ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩১ আষাঢ় ১৪২৬, ১৬ জুলাই ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

বৈশাখে শাড়ি পাঞ্জাবি বাঙালিয়ানা ফুটিয়ে তোলে : চন্দ্রশেখর সাহা

স্বরলিপি : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৪-১১ ৮:২৬:১০ এএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৬-১৩ ৫:৪৯:৪০ পিএম
বৈশাখে শাড়ি পাঞ্জাবি বাঙালিয়ানা ফুটিয়ে তোলে : চন্দ্রশেখর সাহা
Voice Control HD Smart LED

বাঙালির নববর্ষ উদযাপন এখন অনেকটাই নগরকেন্দ্রিক। পয়লা বৈশাখে নতুন পোশাক পরে প্রিয়জন নিয়ে বেড়ানো, খাওয়া-দাওয়া, হৈ-হুল্লোড়- সব মিলিয়ে দিনটি এখন অনেক বর্ণিল। এই উৎসব আয়োজনের অনুষঙ্গগুলোতে তো বটেই পোশাকেও আমরা দেখি লোকজ রঙের প্রাধান্য। দেশের সবচেয়ে বড় সর্বজনীন এই উৎসবকে কেন্দ্র করে নতুন পোশাক, ফ্যাশন ভাবনা জানিয়েছেন ডিজাইনার, কারুশিল্প গবেষক চন্দ্রশেখর সাহার। তার সঙ্গে কথোপকথনে ছিলেন স্বরলিপি

রাইজিংবিডি : হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগিয়ে চলেছে আমাদের ফ্যাশন হাউসগুলো। যাত্রার শুরুটা কখন, কীভাবে হলো? আপনিই বা কীভাবে এই সেক্টরের সঙ্গে জড়িয়ে গেলেন?

চন্দ্রশেখর সাহা : দেশীয় ফ্যাশন হাউসগুলোর মধ্যে আড়ং যাত্রা শুরু করেছে আটাত্তর সাল থেকে। ওই সময় আরও কয়েকটি ফ্যাশন হাউস কাজ শুরু করে; এর মধ্যে কারিকা, রূপায়ন, কুমুদিনী ছিল সমসাময়িক। বলা যায় দেশীয় ফ্যাশন হাউস যাত্রা শুরু করে সত্তরের দশকে। এই দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে আশির দশকের শুরু পর্যন্ত খুব ধীরে এই কনসেপ্ট ডেভেলপ করে। পর্যায়ক্রমে দু’হাজার সালে এসে বলা যায়, মোটামুটি ফ্যাশন হাউসগুলো দাঁড়িয়ে যায়। এ সময় থকেই ব্র্যান্ড কনসেপ্ট প্রতিষ্ঠিত হয়। আমি চারুকলার পাঠ শেষ করে আড়ংয়ের সাথে যুক্ত হয়েছি একাশি সাল থেকে। এ সময় থেকেই আমার প্রাতিষ্ঠানিক ডিজাইনার হিসেবে কাজ করা শুরু। যদিও আমি তার আগে থেকেই ডিজাইন নিয়ে নানা রকম চিন্তাভাবনা করছিলাম। বিশেষ করে পোশাকে বর্ণমালার মোটিফ ব্যবহার করার ধারণা আমার মধ্যে জন্ম নেয় তারও আগে। যাই হোক, আমি যুক্ত হই আড়ংয়ের প্রধান ডিজাইনার হিসেবে। অনেক পরে ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ শুরু করি। একাধিক ফ্যাশন হাউসের সাথে কাজ করেছি। ফ্রিল্যান্সার হওয়ার সাথে ওয়াইডলি কাজ করার একটা সংযুক্তি আছে। এখন পর্যন্ত আমি অনেক কিছুর সাথে জড়িত এমনকি আড়ংয়ের সাথেও। ওদের বড় বড় প্রজেক্টগুলো আমার তত্ত্বাবধানে হয়। এখন কয়েকটি ফ্যাশন হাউস ক্রেতার কাছে বিশ্বস্ত হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ তাদের ব্র্যান্ডিং দাঁড়িয়ে গেছে। শুরু থেকেই আমার বিশ্বাস ছিল, ফ্যাশন হাউসের এই কনসেপ্ট এক সময় প্রতিষ্ঠিত হবে। কারণ জায়গাটা খালি ছিল এবং কাজ করলে তার ফল আসবেই। বাঙালি তার নিজস্ব-দেশজ ঐতিহ্য সম্পর্কে নির্ভরতা পাবে। সেখান থেকে ফ্যাশন হাউস আসলে একটা সাফল্যের গল্প।

রাইজিংবিডি : আপনার করা ডিজাইনে লোকজ মোটিফ প্রাধান্য পায়, এই মোটিফ নিয়ে কাজ করার বিশেষ কোনো কারণ আছে কী?

চন্দ্রশেখর সাহা : পয়লা বৈশাখের পোশাক ডিজাইন করার আগে পরিকল্পনা করতে হয়- পোশাকটি বাঙালিয়ানা ও বাঙালিচর্চার সাথে মিলবে কি না? এই ভাবনা আমার শুরু থেকেই ছিল। প্রকৃতি আমাকে ভাবতে সহায়তা করেছে। প্রশ্ন আসে কেন পয়লা বৈশাখ পালন করা হচ্ছে? মূল কারণ হলো এই দিন বাংলা নববর্ষ। আমরা বলতে চাচ্ছি, বাঙালিরা এভাবে পোশাক পরে, বাঙালিরা এই রং ভালোবাসে, বাঙালি এই খাবারগুলো খেতে পছন্দ করে, বাঙালিদের এই এই নিজস্বতা রয়েছে; বাঙালিদের কবি এরা, ‘বাঙালি আর্ট’ বলতে এই বোঝায়- এই তো? এই সবকিছুর উত্তরে আমি একজন ডিজাইনার হিসেবে লোকজ মোটিফগুলোর মধ্যে খুঁজে পেতে চেয়েছি। ফলে মোটিফগুলো কী দিলে কী হবে, এই বিষয়ে ভাবতে শুরু করি। ভাবনার জন্য আমি বারবার প্রকৃতির দারস্থ হয়েছি। এখনো হই। আমি যা প্রকাশ করবো আগে তা নিজের ভেতরে নিতে হবে। ডিজাইন খুব সহজ বিষয় হয়তো কারও কারও কাছে, আমার কাছে এটি একটি সমাধান। আমি সমাধানে পৌঁছাতে চেয়েছি। ডিজাইনারের কাজ হলো সমাধান খোঁজা। বৈশাখ হচ্ছে সময়, দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ, আর বাঙালিয়ানা হচ্ছে দৈনন্দিন জীবনের যে চর্চা, ঐতিহ্য হচ্ছে অনেক বছর ধরে যেটা আমরা বিশ্বাস করি, বহন করি। এখন ধরুন, নকশি কাঁথার মোটিফ দিয়ে যদি কেউ কিছু করে তাহলে একটা ডিজাইনে এই সবগুলোই একই সূত্রে পাওয়া যাবে।

রাইজিংবিডি : হ্যাঁ, আমরা এখন এ বিষয়গুলো নকশায় দেখছি। এখন শাড়িতেও বিখ্যাত একটি স্থাপনা মোটিফ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

চন্দ্রশেখর সাহা : ঠিক। ধরা যাক, কান্তজির মন্দির, মন্দিরের টেরাকোটার নকশা বিখ্যাত। যা  অনেক আগের স্থাপনা। এই নকশা পয়লা বৈশাখের পোশাক ডিজাইনে চলে আসতে পারে। বাঙালির অস্তিত্বের মেলবন্ধন আছে এর সাথে। এতে ইতিহাস আছে, একটা সময়ের স্বাক্ষর আছে। এখন যদি ইন্দোনেশিয়ার একটা মন্দিরের নকশা পয়লা বৈশাখের পোশাকের মোটিফ হয় তার সাথে একাত্মতা করা ঠিক ততোখানি সহজ আর আত্মিক হবে না। ফলে এই আয়োজনে কালচারাল রিফ্লেকশন আনতে গেলে বা ঐতিহ্য তুলে ধরতে চাইলে কান্তজির মন্দির, বাংলা বর্ণমালা, চর্যাপদের পদ, কবিতার পঙ্‌ক্তিমালা- এগুলো সামনে চলে আসতেই পারে।

রাইজিংবিডি : সেকাল-একাল বা সেই সময় আর এসময়; পয়লা বৈশাখ উদযাপনের চিত্র কতটা বদলেছে বলে মনে করেন?

চন্দ্রশেখর সাহা : পয়লা বৈশাখ উদযাপনের চিত্র এখনকার মতো ছিল না। দিনটি উদযাপনের সর্বজনীন ব্যাপ্তিটা এসেছে অনেক পরে। পয়লা বৈশাখ ব্যবসায়ীরা পালন করতো ব্যবসায়ের নতুন হিসাব-নিকাশ শুরু করার জন্য। হিন্দু সম্প্রদায় দিনটি পালন করতো, ওই পর্যন্তই ছিল ব্যপ্তি। পয়লা বৈশাখ ঘিরে যে অনুষ্ঠান তা নাগরিক জীবনে সর্বজনীন করে তুলেছে ছায়ানট। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের বাংলাদেশে বৈশাখ উদযাপনের উদ্যোগ নেয় ছায়ানট, তবে ঠিক কোন সালে সেটা এই মুহূর্তে মনে করে বলতে পারছি না। সময়ের একটা ধারাবাহিকতা আছে। সময় অনেক কিছু তার সঙ্গে নিয়ে নেয়। বৈশাখী অনুষ্ঠানটাও সময়ের স্রোতে রাজধানীর সীমানা ছাড়িয়ে পৌঁছে গেছে জেলা শহরগুলোতে। এখন তো একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে উদযাপিত হচ্ছে দিনটি। বৈশাখের প্রথম দিনটিতে নতুন পোশাক পরার চলটিও সময়ের সাথে সাথে জনপ্রিয় হয়েছে। এই উৎসব এখন সবার। কেউ কেউ বলেন, বৈশাখ উদযাপন বা বাঙালিয়ানা হচ্ছে হিন্দুয়ানী। তখন কি বুঝবো! তখন বুঝতে হবে যে, সংস্কৃতি চর্চা আর মানুষের জীবনবোধের সঙ্গে সে ধর্মের সম্পর্ক মিলিয়ে ফেলেছে। এটা হচ্ছে তার অজ্ঞানতা।

রাইজিংবিডি : পয়লা বৈশাখের পোশাকে সাধারণত লাল-সাদা রঙের প্রাধান্য থাকে, এর পেছনে নির্দিষ্ট কোনো কারণ আছে কী?

চন্দ্রশেখর সাহা : একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে বৈশাখের পোশাকে লাল আর সাদা রঙের  প্রাধান্য আছে- এটা ঠিক। এই রং নির্বাচনের বিষয়টি অনেক আগে থেকেই চলে এসেছে। যে সময় বৈশাখ শুরু হয় সেই সময়ের আবহাওয়া থাকে গরম। আর গরমের দিন সাদা রং প্র্রেফারেবল এবং আরামদায়ক। তারপর সাদা রঙের সাথে লাল রং যোগ হয়ে গেল। একেবারে নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন হয়ে যাবে যে, কীভাবে বৈশাখের পোশাকে লাল-সাদা প্রধান রং হয়ে উঠলো। কিন্তু একটু খেয়াল করলে বোঝা যাবে এর যৌক্তিকতা সুদূর প্রসারি। এবং তা হওয়ারই ছিল। বাঙালি যতো রঙের ব্যবহারই শিখুক বা চর্চায় নিক, তাদের ভালোলাগাজুড়ে লাল রঙের একটা বড় জায়গা আছে। বিয়ের সময় দেখুন; বিয়ে একটি সম্পর্ক। এই সম্পর্ক স্থাপন হয়ে গেলে দুজন মানুষ একসঙ্গে একটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ জীবনে প্রবেশ করে। যে পোশাকে একটি মেয়ে ওই জীবনে প্রবেশ করে পোশাকটি হয় লাল। আমাদের ঐতিহাস সে সাক্ষ্যই দেয়। ভারতবর্ষের সবাই কোনো না কোনোভাবে লালের প্রতি আসক্ত। এই আসক্তিই লালকে প্রধান করে তুলেছে। যদি আমরা বলি মানুষকে উৎসবমুখী, আনন্দমুখী হতে গেলে রঙিন কাপড়পরতে হবে, ঝলমলে পোশাকই পরতে হবে, তাহলে ইউরোপজুড়ে বিয়ের পোশাক সাদা এবং পেস্টেড কালার কেন? ওরা কি ডিজাইন সচেতন না, কালার চেনে না, ফ্যাশন সচেতন না? এতে যুক্তিতর্কের অনেক বিষয় আছে। এটা মূলত হাওয়া। এখনকার হাওয়াতে কোনো কিছুরই নিয়ম থাকবে না। নিয়ম ভাঙার পর্যায়কাল আর নিয়ম মেনে চলার অতীত কাল; এগুলো তো এখন সবই পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত।

রাইজিংবিডি : এর মানে হলো, বিষয়টি যুগ যুগ ধরে এভাবেই হয়ে আসছে। এবং এভাবেই চলতে থাকবে?

চন্দ্রশেখর সাহা : মানুষ এখন নিয়মভাঙার পর্যায়কালে বাস করছে। বৈশাখের পোশাকে লাল-সাদা রং টিকবে কিনা বলতে পারছি না। অর্থাৎ এভাবেই চলবে কিনা? আগে একটি ছেলে বা মেয়ে কোন পোশাক পরবে তার নীতিনির্ধারক ছিলেন বাবা-মা। কখনো কখনো দাদা-দাদী ঠিক করে দিতেন। লাল-সাদা রঙের বৈশাখী পোশাক এখন ঐতিহ্যে পরিণত হয়ে গেছে। ঐতিহ্য তো তাই, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম বহন করে চলেছে। এখন ঐতিহ্য রক্ষা হয় বহনকারীদের মাধ্যমে। ধরা যাক একটি পরিবারের কথা। যে পরিবারের ঐতিহ্য হলো বাড়িতে অতিথি এলে না খেয়ে যেতে পারবে না। এটা হলো ওই পরিবারের সদস্যদের জন্য পারিবারিক প্রথা। এখন কোনো কারণে সেই পারিবারিক প্রথা যদি নতুন প্রজন্ম গ্রহণ না করে, তাহলে কিন্তু এই ঐতিহ্য উঠে যাবে। এবার আসা যাক গোটা জাতিসত্তার যে ঐতিহ্যচর্চা সেই বিষয়ে। সে ক্ষেত্রেও নতুন প্রজন্মই ঠিক করবে ঐতিহ্য তারা রক্ষা করবে, নাকি নিজের মতো পরিচালনা করবে সবকিছু, নাকি নিজেদের জীবনচর্চা আকাশ সংস্কৃতির আদলে তারা তৈরি করে নেবে। মানুষ, ব্যক্তিমানুষ, গণমাধ্যম ঠিক করবে কী হবে।

রাইজিংবিডি : নিশ্চয়ই তরুণ অনেক ডিজাইনার কাজ করছে। তারা কি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে? নতুনদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

চন্দ্রশেখর সাহা : নতুন যারা কাজ করছে, সবাই যথেষ্ট চেষ্টা করে তার নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা যেন প্রাসঙ্গিক হয়। ক্রেতারা যেন তৃপ্তি পায়; তার পোশাকটা যেন সবার কাছে আকর্ষণীয় এবং আলোচিত হয়। এই ভাবনা মাথায় রেখে, চর্চায় রেখে যে যার অবস্থান থেকে কাজ করছে। হ্যাঁ, কিছু সীমাবদ্ধতার জায়গা আছে। কেউ যদি ব্র্যান্ডের ডিজাইন স্টুডিওর সদস্য হয় তাহলে, এখানে সীমাবদ্ধতার জায়গা হলো ডিজাইনাররা নিজেরা আইডিয়া তৈরি করে ঠিকই কিন্তু এন্টারপ্রেনারদের ইচ্ছার বাইরেসে কাজ করতে পারে না। ডিজাইনারের ইচ্ছা অনুযায়ী ব্র্যান্ড চলবে না। ব্র্যান্ডের পছন্দ হলে পারস্পরিক বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে আসতে হবে।

আমি মনে করি, ডিজাইনারদের আধা-কবি হতে হয়। কারণ কবিতা ছাড়া কল্পনা, দৃশ্যকল্প পুরোপুরি পাওয়া যায় না। এটা অনুশীলনের ব্যাপার। ফ্যাশন, কালার বা নকশা যাই হোক না কেন সবকিছুর ভেতর ডিজাইনারকে কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়।কল্পনাকবিরাই সবচেয়ে ভালো পারে। সেদিক থেকে কবিতা একটা শক্তিশালী মাধ্যম। যার মাধ্যমে ডিজাইনাররা তার কল্পনাশক্তি চর্চায় রাখতে পারে। ডিজাইনারকে দিন শেষে সৃজনশীল হতেই হবে। এর বিকল্প নাই। নিজের চিন্তাকে আগে প্রাধান্য দিতে হবে।

রাইজিংবিডি : ক্রেতাদের একটি অভিযোগ-দেশীয় ফ্যাশন হাউসগুলোর উচ্চমূল্যের পোশাক নিয়ে। এ বিষয়টি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

চন্দ্রশেখর সাহা : ক্রেতারা বাজারের সাথে মানিয়ে নেয়, সমন্বয় করে। তারা বদলায় না আবার বদলায়ও। বদলায় এভাবে যে, ক্রেতা দেখলো পাকিস্তান, ইন্ডিয়ার পোশাক এসেছে এবং তাদের কাছে এটি আগ্রহের বিষয় হয়ে ওঠে। সে দেশাত্মবোধ, দায়বোধ বিসর্জন দেয়, বেমালুম ভুলে যায়। তার মনে কি একটা আকর্ষণ আর একটার প্রতি বিকর্ষণ তৈরি করে। ক্রেতা নিজে সচেতন না হলে এ অবস্থা থেকে ফেরানো সম্ভব নয়। আর হ্যাঁ, মূল্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মূল কারণ তা নয়। দেশ, জাতি, কাল এবং ট্রাডিশন যদি প্রধান না হয়ে কোন পোশাকটা পরলে সবাই বাহবা দেবে বা বলবে-‘তুমি তো দারুণ ফ্যাশনেবল’ এটা প্রাধান্য পায় তাহলে এমন মনে হতেই পারে। নিজস্ব চিন্তাভাবনার প্রতি আস্থা কম থাকলে তবে তা আশঙ্কার। সে ভাবে, কোনটা পরলে সবাই প্রশংসা করবে। কিন্তু এটা ভাবে না, সেই পোশাকটি তার জন্য সঠিক কিনা। প্রভাবিত হয়েও মানুষ এমন করে। ধরা যাক, একটা মেয়ে বিয়েতে লাল বেনারসী পরার ঐতিহ্যকে বলছে ‘ব্যাকডেটেড’। এ কথা বলার পর্যায়ে যখন কেউ পৌঁছে যায়, তখন সে অনায়াসে বেনারসী বাতিল করে লেহেঙ্গা পরতে পারে। তার জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়ে যায়। কেউ যদি সবাই যেদিকে ঝুঁকছে সে দিকটাকে প্রধান মনে করে তখন সে প্রভাবিত হয়। প্রভাবিত মানুষের কাছে দেশ, জাতি, কাল এবং ঐতিহ্য গুরুত্ব নাও পেতে পারে।

রাইজিংবিডি : জামদানি কাপড় আমাদের ঐতিহ্য। জামদানি জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন (জিআই) স্বীকৃতি পেয়েছে। এতে আমরা ঠিক কী ধরণের সুবিধা পাবো?

চন্দ্রশেখর সাহা : এ ধরনের স্বীকৃতিতে আন্তর্জাতিক মহলে বিভিন্ন দেশে যথেষ্ট আলোচনা হয়। আর আমাদের একটা ঐতিহাসিক সত্যের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আমাদের জন্য ঐতিহ্য রক্ষার চর্চায় বলা যেতে পারে সেইফ গার্ড। কিন্তু এই স্বীকৃতি দিলে বা না-দিলে আসলে তেমন কিছু আসে যায় না। দেখার বিষয় হচ্ছে, রিয়েলিটি এবং প্র্যাকটিবিলিটি। ধরা যাক জামদানি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেল কিন্তু একশ বছর পর বাংলাদেশের মেয়েরা আর জামদানি পরলো না, তাহলে এই স্বীকৃতি ঐতিহ্য রক্ষা করতে পারবে না। জামদানি বয়নশিল্পের কেবলমাত্র একটা নিদর্শন নয়, আমাদের ঐতিহ্যের একটা শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। সবদিক থেকেই ভেবে দেখতে হবে। স্থানীয়ভাবে সমস্ত ঐতিহ্যগত বিষয়বস্তু এমনকি বাংলায় কথা বলা, শুদ্ধবাংলায় চিঠি লেখা, বাঙালির খাদ্যাভাস এগুলোও কিন্তু রক্ষার বিষয়।

রাইজিংবিডি : বৈশাখ দুয়ারে। এবারের বৈশাখের পোশাক নিয়ে আপনার ভাবনা জানতে চাচ্ছি।

চন্দ্রশেখর সাহা : দেখুন, বাঙালির পোশাক বলতে শাড়ি, পাঞ্জাবি প্রধান। বৈশাখ পোশাকে বাঙালিয়ানা ফুটিয়ে তোলে। সব সময় ক্রেতার নিজস্ব একটা ভাবনা থাকে। ফ্যাশন হাউসে এসে সে নিজস্ব চিন্তার সাথে মিলিয়ে পোশাক খোঁজে। এই খোঁজার মধ্যে সে দেখে তার সংগ্রহে যা আছে, তার চেয়ে ভিন্ন কিছু আছে কিনা। সে নতুন খোঁজে। গ্রাহকের এই ভাবনা ডিজাইনারদেরও ভাবতে হয়। এ ক্ষেত্রে আমার পরামর্শ হলো, লোকজ সংস্কৃতি বা ঐতিহ্যকে বিষয়বস্তু করে কনসেপ্ট যদি তৈরি করা যায় এবং সেই কনসেপ্টের ভিত্তিতে অর্নামেন্টেশনের সারফেসটা যদি সাজানো যায় ওই মোটিফগুলো দিয়ে তাহলে বৈশাখ, দেশ, বাঙালিয়ানা, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি সবকিছুর মধ্যে একটা যোগসূত্র তৈরি করা যায়। এবারের বৈশাখেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আর রং নির্বাচনের ক্ষেত্রে অফ হোয়াইট আর লাল। তো সেই লাল ও অফ হোয়াইটের প্রকারভেদ আছে। এর সাথে ফোক কালার; ফোক কালার বলতে যে রংগুলো আমাদের প্রকৃতির রং। প্রকৃতির বিকল্প নাই। মানুষের মনোজগতে যাই ছায়া পরুক না কেন, সবকিছু প্রকৃতি থেকেই আসে। যেমন বাতাস। এটা অদৃশ্য প্রকৃতি। কিন্তু এর প্রভাবে যখন গাছের পাতা নড়ে তখন এটা দৃশ্যমান হয়। এই যে দুইভাবে মানুষ প্রকৃতিকে পায়, মানুষ তার ভাবনার জগতে সেই ছায়া- সে যা দেখে, সে তাই দেখে। আবার যা দেখে, তা অনেক সময় দেখেও না। এই না দেখার কারণ হলো, সে দৃশ্যকে মনে নেয় না। মানুষ যখন একইসঙ্গে দেখে এমন মনে নেয় তখন তা স্মৃতিতে থেকে যায়। ডিজাইনারদের আজকের ঘটনা, আজকের দিন, আগামী দিন, অতীতের দিন- সব দিনই ভাবতে হয়। তার মনোজগতে এগুলো লাগে। 




রাইজিংবিডি/ঢাকা/১১ এপ্রিল ২০১৮/তারা

Walton AC
ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন
       

Walton AC
Marcel Fridge