ঢাকা, মঙ্গলবার, ২ কার্তিক ১৪২৪, ১৭ অক্টোবর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

প্রেসিডেন্ট নিক্সনের পতন এবং মিডিয়ার শক্তি

হাসান মাহামুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৮-০৯ ৩:২১:০০ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৮-০৯ ৩:২১:০০ পিএম

হাসান মাহামুদ : মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের শাসনামলে তার ক্ষমতার অবৈধ প্রয়োগ সংক্রান্ত বিপুল পরিমাণ তথ্য ফাঁস হয়েছিল। এই ঘটনা পরিচিতি পেয়েছিল ‘ওয়াটারগেট’ কেলেঙ্কারি নামে। এই ঘটনার কারণে পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন নিক্সন। সংবাদপত্রের ইতিহাসে এই ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে আছে যুগের পর যুগ ধরে।

গত ৪০ বছরে মার্কিন ইতিহাসের অন্যতম বড় ‘রাজনৈতিক ভূমিকম্প’ হিসেবে বিবেচনা করা হয় ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারিকে। নির্বাচনী প্রচারকালে ১৯৭২ সালের ১৭ জুন ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান দল ও প্রশাসনের পাঁচ ব্যক্তি ওয়াশিংটন ডিসির ওয়াটারগেট ভবনস্থ বিরোধী ডেমোক্র্যাট দলের সদর দপ্তরে আড়িপাতার যন্ত্র বসায়। পরে নিক্সনের প্রশাসন এই কেলেঙ্কারি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চালায়। কিন্তু এফবিআই প্রেসিডেন্ট নিক্সনের প্রচারে নিয়োজিত কমিটির সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পায়। ১৯৭৩ সালের জুলাইয়ে সিনেটে ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি তদন্ত কমিটির সদস্যরা প্রেসিডেন্টের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণসহ তথ্য উপস্থাপন করেন। এতে উল্লেখ করা হয়, প্রেসিডেন্ট নিক্সনের অফিসে একটি টেপরেকর্ডার ছিল, যা দিয়ে তিনি অনেক কথোপকথন রেকর্ড করে রেখেছিলেন।

ওই কেলেঙ্কারির জের ধরে নিক্সন ১৯৭৪ সালের ৯ আগস্ট প্রেসিডেন্টের পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। যুক্তরাষ্ট্রে এ পর্যন্ত তিনিই একমাত্র পদত্যাগ করা প্রেসিডেন্ট। তার পদত্যাগের পর ভাইস প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড পরবর্তী চার বছর দেশ পরিচালনা করেন। ওই ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় মোট ৪৩ ব্যক্তিকে কারাগারে পাঠানো হয়, যাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন ছিলেন নিক্সন প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা।

মিডিয়ার শক্তি মাঝেমাধ্যেই ঝড় তোলে৷ যে ঝড় বয়ে যায় বিশ্ব জুড়েই। মিডিয়ার শক্তিতে তেমনি একটি ঝড় বর্তমানে সারাবিশ্বেই বইছে। তা হলো- পানামা পেপার্স। বাংলাদেশেও এই পানামা পেপার্স- এর ঝড় বইছে জোরেসোরেই। এই পানামা পেপার্স সাম্প্রতিককালে সাংবাদিকতার অন্যতম উজ্জ্বল উদাহরণ৷ এটি হচ্ছে এগারো দশমিক পাঁচ মিলিয়ন ডকুমেন্ট এবং দুই দশমিক ছয় টেরাবাইট তথ্য। যা ই-মেইল, আর্থিক বিবরণী, পাসপোর্ট এবং কর্পোরেট নথি আকারে আছে৷ আইন বিষয়ক সংস্থা মোসাক ফনসেকার কাছে এ সব তথ্য ছিল৷

প্রকাশিত এই তথ্যে অনেক কাগুজে প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়ীদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানা গেছে, যারা ১৯৭৭ থেকে ২০১৬ অবধি নিজেদের আয়ের সঠিক তথ্য গোপন করেছেন৷ আর তাদের মধ্যে রয়েছেন বিশ্বের নামকরা সেলিব্রেটি থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, এমনকি নামিদামি অভিনেতা এবং খেলোয়াড়ও। জার্মানির একটি পত্রিকার নেতৃত্বে একদল আন্তর্জাতিক সাংবাদিক বেশ কিছুদিন ধরে অনুসন্ধান করে এসব তথ্য প্রকাশ করেন, যার ফলে একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে পর্যন্ত পদত্যাগ করতে হয়েছে৷ নিঃসন্দেহে এটি পরাক্রমশালী নিক্সনের পতনের থেকে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

মিডিয়ার শক্তির কাছে পরাজিত হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থাও (এনএসএ)। সন্ত্রাসীদের কিংবা সাধারণ মানুষের জন্য বিপজ্জক ব্যক্তিদের নজরদারিতে রাখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা (এনএসএ) – এই কথা সবাই জানতো৷ কিন্তু ২০১৩ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এনএসএ ঢালাওভাবে গোপনে সাধারণ মানুষের ওপর নজর রাখছে৷ মার্কিন পত্রিকা ওয়াশিংটন পোস্ট এবং ব্রিটেনের গার্ডিয়ান পত্রিকা যৌথভাবে এসব তথ্য প্রকাশ করে৷

মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) সাবেক কর্মী এডওয়ার্ড স্নোডেন এ সব তথ্য প্রকাশ করেন৷ ওবামা প্রশাসন এ সমস্ত তথ্য প্রকাশের ঘটনায় ব্যাপক চাপে পড়ে যায় এবং তাদের নীতিগত অবস্থানেও পরিবর্তন এসেছে৷ স্নোডেন বর্তমানে রাশিয়াতে রাজনৈতিক আশ্রয়ে রয়েছেন৷

আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, রাশিয়া স্নোডেনকে বীর হিসেবে বরণ করে নিলেও রাশিয়ার ‘আশ্রিত’ ইতিহাস এক ভিন্ন বার্তা বহন করে। বিশ্লেষকদের ধারণা, রাশিয়ায় স্নোডেন দারুণ মর্যাদায় আশ্রয় পেলেও শেষ পর্যন্ত হয়তো তার জীবনে নেমে আসবে নিদারুণ একাকীত্ব। এই তো চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক অনেক মিডিয়ায় এসেছে- ‘ট্রাম্পকে স্নোডেন ‘উপহার’ দিচ্ছেন পুতিন’। তখন এনবিসি নিউজে প্রকাশ পায়- ‘ভালোবাসার নিদর্শন স্বরূপ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বিশেষ উপহার দিতে যাচ্ছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। সেই উপহারের নাম এডওয়ার্ড স্নোডেন’। অর্থ্যাৎ, প্রযুক্তি জগতের এ মহানায়কের করুন পরিণতি শুধু মিডিয়ার শক্তির কাছেই।

ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির মতোই সম্ভবত আরেকটি কেলেঙ্কারির উন্মোচন হতে যাচ্ছে মার্কিন মুল্লুকে। এবার কেলেঙ্কারির নায়ক হতে যাচ্ছেন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্পের প্রশাসনে থাকা বিভিন্ন ব্যক্তির রুশ সংযোগ ফাসেঁর ধারাবাহিকতায় ওই সংযোগকে ‘ওয়াটারগেট’ কেলেঙ্কারির সঙ্গে তুলনা করেছেন বিশ্লেষকরা। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ট্রাম্পের রুশ সংযোগকে ‘রাশিয়া-গেট’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। নিক্সনের ধারাবাহিকতায় ট্রাম্পকেও পদত্যাগ করতে হবে কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে দেশটিতে।

নতুন করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘রুশ সংযোগ’ নিয়ে তথ্য বেরিয়ে আসছে। আর এটি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য যেমন বিব্রতকর, তেমনি এই কেলেঙ্কারি সহজে মিলিয়ে যাচ্ছে বলেও মনে হচ্ছে না। গতবছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় ট্রাম্পের আইনমন্ত্রী জেফ সেশনসের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে রুশ রাষ্ট্রদূত সের্গেই কিসলিয়াকের দুবার কথোপকথনের তথ্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের পর, ওই ভাষণের প্রভাব অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।

শুধু সেশনস নন, ট্রাম্পের জামাতা কুশনারসহ তার শিবিরের কয়েকজন কর্মকর্তা রুশ রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সাক্ষাৎকরেছেন। আর এতে হোয়াইট হাউস থেকে খুব সহজেই এই বিতর্ক সরে যাচ্ছে না। যদি ‘রাশিয়া-গেট’ কেলেঙ্কারি সত্যিই উন্মোচিত হয়, তাহলে এটি হতে যাচ্ছে চলতি বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত মিডিয়া শক্তি।

বাংলাদেশেও যুগে যুগে মিডিয়ার শক্তি পদচিহ্ন এঁকে যাচ্ছে। হলমার্ক কেলেঙ্কারি, রিজার্ভ চুরি, শেয়ারমার্কেট কেলেঙ্কারি- এসবই মিডিয়ার শক্তির কারণে উন্মোচিত এবং প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশে মিডিয়া বর্তমানে একটি শক্তিশালী অবস্থানে এসেছে। আমরা আশা করবো এ ধরনের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা অব্যাহত থাকবে। দেশে মিডিয়ার শক্তি আরো জোড়ালো হবে। জয় হবে সত্যের, জয় হবে সাংবাদিকতার।

লেখক : সাংবাদিক।

 


রাইজিংবিডি/ঢাকা/৯ আগস্ট ২০১৭/হাসান/শাহনেওয়াজ

Walton
 
   
Marcel