ঢাকা, সোমবার, ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২০ নভেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

লিখন ফেরিওয়ালার ‘জগা খিচুড়ি’

আমিনুর রহমান হৃদয় : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-১১-১৩ ৮:১৩:১৭ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-১১-১৩ ১২:৩৫:৩৭ পিএম

আমিনুর রহমান হৃদয় : রুটি-কলার দামে সাধারণ মানুষকে ‘জগা খিচুড়ি’ খাওয়াচ্ছেন লিখন ফেরিওয়ালা হিসেবে পরিচিত এক যুবক।

রাজধানীর ধানমন্ডি ১৫ নম্বরে ব্যাংক আল-ফালাহ এর সামনে ড্রিম ভ্যান নামে একটি ভ্যানে করে দুপুরে এই ‘জগা খিচুড়ি’ স্বল্পদামে বিক্রি করছেন তিনি। কথা বলে জানা যায়, তার নাম তাজুল ইসলাম লিখন। ফরিদপুর শহরে জন্ম। বর্তমানে রাজধানীর মোহম্মদপুরে থাকেন।

লিখন জানান, তার কাছে শিক্ষার্থী, চাকরিজীবীসহ নিম্ন আয়ের সাধারণ মানুষ দুপুর বেলা কলা-রুটির দামে জগা খিচুড়ি পেট ভরে খেতে পারছেন। ৩০ টাকায় জগা খিচুড়ি, ৪৫ টাকায় ডিম খিচুড়ি আর ৬০ টাকায় চিকেন খিচুড়ি বিক্রি করে থাকেন বলে জানান তিনি।
 


এই যুবক বলেন, ‘বর্তমানে এক প্লেট সাদা ভাত-ভর্তা খেতে গেলেও ২০-৩০ টাকা লাগে। কিন্তু খাওয়ার পরেও ক্ষুধা মিটে না। সেখানে আমি নিম্ন আয়ের মানুষ থেকে উচ্চবিত্ত সবার জন্যই ৩০ টাকায় জগা খিচুড়ি বিক্রি করছি। আমার খিচুড়ি খেয়ে ক্ষুধা মিটে সবারই।’ তিনি আরো বলেন, ‘যারা রুটি-কলা খেয়ে দিন পার করে তাদের স্বল্পমূল্যে জগা খিচুড়ি খেতে দিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ানোও আমার এই দোকান দেয়ার উদ্দেশ্য।’

ধনী-গরীবের বিশাল ব্যবধান দূর করতে এই দোকান ভূমিকা রাখছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার জগা খিচুড়ি খেতে দুপুর বেলা উচ্চবিত্ত শ্রেণীর মানুষজন থেকে খেটে খাওয়া মানুষজনও টোকেন নিয়ে এক লাইনে দাড়িয়ে খিচুড়ি খায়। তখন ধনী-গরীবের কোনো বৈষম্য থাকছে না। একজন খেটে খাওয়া মানুষ যে খাবার খাচ্ছে, একজন চাকরিজীবীও সেই খাবার খাচ্ছে।’ ২০০৯ সালে মা রওশন আরা বেগম মারা যাওয়ার কথা স্মরণ করে এই যুবক আরো বলেন, ‘আমার মা নিজে না খেয়ে ভিক্ষুকদের খাওয়াতেন। মায়ের কাছ থেকেই শেখা অসহায় মানুষের জন্য কাজ করা।’

লিখন ফেরিওয়ালার সঙ্গে কথা বলে আরো জানা যায়, মা মারা যাওয়ার পর একা হয়ে পড়েন তিনি। তার আগে নিজের দুই বছর বয়সেই বাবা নুরুল ইসলামকে হারান লিখন। পরিবারের অন্য সদস্যরা সবাই উচ্চবিত্ত শ্রেণীর। ২০১১ সালে ফরিদুপরে একটি কলেজে ডিপ্লোমা পড়া অবস্থায় দক্ষিণ কোরিয়ায় পাড়ি জমান তিনি। ৫ বছর পরে দেশে ফেরেন। এরপর উদ্বোধন করেন ফেরি করার বাহন ‘ড্রিমভ্যান’ এর। তার আগে রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে সানগ্লাস, কলেজ ব্যাগ, মানিব্যাগ, বেল্ট, স্যান্ডেল, টি-শার্ট ও ক্যাপ বিক্রি করেছিলেন। এখন ড্রিম ভ্যানে করে জগা খিচুড়ি বিক্রি করছেন।
 


কোনো কাজই ছোট না জানিয়ে লিখন বলেন, ‘আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই ঢাকা শহরের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ড্রিম ভ্যানে করে এই জগা খিচুড়ি বিক্রি করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে বিভিন্ন পয়েন্টে মানুষজন জগা খিচুড়ি স্বল্প দামে খেতে পারবে।’

তিনি বলেন, ‘জগা খিচুড়ি বিক্রি করে বর্তমানে তেমন কোনো লাভ হচ্ছে না। যখন বেশ কয়েকটি পয়েন্টে জগা খিচুড়ি বিক্রি শুরু হবে তখন লাভ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’

৫ বছর ফ্রান্সে রাঁধুনি হিসেবে কাজ করা মোহাম্মদ নুরু দেশে ফিরে এসে এই সুস্বাদু জগা খিচুড়ি রান্না করছেন বলে জানান লিখন ফেরিওয়ালা। তিনি আরো জানান, দুপুর ১টায় দোকান খোলার পর বর্তমানে এক ঘণ্টার মধ্যেই জগা খিচুড়ি বিক্রি করা শেষ হয়ে যায়। অনেকে এসে খিচুড়ি খেতে না পেরে ঘুরে যায়।

জগা খিচুড়ি খেতে আসা স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী আবু রায়হান ইফাত বলেন, ‘স্বল্পদামে চিকেন জগা খিচুড়ি খেয়ে তৃপ্তি পেলাম। আসলেই সুস্বাদু জগা খিচুড়ি।’ রিকশাচালক রহিম আলী বলেন, ‘সকালে না খেয়েই রিকশা চালাতে বের হই। এরপর দুপুর বেলা আর বাসায় যেয়ে খেতে পারি না। এখানে ৩০ টাকায় পেট ভরে জগা খিচুড়ি খেতে পারি। পেট ভরা থাকলে রিকশা চালাতে কষ্ট হয় না।’



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৩ নভেম্বর ২০১৭/ফিরোজ

Walton
 
   
Marcel