ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৪ মাঘ ১৪২৫, ১৭ জানুয়ারি ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

কেমন আছে শুঁটকি পল্লীর শিশুরা

মহিউদ্দিন অপু : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৯-০১-১২ ৯:২৭:৩২ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০১-১২ ৯:২৭:৩২ পিএম

মহিউদ্দিন অপু : কখনো ওরা চায়ের দোকানদার, কখনো জেলে। কখনো ওরা গাড়ির হেল্পার, নয়তো কৃষক। কখনো ওরা ফেরিওয়ালা কিংবা কঠোর পরিশ্রমী দিনমজুর। কারণ, দারিদ্রতার যাতাকলে নিষ্পেষিত ওদের জীবন।

দু’বেলা দু’মুঠো খাবারের সন্ধান করতে নিয়তি নোঙর ফেলেছে এমন নানা ধরনের হাড়ভাঙা কাজে। দুর্যোগ ঝুঁকি নিত্যসঙ্গী হওয়া এসব শিশুদের শৈশব থেকেই শুরু হয় বিবর্ণ কর্মজীবন। অধিকারের বার্তা ওদের কাছে অর্থহীন। শিশু সুরক্ষার কথাও জানা নেই। খেয়ে পরে বেঁচে থাকাই একমাত্র জীবনের মূল কথা। তাই শিক্ষার আলো এসব শিশুদের কাছে অমাবস্যার চাঁদ।

এমন চিত্র দেশের প্রান্তিক উপকূলীয় শিশুদের অন্তহীন দুর্দশার চিত্র। উপকূলের প্রান্তিক জনপদে দেখা যায় এমন হাজারো চিত্র। যেখানে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হতে দেখা যায়, উপকূলের বিভিন্ন চরে শুঁটকি উৎপাদনের কাজে নিয়োজিত শিশু শ্রমিকদের।

 



দেশের শুঁটকি পল্লীগুলোতে সাধারণত কর্মসংস্থানের সুযোগ হয় নারী-পুরুষসহ হাজারো মানুষের। নারী-পুরুষ ছাড়াও লক্ষ্য করা যায় এখানকার শুঁটকি পল্লীগুলোতে কর্মরত জনসংখ্যার অধিকাংশই শিশু শ্রমিক। যে বয়সে এসব শিশুদের থাকার কথা পড়ার টেবিল ও বিদ্যালয়ে। অথচ তারা এখন ব্যস্ত শুঁটকি উৎপাদনের কাজে।

শীত মৌসুমসহ বছরের অর্ধেকটা সময়ই সচল থাকে উপকূলের শুঁটকি পল্লীগুলো। এসময়টাতে অনেক শিশু বিদ্যালয়ে না গিয়ে শুঁটকি পল্লীগুলোতে বাবা মায়ের সঙ্গে শুঁটকি উৎপাদনের কাজে সহযোগিতা করতে আসে। কেউবা আবার আসে জীবনের প্রয়োজনে, জীবিকার তাগিদে। লেখাপড়া করার কোনো সুযোগ এদের নেই। নেই খেলাধুলা কিংবা গল্প করারও সসময়। শুধু ওরাই নয়, এখানকার সবাই খুব ব্যস্ত যে যার মতো নির্ধারিত নিজের কাজে। নদী-সমুদ্র থেকে জেলেদের নৌকাগুলো পল্লীর আশেপাশে চরে নোঙর ফেলতেই খড়কুটোর টংঘর থেকে সেদিকে দৌড়ে যায় এসব শিশুরা। এরপর চরের হাঁটু জলে নেমে নৌকা থেকে পল্লীতে নিয়ে আসে ঝাঁপিভর্তি ছোট বড় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। মাছগুলো চাটাইয়ের ওপর বিছিয়ে রোদে শুকিয়ে শুঁটকি উৎপাদনের জন্য আবর্জনা ও শুঁটকির মাছ বাছাই করতে হয়। এ কাজটিও সাধারণত পল্লীর নারী ও শিশুরাই বেশিরভাগ সময়ে করে থাকে। তাই চাটাইয়ে ঝাঁপি হতে মাছ ঢালতেই নারী ও শিশুরা লেগে যায় বাছাইয়ের কাজে। বাছাই শেষ হলেই শুরু হয় রোদে শুকানোর কাজ। তিন থেকে চারদিন মাছগুলো শুকানোর পর শুঁটকি হলে তা ওজন মেপে বস্তাভর্তি করা হয়। এরপর নৌ ও স্থল পথে দেশের বিভিন্ন স্থানে বাজারজাতকরণের জন্য পাঠানো হয় বস্তাভর্তি শুঁটকি। অনেকসময় এ কাজেও শিশুদের শ্রম লক্ষ্য করা যায়।

উপকূলীয় শুঁটকি পল্লীগুলোর মধ্য বরগুনা জেলার তালতলী উপজেলার আশার চর শুঁটকিপল্লী অন্যতম। শীতমৌসুম আসতেই (অক্টোবর-নভেম্বর মাস থেকে) ঝালকাঠি, সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ভোলা ও মংলাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে জেলেরা নৌকাসহ সপরিবারে এ চরে এসে খড়কুটোর টংঘর তৈরি করে শুঁটকি উৎপাদনে কর্মরত হয়। এ চরেই গড়ে তোলে তাদের মৌসুমী সংসার। এছাড়াও জেলার লালদিয়ার চর এলাকার চরেও বছরের ছয়মাস ধরে চলে শুঁটকি আহরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ। তাই শুঁটকিকে কেন্দ্র করে উপকূলীয় হাজার হাজার জেলে ও মৎস্যজীবীদের আনাগোনায় মুখরিত থাকে লালদিয়া চর ও আশার চর।

 



তালতলী উপজেলার আশার চরের মৌসুমী সংসার টংঘরের একজন বাসিন্দা, শিশু মারুফ। বয়স ১২ ছুঁইছুঁই। এই বয়সে তার বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও সে এখন জীবিকার তাগিদে কাজ করছে শুঁটকি পল্লীতে। বিদ্যালয়ে না গিয়ে শুঁটকি পল্লীতে কাজ করার কথা জিজ্ঞাস করতেই মারুফ বলে, ‘আর পাঁচটা পোলাপানের নাহান মোরও স্বপ্ন আছিল ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার। কিন্তু কপালে নাই। সংসার চালাইন্নার লইজ্ঞা এই কাম হয়রে ওয়। বাপে রোগে পরছে, এই কাম হইররাই বাপের ওষুধ কেনার টাহা যোগাই।’ দুঃখ লুকিয়ে হাসতে হাসতে মারুফ আরো বলে, '‘লেহাপড়া হরলে টাহা দেবে কেডা? খাওয়াইবেই বা কেডা? বাপের ওষুধ কেনার টাহা আর সংসার চালাইন্না টাহা কেউ দেলে এই কাম ছাইড়া দিয়া লেহাপড়া শুরু হরতাম।’

শুধু মারুফই নন। এই চরের মতি, সবুজ, রুবেল, হাসানসহ প্রায় অর্ধশতাধিক শিশু শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। অনেক শিশুরা বাবা-মায়ের সঙ্গে বেশকয়েক বছর ধরে এখানে আসতে আসতে এখন হয়ে গেছে পরিপূর্ণ দক্ষ শ্রমিক। জানা যায়, স্থানীয় শিশুদের প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ টাকা করে দেওয়া হয়। আর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা শিশুদের সঙ্গে করা হয় মৌসুমী চুক্তি। অল্প টাকায় বেশি কাজ করানো যায় বলে, অনেক জেলে ও শ্রমিক নিজ এলাকা থেকে এমন শিশুদের নিয়ে আসেন উপকূলীয় এসব শুঁটকির চরে।

এমনই একজন সবুজ। বয়স ১০ বছর। সবুজ এসেছে ভোলা থেকে। তিন বছরের অধিক সময় ধরে এ চরে কাজ করছে সে। তার সঙ্গে নতুন করে এবছর যুক্ত হয়েছে মতি, রুবেল ও হাসান। সবুজ বলে, ‘স্থানীয় দূর সম্পর্কের এক চাচার সঙ্গে প্রথম এই চরে আইছিলাম। পেটেভাতে কাজ করতাম তখন। এরপর কয়েকবার হাত বদল হইয়া এখন এই চরে কাম করি। যদিও হের লগে চুক্তি হইছে। এরপর কার লগে কাম করমু তা কইতে পারি না। আর পড়ালেখা করার কথা যখন ছিল তখন তো টাকা পয়সার পিছনে দৌড়াইছি। তাই পড়ালেখা নিয়া এখান আর ভাবিনা।’

 



দশ বছরের বেশি সময় ধরে শুটকি উৎপাদনের কাজে নিয়োজিত আশার চরের বাসিন্দা শুঁটকি পল্লীর শ্রমিক নেতা ও উৎপাদিত শুঁটকির পাইকার শাহ আলম আকন। তিনি বলেন, ‘এখানে কোনো নারী-শিশুকে জোর করে আনা হয় না। পরিবারে আর্থিক অস্বচ্ছলতা থাকায় তারা নিজেদের ইচ্ছায়ই চরে আসে কাজ করতে। কাজ করে বিনিময়ে অর্থ নেয়, খাওন নেয়। চরে যদি এসব শিশুরা আর না আসে আমাদের কোনো আপত্তি নাই, আমরা অন্য লোকজন দিয়ে আমাদের কাজ করাবো।’

বছরের অর্ধেক সময় আশার চর, লালদিয়ার চরসহ উপকূলীয় বিভিন্ন চরে এমন অস্থায়ী বসতি গড়ে তোলেন কয়েকশত জেলে পরিবার। তাই এসব চর এলাকায় শিশুদের জন্য স্যাটেলাইট বিদ্যালয় স্থাপন করা জরুরি বলে সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তারা বলছেন, এসব চর এলাকায় শিশুদের জন্য স্যাটেলাইট বিদ্যালয় স্থাপন করা হলে এখানকার শিশুরা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত না হয়ে শিক্ষার আলোয় আলোকিত হবে।

তালতলী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান মিন্টু বলেন, ‘শুঁটকি শিল্পের বিকাশে জন্য সাগর উপকূলের এসব শুঁটকি পল্লীগুলোতে মানবিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিসহ সুপেয় খাবার পানির জন্য গভীর নলকূপ স্থাপন, রোগজীবাণু থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মলমূত্র ত্যাগের জন্য পাকা ল্যাট্রিন তৈরি ও শিশুদের শিক্ষার জন্য স্যাটেলাইট বিদ্যালয় স্থাপনে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত পদক্ষেপ নেবেন বলেই আমাদের প্রত্যাশা।’



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১২ জানুয়ারি ২০১৯/ফিরোজ

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC