ঢাকা, মঙ্গলবার, ১ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৬ জুলাই ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

কর্মজীবী মায়েদের গল্প

ঝুমকি বসু : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৫-১২ ৯:৫১:১৬ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৫-১২ ১:৩৭:৫৩ পিএম
কর্মজীবী মায়েদের গল্প
প্রতীকী ছবি
Voice Control HD Smart LED

ঝুমকি বসু : মাঝেমাঝেই খুব মানসিক টানাপোড়েনে ভুগতে থাকে দীপা। প্রায়ই দেখা যায় মেয়েটা যখন অসুস্থ, তখন অফিসে পড়ে যায় জরুরি মিটিং। মেয়েকে ছেড়ে অফিসে যেতেও ইচ্ছা হয় না। আবার অফিস মিটিংও বাদ দেওয়ার উপায় থাকে না। কোনটা ফেলে কোনটা করবে বুঝতে পারে না দীপা।

ছবিটা আমাদের খুব চেনা। ছবিটা একজন কর্মজীবী মায়ের। আজকাল এমন মায়েদের সংখ্যা অনেক। ইন্টারনেটের কল্যাণে একজন দশভূজা মায়ের ছবি হয়তো অনেকেই দেখে থাকবেন। তিনি তার দশটি হাতে ধরে আছেন ল্যাপটপ, খুন্তি, মোবাইল ফোন, সন্তানের দুধের বোতল, ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, লিপস্টিক ইত্যাদি ইত্যাদি।  রূপকের আড়ালে সবাইকে একটা কথাই বোঝানো হয়েছে যে, জীবনযুদ্ধে সফল একজন মায়ের ছবি আসলে এমনই।

একটু যদি তলিয়ে ভাবি তাহলে দেখা যাবে, দুই প্রজন্ম আগেও অন্দরমহলটাই ছিল মায়েদের জায়গা। সংসারের সুখের জন্য নীরবে কাজ করে যেতেন তারা। কেউ কেউ চাকরি করতেন বটে। তবে তা ‘চাকরি’-ই, ক্যারিয়ার নয়। সেই চিত্রটা যে প্রায় অনেকটাই বদলে গেছে তা আপনার বা আমার কারো অজানা নয়। অন্দরে নিজেদের গুরুত্ব একফোঁটা না কমিয়েও, মায়েরা বাইরের জগৎ আবিষ্কার করছেন পুরোদমে। চাকরি, ব্যবসা, সন্তান সামলানো, ঘরকন্না সংক্রান্ত হাজারটা কাজ সবই করছেন এমন মায়েরা হাসিমুখে, তৃপ্তিসহকারে।

কিন্তু সমস্যা একটাই। সময় তো সেই ২৪ ঘণ্টা। ধরাবাঁধা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এত কাজ কীভাবে সুষ্ঠুভাবে করবেন, তাই নিয়ে একটু চিন্তাই হয় বৈকি! অফিসের জরুরি মিটিংয়ের মাঝে মনে পড়লো ছেলের স্কুলব্যাগে টিফিন বক্সটা ঢুকাতে একেবারই ভুলে গেছেন। রান্না বসিয়ে জিভ কাটলেন এই ভেবে যে, গত সপ্তাহে বিদ্যুৎ বিল দেওয়ার কথা ছিল, যা একদমই মনে নেই। ভুলে যাওয়ার সমস্যা হয়তো এড়ালেন। কিন্তু দিনের শেষে দেখা গেল ক্লান্তিতে পারছেন না মাথা তুলতে। মেজাজটাও আজকাল মাঝে মাঝে খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে। সংসারের হাজার কাজ, অফিসের ডেডলাইন, বাজারহাট, সন্তানের স্কুলের পেরেন্ট-টিচার মিটিং, হোমওয়ার্ক করানো- কাজের তালিকা ক্রমে বেড়েই চলেছে। কর্মজীবী মায়েদের সবকিছুই সামলাতে হয় সুষ্ঠুভাবে।

প্রতিদিন সকালে পৃথাকে রেখে অফিসে যেতে সুহানার কান্না পেয়ে যায়। পৃথার কতই বা বয়স? সবে সাত পেরিয়ে আটে পা দিয়েছে। এখন স্কুলে রমজানের ছুটি চলছে। সারাটা দিন ছোট ফ্লাটে ঘরবন্দি হয়ে থাকছে মেয়েটা। সুহানার ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা সাতটা বেজে যায়। আর ওর স্বামীর তো আরও রাত হয় ফিরতে। শুধু মেয়েটাকে সঙ্গ দিতে না পারার কষ্ট নয়, সারাদিন অফিসে নানা কাজের ফাঁকে ফাঁকে পৃথার জন্য দুশ্চিন্তা হয় সুহানার। ঠিক মতো খেয়েছে তো পৃথা? সারাক্ষণ কি টেলিভিশন দেখছে? অচেনা কাউকে দরজা খুলে দিল নাতো? হঠাৎ শরীর খারাপ করলো নাকি? যতক্ষণ না বাসায় ফিরে মেয়েকে সুস্থ, স্বাভাবিক দেখছে ততক্ষণ নানা দুশ্চিন্তা কুঁড়ে কুঁড়ে খায় সুহানাকে।

সুহানার গল্পের সঙ্গে কি আপনার জীবনের বেশ মিল খুঁজে পাচ্ছেন? মিল পাওয়া খুবই স্বাভাবিক। যেসব কর্মজীবী মা সন্তানকে বাসায় রেখে অফিস করেন তাদের গল্প তো প্রায় সব একইরকম। মা ছাড়া সন্তানকে সার্বক্ষণিক দেখভাল মায়ের মতো করে করার লোকের বড্ড অভাব। সংসারে যত মানুষই থাকুক না কেন, মায়ের মতো যত্ন কেউ নেবে না। আর যারা একক পরিবারে থাকেন, তারা যদি কাজের লোকের কাছে সন্তানকে রেখে যান তাহলে তো ভরসার জায়গা আরও কম।

বাসায় শিশু সন্তানকে রেখে অফিস করলে প্রায় সব মায়ের মনেই একটা অপরাধবোধ কাজ করে। একা একা থাকলে সন্তানের মনেও বাসা বাঁধে অভিমান। মা দিবসে এমন কর্মজীবী মায়েদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রইলো কিছু টিপস।

* বাসায় মা সবসময় কাছে না থাকলে সন্তানের মনে অভিমান বাসা বাঁধে। ওকে ওর মতো করে বোঝান। ওকে বোঝান, ওর স্কুলে যাওয়ার মতো আপনাকেও প্রতিদিন অফিসে যেতে হয়। মাঝে মাঝে ওকে সঙ্গে করে অফিসে নিয়ে যান। তাতে ও আপনার কাজের পরিবেশটা বুঝতে পারবে।

* সন্তান যত বড় হয়ে উঠবে আপনার চাকরির গুরুত্বও বুঝতে শিখবে। প্রথম থেকেই সন্তানকে বাসায় রেখে অফিস করাটাকে সেন্টিমেন্টাল ইস্যু বানাবেন না। বাবার মতো মায়ের অফিসে যাওয়াও স্বাভাবিক, সেটাই ওকে বুঝতে দিন। সবসময় কাছাকাছি না থেকেও যে ভালোবাসা মজবুত থাকে তা ওকে বোঝান। সকালে নাস্তার টেবিলে সন্তানকে সময় দিন। স্কুলের জন্য তৈরি হতে সাহায্য করুন। পড়াশোনা, বন্ধুবান্ধবদের খোঁজ নিন। আপনার অফিসের গল্প ওকে শোনান। স্কুল থেকে ফেরার পর অবশ্যই অফিস থেকে ফোন করে ওর সঙ্গে কথা বলুন। বাসায় ফেরার পর সন্তানকে কিছুটা সময় দিন। আপনার উপার্জিত অর্থ যে আপনাদের সবার প্রয়োজন মেটায়, তা ওকে বুঝতে দিন। জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে ছোট থেকেই শিশুদের পরিচয় করিয়ে দেওয়াটা জরুরি। এছাড়া আপনি নিজেও কোনও অপরাধবোধে ভুগবেন না। বরং পজেটিভ দিকগুলো ভাবুন। প্রতিদিন ওকে আধা ঘণ্টা গল্প শোনান। সন্তানের বন্ধুদের ছুটির দিনে বাসায় ডাকুন। ওদের জন্য পছন্দের খাবার বানান। মাঝে মধ্যে বাইরে ঘুরতে যান। এমন জায়গায় যাবেন, যেখানে শিশুরা ছোটাছুটি করতে পারে, নতুন কিছু শিখতে পারে।

* ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে স্বনির্ভর হতে শেখান। আপনার অনুপস্থিতিতে এতে ওর সুবিধা হবে। নিজের জামা-কাপড় গুছিয়ে রাখা, নিজের হাতে খাবার খাওয়া, জামা-জুতা খোলা-পরা ওকে শেখান।

* পরিবেশের ওপর অনেকটাই নির্ভর করে শিশুর মানসিক সুস্থতা। আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশীর সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখুন। আপনার অনুপস্থিতিতে কোনো সমস্যায় যেন সবাই এগিয়ে আসতে পারে। তাই সম্পর্ক ভালো রাখার জন্য ছুটির দিনে মাঝে মধ্যে সবার বাসায় বেড়াতে যান।

* সন্তানের স্কুল, বন্ধুর অভিভাবক, সন্তানের শিক্ষক, আপনার প্রতিবেশী সবার ফোন নম্বর সবসময় নিজের কাছে রাখুন, যাতে অফিসে বসেও যেকোনো প্রয়োজনে আপনি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।

* মাঝে মাঝেই সন্তানকে ফোন করে তার খোঁজ-খবর নেবেন। ও যেন কখনো অনুভব না করে যে, আপনি তাকে অবহেলা করছেন।

* সন্তানকে শেখান বাসায় একা থাকলে ও যেন কাউকে দরজা না খুলে দেয়। আপনার পরিচিত সবাইকে বলে দিন, আপনার অনুপস্থিতিতে বাসায় না আসতে।

* বাসায় একটা ফোন ডায়েরি রাখুন। তাতে প্রয়োজনীয় সব নম্বর লিখে রাখুন।

* খুব বিশ্বাসী না হলে শিশুকে একা কাজের লোকের সঙ্গে বাসায় রাখবেন না। আপনার শিশু কাজের লোকের সঙ্গে থাকতে স্বচ্ছন্দবোধ করছে কিনা তা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নজরে রাখুন।

* বাসায় একটা ফার্স্ট এইড বক্স রাখুন।

* বাসায় ফেরার পর ফ্যামিলি টাইমের সঙ্গে কোনো কম্প্রোমাইজ করবেন না। সন্তানের সঙ্গে সময় কাটান। ওর প্রতিদিন কেমন কাটলো, কীভাবে কাটলো তা জেনে নিন। ওর বন্ধু-বান্ধব, সহপাঠী, শিক্ষকদের নিয়ে ওর সঙ্গে কথা বলুন। একসঙ্গে খাবার খান, টিভি দেখেন। ওর হোমওয়ার্ক করান।

* সন্তানকে ওর শখের কাজে উৎসাহিত করুন। অবসর সময়টা এতে ওর ভালো কাটবে।

* অফিসে অপ্রয়োজনীয় গল্পগুজব, ফোন, ইন্টারনেটের সময় না কাটিয়ে সেটা কাজে লাগান, যাতে বেশি রাত অবধি অফিসে থাকতে না হয়। শেষ মুহূর্তের জন্য কাজ একেবারেই তুলে রাখবেন না। সহকর্মীদের অন্যান্য কাজে সাহায্য করুন, যাতে আপনার সমস্যায় তারাও আপনাকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়।

* সন্তানকে সময় দিতে পারছেন না বলে উপহার দিয়ে সেই ক্ষতি পোষানোর চেষ্টা করবেন না। সময় দিতে না পারার জন্য মনে দুঃখবোধ কাজ করলে মাঝে মাঝে ছুটির দিনের পুরোটা সময় ওকে দিন। আপনার সঙ্গই হবে ওর জন্য সেরা উপহার।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১২ মে ২০১৯/ফিরোজ  

Walton AC
ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন
       

Walton AC
Marcel Fridge