ঢাকা, শুক্রবার, ৮ চৈত্র ১৪২৫, ২২ মার্চ ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

উচ্ছ্বাসের সিংহাসনে তারা সবাই রাজা

মির্জা তারেক : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৩-০৪ ৮:০২:১২ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৩-০৪ ৮:০২:১২ পিএম

মির্জা তারেক: দিনটি ছিল বাঁধভাঙ্গা উচ্ছ্বাসের। তৈরি করা হলো ‘যেমন খুশি তেমন উপভোগ করো’ সিংহাসন। তাতে তারাই রাজা, তারাই প্রজা।

দিনব্যাপী আনন্দ উদযাপনের এই মহারথীরা সবাই শিশু, কোমলমতি আগামীর ভবিষ্যৎ।

এই শিশুরা ‘বিশেষ শিশু’। সমাজের স্বাভাবিক আর দশটা শিশুদের মতো নয়। কিন্তু এই শিশুরাই নাচ, গান, অভিনয়, আবৃত্তি পরিবেশন করে জানিয়ে দিল, সুযোগ পেলে তারাও পারে বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ঘটাতে।

‘কিনে দে কিনে দে রে তুই রেশমি চুড়ি, নইলে করবো তোর সাথে আড়ি।’ ঝকমারি পোশাকে গানের সাথে নাচ পরিবেশন করছিল একদল ছেলে-মেয়ে। মঞ্চের পাশেই হারমোনিয়াম, তবলা বাজিয়ে তাদের উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছিলেন শিক্ষকেরা। আর পরিবেশনা শেষে দর্শক সারিতে বসা মা/বাবাদের কাছ থেকে যখন স্বতস্ফূর্ত হাততালি আসছিল, শিশুদের চোখে-মুখে তখন সলজ্জ হাসি।

রাজধানীর উত্তরা মডেল টাউনের অধীন দিয়াবাড়ির আরপি সিটির সবুজ চত্বরে গত শনিবার বসেছিল বিশেষ শিশুদের বার্ষিক আনন্দমেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বনভোজন। সুইড বাংলাদেশ পরিচালিত ঢাকাসহ দেশের ১৯টি স্কুলের প্রায় দুই হাজার বিশেষ শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকেরা এ অনুষ্ঠানে অংশ নেন। এর আয়োজন করে আহমেদ আবদুর রহমান ট্রাস্ট।

মঞ্চে যখন এই শিশুরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করছিল, দর্শক সারিতে বসা অনেক মায়ের চোখে তখন আনন্দাশ্রু। কারণ একজন বিশেষ শিশুর মা-ই জানেন প্রতিটি দিন কতটা ত্যাগ স্বীকার করতে হয় তাকে এবং সন্তানকে।



শিমুল, রক্তজবা, মাধবীলতার সৌরভ ছড়ানো আরপি সেন্টারের একপাশে বানানো হয়েছিল মঞ্চ। সকাল ১১টায় অনুষ্ঠান শুরুর আগেই শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের উপস্থিতিতে পূর্ণ হয়ে যায় অনুষ্ঠানকেন্দ্র।

জাতীয় সংগীত দিয়ে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে ছিল আলোচনা। এরপরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

সুইড বাংলাদেশের ধানমন্ডি শাখার প্রধান মাহবুবুর মুনীরের প্রানবন্ত সঞ্চালনায় অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বক্তব্য দেন আহমেদ আবদুর রহমান ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট সমাজসেবী ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া। কথা বললেন তার স্ত্রী, চিকিৎসক তাজকেরা খানমও। তাদের কথায় ফিরে ফিরে আসে তাদের সন্তান আহমেদ আবদুর রহমানের কথা, যিনি একজন বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। এই সন্তানের কারণেই তাদের এই ট্রাস্ট গঠন এবং এরপর সুইড বাংলাদেশের সঙ্গে একসাথে পথচলা। সর্বোপরি এই শিশুদের পাশে দাঁড়ানো।

ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া বলছিলেন, ২০০৬ সাল থেকে তারা এ ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজন করে আসছেন। এসব শিক্ষার্থীর উন্নয়নে অতীতে যেমন ভূমিকা রেখেছেন, ভবিষ্যতেও একই ভূমিকা রাখতে সচেষ্ট থাকবেন। তিনি অনুষ্ঠানে বিশেষ শিশুদের ব্যবহারের জন্য একটি গাড়ি হস্তান্তর করেন।

আর অভিভাবকদের প্রতি বিশেষ শিশুদের আনন্দে রাখার আহবান জানিয়ে বক্তৃতা দিলেন তাজকেরা খানম।

এই অনুষ্ঠান আয়োজন ও বিশেষ শিশুদের নিয়ে কাজের পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বললেন সুইড বাংলাদেশের মহাসচিব জওয়াহেরুল ইসলাম ও সুইডের সাংস্কৃতিক সম্পাদক ইমেলদা হোসেন।



সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করে সুইড বাংলাদেশের ইস্কাটন, ধানমন্ডি, সেতাবগঞ্জ, মানিকগঞ্জ ও মৌলভীবাজার শাখার ছেলে-মেয়েরা।

‘সবুজের বুকে লাল সে তো উড়বেই চিরকাল’ গানের সাথে মানিকগঞ্জ শাখার রুহুলের এক পায়ের নাচ ছিল বিশেষ আকর্ষণীয়। আর আদিবাসীদের বিয়ের গান ‘বারে বারে ওই রাম তেরে নজর চলে যায়’ পরিবেশন করে মৌলভীবাজার শাখার ছেলে-মেয়েরা। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, এই শিশুরা মৌলভীবাজারে স্বাভাবিক শিশুদের নাচ-গানের প্রতিযোগিতায় হারিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে এই শিশুদের কস্টিউম ছিল দেখার মতো। ঘাস ফড়িং বিকাশ কেন্দ্রের ছেলে-মেয়েরা গাইলো-‘আমরা করবো জয়’। সুইড ইস্কাটনের সুইড মডেল ল্যাবরেটরি স্কুলের ছেলে-মেয়েদের ছিল ‘সাধের লাউ বানাইলো মোরে বৈরাগী’সহ একাধিক পরিবেশনা।

মঞ্চে শিশুদের পরিবেশনা দেখে অনেক মায়ের চোখে-মুখে দেখা যায় খুশির ঝিলিক। এরকমই একজন মা শারমিন সুলতানা। ছেলে শায়ানকে নিয়ে এসেছিলেন তিনি। শায়ান নিজ থেকে কিছু বলতে পারে না। তবে বলে দিলে পারে। তার ছেলে কোনো পরিবেশনা করেনি। কিন্তু তার ভাষায়, এখানে যেসব ছেলে-মেয়েরা পরিবেশন করেছে, আর যারা করেনি, সব মায়েদেরই অনুভূতিটা প্রায় একই রকম।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল। ছেলে-মেয়েদের উচ্ছ্বাস তবু থামে না। আগামী বছর আবার এরকম অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দিয়ে ভাঙল মিলনমেলা।

প্রসঙ্গত, ২০০৬ সাল থেকে এখানে এ ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজন করে আসছে আহমেদ আবদুর রহমান ট্রাস্ট। পরবর্তী মিলনমেলা অনুষ্ঠিত হবে ২০২০ সালে এমনই এক আনন্দ উদ্যানে।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/৪ মার্চ ২০১৯/হাসান/সাইফ

Walton Laptop
 
     
Walton AC