েছিল ৯৯টি দরজা। এখানে জ্ঞানের আলো আর সূর্যের আলো দুটোই প্রবেশ করে দরজা দিয়ে।

সহকর্মী গিয়াস উদ্দিন সিজারের গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইল। তার কাছেই জানতে চেয়েছিলাম, টাঙ্গাইলের ব্যতিক্রমী স্থাপনার কথা। খোঁজখবর নিয়ে সিজার জানালেন, সন্তোষে শত বছরের পুরোনো একটি স্কুল ভবন আছে যেখানে কোনো জানালা নেই। এর পরিবর্তে সেখানে রয়েছে ৯৯টি দরজা। সিজার জানান, ব্যতিক্রমী এই স্থাপনাটি নিয়ে খুব একটা লেখালেখিও হয়নি, চাইলে ঘুরে আসতে পারেন।

যাত্রার আগে অনলাইন ঘেটে দেখার চেষ্টা করলাম স্কুলটি সম্পর্কে আদতে কোনো তথ্য পাওয়া যায় কি না।সরকারি তথ্য বাতায়নে বলা হয়েছে, স্কুলটির প্রতিষ্ঠাতা জাহ্নবী চৌধুরানী মাত্র ১৩ বছর বয়সে স্বামী গোলকনাথ রায় চৌধুরীর মৃত্যুতে বিধবা হয়ে সন্তোষে ছয় আনী জমিদারির মালিকানা লাভ করেন। তিনি ১৮৭০ সালের ৩ জুন তৎকালীন বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার দ্বিতীয় ইংরেজি (এমই) বিদ্যালয় হিসেবে সন্তোষ জাহ্নবী হাইস্কুল স্থাপন করেন। এই বিদ্যালয় থেকে ১৮৯৬ সালে মহিম চন্দ্র ঘোষ এন্ট্রান্স পরীক্ষায় প্রথম স্থান, ১৯২৬ সালে দেবেন্দ্র নাথ ঘোষ মেট্রিক পরীক্ষায় প্রথম স্থান, ১৯৬৫ সালে ঢাকা বোর্ড থেকে নিতাই দাস পাল এসএসসি পরীক্ষায় প্রথম স্থান এবং ১৯৬৯ সালে আশীষ কুমার পাল এসএসসি মানবিক বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করেন।

শশিভূষণ বিদ্যালঙ্কার তার ভারতীয় ঐতিহাসিক গ্রন্থের তৃতীয় খণ্ডের ২৪৯ পৃষ্ঠায় কিছু তথ্য যুক্ত করেছেন। তিনি লিখেছেন সন্তোষ জাহ্নবী হাই স্কুল টাঙ্গাইল জেলার মধ্যে প্রথম ইংরেজি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। ‘এ বিদ্যালয়ের সম্মুখে একটি সূর্যঘড়ি আছে যা এ উপমহাদেশে দ্বিতীয়টি নেই। ঘড়িটি বর্তমানেও সচল অবস্থায় বিদ্যমান। এ জেলার প্রথম আইসিএস মহিম চন্দ্র ঘোষ সন্তোষ জাহ্নবী হাই স্কুল থেকে ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত এন্টান্স পরীক্ষায় বাংলা বিহার উড়িষ্যা, আসাম এবং বার্মার মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেন। এ বিদ্যালয় গৃহের অন্যতম বৈশিষ্ট এতে কোন জানালা নেই।’

এই তথ্যগুলো আসলে স্কুলটি দেখার আগ্রহ আরো বাড়িয়ে তোলায় গত সপ্তাহে সন্তোষ যাত্রা করলাম। দুর্ভাগ্যবশতঃ সকালে স্কুলে পা দিয়েই জানতে পারলাম শবে বরাত, বুদ্ধ পূর্ণিমা ও গ্রীষ্মের ছুটি মিলিয়ে স্কুল ১৪ দিনের ছুটি। বন্ধের দিনেও শ্রেণিকক্ষগুলো ঝাড়মোছ করছিলেন অফিস সহকারী বুদ্ধু মিয়া। প্রধান শিক্ষকের বাসা আশপাশে কি না জানতে চাইলে বুদ্ধু জানালেন মাত্র আধা মাইল দূরে এম এম আলী সরকারি কলেজের কাছেই প্রধান শিক্ষক মো. আজহারুল ইসলামের বাসা। একটু অপেক্ষা করলেই তিনি ফোন  নম্বর জোগাড় করে দিতে পারবেন। এই ফাঁকে ৯৯ দরজা সম্পর্কে জানতে চাইলে বুদ্ধু বললেন, ‘দরজাতো ১০১টা। আফনে চাইলে ঘুইরা দেখেন।’

প্রধান শিক্ষক মো. আজহারুল ইসলাম


বুদ্ধুর প্রস্তাবে রাজী হয়ে স্কুল ভবনটি ঘুরে দেখা গেল, এর সম্মুখভাগে রয়েছে বিশাল সাইজের মোট ২৪টি দরজা । পেছন দিকেও রয়েছে প্রায় সমসংখ্যক দরজা। দশটি শ্রেণিকক্ষের প্রতিটির ভেতরে আবার তিন থেকে চারটি করে দরজা রয়েছে। এসব দরজা দিয়ে একটি কক্ষ থেকে আরেকটি কক্ষে যাতায়াত করা যায়। অর্থাৎ ভবনের পূর্ব প্রান্তের শেষ কক্ষটির ভেতর দিয়ে পশ্চিম প্রান্তের শেষ কক্ষটিতে যাওয়া সম্ভব। ভবনের সামনে যে  বিশাল দীঘিটি রয়েছে তার বয়সও একই সমান। শত বছরের পুরোনো সূর্য ঘড়িটি বহাল তবিয়তেই আছে।

এরই মধ্যে প্রধান শিক্ষকের ফোন নম্বর জোগাড় হয়ে গেছে। ফোন দিতেই তিনি জানালেন, বাজারে যাওয়ার জন্য এই মাত্র তিনি বাড়ি থেকে বের হয়েছেন। এম এম আলী কলেজের সামনে আমতলায় তিনি চলে আসার জন্য বললেন।

অটোরিকশা থেকে নেমে সেখানে পৌঁছে স্থানীয় একজনকে প্রধান শিক্ষকের কথা বলতেই তিনি দেখিয়ে দিলেন লম্বা একহারা গড়নের পঞ্চাশোর্ধ্ব আজহারুল ইসলামকে। গাছের নিচে টুল টেনে নিয়ে সেখানে বসেই আলাপ শুরু হলো তার সঙ্গে।

তিনি জানালেন, প্রায় ৩শ ফুট দীর্ঘ ভবনটির দেয়াল ২২ ইঞ্চি পুরু।  মেঝে থেকে ছাদের উচ্চতা প্রায় ২২ ফুট। আগে অবশ্য আরো দুই ফুট উচ্চতা বেশি ছিল। পরবর্তী সময়ে ছাদ পুনঃনির্মাণের সময় ছাদের উচ্চতা দুই ফুট কমিয়ে দেওয়া হয়। ভবনের ভেতরে প্রচুর আলো-বাতাসে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করতে পারে সেজন্যেই প্রতিষ্ঠারা স্কুলে সংকীর্ন জানালার পরিবর্তে ১০১টি দরজা রেখেছিলেন। তবে এখন অনেকগুলো দরজা স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় শ্রেণিকক্ষের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য এ কাজ করতে হয়েছে।

আজহারুল ইসলাম জানালেন, প্রায় চার একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত স্কুলটিতে বর্তমানে ১ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে। ২০১৫ সালে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির জন্য দুটি নতুন শাখা খোলার অনুমতি পাওয়া গেছে। তবে এ নিয়েও অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। এবার মাধ্যমিক পরীক্ষায় ২২৪ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল। এদের মধ্যে আটজন অংকে খারাপ করেছে। বাকীরা সবাই পাস। সেই সুবাদে স্কুলে পাসের হার ৯৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ।

স্কুলের সামনের দীঘি


প্রতি বছরই শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু শিক্ষক সংখ্যা সেই তুলনায় বাড়ছে না। স্কুলে বর্তমানে শিক্ষক রয়েছেন ১৮ জন। এদের মধ্যে এমপিওভুক্ত রয়েছেন ১২ জন। আর বাকী ছয়জন খণ্ডকালীন। শিক্ষক সংকটের কারণে অনেক সময় লাইব্রেরিয়ান ও অফিস সহকারীদের দিয়েও ক্লাস নেওয়াতে হয়।

আজহারুল ইসলাম জানান, প্রতিষ্ঠার পর স্কুলের নামে একটি ফান্ড করে কলকাতায় ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার শাখা্য় প্রায় তিন লাখ টাকা জমা ছিল। ওই টাকার লভ্যাংশ পাকিস্তান শাসনামলের প্রথম দিক পর্যন্ত স্কুল ফান্ডে জমা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে অজ্ঞাত কারণে ওই অর্থ আসা বন্ধ হয়ে যায়। বহু চেষ্টা করেও পরে আর ওই টাকা ওঠানো যায়নি।

তিনি জানান, এলাকার অন্য স্কুলের তুলনায় তার স্কুলে শিক্ষার্থীদের বেতন বেশ কম। এছাড়া দারিদ্রপীড়িত অঞ্চল হওয়ায় প্রতি বছরই অনেক শিক্ষার্থীর বেতন মওকুফ করতে হয়। এ কারণে বেতন খাত থেকে তার স্কুলের আয় অনেক কম। এই আয় দিয়েই তাকে ছয়জন খণ্ডকালীন শিক্ষক ও পাঁচজন খণ্ডকালীন অফিস সহকারীর বেতনের ব্যবস্থা করতে হয়। এরপরেও তিনি ও ম্যানেজিং কমিটির সদস্যরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সরকারি অর্থায়নে আধুনিক একটি কম্পিউটার ল্যাব চালু করা হয়েছে। প্রযুক্তির সঙ্গে শিক্ষকদের সম্পৃক্ত করতে প্রত্যেককে প্রজেক্টরের মাধ্যমে ক্লাস নেওয়ার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। মূল ভবনের পশ্চিমে নতুন ভবন করা হয়েছে। পূর্ব পাশে টিনশেড ভবন সংষ্কার করা হয়েছে।

জাহ্নবী উচ্চ বিদ্যালয়ের এই প্রধান শিক্ষক জানালেন, তার অবসরের সময় ঘনিয়ে আসছে। সবার চেষ্টায় স্কুলের ফান্ডে ইতিমধ্যে প্রায় ৩০ লাখ টাকা জমা হয়েছে। বিদায় নেওয়ার আগেই তিনি পূর্ব পাশে নতুন একটি ভবন নির্মাণ করে যেতে চান।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৫ মে ২০১৭/শাহেদ/শাহনেওয়াজ

Walton Laptop