ঢাকা, শুক্রবার, ৬ আশ্বিন ১৪২৫, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

লুকাকু রণক্লান্ত মায়াবী এক ফুটবলার

জাফর সোহেল : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৭-১১ ৩:৪৮:৩৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৭-১১ ৬:৫৭:১৪ পিএম
রোমেলু লুকাকু

জাফর সোহেল : ছোটবেলা আমাদের মধ্যে কিছু ব্যাপার ঘটত। খেলতে গেলে কার সঙ্গে খেলব, কার সঙ্গে খেলব না- এমন হিসাব করতে হতো অনেক সময়। যেমন, গ্রুপের মধ্যে যে সবচেয়ে ভালো তাকে সবাই নিতে চাইত, আর যে ভালো না তাকে কেউ নিতে চাইত না। আবার এমনও হতো, যে একটু বেশি ভালো খেলে তাকে খেলাতেই নিতে চাইত না অনেকে। কারণ তার সঙ্গে কেউ পেরে উঠবে না! আশ্চর্য এই যুক্তিতে তুখোড় খেলায়াড়কেও অনেক সময় খেলার বাইরে থাকতে হতো- কী যন্ত্রণা!

এবারের বিশ্বকাপে ছেলেবেলার সেই ‘না খেলতে দেয়া’র তত্ত্ব স্মরণ করিয় দিলেন একজন। তিনি ইংরেজ ডিফেন্ডার, তবে সাবেক। ফার্দিনান্দ নামে ইংল্যান্ড জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার এই ভদ্রলোক গত রোববার একটি মন্তব্য করেছেন গণমাধ্যমে। তাঁর সেই মন্তব্যে সবারই ভ্রু কুঁচকে যাওয়া অবস্থা - ‘বলে কী ভদ্রলোক!’ তা এই ফার্দিনান্দ সাহেব কী বলেছেন? তিনি বলেছেন, রোমেলু লুকাকু নামে যে ফুটবলার বেলজিয়াম দলের হয়ে এই বিশ্বকাপে খেলছেন তাঁকে খেলতে দেয়াই উচিত না! কারণ, তিনি বেশি ভালো খেলছেন, এত ভালো যে অন্যদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে গেছেন তিনি। অতএব তাঁকে খেলতে দেয়া যাবে না!

নিছক মজা করার জন্য এটা বললেও বাস্তবে মাঠের লড়াইয়ে লুকাকুর সঙ্গে পেরে উঠছেন খুব কম ফুটবলারই। রাশিয়া বিশ্বকাপ এবার ফুটবল অনুরাগীদের দিয়েছে মনে রাখার মতো একটি নাম- রোমেলু লুকাকু। ফার্দিনান্দের মতে, যার সাথে কেউ পারে না! সত্যি সত্যিই লুকাকু নামের কালো মাণিক যেন অপরাজেয় এক যোদ্ধা। এ যোদ্ধা ট্রয় কিংবা গ্লাডিয়েটরস মুভির নায়কদের মতো ইতিহাস আর রুপালি পর্দার যোদ্ধা নয়, বাস্তব পৃথিবীর মাটি ও মানুষের যোদ্ধা। তার যুদ্ধক্ষেত্র এখন সবুজ মাঠ। যদিও এই মাঠের সবুজ ঘাসের মতো এতটা মসৃণ মোটেই ছিল না তার জীবনের যুদ্ধ। জীবন বলতে তো আর মানুষের শক্ত-সমর্থ যৌবনকেই বোঝায় না, যৌবনে আসার আগে শৈশব কৈশোরের অনেক অধ্যায় আছে জীবনের। লুকাকুর জীবনের সেইসব অধ্যায়ের পরতে পরতে আছে যুদ্ধের ছবি। বেঁচে থাকার যুদ্ধ, বড় হওয়ার যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে বেশির ভাগ সময় সঙ্গ দিয়েছেন তার মা। অন্যত্র রান্নার কাজ করে মা তার যোগাতেন অন্ন। কখনো কখনো প্রতিদিনের খাবার তাদের জুটত না। কখনো মা ধার করে অন্যের কাছ থেকে চেয়ে তাদের খাওয়াতেন। এবারের বিশ্বকাপ লুকাকুর জীবনের এসব গল্প তুলে আনছে মানুষের কাছে। গল্পে আছে, লুকাকুর মা লুকিয়ে লুকিয়ে দুধে পানি মিশিয়ে তাদের কীভাবে ভোলাতেন সেই কথাও!

কী করে তবে মিলিয়নিয়ার তারকা হলেন অভাবী লুকাকু? সেখানেও আছে আরেক যুদ্ধের গল্প। আছে অনেক সহযোদ্ধা ও ত্রাতার গল্পও। সহযোদ্ধার নাম রজার লুকাকু। পরিচয়ে তিনি রোমেলু লুকাকুর বাবা। অর্থাৎ সিনিয়র লুকাকু। বেলজিয়ামের এনটেয়ার্পে জন্ম নিলেও লুকাকু আসলে আফ্রিকান। বাবা কঙ্গোর আর মা আলজেরীয়। দারিদ্র্যের কষাঘাতে লুকাকুদের জর্জরিত হওয়ার পেছনে আছে কিছুটা উদাসীন বাবার অবেহলা। আবার সেই বাবাই লুকাকুকে ধরিয়ে দেন স্বপ্নের সিঁড়ি। আন্ডারলেখট নামে বেলজিয়ামে একটি ফুটবল ক্লাব আছে। তাদের কিশোর ফুটবলারদের একাডেমিও আছে। সিনিয়র লুকাকু সেই আন্ডারলেখটের ঠিকানায় পৌঁছে দেন ছেলে রোমেলু লুকাকুকে। সেটি ২০০২ সালের গল্প। অনেকে জানলে আশ্চর্য হবেন এবারের বিশ্বাকাপের বেলজিয়াম দলের একটা বড় অংশই এসেছেন সেই আন্ডারলেখটের সবক নিয়ে। লুকাকুর জন্য তার বাবা রজার লুকাকু সত্যিকারের সহযোদ্ধা হয়েই কাজ করছিলেন। তিনি জানতেন বড় ফুটবলার হতে হলে ছেলেকে কী করতে হবে।

২০০৬ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়স থেকে লুকাকু শুরু করেন পেশাদার ফুটবল খেলা। বেলজিয়ামের বিভিন্ন যুব লীগে খেলে তিনি নজর কাড়েন। ১৬ বছর বয়সে ২০০৯ সালে তিনি প্রিমিয়ার লীগ খেলা শুরু করেন! তখনো তিনি স্কুলেই পড়তেন। ফুটবলের রাজা কালো মাণিক পেলেকেই কেবল আমরা দেখি ১৭ বছর বয়সে সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলতে এবং বিশ্বকাপ জিততে। বেলজিয়ামের লুকাকু যে আরেক কালো মাণিক হয়ে ১৬ বছর বয়স থেকেই ফুটবল মাঠ কাঁপাচ্ছেন আমরা কয়জন সেকথা জানি? রাশিয়া বিশ্বকাপ আমাদের তা জানার সুযোগ করে দিয়েছে। নচেৎ এই লুকাকু তো এরই মধ্যে অনেক পথ পাড়ি দিয়েছেন, বেলজিয়ামের হয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতাও এরই মধ্যে এই ক্ষ্যাপাটে তরুণ। ম্যানচেষ্টার ইউনাইটেডের হয়েও গোলের বন্যা বইয়েছেন। কই ফুটবল দুনিয়া তো তাকে নিয়ে মাতামাতি করেনি! সত্যি বলতে, মেসি রোনালদোর যুগে যেন প্রদীপের নিচেই পড়ে গিয়েছিলেন লুকাকু! এমন রত্ন অবশেষে ছায়া মাড়াতে পেরেছেন। আমরা তাঁকে মুগ্ধ নয়নে দেখার সুযোগ পেয়েছি। মার্ক্স-লেনিন-পুতিনের রাশিয়াকে আর যাই হোক এই কৃতিত্ব দিতেই হবে। তারা বিশ্বকে লুকাকুকে চিনিয়েছে। 

কোন লুকাকু? যে দু্ই বেলা খেতে পারত না, যার ঘরে ইঁদুর ঘুরে বেড়াত, যে খাটের অভাবে ঘরের মেঝেতে ঘুমাত, যার দাদু মরে গিয়েছিল এই কষ্টে যে, তার মেয়ের (লুকাকুর মায়ের) কষ্টের সীমা ছিল না; সেই লুকাকু যাকে ছোট বেলা থেকেই কটাক্ষ করত পাড়ার লোকেরা- গায়ের রঙের কারণে, চেহারায় দারিদ্র্যের ছাপের কারণে; সেই লুকাকু যে টিভির অভাবে খেলা দেখতে পারত না কিন্তু বন্ধুদের বলে বেড়াত ‘হ্যাঁ আমি দেখেছি, দারুণ ভলি করেছে জিদান’! সেই লুকাকু যাকে দিনের পর দিন অযত্ন করেছে অভিজাত ক্লাব মালিকেরা, ধারে বিক্রি করে দিয়েছে ছোট ক্লাবে।

শুরুতে বলেছিলাম, লুকাকু এক যোদ্ধার নাম। বাস্তবিক অর্থে লুকাকু সবসময় যুদ্ধেই থাকেন। তিনি বলেন, ‘আমার জন্য প্রতিটি ম্যাচই ফাইনাল ম্যাচ’! ফুটবলে বয়স ২৫ মানে মধ্যবয়সীদের কাতারে চলে যাওয়া। কিন্তু লুকাকু যেন উল্টো পথে হাঁটছেন। তিনি দিনে দিনে আরও তরুণ হচ্ছেন। যত দিন যাচ্ছে তত শাণিত আর ধারালো হচ্ছেন তিনি। ফ্রান্সের সাবেক স্ট্রাইকার থিয়েরি অঁরি এখন লুকাকুর গুরু। একসময় লুকাকু চাইতেন তাঁর মতো হতে। এখন অঁরি চান লুকাকু যেন তাঁকেই ছাড়িয়ে যান। এতেই যে তাঁর কোচ হিসেবে সাফল্য। কাকতালীয়ভাবে সেমিফাইনাল ম্যাচে লুকাকু খেলেছেন অঁরির নিজ দেশ ফ্রান্সের বিপক্ষে! সত্যি বলতে এই দিনটি লুকাকুর ছিল না। গতি দিয়ে তিনি জ্বলে উঠতে পারেননি। বরং এই ম্যাচে তাকে ক্লান্ত মনে হয়েছে। ফলে দলও হেরেছে। কিন্তু তাতে কী? এরই মধ্যে লুকাকু জাত চিনিয়েছেন। দিয়েছেন অবহেলার জবাব, কটাক্ষের জবাব, দুর্ভাগ্যের জবাব। তাই দেখে হয়তো ওপারে বসে মিটিমিটি হাসছেন তাঁর স্বর্গীয় দাদু।

কোয়ার্টার ফাইনালে লুকাকু গোল করতে পারেননি, কিন্তু ডি ব্রুইনার যে গোল সত্যিকার অর্থে ব্রাজিলকে ছিটকে দিয়েছিল ম্যাচ থেকে সেই গোলের ক্যারিশমাটিক পাসটা দিয়েছিলেন তিনিই। এবং এতটা ক্ষিপ্রতা তখন তাঁর পায়ে ছিল যে, ব্রাজিলের গোটা দলটাই যদি সামনে আসত, মনে হয় না আটকাতে পারত। বল নিয়ে উসাইন বোল্টের গতিতে দৌড় দিলেন তিনি- এটাই তার বৈশিষ্ট্য। তিনি গতির তোড়ে ছিন্নভিন্ন করে দেন প্রতিপক্ষের ডিফেন্স। পায়ে বল গেলেই মুহূর্তের মধ্যে তিনি যা করেন, এই মুহূর্তের পৃথিবীতে তা আর কেউ করতে পারে না। লুকাকু এই জায়গায় অনন্য, অসাধারণ। রাশিয়া বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচ লুকাকুর খেলা হলো না সত্যি তাই বলে ফুটবলপ্রেমীরা তাঁকে ভুলে যাবেন না। তাঁর সেই বিখ্যাত গতির মতোই, চকিতে তিনি ভেসে উঠবেন মানুষের মনের পর্দায়। তাঁকে ভুলে যেতে দেবেন না তিনি।

 

 

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১১ জুলাই ২০১৮/তারা   

Walton Laptop
 
     
Walton