ঢাকা, রবিবার, ৬ শ্রাবণ ১৪২৫, ২২ জুলাই ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

‘পুরোনো কাপড়েই এবার ঈদ করতে হবে’

আমিনুর রহমান হৃদয় : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৬-১৫ ২:৩৪:৫৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৬-১৫ ৪:১৫:৪৫ পিএম

আমিনুর রহমান হৃদয় : সাপের খেলা দেখিয়ে মানুষকে তারা আনন্দ দেয়। তাদের নেই কোনো স্থায়ী জমি, নেই স্থায়ী থাকার মতো ঘর। দেশের বিভিন্ন জেলায় ঘুরে ঘুরে সাপের খেলা দেখিয়েই চলে তাদের সংসার। সাধারণত ১৫ থেকে ২০ দিনের জন্য অন্যের জমিতে পলিথিনের তাঁবু টাঙিয়ে অস্থায়ী ঘর তুলে বসবাস করে তারা। এরপর আবার অন্যত্র।

সম্প্রতি ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ পৌরসভার জগথা রাইসমিল পাড়ায় অস্থায়ীভাবে ২০টির মতো বেদে পরিবার বসবাস করছে। পরিবারগুলোতে ৭০ থেকে ৮০ জন মানুষ রয়েছে। তাদের জীবন সংগ্রামের নানাদিক ও ঈদ উৎসব নিয়ে কথা হয় এ প্রতিবেদকের সঙ্গে। ‘মানুষ সাপের খেলা দেখে কিন্তু টাকা দিতে চায় না। এখন মাত্র দিনে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা আয় হয় খেলা দেখিয়ে। খুব কষ্টে সংসার চালাতে হয়।’ বলছিলেন সাপুড়ে মোহাম্মদ আল-আমিন। কথায় কথায় তিনি জানালেন, বাবার কাছ থেকেই তার এই পেশায় হাতেখড়ি। পূর্বপুরুষের পেশা। তাই কষ্ট হলেও সাপের খেলা আর তাবিজসহ গাছ-গাছালির ওষুধ বিক্রি করেই জীবিকা নির্বাহ করছেন। আল-আমিন বলেন, ‘সাপ খেলা এখনো মানুষের কাছে জনপ্রিয়। শিশু থেকে বুড়ো সবাই এই খেলা দেখতে পছন্দ করে। মানুষকে আমরা আনন্দ দিলেও আমাদের জীবনে কষ্টের সীমা নেই। প্রতিবার ঈদে আমার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েকে ঈদের জামাকাপড় কিনে দিই। কিন্তু এবার খেলা দেখিয়ে তেমন টাকা আয় না হওয়ায় ঈদের জন্য নতুন কাপড় কিনে দিতে পারি নাই। পুরোনো কাপড়েই এবার ঈদ করতে হবে।’

 



রাজধানীর সাভার উপজেলায় জন্মস্থান হলেও সেখানে তাদের নিজস্ব কোনো জমি না থাকায় দেশের বিভিন্ন জায়গায় এভাবেই ঘুরে ঘুরে তারা জীবিকা নির্বাহ করছেন। এ সম্প্রদায়ে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও সাপের খেলা দেখিয়ে থাকেন। ‘জন্মের পর থেকে এই পেশার সঙ্গে জড়িত আছি। আমার স্বামীও সাপের খেলা দেখায়। দু’জনের আয়ে কোনোমতে চলে যায় আমাদের জীবন।’ বলছিলেন বেদেনী মাধুরী। জানালেন, এক ছেলে ও এক মেয়ে তার। ১২ দিন ধরে পীরগঞ্জ উপজেলায় এসেছেন। কিন্তু এখানে সাপের খেলা দেখিয়ে তেমন টাকা পাচ্ছেন না। ছেলে ও মেয়েকে ঈদের জন্য নতুন জামা-প্যান্ট কিনে দেওয়ার ইচ্ছে থাকলেও টাকা নেই তার কাছে। মাধুরী বলেন, ‘আমরা তো মানুষের কাছে সাহায্য চাইতে পারি না। মানুষ যদি আমাদের দুঃখটা একটু বুঝতো...। সাপের খেলা দেখে যদি প্রত্যেকে টাকা দিত। তাহলেই আমাদের দুঃখ থাকতো না। কিছু কিছু মানুষ খেলা দেখে টাকা দেয় আর কিছু মানুষ খেলা শেষ হওয়ার একটু আগে টাকা না দিয়েই চলে যায়। খেলা দেখে ঠিকই কিন্তু টাকা দেয় না। আমরা কীভাবে খাবো সেটা তারা একবারও ভাবে না।’

নারীরা দল বেঁধে গ্রামে গ্রামে সাপ খেলা দেখান। পাশাপাশি তাবিজ ও গাছ-গাছালির ওষুধ বিক্রি করেন। সাধারণ মানুষ অনেক সময় তাদের নিয়ে খারাপ মন্তব্য করে জানিয়ে বেদেনী তুরতুরি আক্তার বলেন, ‘আমরা দু’বেলা খাবারের জন্য সাপ খেলা দেখাই, গ্রামে গ্রামে ঘুরি। অনাহারে থাকলে তো কেউ খোঁজ নিতে আসে না’। অনেকটা সংগ্রাম করেই পথ চলতে হচ্ছে বলে জানান তিনি। সাপের মধ্যে গোখরা, কালো গোখরা, পঙ্খীরাজ, শীষ নাগ, কাল নাগ-নাগিনী সহ ১৫-২০ প্রকারের সাপ আছে তাদের কাছে।

 



৬৫ বছর বয়সি মোহাম্মদ রজব আলী নামে সাপুড়িয়া সর্দার বললেন, ‘চৌদ্দ পুরুষ এই পেশার সঙ্গে জড়িত। ছোটবেলায় যখন থেকে বুঝতে শিখেছি তখন থেকেই সাপ নিয়ে খেলা শুরু। সেই সাপের খেলা এখনও চলছে। সাপের খেলা দেখে মানুষ আনন্দ পায় আর বিনিময়ে টাকা দেয়। এই টাকাতেই চলে সংসার।’ এ যুগেও সাপ খেলা দেখার প্রতি মানুষের আগ্রহ আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সাপ খেলার জনপ্রিয়তা এখনও কমেনি। ছোট থেকে বুড়ো সব বয়সের মানুষ সাপ খেলা দেখতে ভালোবাসে।’ সাপ খেলা দেখার পাশাপাশি অন্যের বাড়ি ঘরে বাস করা সাপ বের করে দেন তারা। এর বিনিময়ে টাকা পান। এভাবেই চলছে এই সম্প্রদায়ের মানুষের জীবন। মোহাম্মদ বিজয় নামে একজন সাপুড়ে বলেন, ‘খেলা দেখিয়ে ভালো আয় না হওয়ার কারণে এবারের ঈদ পুরোনো কাপড়েই অনেককে করতে হবে। আমাদের মধ্যে অনেকে শুধু ছেলেমেয়েকে কিনে দিয়েছে ঈদের পোশাক। আবার অনেকে সেটাও পারেনি। অনেক সময় আমাদের ভালো আয় হয় খেলা দেখিয়ে। মানুষ ভালো টাকা দেয়। কিন্তু এবার কপাল খারাপ।’



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৫ জুন ২০১৮/ফিরোজ/তারা

Walton Laptop
 
     
Walton