ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১২ ডিসেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

রতনতনু ঘোষ: স্মৃতির পাতা থেকে

সাইফুজ্জামান : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-১০-০৩ ৩:২১:১২ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-১০-০৩ ৩:২৯:২৪ পিএম
রতনতনু ঘোষ

সাইফুজ্জামান: রতনতনু ঘোষ প্রাবন্ধিক, গবেষক, কবি। তার মৃত্যুর পর এক বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু মনে হয় কিছুক্ষণ আগেও তার সাথে আমার দেখা হয়েছে। ঢাকা শহর প্রদক্ষিণ শেষে আমার অফিসে এসে বসবেন, নতুন লেখা পাঠ করে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইবেন। কিন্তু বাস্তব বড় সত্য, তিনি নেই- এ সত্যে আমাদের আস্থা রাখতে হবে। তাকে নিয়ে লিখতে গেলে স্মৃতির পাতা ফুঁড়ে কতো কিছুই না ভেসে ওঠে।

রতনতনু ঘোষের সাথে প্রথম পরিচয় দৈনিক ‘আজকের কাগজ’ পত্রিকা অফিসে। উপ-সম্পাদকীয় পাতায় ও সাহিত্য কাগজে আমরা নিয়মিত লিখেছি। সাহিত্য আড্ডায়ও অংশ নিয়েছি। তিনি প্রবন্ধ লিখেছেন। আমরা প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছি। ঢাকা শহরের দৈনিক পত্রিকা অফিস ঘিরে আমাদের আড্ডা দীর্ঘায়িত হয়েছে। অনেকেই চলে গেছেন প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে। এরসঙ্গে যুক্ত হলো রতনতনু ঘোষের নাম। বইমেলা এলে তার উৎসাহ বেড়ে যেত। অন্তত ১০ থেকে ১২টি বই প্রকাশ ও সম্পাদনা ছাড়া তার দিনরাত অর্থহীন মনে হতো। প্রতিদিন বইমেলায় তার উপস্থিতি ছিল অপরিহার্য। নিজের বইয়ের কথা কম বলতেন। অন্যান্য লেখকের বইয়ের খোঁজখবর নিতেন। ভালো বইগুলো চিহ্নিত করতেন। এবং আমাদের জানাতেন। আমরা তার কাছ থেকে জানতে চাইতাম বইয়ের কথা।

রতনতনু ঘোষ রচিত প্রবন্ধগ্রন্থগুলো হলো: বাংলাদেশের রাজনীতি, প্রত্যাশা ও বাস্তবতা, আলোকিত বাংলাদেশের পথ, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু, অপারেজয় বাংলাদেশ, অগ্রসর বাংলাদেশ, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি, বাংলাদেশের সাহিত্য।
তার কাব্যগ্রন্থও রয়েছে। রতনতনু ঘোষের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ ও ‘নির্বাচিত কবিতা’ বেরিয়েছে কোনো এক বইমেলায়।

রতনতনু ঘোষ মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজে অধ্যাপনা করেছেন। তিনি বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ প্রসঙ্গে ছিলেন অটল। গণতান্ত্রিক যাত্রাপথে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার প্রতি আস্থাশীল ছিলেন। দলীয় পুরস্কার ও সম্মাননার জন্য তিনি কাঙ্গাল ছিলেন না। তারপরও কাজের স্বীকৃতি তিনি পেয়েছেন। প্রবন্ধ রচনার জন্য গণগ্রন্থাগার (১৯৮৫) পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রকল্প পুরস্কার ও সম্মাননাও তিনি পেয়েছেন। নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত অমর্ত্য সেন, কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়সহ এ দেশের জাতীয় ব্যক্তিত্বদের সাক্ষাৎকার গ্রহণে তিনি তার তেজদীপ্ত প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিলেন।

রতনতনু ঘোষ পড়ুয়া ছিলেন। তাৎক্ষণিক প্রবন্ধ রচনায় তার ক্ষমতা ছিল বিস্ময়কর। মনের ভাব, নিঃসঙ্গতা ও প্রেম অবলম্বন করে তিনি রচনা করেছেন ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা ও  নির্বাচিত কবিতা’। ছাত্রছাত্রী, স্বজন ঘিরে মখুর থাকলেও তিনি একাকীত্ব অনুভব করতেন। এই একাকীত্ব থেকে তার কবিতা লেখার উপকরণ সংগ্রহ করতেন। অভিমান আর বাস্তব ঘাত-প্রতিঘাত, বঞ্চনা তার কবিচিত্তে আলোড়ন তুলেছে। কবিতা ও আত্মকথনে বাস্তবতার গল্প উঠে এসেছে। তিনি ছিলেন পরিশ্রমী লেখক ও পাঠক। রতনতনু ঘোষ সংগঠক হিসেবেও ভূমিকা রেখেছেন। সাহিত্য সংগঠনগুলোতে তার সম্পৃক্ততা পৃষ্ঠপোষক হিসেবে তাকে অনায়াসে চিহ্নিত করে। অন্যের বিপদে এগিয়ে আসা ছিল তার স্বভাবজাত। লেখক বন্ধু ও সংগঠকদের পাশে বন্ধুর মতো থেকেছেন। দৈনিক ‘যায় যায় দিন’ অফিসে একটি লেখা জমা দেয়ার জন্য ৩ অক্টোবর ২০১৬ তারিখ তিনি যান। লেখা জমা দিয়ে ফেরার পথে রতনতনু ঘোষ হৃদরোগে আক্রান্ত হন। সামরিক হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

রতনতনু ঘোষ বাংলা একাডেমির আজীবন সদস্য ছিলেন। যদিও মৃত্যুর পর তার মরদেহ বাংলা একাডেমিতে নেয়া যায়নি। যদিও তিনি পুরস্কার প্রত্যাশি ছিলেন না। তারপরও আমরা এ প্রসঙ্গে মুখর ছিলাম। আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম, তিনি তার কাজের আরো কিছু স্বীকৃতি পাবেন। কিন্তু তা হয়নি। রতনতনু ঘোষের রচনার সংখ্যা কম নয়। গুণগতমান ও বিষয় বৈচিত্রের দিক থেকে সেগুলো সমৃদ্ধ। তার মৃত্যুর পর তার সমগ্র রচনা প্রকাশের উদ্যোগ কোনো প্রকাশনা সংস্থা নিয়েছে কিনা আমাদের জানা নেই। সেগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আসে। এগুলো গ্রন্থিত হওয়া জরুরি। আমরা যদি আমাদের কৃতী সন্তানদের সম্মান করতে না জানি তাহলে এ অমর্যাদা সকলের।

কবি লেখকদের জন্মদিন পালনের উৎসাহ তার ছিল। তার পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে আমরা জমায়েত হয়েছিলাম। তখন একটি গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। রতনতনু ঘোষ আমাদের স্মৃতিতে বেঁচে থাকবেন। আমরা যারা তার মতো বন্ধু হারিয়েছি তাদের জন্যে তার মৃত্যুদিনে স্মরণসভায় দাঁড়ানো বেদনার। যারা চলে যায় তারা যায়। তাদের স্মৃতি নিয়ে অন্যরা বেঁচে থাকে এটাই প্রকৃতির নিয়ম। রতনতনু ঘোষ সারাজীবন সত্য, ন্যায় ও ইতিহাসের দায় থেকে সাহিত্য সংস্কৃতি অঙ্গনে নিবেদিত ছিলেন। শোষণমুক্ত সমাজ নির্মাণে তিনি ব্রতী হয়েছিলেন। প্রতিটি সৎ উদ্যোগ কখনো বৃথা যায় না কিংবা হারিয়ে যায় না। হারিয়ে যাবেন না রতনতনু ঘোষও। রমনা, আজিজ মার্কেট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শাহবাগের সবুজ চত্বর ঘিরে আমাদের আড্ডা গভীর রাত পর্যন্ত আজও চলছে। সেই আড্ডায় নেই শুধু রতনতনু ঘোষ। তবে তিনি আমাদের স্মৃতিতে সরব আছেন। তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৩ অক্টোবর ২০১৭/তারা

Walton
 
   
Marcel