ঢাকা, বুধবার, ৮ ভাদ্র ১৪২৪, ২৩ আগস্ট ২০১৭
Risingbd
শোকাবহ অগাস্ট
সর্বশেষ:

সাইদুরের জীবনে বন্ধুদের অবদান অনেক

শতাব্দী জুবায়ের : রাইজিংবিডি ডট কম
প্রকাশ: ২০১৭-০৮-০৬ ১১:০৯:৪৪ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৮-০৬ ১:৪১:১০ পিএম
মো. সাইদুর রহমান

শতাব্দী জুবায়ের : মো. সাইদুর রহমান। সবাই তাকে সাইদুর নামেই ডাকে। তিনি শারীরিক প্রতিবন্ধী। পড়ছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগে। এখন আছেন তৃতীয় বর্ষে। তার পা দুটি ঠিক ভাবে নড়াচড়া করতে পারেন না। কলম ধরতে পারলেও দ্রুত লেখতে পারেন না। মুখের মধ্যেও রয়েছে জড়তা। তোতলিয়ে তোতলিয়ে কথা বলেন।

ছোটবেলা থেকেই তার এই অবস্থা। হুইলচেয়ার একমাত্র ভরসা। তবে হুইলচেয়ারে বসে চলাচল করলেও তা ঠেলে নিয়ে যেতে হয় কাউকে। তাই কারো না কারো ওপর নির্ভর করেই তাকে চলতে হয়। কখনো বন্ধু, কখনো ক্যাম্পাসের ছোট অথবা বড় ভাই, কখনো কোনো বান্ধবী। নিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষা, বিভাগে যাওয়া, হলে ফেরা সব সময়ই বন্ধুদের ওপর নির্ভর করে চলতে হয়। তাই তার কাছে বন্ধুর বিকল্প কিছু নেই।

সাইদুরের বাড়ি কুমিল্লা জেলার দেবীদ্বার উপজেলায়। বাবা জাহাঙ্গীর হোসেন মোল্লা ছিলেন মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক। মা শামসুন নাহার গৃহিণী। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। গত বছর তার বাবা মারা যান। বন্ধু দিবসে তিনি যখন তার জীবনের কথাগুলো বলছিলেন, তখন তার চোখের কোণে দেখা যাচ্ছিল এক বিন্দু জল। গলাটাও আর্দ্র হয়ে আসছিল। প্রতিবন্ধী হলেও ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন একটু চঞ্চল টাইপের। ঘরে আবদ্ধ হয়ে থাকতেন না। হাঁটতে না পারলেও হামাগুড়ি দিয়ে চলে যেতেন বাড়ির পাশের খেলার মাঠে। অথবা মাঝে মাঝে মা শামসুর নাহার দিয়ে আসতেন মাঠে।

সাইদুর ছোটবেলার স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘ছোটবেলায় প্রথম যখন আমি মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে খেলায় যেতাম তখন অনেকেই আমাকে ভয় পেত। তবে ধীরে ধীরে আমাকে মেনে নেয়। মাঝে মাঝে আমাকে খেলায় না নিলে অথবা আমার সঙ্গে কেউ না খেললে আমার মন খারাপ হতো। তবে আমি বসে থাকতাম না একা একাই খেলে যেতাম।’

‘যেহেতু আমি হাটতে পারতাম না তাই দাঁড়ানোর চেষ্টা করলে বা কখনো কখনো এমনিতেই মাটিতে পরে যেতাম। মা যখন আমাকে মাঠে রেখে আসতেন তখন অনেকেই বলতো সে পড়ে গিয়ে ব্যথা পাবে।’ মা তখন একটা কথা বলতো, ‘এক দিন দুই দিন পড়ে ব্যথা পাবে। পাক না। ব্যথা পেতে পেতেই সে অভ্যস্ত হয়ে যাবে। আর ব্যথা পাবে না। এই কথাই ছিল আমার শক্তি।’

সাইদুরের বয়স যখন দেড় বছর তখন তার নিউমোনিয়া হয়। তার সঙ্গে দেখা দেয় টাইফয়েড জ্বর। তাকে নেয়া হয় ঢাকা মেডি্ক্যাল কলেজ হাসপাতালে। ডাক্তাররা সাইদুরের বাবাকে বলেছিলেন সে মাত্র তিন দিন বাঁচবে। বাবা-মা ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করে বাড়িতে নিয়ে আসেন। পরে তার নানা হোমিও প্যাথিক ডাক্তার তার চিকিৎসার ভার নেন। ধীরে ধীরে সাইদুর সুস্থ হয়ে ওঠে। তবে বয়স বাড়তে থাকলেও স্বাভাবিক ভাবে হাঁটতে পারেনি সাইদুর। তাই তাকে নিতে হয় স্ক্র্যাচ। নির্ভর করতে হয় পরিবার ও বন্ধুদের ওপর।



সাইদুরকে প্রাথমিক শিক্ষা দেয়া হয় পরিবারেই। প্রথমেই ভর্তি হন মাধ্যমিক স্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে। তারপর বন্ধুদের সহায়তায় এগিয়ে চলা। মাধ্যমিক স্কুলে নিয়মিত ক্লাস করতে পারেননি। তবে বাড়িতে বসে বসে সারাদিন পড়াশুনা করতেন। সবার আগেই বই পড়ে শেষ করতেন। এস এস সি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.৫০ পান। তারপর ভর্তি হন কলেজে। এইচ এস সি পরীক্ষায় পান জিপিএ ৪.২০। তার পরপরই বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা। ভর্তি পরীক্ষার জন্য বই কিনে বাসায় পড়াশুনা শুরু করে দেন। ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, জগন্নাথ ও কুমিল্লা এই চারটি বিশ্ববিদ্যালয়েই তিনি ভর্তি পরীক্ষা দেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পেয়েছিলেন। কিন্তু ভর্তি হননি। বেছে নেন লাল পাহাড়ের সবুজ ক্যাম্পাস কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রথমে ভর্তি হয়েছিলেন অর্থনীতি বিভাগে। কিন্তু ৬-৭ মাস পড়ার পর দেখলেন সেটা চালিয়ে যাওয়া একটু কঠিন হয়ে যাচ্ছে। আবার হাতের আঙুলগুলোও ভালো ভাবে কাজ করছে না। তাই পরীক্ষায় লেখার জন্য কাউকে রাখতে হয়েছে। কিন্তু অর্থনীতিতে পড়া তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। তার একটা লক্ষ্য ছিল যে অনার্স পাস সাটিফিকেট লাগবেই। তাই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সহায়তায় আবার ভর্তি পরীক্ষা দিলেন এবং লোক প্রশাসন বিভাগে ভর্তি হলেন।

বিশ্ববিদ্যালয় শুরুর দিকে মা শামসুর নাহার কুমিল্লা শহর থেকে ১১ কিলোমিটার দূরের কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে  প্রতিদিন নিয়ে আসতেন। আবার ক্লাস শেষ নিয়ে যেতেন তাকে। ছেলের সঙ্গে মাকেও থাকতে হতো সারাদিন। মা তখন ছিলেন তার একমাত্র বন্ধু। তিনি ভাবলেন এই ভাবে আর কত কষ্ট দিব মাকে। নিজের ওপর নির্ভর করা উচিত। পরে চলে আসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজী নজরুল ইসলাম আবাসিক হলে। বন্ধু এবং প্রশাসনের সহায়তায় সিট পেয়ে গেলেন নিচতলায় ১০৮ নং রুমে। আর নিচতলায় হওয়াতে তার জন্য সুবিধা হয়েছে।

এখন হুইলচেয়ারে করে ক্যাম্পাসে আসেন নিয়মিত। প্রতিদিন হল গেটের সিড়িতে এসে দাঁড়ালে যে কেউ ধরে নামিয়ে দেন। বন্ধুরা ঠেলে ঠেলে নিয়ে আসেন পাহাড়ের ওপর অবস্থিত কলা ও সমাজ বিজ্ঞান অনুষদ ভবনে। আবার কোলে করে তুলে নেন তিন তলায় তার বিভাগে। এখন বন্ধুরাই তার একমাত্র ভরসা। পড়াশুনা, সিট সংগ্রহ করা, বই কেনা সব কিছু করে দেন বন্ধুরাই। তিনি বলেন, ‘বন্ধুদের অনেক বিরক্ত করি তবে তারা একটুও বিরক্ত হয় না। সবাই আমার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে। ক্লাস শেষে বন্ধুরা সবাই যখন ঘুরতে যায় আমাকেও সঙ্গে নেয়। আড্ডা আর মাস্তিতেই কাটে দিন। তাদের সহায়তায়ই উপভোগ করছি বিশ্ববিদ্যালয় জীবন।’

হলের রুম মেট সিনিয়র জুনিয়র যারা আছে সবাই বন্ধু সুলভ আচরণ করে। কোনো কিছুর দরকার হলে যখন তখন যেতে পারেন না। রুমমেটরা এনে দেন। ওদের সহায়তার বিকল্প নেই তার নিত্যদিনের চলার পথে।

সাইদুরের বন্ধুরা বলেন, ‘সে আমাদের ক্লাসমেট, বন্ধু। সে প্রতিবন্ধী সেটা আমরা মনে করি না। আমরা যখন ঘুরতে যাই অথবা পার্টি করি তখন সে থাকে সবার আগে। ওর মানসিক শক্তি অনেক বেশি। আর স্মৃতি শক্তি সে তো বলার অপেক্ষা রাখে না। আমরা তার সকল কাজে প্রত্যেকের অবস্থান থেকে পাশে থাকার চেষ্টা করি।’

পড়াশুনা শেষ করে গবেষক হওয়ার ইচ্ছা সাইদুরের। দেশের বাইরে গিয়ে একটা ডিগ্রি অর্জন করাও তার স্বপ্ন। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিমধ্যে আবেদনও করেছিলেন। গ্রহণও হয়েছিল। নানা জটিলতার কারণে পারেননি যেতে। প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করতে তার খুব ইচ্ছা। তিনিসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের আরো কয়েকজন প্রতিবন্ধী মিলে প্রতিবন্ধীদের একটি সংগঠনও করেছেন। তিনি এখন এটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

তার এতটা দূর আসা সম্ভব হয়েছে বন্ধুদের একটু ভালোবাসা, সহমর্মিতা, স্নেহের জন্য। এভাবে সকল প্রতিবন্ধীরা যদি সবার স্নেহ ভালোবাসা পায় তাহলে তারাও বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে স্বাচ্ছন্দ্যে পড়তে পারবে বলে মনে করেন সাইদুর রহমান। বন্ধু দিবসে তার একটাই ভাষ্য- ‘জীবনে চলার পথে বন্ধুদের বিকল্প নেই।’




রাইজিংবিডি/ঢাকা/৬ আগস্ট ২০১৭/ফিরোজ

Walton Laptop