ঢাকা, সোমবার, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১১ ডিসেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

তার কলম, দেশাত্মবোধক গান ছিল স্বাধীনতাপ্রেমীদের অনুপ্রেরণা

হাসান মাহামুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-১০-০৭ ৯:৫০:০১ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-১০-০৭ ৯:৫০:০১ পিএম
নয়ীম গহরের বিভিন্ন সময়ের উল্লেখযোগ্য ছবি কোলাজ আকারে

হাসান মাহামুদ : ‘জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো’, ‘নোঙ্গর তোলো তোলো সময় যে হলো হলো’ কিংবা ‘পূবের ঐ আকাশে সূর্য উঠেছে’, পূর্বের ঐ আকাশে সূর্য উঠছে আলোকে আলোকময়, জয় জয় জয় জয় বাংলা’সহ অসংখ্য গানের প্রণেতা নয়ীম গহর। বরেণ্য এ গীতিকার মুক্তিযুদ্ধের সময়ে এমন সব কালজয়ী দেশাত্মবোধক গান রচনা করে স্বাধীনতাপ্রেমী যোদ্ধা ও সাধারণ জনগণকে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন, সাহস দিয়ে গেছেন।

দেশের বাইরে চাকরি নিয়ে গেলেও ফিরে এসেছেন মাটির টানে। যোগ দিয়েছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের একজন যোদ্ধা হিসেবে। সৃষ্টি করেছেন বহু আধুনিক ও মুক্তিযুদ্ধের হৃদয়স্পর্শী গান। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের রক্ত ঝরা দিনগুলিতে গানের বাণীতে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন। সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণ ছাড়াই মুক্তিযুদ্ধে তার অসামান্য অবদান ছিল।

স্বাধীনতার জন্য শুধু গানই রচনা করে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করেননি, জীবন বাজি রেখে বঙ্গবন্ধুর জরুরি বার্তা অতিগোপনে ২৫ মার্চ রাতে চট্টগ্রামে এম আর সিদ্দিকীর কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন নয়ীম গহর। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশমতো নয়ীম গহর জীবন বাজি রেখে অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সঙ্গে তা পৌঁছে দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল নয়ীম গহরের। তিনি মুক্তিযুদ্ধের আগেই নিজের লেখা দেশাত্মবোধক গানগুলো গোপনীয়তার সঙ্গে রেকর্ড করেছিলেন করাচী গিয়ে। তার সঙ্গে ছিলেন সুরস্রষ্টা আজাদ রহমানও।

দেশ ও জাতির জন্য অনেক অবদান রেখেও পরিণত বয়সে নয়ীম গহর ছিলেন নিভৃতচারী। মুক্তিযুদ্ধের সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও নয়ীম গহর ইচ্ছে করেই মুক্তিযোদ্ধা সনদপত্র সংগ্রহ করেননি। অনেকটা নীরবেই তিনি দু’বছর আগে চিরবিদায় নেন। ৭ অক্টোবর এই মহান মনীষীর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৫ সালের ৭ অক্টোবর রাতে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। ২০০০ সালে তাঁর ওপেন হার্ট সার্জারি হয়েছিল। কয়েক বছর ধরে তিনি চলাচলে অক্ষম ছিলেন। ছয় মাস আগে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে তার স্মৃতিশক্তি লোপ পেয়েছিল।

স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম নাটক বিটিভিতে প্রচারিত হয়। নাটকটির নাম ছিল ‘পাখি আমার জয়ন্ত’। নাটকটির রচয়িতা ছিলেন নয়ীম গহর। অর্থ্যাৎ নয়ীম গহর বাংলাদেশে টেলিভিশনে প্রচারিত প্রথম নাটকের রচয়িতা ছিলেন। নাটকটি তিনি রচনা করেছিলেন নিজের ছেলের নামে। প্রসঙ্গত, জয়ন্ত তার ছেলের নাম। নাটকটির পরিচালক ছিলেন আবদুল্লাহ-আল-মামুন। প্রধান অভিনেতা-অভিনেত্রী ছিলেন সুজাতা ও গোলাম মুস্তাফা। এছাড়া দেশের প্রথম সর্বাধিক জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানও শুরু হয় তার হাত ধরে। ফজলে লোহানী ও নয়ীম গহর মিলে একটি নতুন ধারার টিভি অনুষ্ঠান করেন ‘যদি কিছু মনে না করেন’ শিরোনামে। ‘ইচ্ছে করেই যারা ভুল করেন, জেনেও না জানার ভান করেন, তাদের কিছু ভুল বুঝিয়ে দেব’ এ গানটি ও তারই রচনা।

প্রতিভাবান এই মানুষটি বিক্রমপুরের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে বাংলা ১৩৪৪ সালের ২৯ শ্রাবণ, ইংরেজী ১৪ আগস্ট ১৯৩৬ খৃষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। কলেজ জীবনে ইংরেজী কবিতা দিয়ে তার প্রতিভা প্রকাশ করেন, তখনকার প্রথম শ্রেণির ইংরেজী পত্রিকা ‘অবজারভার’ এ। বাংলা কবিতার বই মাত্র দু’টি। ‘শব ও স্বগতোক্তি এবং নিষিদ্ধ বিছানা’। ‘রাহুগ্রাস’ নামে তার একটি গল্প গ্রন্থও রয়েছে।

দেশাত্মবোধক গানের পাশাপাশি তিনি দুই শতাধিক গানের কথা লিখেছেন। অনেক কবিতা ও ছোট গল্প রচনা করেছেন যার অনেক ছাপা হয়েছে পত্র-পত্রিকায়। কিন্তু কবি বড় অগোছালো। তার এই মূল্যবান রচনাগুলো এলামেলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এই মহান গীতিকারের অসংখ্য লেখা এখনো অপ্রকাশিত রয়ে গেছে। এর মধ্যে এই বছরের ফেব্রুয়ারিতে বড় মেয়ে তাজরীন গহর, তার লেখা একটি অপ্রকাশিত গানকে শিরোনাম করে একটি অ্যালবাম প্রকাশ করেন। অগ্নিবীণা থেকে বের হয় তাজরিন গহরের প্রথম একক ‘একুশ আসে’ অ্যালবামটি। অ্যালবামের শিরোনাম গানটি নয়ীম গহরের অপ্রকাশিত ডায়েরি থেকে নেওয়া।

ছাত্র জীবনেও তিনি অত্যন্ত মেধার পরিচয় দেন। ১৯৫৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকে প্রথম স্থান অধিকার করেন। তিনি একজন ভাল চিত্রকরও ছিলেন। তার দ্বিতীয় মেয়ে ইলোরা গহর চলচ্চিত্রে এবং ছোট পর্দায় সুনাম কুড়িয়েছেন। ‘যদি কিছু মনে না করেন প্রথম অনুষ্ঠানে দু’বোন, অজন্তা, ইলোরা ওদের বাবার লেখা গান গেয়ে বেশ নাম করেছিলেন। 

গত বছরের নভেম্বরে নতুন ১০৮ শব্দসৈনিককে মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দিয়ে গেজেট প্রকাশ করা হয়। এখানে তিনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত হন। মৃত্যুর তিন বছর আগে তাকে দেওয়া হয় দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা হিসেবে ‘স্বাধীনতা পদক’। এই মহান মানুষটির প্রতি অজস্র সালাম।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৭ অক্টোবর ২০১৭/হাসান/শাহনেওয়াজ

Walton
 
   
Marcel