ঢাকা, রবিবার, ৭ ফাল্গুন ১৪২৩, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৭
Risingbd
অমর একুশে
সর্বশেষ:

সংস্কৃতিকে কলুষিত করবেন না

হাসান মাহামুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০২-১৩ ৭:৪৬:০৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০২-১৩ ৭:৪৬:০৭ পিএম

হাসান মাহামুদ : প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি আসলেই ভাষা আন্দোলন, সর্বস্তরে বাংলা চালু নিয়ে হাঁকডাক, ভাষা নিয়ে আলোচনা-টক শো-মতামত ইত্যাদি এন্তার চোখে পড়ে। এর আগেও একটি নিবন্ধে লিখেছিলাম, ভাষা আন্দোলনের প্রসঙ্গভাবনা বা অবতারণাকে আমরা এতোটাই ‘মৌসুমী’ বানিয়ে ফেলেছি; ভাষা সংক্রান্ত কোনো নিবন্ধ চোখে পড়লেই আমাদের সর্বপ্রথম মনে প্রশ্ন জাগে- এখন কী ফেব্রুয়ারি মাস? মোদ্দা কথা হচ্ছে, আমরা ধরেই নিতে পারি আমাদের জাতিগত অহঙ্কারের উপলক্ষ্য ভাষা আন্দোলনের বড় ট্র্যাজেডি ফেব্রুয়ারির কাছে ফাল্গুনের পরাজয়। আর সেই পরাজয়ের বোঝা দিন দিন ভারি হচ্ছে।

ভাষার মাস হিসেবে আমরা বাংলার পরিবর্তে ইংরেজি মাসটাই পালন করি। ফাল্গুনের পরিবর্তে ফেব্রুয়ারি, ৮ ফাল্গুনের পরিবর্তে ২১ ফেব্রুয়ারি। ইংরেজিপ্রীতি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ফেব্রুয়ারিতে ভাষার মাসের আবেদনের পরিবর্তে আকাশ সংস্কৃতি নিয়ে পড়েছি আমরা। আর এই কাজটি করছেন আমাদের কিছু ‘সো-কল্ড প্রগ্রেসিভরা’।

ভারতবর্ষে সবসময়ই একাধিক ভাষার চর্চা হয়েছে। বলা যায়, ভবিষ্যতেও হবে। স্বাধীন বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও কথাটি পুরোপুরি প্রযোজ্য। ইংরেজি শেখার সঙ্গে আমাদের বিরোধ নেই, কিন্তু স্বকীয়তা হারিয়ে শুধু ইংরেজিকে জাপটে ধরার মধ্যে কতটা মাহাত্ম রয়েছে তা ভাবার কি আদৌ সময় আসেনি?

সপ্তদশ শতাব্দিতে বৃটিশ শাসনামলে রাজা রামমোহন রায় ইংরেজি শিক্ষার প্রতি জোর দিয়েছিলেন। সেই থেকে ভারতবর্ষে ইংরেজি প্রচলনে ভিন্ন মাত্রা পায়। যদিও বাংলাপিডিয়ায় ইংরেজি ভাষা সর্ম্পকে বলা হয়েছে, বাংলায় ইংরেজি ভাষা আয়ত্ত করার ব্যাপারটি শুরু হয় সতেরো শতকের ত্রিশের দশকে, প্রথমে বালাসোর এবং পরে হুগলিতে ইংরেজদের কারখানা প্রতিষ্ঠার পরে। ১৬৫১ খ্রিস্টাব্দে সুলতান শাহ সুজা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উদ্দেশ্যে যে ফরমান জারি করেন, তার মাধ্যমেই বাংলা তথা ভারতীয় পক্ষে ইংরেজি ভাষা ব্যবহারেরও সূত্রপাত ঘটে।

ব্রিটিশ রাজত্বের মতো ইংরেজি এখন আর সরকারি ভাষা নয়, তবে বর্তমান বাংলাদেশ সরকার দেশে ও বিদেশে এর গুরুত্ব অনুধাবন করে একে শিক্ষার দ্বিতীয় মাধ্যম হিসেবে ঘোষণা করেছে। পাঠ্যবিষয় হিসেবে ইংরেজি এখন অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শেখানো হয় এবং প্রায় সকল পাবলিক পরীক্ষায় এটি একটি আবশ্যিক বিষয়।

স্বাধীন বাংলাদেশের শুরু থেকেই রাজনীতিক এবং নীতিনির্ধারকরা শিক্ষার পরিসরে বাংলা প্রচলনের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আশ্চর্য কারণে বাংলাদেশেই সকল স্তরের শিক্ষায় ‘বাংলা’ বাস্তবায়ন হয়নি। শিক্ষার মান ঠিক রাখা এবং প্রত্যাশা পূরণ করা বাংলাদেশে আজও খুব বড় চ্যালেঞ্জ।  হয়তো সে জন্য বাংলাও যোগ্য মর্যাদা পাচ্ছে না।

যাই হোক, ইংরেজির এই জয়জয়কারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরো তিনটি মোটা দাগের অনুষঙ্গ। পুরোদস্তুর একটি দেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং ইতিহাস পরিবর্তন করে দিতে যেগুলোকে মোক্ষম অস্ত্রই বলা যায়। প্রথমত, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। যাকে আমরা অনেকেই ‘আকাশ সংস্কৃতি’র কুফল বলে থাকি। বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে বিজাতীয় সংস্কৃতি খুব সহজেই ঢুকে যাচ্ছে, দেশীয় সংস্কৃতিকে কলুষিত করছে।

এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ১৪ ফেব্রুয়ারি ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’ উদযাপন। দ্বিতীয়ত, নিয়ন্ত্রণহীন এবং ব্যবহারবিধি ব্যতিরেকে সহজলভ্য সোস্যাল মিডিয়া ব্যবহারের প্রভাব। আমাদের ব্যক্তিগত, অফিসিয়াল, পারিবারিক এমনকি দাম্পত্য জীবনেও এই সোস্যাল মিডিয়া প্রবেশ করেছে। মহিলা অধিদপ্তরের শালিসী বোর্ড থেকে কয়েকদিন আগেও জানানো হয়েছে, আজকাল তালাক চেয়ে কিছু আবেদন পড়ে, যেখানে স্বামী-স্ত্রীর একে অপরের মধ্যে অবিশ্বাস ও সন্দেহপ্রবণতাকে চিহ্নিত করা হয়। আর এসবের জন্য তারা উদাহরণ হিসেবে সোস্যাল মিডিয়াকে দায়ী করেছেন। তৃতীয়ত, কর্পোরে মিডিয়ার অভূতপূর্ব উত্থান।

সোস্যাল মিডিয়া এবং কর্পোরেট মিডিয়ার এই উত্থানের প্রভাব সম্পর্কে পরবর্তী লেখায় আলোচনা করা হতে পারে।

বলা হচ্ছে, ফেব্রুয়ারি মাস শোকের মাস, ভাষার মাস। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। দেশের প্রায় সকল মিডিয়া ঘটা করে প্রচার করছে ফেব্রুয়ারি মাসে উদ্ভট কিছু দিবসের সংবাদ। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর অনুষ্ঠানে, পত্রিকাগুলোর ফিচার পাতায়, অনলাইনগুলোর প্রচ্ছদে গুরুত্বের সঙ্গেই স্থান পাচ্ছে এসব দিবস নিয়ে ধারকদের আবেগীয় ফিচার। যেন নতুন একটি তথ্য জানিয়ে ক্রেডিট নিচ্ছেন তারা।

কিন্তু একবারও ভাবছেন না, এই প্রচার আগামী দুয়েক বছরের মধ্যেই দেশীয় সংস্কৃতিতে প্রবেশ করতে পারে। এর পরিণাম আমাদের জন্য কোনো ভাবেই সুখকর হবে না। যেমন- ভ্যালেন্টাইন ডে বিষয়টাকে যেন আমাদের সংস্কৃতির অংশই বানিয়ে ফেলেছি। আর এখন হুজুগ উঠেছে ‘ভ্যালেন্টাইনস উইক’এর। ভ্যালেন্টাইন ডে সংস্কৃতিতে প্রবেশ করে যাচ্ছে, এটা না হয় অনিচ্ছাতেও মেনে নেওয়া হলো। কিন্তু তথাকথিত প্রগতিশীল ফিচার রাইটার আর সুশীলদের প্রতি অনুরোধ করছি, দয়া করে ভ্যালেন্টাইনস উইক নামের এই হুজুগ থামান। আমাদের সংস্কৃতির সাথে কোনো ভাবেই যায় না এটি।

এখানে একটি তথ্য জানিয়ে রাখা প্রয়োজন, সেটি হলো- এই ‘ভ্যালেন্টাইনস উইক’ বিষয়টি বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই পাশ্চাত্যে পালিত হয়ে আসছে। কিন্তু আমাদের সিনিয়র ভাইয়েরা কখনো এই বিষয়টি নিয়ে লেখেননি। কারণ, এসব বিষয় নিয়ে লেখা মানে, কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে উন্মাদনা জাগিয়ে দেওয়া। কিন্তু এখনকার ফিচার রাইটাররা এসব নিয়ে খুব একটা ভাবেন বলে মনে হয় না।

একবার দেখে নিন ‘ভ্যালেন্টাইনস উইক’ বলতে কি পালিত হয়। ৭ ফেব্রুয়ারি ‘রোজ ডে’, মানে গোলাপ বিনিময়ের দিন। এই দিনের মাধ্যমে সপ্তাহ শুরু। পরদিন ৮ তারিখ পালন হয় ‘প্রপোজ ডে’। এরপর ক্রমান্বয়ে চকলেট ডে, টেডি ডে, প্রমিজ ডে, হাগ ডে, কিস ডে এবং সবশেষ ১৪ ফেব্রুয়ারি- ভ্যালেন্টাইন ডে।

‘ভ্যালেন্টাইনস উইক’ এর দিনগুলোর মর্মার্থ এবার দেখে নিন। ৭ ফেব্রুয়ারি ‘রোজ ডে’তে ছেলে-মেয়ে গোলাপ বিনিময় করে। ভালোবাসার ফুল গোলাপ, ভালবাসার ভাষা বুঝতে ও বোঝাতে পারে গোলাপ- এটি চিরন্তন। একে অপরকে গোলাপ দিয়ে পছন্দের বিষয়টি জানান দেওয়ার পরদিন ‘প্রপোজ ডে’। একে অপরকে ভাললাগা-ভালবাসা নিবেদন করার দিবস। এরপর চকলেট ডে-তে সেই ছেলে-মেয়ে মিষ্টি মিষ্টি আলাপ করলো, টেডি ডে-তে ছেলেটি কিছু গিফট করলো, প্রমিজ ডে-তে একে অপরের কাছে প্রতিজ্ঞা করলো সবসময় পাশে থাকার। প্রতিজ্ঞা করার পরদিন তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরতে পারবে, কারণ এটি হাগ ডে। এর পরদিন তারা চুম্বন করতে পারবে- কারণ, রীতি অনুযায়ী সেদিন কিস ডে। তাহলে তার পরদিন ১৪ তারিখ ভ্যালেন্টাইন ডে- কোন সর্ম্পকটাতে ইঙ্গিত করে? এটি বুঝে নেওয়ার দায়িত্ব পাঠকের।

তবে শুধু যদি ভ্যালেন্টাইন ডে’র কথা বলা হতো, তাহলে ‘একটি ভালবাসার জন্য’, অন্তত এভাবে হলেও বিষয়টি মেনে নেওয়া যেত। কিন্তু ‘ভ্যালেন্টাইনস উইক’ এর এই ধারাবাহিকতা কোন সংস্কৃতির ধারক-বাহক? আমাদের পরিবারতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা এবং সমাজপ্রধান সংস্কৃতিতে এই অপসংস্কৃতি প্রবেশ করানো কোনো ভাবেই ঠিক হবে না। তাই, ভ্যালেন্টাইন নামের এই সপ্তাহটা আমাদের মিডিয়াগুলোতে প্রচার-প্রসার করা অনুচিত। কেউ কেউ হয়তো বলতে পারেন, এটি যুগের চাহিদা। না, এটি যুগের চাহিদা নয়। এটি বিজাতীয় সংস্কৃতি এবং নগ্নতার উপলক্ষ্য মাত্র। এটি কোনো ভাবেই প্রগতিশীল হতে পারে না।

আমরা এখনো একটি সামাজিক এবং পারিবারিক বন্ধনের মধ্যে বসবাস করছি। এই অবস্থায় সংস্কৃতিতে এই ‘ভ্যালেন্টাইনস উইক’ প্রবেশ করলে তার নেতিবাচক প্রভাবের পাশাপাশি বিষয়টির অপব্যবহারই হবে- এটা বলা যায়।

শিশুরাই দেশের নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৫১ শতাংশই শিশু। একবার ভাবুন, দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী কিংবা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আপনি-আমি কি রেখে যাচ্ছি? ফিচার লিখে বাহবা পাওয়ার জন্য, নতুন কোনো টপিক নিয়ে লিখে নিজের পাণ্ডিত্য জাহির করার জন্য আর যাই করুন, অপসংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দেওয়া কাম্য নয়।

‘প্রহরশেষের আলোয় রাঙা সেদিন চৈত্রমাস- / তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ ...’ এই চোখ দেখাটা কাব্যের চরণেই থাকতে দিন, দিনেদুপুরে রাস্তায় নামিয়ে আনবেন না।

লেখক: সাংবাদিক।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭/হাসান/তৈয়বুর/শাহনেওয়াজ