ঢাকা, বুধবার, ৮ ভাদ্র ১৪২৪, ২৩ আগস্ট ২০১৭
Risingbd
শোকাবহ অগাস্ট
সর্বশেষ:

চিঠি পাঠানোর ৭দিন পরই শহীদ হলেন পুত্র

রুমন চক্রবর্তী : রাইজিংবিডি ডট কম
প্রকাশ: ২০১৭-০৮-০৮ ৩:৪৩:০৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৮-১০ ১০:০১:১৪ পিএম

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি : সাহসী মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম বীর বিক্রমের ৪৬তম শাহাদৎ বার্ষিকী আজ। ১৯৭১ সনের ৮ আগস্ট সুনামগঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর সাচনা পাক হানাদারমুক্ত করতে রক্তক্ষয়ী সম্মুখ যুদ্ধে তিনি শাহাদৎ বরণ করেন।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে স্মরণীয় এ যুদ্ধে তিনি কমান্ডার হিসাবে নেতৃত্ব দেন। ভয়াবহ এই যুদ্ধে মুক্তিসেনাদের প্রবল আক্রমণে ৩৬ পাকসেনা নিহত হয় এবং এক পর্যায়ে সাচনা বন্দর শক্রমুক্ত হয়। যুদ্ধশেষে পলায়নরত পাকসেনাদের কাভারিং ফায়ারের একটি বুলেট সিরাজের কপালে বিদ্ধ হয়ে তিনি গুরুতর আহত হন। সঙ্গে সঙ্গে মিত্র বাহিনীর হেলিকপ্টার যোগে ভারত নেওয়ার সময় পথিমধ্যে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার লাশ নিয়ে হেলিকপ্টার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের নিকট টেকেরঘাটে অবতরণ করে। সেখানে খাসিয়া পাহাড়ের পাদদেশে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় তার দাফন সম্পন্ন হয়।

মৃত্যুর মাত্র ৭ দিন পূর্বে তিনি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে তার পিতাকে একটি পত্র লেখেন। সেই চিঠির প্রতিটি লাইনে ফুটে উঠেছে মাতৃভূমির প্রতি শহীদ সিরাজের নিখাঁদ ভালোবাসা। যুদ্ধে মৃত্যুকে নিশ্চিত জেনে অসাধারণ সেই চিঠিতে ছিল নিজ পরিবার ও দেশবাসীর প্রতি দেশপ্রেমমূলক মর্মস্পর্শী নির্দেশনা।

চিঠিটি হুবহু তুলে দেওয়া হলো :

প্রিয় আব্বাজান,                                                                                   টেকেরঘাট                                                                                                                        

                                                      তাং- ৩০-০৭-৭১ ইং

আমার সালাম নিবেন, আশা করি খোদার কৃপায় ভালই আছেন। বাড়ির সকলকেই আমার শ্রেণিমত সালাম ও স্নেহ রহিল। আলীরাজ, রওশন, মাতাব, রনু, ইব্রাহীম, ফুল মিয়া, সকলেই একত্রে আছি। দেশের জন্য আমরা সকলেই জান কোরবান করিয়াছি। আমার জন্য ও দেশ স্বাধীন হওয়ার জন্য দোয়া করবেন। আমি জীবনকে তুচ্ছ মনে করি। কারণ দেশ স্বাধীন না হইলে জীবনের কোন মূল্য থাকিবে না। তাই যুদ্ধই জীবনের পাথেয় হিসাবে নিলাম। আমার অনুপস্থিতিতে মাকে কষ্ট দিলে আমি আপনাদেরকে ক্ষমা করিব না। পাগলের সব জ্বালা সহ্য করিতে হইবে। চাচা, মামাদের ও বড় ভাইয়ের নিকট আমার সালাম। বড় ভাইকে চাকুরীতে যোগদান করিতে নিষেধ করিবেন। জীবনের চেয়ে চাকুরী বড় নয়। দাদুকে দোয়া করিতে বলিবেন। মৃত্যুর মুখে আছি। যে কোন সময় মৃত্যু হইতে পারে এবং মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত। দোয়া করবেন মৃত্যু হইলেও যেন দেশ স্বাধীন হয়। তখন দেখিবেন লাখ লাখ ছেলে বাংলার বুকে পুত্র হারাকে বাবা বলে ডাকবে। এই ডাকের অপেক্ষায় থাকুন। আর আমার জন্য চিন্তার কোন কারণ নেই। আপনার দুই মেয়েকে পুরুষের মত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলবেন। তবেই আপনার সাধ মিটে যাবে।

দেশবাসী স্বাধীন বাংলা কায়েমের জন্য দোয়া কর। মীর জাফরী করিও না। কারণ মুক্তি ফৌজ তোমাদের ক্ষমা করিবে না এবং বাংলায় তোমাদের জায়গা দিবে না। সালাম, দেশবাসী সালাম।

ইতি,
মোঃ সিরাজুল ইসলাম

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধের কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য সরকার শহীদ সিরাজকে বীর বিক্রম খেতাব প্রদান করে এবং সাচনা নদী বন্দরের নামকরণ করা হয় সিরাজনগর।

শহীদ সিরাজুল ইসলাম ১৯৫২ সালে কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার ছিলনী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সনে কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল কলেজের বিএ প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। যুদ্ধের শুরুতেই তিনি মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেন এবং ভারতের আসামে ইকোয়ান ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফিরে তিনি ৫ নং সেক্টরের অধীনে সাব-সেক্টর কমান্ডার হিসেবে সাচনা যুদ্ধ ছাড়াও সিলেট ও সুনামগঞ্জ এলাকায় আরও অনেক যুদ্ধে বীরত্বের সাথে অংশগ্রহণ করেন। মরহুম মকতুল হোসেন ও গফুরুন্নেছার একমাত্র পুত্র শহীদ সিরাজ ছিলেন দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সবার বড়। শহীদ সিরাজ ছিলেন অবিবাহিত।

স্বাধীনতা পরবর্তী শহীদ সিরাজের পরিবারের কাহিনী অত্যন্ত করুণ। পুত্র শোকে তার পিতা ১৯৭৩ সালে ইন্তেকাল করেন। একমাত্র পুত্রকে হারিয়ে তার মা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন এবং দীর্ঘদিন অপ্রকৃতিস্থ থাকার পর রোগে-শোকে ১৯৮৮ সালে তিনিও মারা যান। প্রতিকূল অবস্থার কারণে শহীদ সিরাজের চিঠিতে বর্ণিত ইচ্ছা মোতাবেক তার দুই বোনকে সুশিক্ষিত করে তোলা সম্ভব হয়নি। খুব সাধারণ ঘরে তাদের বিয়ে হয়।  বড় বোন মনোয়ারা খাতুন কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার নিয়ামতপুরে ঘর-সংসার করছেন। ছোট বোন আনোয়ারা খাতুন  তিন পুত্র ও দুই কন্যা রেখে ১৯৯২ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত এক জনসভায় মরহুম জননেতা সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত সাচনা নদী বন্দরকে সিরাজ নগর হিসেবে নামকরণের ঘোষণা প্রদান করেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় উদ্যোগের অভাবে নামকরণ কার্যকর হয়নি।

তার স্মরণে জেলা সদরে গুরুদয়াল সরকারি কলেজ প্রাঙ্গণে একটি ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে এবং নিজ বাড়ি ইটনা উপজেলা সদরে ধনু নদীর উপর একটি সেতুর নামকরণ করা হয়েছে। কিন্তু সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার টেকেরঘাটে অবস্থিত শহীদ সিরাজের কবর অযত্ন-অবহেলায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। 

শহীদ সিরাজের শাহাদৎ বার্ষিকী পালন উপলক্ষে কিশোরগঞ্জের ইটনা সমিতি ও শহীদ সিরাজুল ইসলাম, বীর বিক্রম স্মৃতি সংসদ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

সাচনা নদী বন্দরের নাম সিরাজনগর কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছেন কিশোরগঞ্জস্থ ইটনা সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুল মালেক ভুঁইয়া এবং শহীদ সিরাজুল ইসলাম বীর বিক্রম স্মৃতি সংসদের সভাপতি অ্যাডভোকেট মারুফ আহমেদ।



রাইজিংবিডি/কিশোরগঞ্জ/৮ আগস্ট ২০১৭/রুমন চক্রবর্তী/টিপু

Walton Laptop