ঢাকা, সোমবার, ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২০ নভেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

অক্টোবর স্মৃতিভবন

শাহ মতিন টিপু : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-১০-১৫ ৩:৩৬:৪৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-১০-১৫ ৩:৪১:১৫ পিএম

শাহ মতিন টিপু : এক মর্মান্তিক বেদনাদায়ক ঘটনার স্মৃতি স্মারক ‘অক্টোবর স্মৃতিভবন’। ১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের একটি ভবন ধসে প্রাণ হারিয়েছিল ৪০ জন সম্ভাবনাময় তরুণ।

জগন্নাথ হলের যেখানে বর্তমানে অক্টোবর স্মৃতিভবন সেখানেই ঘটেছিল এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। এই নির্মম ট্র্যাজেডির স্মৃতি রক্ষায় পরে নির্মিত নতুন ভবনটির নাম রাখা হয় অক্টোবর স্মৃতিভবন।

এই বেদনাভরা ঘটনায় গোটা দেশ তিনদিনব্যাপী শোক প্রকাশ করেছিল। সেদিন দুর্ঘটনার সময় বাইরে বৃষ্টি হচ্ছিল আর বিটিভিতে চলছিল ধারাবাহিক নাটক 'শুকতারা'। ভবনটির দোতলায় ছিল হলের টিভি কক্ষ। নাটক দেখার জন্য সে সময় টিভি কক্ষে উপস্থিত ছিলেন প্রায় ২৫০-৩০০ জন ছাত্র, কর্মচারী ও অতিথি। ভবনে তখন মেরামত কাজ চলছিল। হঠাৎ বিকট শব্দে ছাদের মাঝের অংশ ভেঙে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে ধুলায় পুরো কক্ষ অন্ধকার হয়ে যায়। এরপর সবাই প্রত্যক্ষ করেন সেই মর্মান্তিক দৃশ্য। কেউ প্রাণ হারিয়েছে, কেউ আহত হয়ে গোঙাচ্ছে। মুহূর্তে কান্না-হাহাকারে এক বিষাদময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। শোকে স্তব্ধ হয়ে যায় সারাদেশ।

সেদিন আহত হয়েও যারা আজো বেঁচে আছেন তাদের একজন হল কর্মচারী নিতাই চন্দ্র দাস। সেদিনের ঘটনা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘তখন আমি হলের ক্যান্টিনে বাবুর্চির সহকারী হিসেবে কাজ করতাম। শুকতারা নামের নাটকটি দেখার জন্য দ্রুত কাজ শেষ করে টিভি রুমে চলে যাই। তখন বাইরে বৃষ্টি হচ্ছিল। আমি পেছনের দিকেই দাঁড়িয়েছিলাম। হঠাৎ করে বৃষ্টির মাত্রা বেড়ে যায়। আমি যেখানে দাঁড়িয়েছিলাম, তার একটু সামনে তখন ছাদের একটা অংশ ভেঙে পড়ে। আমার মাথায় মারাত্মক আঘাত লাগে, জ্ঞান হারাই। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর আমার জ্ঞান ফেরে। তখন দেখি আমার আশপাশে অনেক লাশ।’

সে সময়ের হলের কর্মচারী সুশীল দাস বলেন, ‘আমি চেয়ারে বসে নাটকটি দেখছিলাম। এক ছাত্র এলে তাকে চেয়ার ছেড়ে দিয়ে আমি সামনে গিয়ে বসি। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই ছাদটি ভেঙে পড়ে। পুরো টিভিকক্ষ ধুলোয় অন্ধকার হয়ে যায়। আমার ছেড়ে আসা সিটে বসা ছাত্রটি মারা যান। ওখানে বসা থাকলে হয়তো আমিই মারা যেতাম।’



ঘটনার আরেক প্রত্যক্ষদর্শী নেপাল চন্দ্র দাস বলেন, ‘হলের মাঠে সারি বেঁধে লাশগুলো রাখা হয়েছিল। একদিকে চলছিল তাদের পরিচয় নির্ণয় প্রক্রিয়া; অন্যদিকে রক্ত দেওয়ার জন্য লোক সংগ্রহ। কেউ মেডিক্যালে যাবে বললে রিকশাচালকরা ভাড়াও নিতেন না।’

জগন্নাথ হল ট্র্যাজেডির স্মরণে অক্টোবর স্মৃতিভবনের নিচতলায় একটি ছোট জাদুঘর আছে। মৃত্যুবরণ করা বেশ কয়েকজনের ছবি আছে এই জাদুঘরে। সেদিনকার ব্যবহৃত টিভি সেটটিও রাখা আছে সেখানে। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো আজও সেদিনের ভয়াবহতা প্রমাণ করে। ভবনটির সামনে নিহতদের স্মরণে তাদের নামসংবলিত একটি ফলক স্থাপন করা হয়েছে।

প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম যে তিনটি হল নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল জগন্নাথ হল তার একটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ঐতিহ্যকে ধারণ করে আছে জগন্নাথ হল। ঢাকার বলিয়াদির জমিদার কিশোরীলাল চৌধুরীর পিতা জগন্নাথরায় চৌধুরীর নামে এই হলের নামকরণ করা হয়। এই হলের প্রথম প্রভোস্ট ছিলেন অধ্যাপক নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে বিখ্যাত অধ্যাপক সত্যেন্দ্রনাথ বসু, অধ্যাপক জ্ঞান চন্দ্র ঘোষ, ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব, অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা এই হলের প্রভোস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় ড. গোবিন্দচন্দ্র দেব ও অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতাকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী হত্যা করে।

তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে অসন্তোষ ও বিক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে ১৯৪৭ সালের শেষ দিকে। রাষ্ট্রভাষা উর্দু’র বিরূদ্ধে রুখে দাঁড়ায় তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের তরুণ ছাত্রদের দল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা প্রতিবাদ মুখর হয়ে ১৯৪৮ সনের ১০ মার্চ মিছিল করে জমায়েত হয়েছিল জগন্নাথ হলেরই সামনে। এদের মুখ বন্ধ করে দেওয়ার জন্য পাকিস্তান সরকারের গুলি চলেছিল নির্বিচারে। জগন্নাথ হলের সামনে সুরকির রাস্তা লাল হয়ে গিয়েছিল আহত ছাত্রদের রক্তে। তারপর ১৯৫২ সনের ২১ ফেব্রুয়ারির স্মরণীয় ইতিহাস। বিশ্বদ্যিালয়ের প্রাঙ্গণে জমায়েত হয়েছিল অগণিত ছাত্রছাত্রী।

রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে স্মারকলিপি মিছিল করে পৌঁছে দেবে এসেমবলী হাউসে। ১৯৫২ সনের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারাভঙ্গ করে ছাত্রদের মিছিলটা যাচ্ছিল ঐ এসেম্বলী হাউসেরই পথে, কিন্তু না, মিছিল তো গন্তব্যস্থলে পৌঁছালো না। আবার পাকিস্তান সরকারের কড়া হুকুম- টিয়ার গ্যাস, গুলি। ঢাকার রাজপথ ছাত্রদের রক্তে রঞ্জিত হলো। আজ সেখানে শহীদ মিনার মাথা উচুঁ করে দাঁড়িয়ে থেকেও মাথা নীচু করে ছেলে হারানোর কথা মনে করিয়ে দেয়।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কাল রাত্রি। জগন্নাথ হলের মাঠে জড়ো করা হয়েছিল ছাত্র শিক্ষকদের। নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল এই হলেরই মাঠে। তারপর গর্ত করে মাটি চাপা দিয়ে সৃষ্টি করলো গণ কবরের। এইসব ঘটনার নিরব সাক্ষী জগন্নাথ হল। একটার পর একটা নির্মম ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়েছিল জগন্নাথ হল। সেখানে ১৯৮৫ সালে যোগ হলো ভবনের ছাদ ধসে ৪০টি তরতাজা প্রাণের মৃত্যু।

জগন্নাথ হল ট্র্যাজেডির ৩২ বছর পেরিয়ে গেলেও দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক হলই এখনও ঝুঁকিপূর্ণ। অতীত ইতিহাস থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। কারো অবহেলায় যেন আর না হারায় কোন সম্ভাবনাময় প্রাণ।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৫ অক্টোবর ২০১৭/টিপু

Walton
 
   
Marcel