ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৪ কার্তিক ১৪২৪, ১৯ অক্টোবর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

যুদ্ধজয়ী বাবার গল্প

মনদীপ ঘরাই : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৬-১৮ ১২:২৯:০৬ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৬-১৮ ৭:৫৭:৩৮ পিএম

মনদীপ ঘরাই : তখন আমি খুব ছোট। বয়স তিন কিংবা চার বছর। অফিস থেকে বাবা ফিরলে চুপটি করে তার জুতোটা নিজে পরতাম। নিজের পায়ের কাছে দানবাকৃতির সেই জুতো সামলানোই বড় কষ্ট ছিল। তারপরেও পরতাম। এ ছিল এক অসাধারণ আবেগের অভ্যাস।

যখন আরেকটু বড় হলাম, শুনতাম নির্বাচন, নির্বাচন। বাসার নষ্ট ফ্রিজ এর ভেজিটেবল বক্সকে ব্যালট বাক্স বানিয়ে বাবার মত নির্বাচনের ডিউটি করতাম। আর ভোটার হত আমাদের বাসার কাছের বস্তির আমার বয়সী খেলার সাথীরা। এর উদ্যোক্তাও বাবা। বলতেন, ওদের সাথে খেলে জীবন কি সেটা শিখতে হবে।

কিছুদিন পর খেলার বিষয় গেল পাল্টে। খেলাটা এবার অফিস-অফিস খেলা। বাবার মতো অফিসার সাজতাম। কেউ হত সিএ, কেউ পিয়ন। তবে সবসময় আমি অফিসার ছিলাম না। পিয়নও হতে হত, সিএর দায়িত্বও পালন করেছি।

আমার বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা। নাম রণজিত কুমার ঘরাই। খুব জানতে ইচ্ছে করে পরলোকগত পিতামহীর কাছে, যথার্থ নাম রেখেছিলেন ছেলের! ‘রণজিত’ অর্থাৎ যুদ্ধ জয় করেছে যে। সাহসী যোদ্ধা রণজিত ১৯৭১ সালে সম্মুখযুদ্ধ করেছিলেন ৯ নং সেক্টরে। সুন্দরবন এলাকায়।

মুক্তিযুদ্ধ শেষে স্বাধীন দেশে ১১ ভাইবোনের বড় হিসেবে ঝাঁপিয়ে পড়েন জীবন যুদ্ধে। বাগেরহাট জেলার মোড়েলগঞ্জ থানায় দিনরাত খেটে গড়ে তোলেন ছোট্ট খাবার হোটেল ‘বঙ্গবন্ধু চা বাসর’। সকাল থেকে রাত অবধি খাটুনি, তার পাশাপাশি পড়াশোনা।

ডিগ্রি পাশ করতেও সংগ্রাম। সে বছর পুরো উপজেলায় পাশ করেছিলেন মাত্র দুজন। তার একজন আমার বাবা। তারপর অনেকটা নাটকীয়ভাবেই পুলিশ সার্ভিসে। দারোগার চাকরিটা করতে করতেই বিসিএস পরীক্ষার আবেদন করলেন। ফলাফল-বিসিএস প্রশাসনে অন্তর্ভুক্তি। ১৯৭৩ সালের ব্যাচে ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে যোগদান। এরপর রণজিত ঘরাই ছিলেন প্রশাসন ক্যাডারে সাহসিকতার আইকন। কোমরে লাইন্সেস করা রিভলবার আর বুকে অসীম সাহস। এ নিয়েই লড়ে গেছেন সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে। তার অধিক্ষেত্রে পরীক্ষার হলকে নকলমুক্ত করেছিলেন সে আমলেই। তার মধ্যে অন্যতম ছিল যশোরের অভয়নগর উপজেলা।

ভোলার মনপুরা উপজেলার প্রথম টিএনও ছিলেন বাবা। দুর্যোগ মোকাবেলায় রেখেছিলেন অসামান্য অবদান। সে টান থেকেই হয়ত মনপুরা দ্বীপের নামে আমার নাম রেখেছিলেন মনদীপ। জানি দীপ এ ব ফলাটা নেই। সেজন্যই হয়ত মনের আলো ছড়াবার একটা সুযোগও পেয়েছি নাম থেকে।

এরপর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরি করে বাবা সরকারের উপসচিব হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। অবসরে যাওয়ার পরও নিজের জীবনযাপনটা বেছে নিয়েছেন নিজের মত করেই। আমার মা’র নামে বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জের ছোট্ট গ্রাম বলভদ্রপুরে গড়ে তুলেছেন ‘বাসন্তী মৎস ও  কৃষি খামার’। নিজের হাতে সাজিয়ে তুলেছেন পুরো জায়গাটাকে। ছোট ৯ ভাইবোনকে মানুষ করেছেন। দু সন্তানকে গড়ে তুলেছেন বিসিএস ক্যাডার হিসেবে।

ছেলেবেলায় বাবার জুতো পায়ে দেওয়া ছোট্ট আমি সময়ের আবর্তনে যোগদান করেছি সেই প্রশাসন ক্যাডারেই, ২০১৩ সালে। বাবার অফিস করা দেখে অফিস-অফিস খেলা রূপ নিয়েছে বাস্তবে। তবে, জীবন চমকে দেয়। দিতেই থাকে।

যশোরের অভয়নগর। ১৯৮৮-৮৯ সালে বাবা এই উপজেলায় ছিলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে। দাপটের সাথে লড়ে গেছেন অন্যায় ও পরীক্ষার নকলের বিরুদ্ধে।

ঠিক ২৮ বছর পর সময়ের কাটা এনে দাঁড় করালো অন্যরকম পুণরাবৃত্তির সামনে। মার্চে সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে যোগদান করেছি শৈশবের স্মৃতি বিজড়িত যশোরের অভয়নগর উপজেলায়। আরো অবাক করা ঘটনা হল, ইউএনও স্যার বহি:বাংলাদেশ ছুটিতে থাকায় গত দেড়মাস ধরে বসছি বাবার আসনে, উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে।

এ এক অন্যরকম অনুভূতি। শৈশবের বাবার জুতো পরার আবেগ। অফিস-অফিস খেলার অনুভূতি। বোঝানো যাবে না। চোখ বুঝে তাই প্রতিক্রিয়া জানাতে একদম দেরি করিনি।

বাবার অর্জন পাহাড়সম। সে পাহাড়ে চড়তে চাই না। চাই পর্বতসম অর্জনকে কুর্নিশ করে বাবার সুনামটা ধরে রাখতে। চেষ্টা করছি অবিরাম। নিজের মত করে।

সম্পদের প্রাচুর্য নেই আমার বাবার। তবে আছে আকাশছোঁয়া সাহস আর আত্মবিশ্বাস। বাবাকে কখনও ঘাবড়াতে দেখিনি। বিচলিত হতে দেখিনি কঠিন বিপদের ক্ষণেও। ছোটবেলা থেকে খুব ভয় পেতাম। শ্রদ্ধাও করতাম খুব। কোনোদিন বলা হয়নি— তোমাকে খুব খুব বেশি ভালবাসি বাবা। বাবা দিবসে তোমাকে প্রণাম।

লেখক: ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (অভয়নগর, যশোর)




রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৮ জুন ২০১৭/মনদীপ/সাওন/শাহ মতিন টিপু

Walton
 
   
Marcel