ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২৩ নভেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

২৪ ঘণ্টার সেবা

তানভীর হাসান তানু : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৫-১৬ ১২:৫৯:২৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৫-১৬ ৪:২৬:৫৩ পিএম

তানভীর হাসান তানু, ঠাকুরগাঁও: বড় শহরে ‘২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে’ এমন ওষুধ বিক্রেতার সেবা পাওয়া যায়। কিন্তু মফস্বল শহরে এমন দেখা যায় না। জরুরি ওষুধ পাওয়ার ক্ষেত্রে ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে এমন দোকান যে কত জরুরি, তা কেবল ভূক্তভোগীরাই জানেন।

ঠাকুরগাঁও শহরে ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে এমন ওষুধের দোকান দিয়ে সেবার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন কামরুল হাসান। বলতে গেলে ঠাকুরগাঁওয়ের অধিকাংশ মানুষই জানে সেখানকার আধুনিক সদর হাসপাতালের সামনের গলির লুবনা ফার্মেসির নাম। ২৪ ঘণ্টা সার্ভিসের সুবাদে এর দোকানি কামরুলের নামও জানেন অনেকে।

ঠাকুরগাঁও শহরে রাত ১২টার পর যখন প্রায় সকল ওষুধের দোকান বন্ধ হয়ে যায়, তখন সাধারণ মানুষের জন্য দরজা খোলাই থাকে লুবনা ফার্মেসির। গভীর রাতে রোগীর স্বজনদের ওষুধের জন্য বিপাকে পড়তে হয় না।

গত রোববারের ঘটনা। রাত আড়াইটার দিকে দ্রুত একটি অটো রিকশা ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আসে। অটো রিকশার মধ্যে কান্নার শব্দ পেয়ে কৌতূহলে এগিয়ে যাই। রোগীর স্বজন জানালেন, তার বাড়ি ঠাকুরগাঁও জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলা বালিয়াডাঙ্গীর লাহিড়ী পিয়াজুপাড়া গ্রামে। রাতে তার মা হঠাৎ বমি করতে করতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন । দিশেহারা পুত্র মাকে প্রথমে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসেন। কিন্তু সেখানে জরুরি বিভাগে কাউকে না পেয়ে বাধ্য হয়ে  ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে নিয়ে আসেন।

কতর্ব্যরত চিকিৎসক তার মায়ের প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য ইনজেকশন, স্যালাইন ও ওষু্ধ লিখে দিলেন। হাসপাতাল থেকে স্যালাইন সরবরাহ করা হলেও ওষুধ ও ইনজেকশন কেনার জন্য তিনি ফার্মেসির দিকে রওনা দিলেন। হাসপাতালের সামনে গিয়ে দেখেন, সকল ওষুধের দোকান বন্ধ। এতে বিপাকে পড়েন তিনি। ওষুধ ও ইনজেকশন পাওয়া না গেলে মাকে বাঁচানো মুশকিল হয়ে পড়বে। এর মধ্যে একজন বার বার তাগাদা দিচ্ছিলেন, তাড়াতাড়ি ইনজেকশন ও ওষুধ আনতে হবে।

এ সময় তিনি সন্ধান পেলেন লুবনা ফার্মেসির। সাইন বোর্ডে লেখা ‘২৪ ঘণ্টা খোলা’। অনেক শক্তি ও ভরসা পেলেন সেই পুত্র। পেসক্রিপশনের সব ওষুধ ও ইনজেকশন মিলল দোকানে। ওষুধ কিনে দোকানিকে ধন্যবাদ জানালেন তিনি।

লাভের আশায় এই ২৪ ঘণ্টার সার্ভিস কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে কামরুল হাসান তার একটি গল্প শুনিয়ে দিলেন। বললেন, ‘২০১০ সালের ঘটনা। রাতে  হাসপাতালে একজন রোগী আসে। খুব সংকটাপন্ন অবস্থা। একটি ইনজেকশন হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকে সে। ইনজেকশনটি আমার দোকানে তখন ছিল না। পাশের দোকানে ছিল। ওই দোকানটি তখন বন্ধ হয়ে গেছে । ইনজেকশনটি না পেয়ে রোগীটি মারা যায়। খুবই কষ্ট পেয়েছিলাম সেদিন। রোগীর স্বজনদের সাথে আমিও চোখের পানি ধরে রাখতে পারি নাই। তখনই অনুভব করলাম ব্যবসা মানে শুধু টাকা নয়, সেবাও। মানুষ তো সমাজে বিভিন্ন মাধ্যমে সেবা করে থাকে। আমি না হয় রাত জেগে ওষুধ বিক্রি করে একটু সেবা করি। সেই দীর্ঘ ৭ বছর যাবত এই ২৪ ঘণ্টার সার্ভিস। এমনও রাত যায়, সারা রাতেও বিক্রি হয় না। তবু এই সেবাটি আমি বন্ধ করিনি।’

ঠাকুরগাঁও শহরের হাজীপাড়া থেকে ওষুধ নিতে আসা জীবন হক জানান, শহরে একমাত্র লুবনা ফার্মেসি ২৪ ঘণ্টা খোলা পাওয়া যায়। হঠাৎ বোনের গ্যাসের সমস্যার জন্য ওষুধ নিতে এসেছেন।

ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. শাহজাহান নেওয়াজ বলেন, ‘রাতে অনেক সময়ই শিশু রোগী ভর্তির সংখ্যা বেড়ে যায় । রোগীদের স্বজনদের কাছে শুনেছি, তারা কামরুলের লুবনা ফার্মেসি থেকে ওষুধ সংগ্রহ করেন। নিঃসন্দেহে এটাও একটি মহৎ সেবা।’

মিরাজুল নামে এক রোগীর স্বজন বলেন, ‘ঢাকায় প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে নিজস্ব ফার্মেসি আছে। প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে যদি সে রকম ব্যবস্থা নেয়, তাহলে রাতের বেলা রোগীরা ওষু্ধের জন্য বিপদে পড়বে না।’

ঠাকুরগাঁও জেলা কেমিষ্ট ও ড্রাগিষ্ট কমিটির সভাপতি আজিজুল হক বলেন, ‘সারাদিন পর রাতে কর্মচারীরা দোকানে থাকতে চায় না। তাই বাধ্য হয়ে দোকান বন্ধ করেন অনেকে। লুবনা ফার্মেসির এই কার্যক্রম অসহায় ও সাধারণ মানুষের সেবায় সত্যিকারের দৃষ্টান্ত। আমরা নির্বাহী কমিটিতে আলোচনা করে আরো কয়েকটি দোকান খোলা রাখার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করবো।’

প্রসঙ্গত, ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালটি ১০০ শয্যাবিশিষ্ট হলেও পঞ্চগড়, নীলফামারী জেলায় কয়েকটি উপজেলার রোগীরা এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। প্রতিদিন প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ রোগী ভর্তি থাকেন।




রাইজিংবিডি/ঠাকুরগাঁও/১৬ মে ২০১৭/তানভীর হাসান তানু/টিপু/তারা

Walton
 
   
Marcel