ঢাকা, সোমবার, ১১ চৈত্র ১৪২৫, ২৫ মার্চ ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

তীব্র শীতে জবুথবু উপকূল

রফিকুল ইসলাম মন্টু : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৯-০১-০৬ ১২:৩২:৪১ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০১-০৬ ৬:৫৩:২১ পিএম

রফিকুল ইসলাম মন্টু: ঢালচরের মোমেনা বেগমের ঝুপড়ি ঘরে উত্তরা বাতাসের শীতল প্রবাহ। চরমোন্তাজের নাসিমা বেগমের নিচু ঘরে মাথার ওপরে থাকা টিনের চালা দিয়ে ক্রমাগত ঝরে শিশিরের ফোঁটা। আবার কালাবগির আবদুল মজিদের ঘরের সবগুলো কাঁথা একত্রিত করেও শীত নিবারণ করতে পারছেন না। এভাবেই সমুদ্র তীরবর্তী উপকূল অঞ্চলের হাজারো মানুষ এবারের তীব্র শীতে কাতর।

এবারের শীত একটু বেশি বলেই মনে করেন ঢালচরের মোমেনা বেগম। দিন আনা দিন খাওয়া মানুষ। স্বামী নেই। থাকেন মেয়ের জামাইয়ের সঙ্গে। নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা মেটানোর পর শীত নিবারণের জন্য আলাদা করে প্রস্তুতি নেয়ার সুযোগ থাকে না মোমেনার। কান্না জড়ানো কণ্ঠে বলেন, কই পামু? আমাগো তো কিছুই নাই। জমাজমি সব ওই গাঙে লইয়া গ্যাছে। এখন থাকি মাইনসের বাড়ি। শীতের কাপড় আমারে কে দিবে? পুরানো ছেড়া একটা সোয়েটার ছিল, সেটা পরি। পাতলা কাঁথা গায়ে জড়িয়ে থাকি।

ডিসেম্বর আর জানুয়ারিতে উপকূল অঞ্চলজুড়ে বিরাজ করছে শীতের তীব্রতা। এরই মধ্যে একাধিকবার রয়ে গেছে মাঝারি ধরণের শৈত্যপ্রবাহ। দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বয়ে গেছে শৈত্যপ্রবাহ। কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাটে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমেছে ৫.২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। উপকূলীয় এলাকাগুলোর মধ্যে খুলনা বিভাগের কিছু এলাকা, সন্দ্বীপ, সীতাকুণ্ড ও ফেনীর ওপর দিয়ে মাঝারি (৮-৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস) থেকে মৃদু (৮-১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যায়। জানুয়ারিতেও উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় শীতের তীব্রতা অনেক বেশি বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন।

ঢালচরের আরেকজন নুরুদ্দিন মাঝি। খেটে খাওয়া জীবনে আর্থিক অবস্থা খুব একটা বদল করতে পারেননি। দৈনন্দিন অতি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে শীত কাপড়ের জন্য বিশেষ কোনো বাজেট রাখতে পারেন না। তাই নিজে এবং ছেলেমেয়েদের জন্য এবারের শীতে নতুন কোনো কাপড় নেই। কম্বল কিংবা লেপ জোগানোর সাধ্য হয়নি। পুরানো কাঁথা পেঁচিয়ে রাতে শীত নিবারণ করেন। নুরুদ্দিন বলেন, শহর থেকে ভালো শীত কাপড় কেনার সাধ্য আমাদের নাই। এলাকায় কম দামে কিছু পাওয়া গেলে সেগুলোই আমাদের ভরসা।
 


পটুয়াখালীর চরমোন্তাজের বেড়িবাঁধের তীরবর্তী এলাকায় বহু মানুষের সঙ্গে দেখা মেলে, যারা শীতকষ্ট লাঘবে প্রয়োজনীয় কাপড় সংগ্রহ করতে পারেন না। ভাঙনের কারণে নদীর মুখে থাকে নয়াপাড়ার বাসিন্দা নাসিমা বেগমের ঘর। ঠিক ঘর না বলে একে ঝুপড়ি বলাই ভালো। কিছু টিনের টুকরো, পলিথিন ইত্যাদি দিয়ে ছাওয়া হয়েছে। বেড়াও বেশ নড়বড়ে। ঘরের ভেতরে একটা চৌকি পাতা। এই তীব্র শীতের রাতে এখানেই থাকেন সবাই। রাতে যখন প্রবল শীতল বাতাস ঘরে ঢুকে কিংবা শিশিরের ফোঁটা পড়ে ঘরখানা আরও শীতল করে দেয়, তখন ঘরে থাকা মানুষগুলোর শীতকষ্ট আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

সুন্দরবন লাগোয়া পাঁচ নদীর মোহনার দ্বীপ গোলাখালী। সাতক্ষীরার শ্যামনগরের কালিঞ্চি গ্রামের ফিরোজা বেগমের খেয়া পার হয়ে গোলাখালীর লোকালয়ের দিকে এগোতেই কথা বলতে এগিয়ে এলেন মমিন আলী। অন্যান্য সমস্যার মাঝে শীত যেন তাদের কাছে একটু বাড়তি সংকট নিয়ে আসে। মমিন আলীর কথায় তার ইঙ্গিত পাই। তিনি বলেন, এই সময়ে আমাদের কাজের অভাব। কাজের অভাব মানে রোজগার কম। আর রোজগার কম মানে ধারদেনা করে চলা। এর ওপর শীতকষ্টের বাড়তি বোঝা। এই দ্বীপের প্রায় সকলেই দিন আনা দিন খাওয়া মানুষ। অতি প্রয়োজন ছাড়া বাড়তি খরচ করার সুযোগ এদের নেই। তিনি বলেন, নতুন শীতকাপড় কেনার কথা আমরা ভাবতেই পারি না। ঘরে থাকা পুরানোটা দিয়ে যতটা সম্ভব শীত নিবারণ করি। বেশি প্রয়োজন হলে পুরানো শীত কাপড়ের দোকানে যাই।

গোলখালীর আনছার মোল্লার স্ত্রী ছামিরন বললেন, শীত বাড়লে মনে কষ্ট বাড়ে। ছেলেপেলে নিয়ে কষ্ট করে কয়েকটা দিন কাটাই। ঘরের ফাঁকফোকর দিয়ে বাতাস ঢোকে। কষ্টের রাত অনেক লম্বা হয়। অপেক্ষায় থাকি কখন সকালের রোদ উঠবে। অতিরিক্ত শীতে ঘরে ঘরে রোগবালাই দেখা দেয়। কিন্তু আমাদের তো ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সাধ্য নাই। অসুখ হয়। এমনি এমনিই অসুখ সেরে যায়। আর না সারলে একটু বেশিদিন ভুগতে হয়। পাশের বাসিন্দা আফরোজা বেগম, মমিন আলী, মনসুর আলী, সোবাহান আলীসহ আরও কয়েকজন ছামিরনের কথায় সায় দেন।

একই অবস্থা দ্বীপ জেলা ভোলার মদনপুর, হাজীপুর কিংবা লক্ষ্মীপুরের রমণীমোহন এবং চর গজারিয়ার। দ্বীপের মানুষগুলো তীব্র শীতকষ্টে জবুথবু। মোটামুটি সচ্ছল মানুষেরা শীত নিবারণের জন্য প্রয়োজনীয় গরম কাপড় সংগ্রহ করতে পারলেও দরিদ্র মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই। মদনপুরের খালেক মাঝি কিংবা রহমান মাঝির মতো মানুষের ঘরে শীত আসে অনেক কষ্ট নিয়ে। এ দ্বীপের অবস্থাপন্ন ব্যক্তি লুৎফর রহমান পাটোয়ারী বলেন, এখানকার অধিকাংশ মানুষের ঘরে প্রয়োজনীয় শীতবস্ত্র নেই। সে কারণে তারা অনেক কষ্ট করে দিনাতিপাত করেন।
 


তিনি বলেন, শীত মৌসুমকে গ্রামে ‘রবি মৌসুম’ হিসাবে পরিচিত হলেও এ মৌসুমে সব মানুষের কাজ থাকে না। কারণ দ্বীপাঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ মাছধরার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ কারণে শুকনো মৌসুমে তাদের ঘরে অভাব বিরাজ করে। ফলে শীত নিবারণে তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে না। আবার বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে শীতবস্ত্র দেওয়া হলেও তা এই দ্বীপের মানুষের কাছে পৌঁছায় না। দ্বীপের প্রান্তিক মানুষেরা যাতে শীতবস্ত্র পায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

দ্বীপ মদনপুরের অধিকাংশ মানুষ নদী পার হয়ে চিকিৎসার জন্য যান ডাক্তার মহিউদ্দিনের চেম্বারে। শীতকালে এই মানুষেরা কী ধরণের রোগবালাইয়ের শিকার হয়- জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রথমত ঠান্ডাজনিত রোগবালাইয়ের বিষয়ে দ্বীপের মানুষের মাঝে সচেতনতা নেই। অন্যদিকে অনেকের ঘরে শীত নিবারণের প্রয়োজনীয় শীতবস্ত্র নেই। ফলে এই সময়ে জ্বর, সর্দি, নিউমোনিয়া ইত্যাদি রোগ বেড়ে যায়। শ্বাসকষ্টের রোগীরা এই সময় বেশি কষ্ট পায়। ওষুধ দেয়ার পাশাপাশি এদেরকে শীতকালীন স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়।

খুলনার পাইকগাছার সমাজকর্মী ও সাংবাদিক প্রকাশ ঘোষ বিধান বলেন, প্রান্তিকের মানুষেরা অন্যান্য নাগরিক সুবিধার বিভিন্ন সংগঠনের বিতরণকৃত শীতবস্ত্র থেকেও বঞ্চিত হয়। শীত সামনে রেখে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল পরিমাণ কম্বল বিতরণ করলেও সেগুলো উপকূলের প্রান্তিক জনপদের মানুষের কাছে খুব একটা আসে না। ওই তালিকায় এই এলাকার বিপন্ন মানুষদের অগ্রাধিকার থাকা উচিত। পাশাপাশি এলাকার স্বচ্ছল ব্যক্তিরা বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ালে সংকট অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব।

শীত আসে। প্রকৃতি ফিরে পায় ভিন্ন আবেশ। সন্ধ্যার পাতলা কুয়াশা ভোররাতে আরও গাঢ় হতে থাকে। গাছের পাতায় শিশির পতনের শব্দ শোনা যায়। কিছু মানুষের ঘুম আরও গভীর হয়। কিন্তু কিছু মানুষের ঘুম শেষ হয় আজানের শব্দে। বাকি রাতটুকু তারা জেগে রয় স্নিগ্ধ রোদেলা সকালের অপেক্ষায়। দীর্ঘ কষ্টের রাতটার চেয়েও রোদে পিঠ এলিয়ে দেয়া সকালটাই যেন তাদের কাছে অনেক বেশি আরামদায়ক।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/৬ জানুয়ারি ২০১৯/তারা

Walton Laptop
 
     
Walton AC