ঢাকা, বুধবার, ৬ আষাঢ় ১৪২৬, ১৯ জুন ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

‘জলহস্তির মতো বাঁচি!’

রফিকুল ইসলাম মন্টু : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০১-১৪ ৪:০৯:০৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০১-১৪ ৪:০৯:০৫ পিএম
Walton AC 10% Discount

রফিকুল ইসলাম মন্টু : নদীর তীর ধরে সরু কাঁচা সড়ক। এঁকেবেঁকে চলে গেছে কালাবগির শেষ প্রান্তে। এপাড়ে কালাবগি গ্রাম, ওপাড়ে সুন্দরবন। মাঝখানে বয়ে গেছে ভয়াল নদী শিবসা। খুঁটির ওপরে মাচা পেতে বানানো হয়েছে ঘর। জোয়ারের পানি ছুঁয়ে যায় ঘরের সেই মাচা। যতদূর হাঁটছি, ঘরের চেহারা একই রকম। ঘরের বৈশিষ্ট্যের কারণে এপাড়ার নাম হয়েছে ঝুলন্ত পাড়া। কালাবগির মূল ভূখণ্ডের মানুষজনের জীবনধারা থেকে এদের জীবনধারায় বেশ পার্থক্য। এই ব্যতিক্রমী জীবনধারার ব্যাখ্যা দিলেন ঝুলন্ত পাড়ার শেষপ্রান্তে কালাবগি ফকির কোনার বাসিন্দা ছকিনা বেগম। বললেন, ‘আমরা জলহস্তির মতো বাস করি।’

কীভাবে- প্রশ্ন করি। জবাবে ছকিনা বলেন, ‘ঝড়ের সময় বাড়িঘর পানিতে ডুবে যায়। জোয়ারের সময় পানি ওঠে ঘরে। সিগন্যাল পড়লে আল্লারে ডাকি। শুকনো সময় বাইরে রান্না করি, বর্ষায় ঘরের বাইরে বের হওয়ার সুযোগ নাই। শীতকালে বাঘের ভয়। গরম কালে সাপের ভয়। দস্যু আর কুমিরের ভয় তো বছরের সব সময়। এখন বুঝতে পারছেন- আমরা কীভাবে বেঁচে আছি?’

শীত সকালে নীরব-নিস্তব্ধ কালাবগি। ভাটার টানে শিবসার তীর শুকিয়ে আছে। তীরের কাদাপানিতে আটকে আছে দু’চারটি নৌকা। কাঁচা সড়কের দু’ধারে ছড়ানো ছিটানো বাড়িঘর। মাঝে মাঝে দু’একটা দোকানপাট। শিবসা তীরের পশ্চিম পাড়া বলে পরিচিত জায়গাটিতে দাঁড়িয়ে দক্ষিণ-পূর্বে তাকালে চোখে পড়ে আরও অনেকগুলো ঝুলন্ত ঘর। একটির সঙ্গে আরেকটি ঘর লাগানো। মূল রাস্তা থেকে পাড়ার দিকে রাস্তা থাকলেও তা চলাচলের অনুপযোগী। কবে যে এ রাস্তা নির্মিত হয়েছে, তা জানেন না এলাকার মানুষও। জীবনের সবকিছু হারিয়ে এই মানুষগুলোর এখন ঠাঁই হয়েছে ঝুলন্ত বাড়িতে।



কালাবগি পশ্চিম পাড়ার রুহুল আমীন কেবল দোকান খুলেছেন। নিজের জমিজমা থাকলেও এখন তা শিবসাগর্ভে। যে বাঁধের পাশে রুহুল আমীনের দোকান, সেটি চতুর্থ বাঁধ। এর আগে আরও তিনটি বাঁধ গিলে খেয়েছে শিবসা। নদীর তীরে দাঁড়িয়ে তর্জনী তুলে শিবসায় প্রথম বেড়িবাঁধের স্থানটি বোঝানোর চেষ্টা করলেন কালাবগির আরেক বাসিন্দা মনিরুজ্জামান। সে অনেক দূরে প্রায় সুন্দরবনের কাছাকাছি। এপাড় থেকে সুন্দরবন বেশ স্পষ্ট দেখা যায়। বাসিন্দারা জানালেন, নদী নাকি অনেক ছোট ছিল। আর এই নদীতেই ছিল তাদের জীবিকা। এখানকার অধিকাংশ মানুষ শিবসা নদীতে চিংড়ির পোনা ধরে জীবিকা নির্বাহ করলেও সেদিন ফুরিয়েছে। চিংড়ির পোনা ধরায় নিষেধাজ্ঞা, পাশাপাশি সুন্দরবনের কাজেও রয়েছে নানামূখী সমস্যা।

একদিকে নদী ভাঙ্গনের কারণে সহায় সম্পদ হারানো, অন্যদিকে জীবিকার পথ সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় এখানকার মানুষের সংকট বেড়ে যায়। কালাবগি এসে প্রথম যার সঙ্গে কথা বলি, সেই রুহুল আমীন বাড়ি বদল করেছেন ৯বার। মনিরুজ্জামান বাড়ি বদল করেছেন দু’বার। আর মনিরুল সানা জানালেন তিনি বাড়ি বদল করেছেন ১২ বার। ভাঙন এদের জীবন বদলে দিয়েছে। অন্যদের মতো এখানকার মানুষেরাও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতেন। সময়ের বদলে এখন তাদের বসবাস ঝুলন্ত ঘরে। কথাগুলো বলতে গিয়ে ক্ষোভ ঝরে বাসিন্দাদের কণ্ঠে। তারা বলেন, ‘ভোটের আগে বলে সব করে দেব। ভোটের পরে আর ফস করে না।’

খুলনার দাকোপের সুতারখালী ইউনিয়নের আওতাধীন এই কালাবগি। ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। সে সময় থেকে বহুবার সুতারখালী ইউনিয়নের নাম সংবাদ মাধ্যমে এসেছে। তবে উন্নয়ন সে তুলনায় হয়নি। আইলার পরে যে বেড়িবাঁধ নির্মিত হয়েছিল, সেটিও ভাঙনের মুখে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে সুতারখালী ইউনিয়নের চারিদিকে নতুন বাঁধ হচ্ছে। কিন্তু সে বাঁধের বাইরে থাকছে কালাবগির অন্তত ৫শ পরিবার। নদীর তীরে ভাঙন বলে অনেক দূর দিয়ে বেড়িবাঁধ নির্মিত হচ্ছে। কিন্তু এ বিষয়ে ভাঙনতীরের মানুষের ব্যাখ্যা ভিন্ন। তারা বলেন, নদীর ভাঙন রোধ না করে যত শক্ত করেই বাঁধ দেওয়া হোক না কেন, তা টিকবে না। জনপদ নিরাপদ করতে হলে ভাঙন রোধের দিকেই আগে নজর দিতে হবে।              



বাসিন্দারা জানালেন, ঘূর্ণিঝড় আইলার পর এখানকার মানুষের জীবনধারা বদলাতে শুরু করে। আইলার প্রবল জলোচ্ছ্বাসের প্রভাবে বাড়িঘর ভেসে যায়। শেষ অবধি কারও কোনো ভিটে অবশিষ্ট ছিল না। আবার জীবিকার তাগিদে এলাকাও ছাড়তে পারছে না মানুষগুলো। সে কারণে আইলায় যতখানি পানি উঠেছিল, ততখানি উঁচু মাচা পেতে ঘর বানানো হয়েছে। সেই ঘরেই বসবাস করছেন কালাবগির ঝুলন্ত পাড়ার মানুষ। আইলার মতো বড় জলোচ্ছ্বাস আর আসেনি, তবে জোয়ারের পানিও ঘরের পাটাতন প্রায় ছুঁয়ে যায়। কালাবগির ঝুলন্ত পাড়ার পথ ধরে হাঁটলে মনে হবে এটা বাংলাদেশের বাইরের কোন জনপদ। নাগরিক সেবার ছিটেফোঁটা হয়তো এদের কাছে পৌঁছায়। রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে জীবনের অন্যান্য প্রয়োজনগুলো এদের সাধ্যের বাইরে। অথচ বাঁধের ভেতরের অংশে নিজের ঘরে বসে মনিরুজ্জামান বলছিলেন, কালাবগিকে একসময় ‘বাংলার কুয়েত’ বলা হতো। চিংড়ির পোনা ধরে এ এলাকার মানুষ বেশ ভালো ছিল। দাকোপের ব্যাংকগুলোতে যেত এখানকার পোনা ব্যবসায়ীদের টাকা। প্রতিদিন এত টাকা জমা হতে দেখে ব্যাংকের লোকজনও অবাক হয়ে যেতো।

মনিরুজ্জামান জানান, সে সময় ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সকলের হাতেই বেশ টাকা ছিল। অনেকে এলাকায় জমি কিনেছেন। অনেকে আবার খুলনা কিংবা দাকোপা শহরেও জমি কিনে বাড়ি করেছেন। এলাকার অনেকের জমি নদীতে হারিয়ে গেছে। অনেক মানুষ আবার এখানকার ব্যবসা গুটিয়ে পাড়ি জমিয়েছেন শহরে। শুধু মাছ কিংবা মাছের পোনার ব্যবসা নয়, এলাকায় কৃষি আবাদ করেও মানুষজন বেশ সচ্ছল জীবন কাটাতো। এখন আর সে দিন নেই। কালাবগিতে ব্যবসা নেই, এখন আর বাইরের মানুষ ফিরেও তাকায় না। এমনকি এই জনপদের উন্নয়নেও সরকারি-বেসরকারি তৎপরতা আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে।      

 

এলাকায় কর্মরত খুলনাভিত্তিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা রূপান্তর-এর নির্বাহী পরিচালক রফিকুল ইসলাম খোকন বলেন, ঘূর্ণিঝড় আইলার পর এলাকাটি বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ভাঙনে স্থানীয় বাসিন্দারা জমি হারিয়েছে। ফলে তাদের দুর্ভোগ আরও অনেকখানি বেড়ে গেছে। এদের সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ গ্রহণেও সমস্যা দেখা দিয়েছে। কারণ অবকাঠামোগত উন্নয়নে কাজ করতে হলে জমি প্রয়োজন। ওই এলাকায় এমন কোনো জমিও নেই। ফলে উন্নয়ন ঘটাতে হলে এদের অন্যত্র সরিয়ে আনার পদক্ষেপ নিতে হবে। এরপর এদের কী ধরণের সুবিধা নিশ্চিত করা যায়, সেটা দেখতে হবে।  কালাবগির দক্ষিণপ্রান্তে ফকির কোনা এলাকার বাসিন্দা ছকিনা বেগমের কথার সঙ্গে বাস্তবের খুব মিল। গাদাগাদি করে বানানো ঘর। একই ঘরে অনেক জনের বসবাস। সারা বছরই এক ধরণের কষ্ট। যে পানিতে কুমিরের ভয়, তারই পাশের ডাঙ্গায় বাস করে একদল বিপন্ন মানুষ- যাদের বেঁচে থাকার বিকল্প আর কোনো পথ নেই।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৪ জানুয়ারি ২০১৯/তারা 

Walton AC
     
Walton AC
Marcel Fridge