ঢাকা, বুধবার, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

‘বাবা কেন আমাকে নিজের মেয়ে ভাবতে পারলো না’

আরিফ সাওন : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-১১-১৮ ১২:৫৪:৫০ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-১১-২১ ৫:০৯:১২ পিএম

এইচ এম আজিমুল হক । ২৪ তম বিসিএস পরীক্ষায় শিক্ষা ক্যাডারে মনোনীত হয়ে বাগেরহাট সরকারী পি.সি কলেজে কর্মজীবন শুরু করেন। কিন্তু অনেক আগে থেকেই ইচ্ছা ছিলো পুলিশ হওয়ার। তাই আবার ২৫তম বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেন। এতে ২৫তম স্থান অধিকার করেন তিনি। ফলে পেয়ে যান পছন্দের ক্যাডার হওয়ার সুযোগ। ২০০৬ সালের ২১ আগস্ট যোগ দেন পুলিশের এএসপি হিসেবে। এইচ এম আজিমুল হক বর্তমানে রাজধানীর রমনা জোনের এডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অতি সম্প্রতি তিনি পুলিশ সুপার হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন।

এর আগে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন, ভোলা, পুটয়াখালি, যশোরসহ বিভিন্ন জেলায়। সৎ ও আদর্শবান এই পুলিশ কর্মকর্তার চাকরি জীবনে রয়েছে অন্তত শতাধিক ক্লুলেস মামলা ডিটেক্ট করার সাফল্য। আর এসব কাজে কখনো পেয়েছেন অনেক আনন্দ, স্বস্তি, আবার কখনো কেঁদেছেনও। এই পুলিশ কর্মকর্তার চাকরিতে আসা, চাকরি জীবনের নানা অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন রাইজিংবিডির নিজস্ব প্রতিবেদক আরিফ সাওনের সাথে।

রাইজিংবিডি : আজ আপনি যে অবস্থানে আছেন,  এতে সবচেয়ে কার অবদান বেশি?
এইচ এম আজিমুল হক :
আমাদের বাড়ি মোড়েলগঞ্জের পুটিখালি গ্রামে। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে আমি। আমার বাবা মো. মোবারক আলী ছিলেন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। এখন অবসরে আছেন। চার ভাই বোনের মধ্যে আমি সবার ছোট। আর্থিক অনাটনের মধ্যেই বড় হয়েছি। ছোট বেলায় দেখেছি, বাবা যে টাকা বেতন পেতেন, তা ভাই বোনদের সবার লেখাপড়ার জন্য ভাগ করে দিতেন। তবে অল্প বেতনে চাকরি করলেও আমাদের গ্রামে রেখে লেখাপড়া করাননি। মোড়েলগঞ্জ শহরে আমাদের বাসা করে সেখানে রাখতেন। একটু বড় হওয়ার পরে, আমাকে পাঠিয়ে দেন খুলনায়। আর বড় দুই ভাইকে পাঠিয়ে দেন ঢাকায়। বাবা নিজে গ্রামের বাড়িতে ভাত রান্না করে খেয়ে, আমাদের মাকে আমাদের সাথে রেখে আমাদের লেখা পড়া শিখিয়েছেন। কারণ, যে গ্রামে আমাদের জন্ম সেই গ্রামে আমার বাবা হচ্ছেন প্রথম মেট্রিক পাস। আমার ভাই হচ্ছেন প্রথম এমএ পাস। আমি প্রথম বিসিএস ক্যাডার।– এ রকম একটা গ্রাম থেকে আমরা উঠে আসছি। এর পিছনে সব কৃতিত্বের দাবিদার আমার বাবা।

রাইজিংবিডি : আপনি তো শিক্ষা ক্যাডারে ছিলেন, পুলিশে কেন আসা?
আজিমুল হক :
ছোট বেলায় আমরা খুব একটা বিলাসী ছিলাম না। আমাদের ইচ্ছা ছিলো লেখাপড়া শিখে ছোটখাটো চাকরি করবো। যে প্রতিষ্ঠানেই লেখাপড়া করেছি, সেখানেই মেধার স্বাক্ষর রাখায় আমার অ্যাম্বিশন আরো বড় হয়েছে। বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন ছোট বেলা না থাকলেও একটা সময়ে এসেছে, যখন দেখেছি পুলিশ কর্তৃক মানুষের হয়রানির শিকার হওয়া। ছোটবেলা দেখেছি জমিজমা সংক্রান্ত মামলা নিয়ে আমার বাবা পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছেন।

একবার আমার বাবাকে পুলিশে ধরে নিয়ে য়ায়। জমিজমা সংক্রান্ত মামলায়। এলাকার কিছু লোক আমাদের জমি দখল করতে চায়। তারা একটা মিথ্যা মামলা দেয়। আমার একবারে ছোট মনে গেঁথে যায়, এখনো গেথে আছে। সেই মিথ্যা মামলায় আমার বাবাকে পুলিশে ধরে নিয়ে গেল। তদবির করে পুলিশের কাছ থেকে ছাড়িয়ে আনতে হয়।

এসব দেখে পুলিশের চাকরির প্রতি আমার একটা আগ্রহ জন্মায়, যে আমি পুলিশ হলে অন্তত মানুষের উপকার করতে পারবো। ২৫ তম বিসিএসে আমি ২৫তম স্থান অধিকার করি। আমার ফার্স্ট চয়েস পুলিশ থাকায় আমি পুলিশে এসেছি। এর আগে ২৪তম বিসিএসেও আমরা ফাস্ট চয়েস পুলিশ ছিলো। একটা পরীক্ষা খারাপ হওয়ার কারণে পুলিশ ক্যাডার না পেয়ে শিক্ষা ক্যাডার পাই। তবে আমি দমে যাইনি। পরবর্তীতে আবার অংশ নেই।

রাইজিংবিডি : পুলিশের চাকরি কেমন এনজয় করছেন?
আজিমুল হক :
এক কথায় দারুণ এনজয় করছি। ওই কথাটা আমার সব সময় মনে পড়ে- আই ফোনের প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জব বলেছেন, তুমি তোমার কাজটাকে প্রিয়তমার মত করে করে খোঁজো, যতক্ষণ তুমি কাজটা না পাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত খুঁজতে থাকো। যতক্ষণ পযন্ত তুমি কাজে আনন্দ না পাবে তুমি মনে করবে এই কাজটা তোমার জন্য না। খলিল জিব্রানের সেই বিখ্যাত উক্তি যেমন- কাজই হচ্ছে মানুষের আনন্দ। মানুষকে যদি আনন্দ পেতে হয়, তাহলে সেই আনন্দ কাজের মাধ্যমেই পেতে হয়। যে কাজে সুখ পাবে না, তার জীবনে সুখ বলে কিছু নেই। আমি আসলে ঠিক সেই ভাবে আমার কাজটাকে খুঁজে পেয়েছি।

রাইজিংবিডি : চাকরি জীবনের স্মরণীয় ঘটনা যদি বলেন-
আজিমুল হক :
শতাধিক ক্লুলেস মামলা ডিটেক্ট করেছি। আল্লাহর ইচ্ছায় এমন এমন মামলা ডিটেক্ট করেছি, যেসব মামলার কোন ক্লু-ই ছিলো না। মামলা ডিটেক্ট করতে গিয়ে অনেক সময় আমাকে ভ্যান চালাতে হয়েছে। সকাল থেকে ভ্যান চালাচ্ছি, পুরো পা একে বারে বিষ হয়ে গেছে। কারণ অভ্যাস নেই। ঠিক সন্ধ্যার সময় আসামি ধরে ফেলছি। ভোলায় থাকাকালে ডাকাতের সাথে যুদ্ধ করতে হয়েছে। ভোলা, পটুয়াখালি, বরগুনা, যশোর–সব কঠিন জায়গায় চাকরি করেছি। অনেক স্মরণীয় ঘটনা আছে। যেগুলো হয়তো এক সপ্তাহেও বলে শেষ করতে পারব না।
 


রাইজিংবিডি : এমন কি কখনো হয়েছে, কোনো মামলা ডিটেক্ট করতে গিয়ে কেঁদেছেন, বা খুব কষ্ট পেয়েছেন?
আজিমুল হক :
হ্যাঁ, এমন ঘটনা ঘটেছে। একটি ঘটনা শেয়ার করছি। সরকারি চাকরি থেকে অবসরের পর এলাকায় এসে দোকান দেন এক ভদ্রলোক। ইস! এখনো আমার মনে মধ্যে খুবই খারাপ লাগে। মেয়েটা কী ফুটফুটে! মানে, নায়িকাদের মত চেহারা, এতো সুন্দর দেখতে! তখন তার বয়স হয়তো ১৬ বছর হবে। ক্লাস টেনে পড়তো। তার বাবা ওই অবসর প্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবীর লাশ পাওয়া গেলো বাড়ির কাছে মাঠের মধ্যে। গলা কাটা। সকালে তার বাড়িতে গেলাম, তার মা, স্ত্রী সন্তান সবাই কান্নাকাটি করছে।

মামলা তদন্ত করতে নেমে কোনো ক্লু পাচ্ছি না। কিন্তু আমার সন্দেহ, খুন তার স্ত্রী করেছে। কিন্তু এমনভাবে আমি তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করি, এই মামলায় যদি তার স্ত্রীকে সরাসরি দোষারোপ করি তাহলে পত্রিকায় লেখালেখি হবে। তবে আমি পুলিশ ফোর্স সেট করে রাখি, তারা যেন এলাকা ত্যাগ করতে না পারে। তাদেরকে বার বার আমি ব্যস্ত রেখেছি। প্রায় একমাস কোন কুল কিনারা পাচ্ছি না। কেউ বলে তার ভাইরা করেছে, কেউ বলে অন্যরা, বিভিন্ন তথ্য আসছে। কিন্তু সঠিক কোনো তথ্যই মিলছে না। তবে আমি ভিতরে ভিতরে নিশ্চিত, কাজটা তার স্ত্রী করেছে। তবে সে কেন করেছে, এটা বুঝতে পারছি না। কেন নিজের স্বামীকে মারতে হবে! সুন্দর একটা বাড়ি করেছে, সন্তানরা স্কুলে যাচ্ছে, রাস্তার পাশে একটা দোকান দিয়েছে, তাকে কেন মারতে হবে?

একদিন ওই লোকের স্ত্রীকে বললাম মেয়েকে নিয়ে আমার বাসায় আসতে। তখন পটুয়াখালিতে যে বাংলোয় ছিলাম সেখানে সুন্দর সিঁড়ি আছে। সিঁড়িতে বসে আমি, আমার স্ত্রী আর ওরা। নাস্তা দিয়ে মেয়েটাকে বললাম মা নাও, খাও। তাকে যখন মা বলে, ডাক দিয়ে পাশে বসাই। হাউ মাউ করে কেঁদে দিয়ে বলে স্যার, আপনি আমাকে কি মেয়ে ভাবতে পারেন? আমি বলি, কেন পারবো না। আমি প্রথম বয়সে বিয়ে করলে তোমার মত মেয়ে থাকতো আমার। তখন মেয়েটা বলে, স্যার, তাহলে আমার বাবা কেন আমাকে নিজের মেয়ে ভাবতে পারলো না?

শুনে আমার মন খারাপ হয়ে গেলো। আমার স্ত্রী ওই পরিস্থিতির স্বাক্ষী। আমি বললাম কেন? মেয়েটাকে বললাম, মা বলো তো ঘটনা কি? তখন তার মা বললো, ওর কাছে কি শুনবেন। আমার কাছে শোনেন। ওরে আমি কেন মারছি, শোনেন।

ওই মহিলা স্কুলশিক্ষক। সকালে তিনি স্কুলে যেতেন, আর তার স্বামী নিজের দোকানে গিয়ে বসতেন। মেয়েটা স্কুল থেকে ফিরলে বা যখন তার মা থাকতো না, তখন বাবা মেয়েকে যৌন নিপীড়ন করার চেষ্টা করতো। মেয়ে নিজের বাবার হাত থেকে বাঁচতে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে রাখতো। কখনো কখনো মাকে ফোন দিয়ে স্কুল থেকে নিয়ে আসতো। পরবর্তীতে মা চিন্তা করে দেখে একটা বিশ্রী অবস্থা হয়ে যাবে। স্বামীকে মেরে না ফেললে মেয়েকে রক্ষা করা যাবে না। তাই তার স্ত্রী আর ছোট বোনের স্বামীকে দিয়ে অন্যান্য কিলার ভাড়া করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়। এর রহস্য বের হওয়ার পর হঠাৎ লক্ষ্য করি আমার দু চোখ বেয়ে নিরবে অশ্রু ঝরে পড়ছে। 

রাইজিংবিডি : কোন কাজটি করে বেশি আনন্দ পেয়েছেন?
আজিমুল হক :
আনন্দ আমি প্রতিনিয়ত প্রতি কাজের পুরস্কার হিসেবে গ্রহণ করি। কারণ কাজের মধ্যে আনন্দ খুঁজে নিলে পুরস্কারের প্রত্যাশায় কষ্ট পেতে হয় না। তবে আপনাদের স্মরণ আছে হয়তো, উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের সেই ছোট্ট মেয়ে রিশার কথা। এক বখাটে ছুরি মেরে রাস্তায় হত্যা করে। যা নিয়ে সারা দেশে তোলপাড় হয়। আমি ৭২ ঘন্টার মধ্যে নীলফামারি থেকে সেই আসামি ধরে আনি। সে ইন্ডিয়া চলে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। যেদিন ধরি তার আগে সে এক ভাঙ্গা কবরের মধ্যে আশ্রয় নিয়েছিল। কবরস্থান থেকে বাইরে বের হওয়ার পর এলাকার লোকজনের সহায়তায় তাকে ধরে ফেলি। এরপর সে জানায়, সারা রাত সে ভাঙ্গা কবরের মধ্যে শুয়ে ছিলো।

ঢাকায় আরেকটি মামলা পেয়েছি পুটয়াখালির মত। এই তো কয়েক মাস আগে। মামলাটা হচ্ছে একটা মেয়ে তার মাকে নিয়ে এসেছে। তার বাবা মাদক সেবন করে, এ কারণে তাকে মামলায় আটকাবে। এজন্য আমাদের এক পুলিশ সদস্যকে টাকাও দিতে চেয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আমার সন্দেহ হলো, মেয়ে কেন বাবাকে আটকাতে চায়। পরে অনুসন্ধান করে দেখলাম ওই বাবা মেয়েকে  নিপীড়ন করে। এই মামলায় আমার আত্মতৃপ্তির বিষয় হচ্ছে, বাবার কাছেও যে মেয়েটি নিরাপদ নয়, জন্মদাতা পিতার কাছে যে মেয়ে যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে, সেই মেয়ে আমার কাছে নিরাপদ, আমি তাকে নিরাপত্তা দিচ্ছি। এর চেয়ে আর আত্মতৃপ্তির বিষয় কী হতে পারে। সেই দিক থেকে আমি মনে করি পেশাগত ভাবে আমি অত্যন্ত একটা মহৎ পেশায় আছি। আমি মানুষের জন্য কিছু হলেও কাজ করার সুযোগ পাচ্ছি।

রাইজিংবিডি : পুলিশের চাকরি এতো ভালোবাসেন কেন?
আজিমুল হক :
এই জন্য ভালো লাগে যে, মানুষের জন্য কিছু করা যায়। বাংলাদেশের মানুষ একটা নেগেটিভ মানসিকতার মধ্যে আছে। অবশ্য পুলিশের ভিতরে এখনো কিছু সমস্যা আছে। আমি মনে করি এর ভিতর থেকেও বাংলাদেশ পুলিশ ভালো কিছু করছে, করার চেষ্টা করছে। আর ভাল কিছু করে বলেই মানুষ পুলিশের কাছে দৌড়ে আসে। সুবিচার পায় বলে পুলিশের কাছে আসে। তা না হলে তো অন্যত্র যেতো।

রাইজিংবিডি : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
আজিমুল হক :
রাইজিংবিডিকেও অসংখ্য ধন্যবাদ।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৮ নভেম্বর ২০১৮/সাওন/এনএ

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC