ঢাকা, মঙ্গলবার, ৯ কার্তিক ১৪২৪, ২৪ অক্টোবর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

বার্ধক্য মানবজীবনের অন্যতম চ্যালেঞ্জ

হাসান মাহামুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-১০-০১ ২:২৮:০৬ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-১০-০১ ৪:৪২:৩৬ পিএম

হাসান মাহামুদ : বার্ধক্য মানবজীবনের শেষ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। বিদেশে বয়স্করা সিনিয়র সিটিজেন হিসেবে পরিচিত হলেও বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে ‘প্রবীণ’ এবং গ্রামাঞ্চলে ‘বুড়ো-বুড়ি’ শব্দই তাদের বড় পরিচয়। জীবনের এ পর্যায়ে একজন প্রবীণ নানামাত্রিক সমস্যায় পড়েন।

বার্ধক্যকে মানবজীবনের প্রধানতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছে জাতিসংঘ। সংস্থাটি এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জন্য ৬০ বছর ও তদূর্ধ্ব এবং উন্নত অঞ্চলের জন্য ৬৫ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সীদের প্রবীণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বাংলাদেশে সরকারি চাকরি অবসর গ্রহণের বয়স ৫৯ বছর হওয়ায় অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা বৃদ্ধ হওয়ার আগেই প্রৌঢ় হিসেবে বিবেচিত হন। গ্রাম-বাংলায় কৃষিকাজ বা ব্যবসা-বাণিজ্যে নিয়োজিত ব্যক্তিদের কাজ থেকে অবসর গ্রহণের কোন নির্দিষ্ট বয়স নেই। তাই তাদের পৌঢ়ত্ব নির্ধারণ বেশ কঠিন।

এ সমস্যা সম্পর্কে ব্যাপক গণসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ১৯৯১ সাল থেকে প্রতি বছর ১ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস পালিত হয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস ২০১৭-এর প্রতিপাদ্য হলো, ‘আগামীর পথে, প্রবীণের সাথে’। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন এজেন্ডায় বার্ধক্য ইস্যুটি গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য শ্লোগানটির মাধ্যমে জাতিসংঘ সংশ্লিষ্ট সকল মহলকে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

বাংলাদেশের প্রথম লোক গণনা রিপোর্ট অনুযায়ী ১৯৭৪ সালে এ দেশের ষাটোর্ধ্ব প্রবীণের সংখ্যা ছিল ৪০ লাখ ৫৬ হাজার ৯৫৮। এ সংখ্যা ধীরে ধীরে বেড়ে ১৯৯১ সালের লোক গণনায় ৬০ লাখ ৪৫ হাজার ২৩ এ পৌঁছায়। প্রবীণদের এই সংখ্যা দেশের মোট জনসংখ্যার ৫.৪২ শতাংশ ছিল। ২০১১ সালের লোক গণনায় প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১ কোটিতে যা মোট জনসংখ্যার ৭ শতাংশ আর বর্তমানে এ সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) মতে, কোনো দেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা ১০ থেকে ১২ ভাগ প্রবীণ হলে ঐ দেশকে বার্ধক্য জনসংখ্যার দেশ ধরা হয়। সে হিসেবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ বার্ধক্য জনসংখ্যার দেশ হিসেবে চিহ্নিত হবে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশে বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার শিশু বৃদ্ধির হারের চেয়ে অনেক গুণ বেশি। ফলে প্রবীণদের মোট সংখ্যা শিশু জনসংখ্যা ছাড়িয়ে যাবে। সুতরাং এটিই প্রতীয়মান হয় যে, ভবিষ্যতে বাংলাদেশে প্রবীণরাই জনসংখ্যার একটি বড় অংশ হয়ে পড়বে। বাংলাদেশে প্রবীণদের হার যেমন বেড়ে চলেছে তেমনি বেড়ে চলেছে তাদের বঞ্চনার মাত্রাও।

আদম শুমারী মতে, বাংলাদেশের বর্তমান ষাটোর্ধ্ব বয়স্ক ব্যক্তির সংখ্যা শতকরা প্রায় ৬ ভাগ; অথ্যাৎ বয়স্কের সংখ্যা আনুমানিক ৯০ লাখ। আধুনিক চিকিৎসা সুবিধা, খাদ্যাভাস পরিবর্তন এবং সচেতনতার ফলে জনগণের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়েছে। খাদ্য গ্রহণের ভারসাম্য ও আধুনিক স্বাস্থ্যসম্মতভাবে বসবাসের কারণে বয়স্কদের মৃত্যুহার একদিকে যেমন কমেছে অন্যদিকে গড় আয়ুও বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশে পুরুষদের গড় আয়ু প্রায় ৬০ বছর এবং নারীদের ৬৫ বছর। স্বাভাবিকভাবেই এখানে প্রবীণদের বেঁচে থাকার হারও বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি প্রবীণদের সংখ্যা বৃদ্ধিতে সমস্যাও বেড়েছে। সময়ের সাথে নগরায়ন, শিল্পায়ন, চাকরিগত ও অন্যান্য পরিবর্তিত পেক্ষাপটে বাঙালির ঐতিহ্যমণ্ডিত যৌথ পারিবারিক ব্যবস্থায় ফাটল আর পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় তাদের দেখভালের জন্য একটি বড় সমস্যা।

একান্নবর্তী পরিবার ব্যবস্থায় প্রবীণদের অবস্থান ছিল অত্যন্ত সম্মানজনক। কিন্তু পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ, পশ্চিমা সমাজ ব্যবস্থার প্রভাব এবং আর্থ সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের ফলে বর্তমানে সমাজ-সংসারে বয়স্করা অনেক ক্ষেতেই বোঝা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। তাই হতভাগ্য কোনো কোনো প্রবীণ ভিক্ষাবৃত্তি বা অন্যের করুণার পাত্র হয়ে বাকি জীবন অতিবাহিত করছেন।

নিজের সন্তানদের কাছেও হচ্ছেন অবাঞ্ছিত। ফলে প্রতিদিনই বয়স্ককেন্দ্রে বাড়ছে তাদের ম্লাণ মুখ; এ অবস্থায় তাদের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলার ঘটনাও বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এই দৃশ্য সর্বজনীন নয়। বাংলাদেশের সমাজ-সংসারে প্রবীণদের অবস্থান উন্নত বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় অপোকৃত সম্মানজনক। বিশেষত যৌথ পরিবারগুলোতে পারিবারিক পরিকল্পনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা আয়-ব্যয়ের হিসাব ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ কাজে প্রবীণদের ভূমিকা আজও গুরুত্ববহ। বৃহত্তর সমাজেও প্রবীণদের মতামতের গুরুত্ব কম নয়।

সামাজিক প্রেক্ষাপটে একজন প্রবীণকে ‘দাম্পত্য সম্পর্ক বা বিয়োগ’, ‘সন্তানের সঙ্গে সম্পর্ক’, ‘নাতি-নাতনীর সঙ্গে সম্পর্ক’ ইত্যাদি ক্ষেত্রে মানিয়ে চলতে হয়। চাকরি কিংবা কাজ থেকে অবসর গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে দাম্পত্য সম্পর্কেও সুস্পষ্ট পরিবর্তন আসে। এ সময় গৃহকর্তা অধিকাংশ সময় বাড়িতে অবস্থান করায় পরিবারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ তার জন্য অবশ্যসম্ভাবী হয়ে ওঠে। স্ত্রী তার সংসারের একাধিপত্যে স্বামীর ভূমিকাকে কখনও খোলাখুলিভাবে গ্রহণ করেন আবার কখনও করেন না; তবে বেশীরভাগ ক্ষেত্রে তাদের সুসম্পর্কের বিষয়টি নির্ভর করে অতীত বন্ধনের ওপর। যে বন্ধন তৈরি হয় মধ্যবয়স থেকেই। যখন সন্তানরা যার যার মতো দূরে সরে যেতে থাকে। তখন প্রবীণ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারস্পারিক নির্ভরশীলতা সুগভীর হয়। তারা প্রায় ক্ষেত্রে যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণেও মনযোগী হন। তাই স্বামী বা স্ত্রীর মধ্যে একজনের মৃত্যু অপরজনের জীবনে বয়ে আনে শূন্যতা ও একাকীত্বের করুণ অধ্যায়।

সন্তানের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনে মহিলারা পুরুষদের চেয়ে বেশী আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হন। সন্তানকে লালন-পালন করার ফলে বন্ধনের বিশেষ ভাগটি তাদের জীবনে গভীরভাবে প্রভাবিত। বয়স্ক স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এটি নিয়েও দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। শুধু সন্তানের কারণে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয় তা নয়; মানষিক অস্থিরতার কারণে সন্তানের মতামতকে সন্দেহের চোখে দেখায় ব্যক্তিত্বের সংঘাত এবং বিভিন্ন অবাঞ্ছিত পরিস্থিতিরও সৃষ্টি হয়। স্বভাবতই সন্তানরাও প্রবীণ বাবা-মায়ের অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞাকে সম্মান না করে নিজস্ব কর্তৃত্ব স্থাপনের চেষ্টা করে। ফলে প্রজন্মের মাঝে সম্পর্কের ব্যবধান বেড়ে যায়। নাতি-নাতনীরা যখন ছোট থাকে তখন প্রবীণরা খেলাধুলা ও গল্প বলার বিষয়টি তাদের জীবনে প্রভাব সৃষ্টি করলেও তারা যখন কৈশোর বা যৌবনে পদার্পন করে তখন তাদের জীবনে দাদা-দাদীর প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়। এ সময় প্রবীণদের সহচর্য তাদের কাছে বিরক্তিকর হয়ে ওঠে এবং পুরাতন মূল্যবোধ ও ধ্যান ধারণার সঙ্গে তাদের ধ্যান-ধারণার সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে।

প্রবীণদের আর্থ-সামাজিক অবস্থান বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশে সব ধরণের সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণ করে। মূলত আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণেই প্রবীণরা পরিবারে ও সমাজে উপেক্ষা, অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হন। তারা গণ্য হন অপ্রয়োজনীয় এবং পরিবার ও সমাজের বাড়তি বোঝা হিসাবে। আর্থ-সামাজিক অবস্থান অর্থাৎ উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত এই তিনটি অবস্থানে প্রবীণদের ভূমিকাও ভিন্ন ভিন্ন। উচ্চবিত্ত সমাজে প্রবীণদের সমস্যা তুলনামূলক কম। আর্থিক স্বচ্ছলতার কারণে তাদের মনোবল দৃঢ় থাকে। পরিবারের অন্য সদস্যরা তাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে বরং তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেয়। তবে সন্তানরা নিজস্ব কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকায় একাকীত্ব ও মানসিক নিঃসঙ্গতা থেকে মুক্ত হওয়া প্রবীণের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে।

গ্রামে বা শহরে স্বচ্ছল প্রবীণরা পারিবারিক ও সামাজিক বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানে নেতৃত্ব দেন, ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে নিজেদের ব্যস্ত রাখেন। মধ্যবিত্ত সমাজে অর্থনৈতিক অস্থিরতা তাদেরকে সবচেয়ে বেশী প্রভাবিত করে। আর্থিকভাবে সন্তানের মুখাপেক্ষি হয়ে নিজেদের ব্যস্ত থাকতে হয়। বাজার করা, নাতি-নাতনীকে স্কুলে আনা-নেওয়া ও পড়ানো ইত্যাদি তাদের অন্যতম দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়। মধ্যবিত্ত প্রবীণরাও বিভিন্ন পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন তবে নিম্নবিত্ত বা দরিদ্র প্রবীণরা যতদিন শারীরিক ক্ষমতা থাকে ততদিনই উপার্জনে নিয়োজিত থাকেন। কিছু প্রবীণ সম্পূর্ণরূপে সন্তানদের ওপর নির্ভরশীল থাকতে বাধ্য হন। সন্তানের অবহেলার কারণে কখনও কখনও অনেক বাবা-মাকে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করতে হয়। অথচ তাদের কর্মময় জীবনের সিংহভাগ ব্যয় হয়েছে নিজ পরিবার গঠন ও উন্নয়ন, সমাজ ও জাতির সার্বিক অগ্রগতি ও উন্নতিতে।

জীবনের শেষ পর্যায়ে একজন প্রবীণ নানামাত্রিক সমস্যায় পড়েন। যদিও খাতা-কলমে সমাজ-সংসারে তাদের অধিকার সুরক্ষিত। তবে অধিকারের প্রশ্নে নয় বরং তাদের জীবনের শেষভাগ সফল, সার্থক ও স্বাচ্ছন্দময় করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/০১ অক্টোবর ২০১৭/হাসান/শাহনেওয়াজ

Walton
 
   
Marcel