ঢাকা, শুক্রবার, ১০ চৈত্র ১৪২৩, ২৪ মার্চ ২০১৭
Risingbd
মার্চ
সর্বশেষ:

আফ্রিকায় দুর্ভিক্ষ : কতটুকু জানি আমরা

রুহুল আমিন : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৩-১২ ৬:২৫:৩৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৩-১২ ৬:২৫:৩৭ পিএম

রুহুল আমিন : আফ্রিকা মহাদেশে প্রচণ্ড খরা ও দুর্ভিক্ষ শুরু হয়েছে।  সোমালিয়া, চাদ, নাইজেরিয়া, নব্য স্বাধীন দক্ষিণ সুদানে কয়েক কোটি মানুষ দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত। ইয়েমেনও রয়েছে বিপর্যস্ত অবস্থায়।

এ ছাড়া কেনিয়া, উগান্ডা, রুয়ান্ডা, বুরুন্ডি ও তানজানিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশ মারাত্মক দুর্ভিক্ষের হুমকিতে রয়েছে। কেবল তানজানিয়াতেই ৭৮ শতাংশ মানুষ খাদ্য সংকটে আছে। খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে গবাদিপশু ও পাখিরও। এর সঙ্গে আছে পানিবাহিত নানা রোগের প্রাদুর্ভাব। গত সপ্তাহে দক্ষিণ সোমালিয়ায় অনাহারে এবং ডায়রিয়ায় অন্তত ১১০ জন মারা গেছে বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে খবর এসেছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী দুর্ভিক্ষপীড়িতদের জন্য আন্তর্জাতিক মহলে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন।

ওই সময় জাতিসংঘ এক প্রতিবেদনে বলেছিলো, সোমালিয়ায় প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ মারাত্মক খরা ও দুর্ভিক্ষের কারণে ব্যাপক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। তাদের জন্য অবিলম্বে মানবিক সাহায্য প্রয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা 'হু'ও সোমালিয়ায় বড় ধরনের দুর্ভিক্ষের ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছে।

আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে খরা ও দুর্ভিক্ষের কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রিন হাউজ গ্যাস এসব দেশের আবহাওয়ায় বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। তাই এই অঞ্চলে খরা ও দুর্ভিক্ষ দেখা দিচ্ছে। পরিস্থিতি দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি যুদ্ধ, অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং বাইরের ষড়যন্ত্রও এসব অঞ্চলের সংকটকে দীর্ঘায়িত করছে। এসব নানা কারণে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ অর্থনৈতিকভাবে বিকশিত হতে পারছে না।

যেমন ইয়েমেন, দক্ষিণ সুদান ও নাইজেরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে চলমান যুদ্ধবিগ্রহ জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে ফেলেছে। দ্রব্যমূল্য ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। খরায় পূর্ব আফ্রিকার কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ধ্বংসের পথে। এই চারটি অঞ্চলে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে দুই কোটি মানুষ মৃত্যু ঝুঁকিতে রয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে দক্ষিণ সুদানের কয়েকটি অঞ্চলকে দুর্ভিক্ষকবলিত ঘোষণা করা হয়। গত ছয় বছরের মধ্যে বিশ্বের কোনো দেশে এই প্রথম দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করা হয়। প্রায় এক লাখ মানুষ খাদ্যাভাবে রয়েছে, ১০ লাখেরও বেশি মানুষ দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে। আর ইউনিসেফ জানিয়েছে, দক্ষিণ সুদানের প্রায় ৫০ লাখ মানুষের জন্য জরুরিভিত্তিতে খাদ্যসামগ্রী প্রয়োজন।

আফ্রিকা মহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের খরা ও খাদ্যাভাব কয়েক বছর ধরে চলছে। ২০১১ সালে ইথিওপিয়া, কেনিয়া ও সোমালিয়ায় খরা এবং দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। আশঙ্কার বিষয় হলো জাতিসংঘের হুঁশিয়ারি থাকা স্বত্বেও বিশ্ববাসী সতর্ক হচ্ছে না দুর্ভিক্ষের বিষয়ে। তার প্রমাণ মেলে আন্তর্জাতিক মিডিয়ার দুর্ভিক্ষের খবর প্রচারের ক্ষেত্রে কৃপণতা দেখে। এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে আফ্রিকায় দুর্ভিক্ষ সম্পর্কে উল্লেখ করার মতো কোনো সংবাদ আসেনি। সোমালিয়ায় ১১০ জনের মৃত্যুর খবরও আসে জাতিসংঘের ঘোষণার পর।

আফ্রিকার বিস্তৃর্ণ অঞ্চলে ভয়াবহ আকারে দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়ার আগেই ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যান্য সংবাদের পাশাপাশি খরা ও দুর্ভিক্ষের সংবাদও গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করতে হবে। আফ্রিকার বর্তমান অবস্থার পেছনে প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি মানবসৃষ্ট কারণও রয়েছে যথেষ্ট। জাতিগত সংঘাত আফ্রিকার নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। তবে জলবায়ুর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। কিন্তু আফ্রিকা অঞ্চলের দেশগুলোর দ্বারা জলবায়ুর কতটুকু ক্ষতি হয়? যে পরিমাণ ক্ষতি হয় উন্নত বিশ্ব দ্বারা। তবে ভুক্তভোগী কিন্তু আফ্রিকার অসহায় মানুষ। হয়তো সাহায্য দিয়ে সাময়িকভাবে খরায় আক্রান্ত ও দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষগুলোকে বাঁচানো সম্ভব। কিন্তু এই সমাধান বেশিদিন স্থায়ী হবে না। কয়েক দশক ধরে চলা দুর্ভিক্ষদশা দূর করতে হলে সমস্যার শেকড় খুঁজে বের করতে হবে। দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের জন্য সমস্যার মূল খুঁজে বের করতে হবে। জলবায়ুর ওপর বিরুপ প্রভাব বিস্তার করা বিশ্বব্যাপী চলা প্রকল্পগুলোর ব্যাপারে বিশ্ব রাজনীতিকদের ভাবনা জরুরি।

আন্তর্জাতিক মিডিয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের মিডিয়াগুলোতেও আফ্রিকার দুর্ভিক্ষের খবর তেমন একটা চোখে পড়ে না। গত সপ্তাহে সোমালিয়ায় দুর্ভিক্ষের খবর এলেও আফ্রিকার অন্যান্য অঞ্চলের ভয়াবহ অবস্থার চিত্র আসেনি। বিজ্ঞানের উৎকর্ষতায় মানুষ মহাশূন্যে আস্তানা গড়ার স্বপ্ন দেখছে। মঙ্গলে প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজে সেখানে বসবাসের চেষ্টা করছে। অথচ পৃথিবীতে বসবাসরত মানুষের খোঁজ খবর রাখছে না। চারদিকে পুঁজির ডামাডোল। এটা মানব ইতিহাসের জন্য লজ্জাকর অবস্থা।

জাতিসংঘ শুধু হুঁশিয়ারি আর সাহায্যের আহ্বান জানিয়ে তাদের দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না। নিতে হবে যথাযথ পদক্ষেপ। উদ্যোগী হয়ে এগিয়ে আসতে হবে আফ্রিকার বিশাল অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের প্রাণ বাঁচাতে। তবেই প্রকৃত শান্তি বিরাজ করবে। আর না হয় শান্তি কেবল স্লোগানেই আটকে থাকবে।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১২ মার্চ ২০১৭/রুহুল/শাহনেওয়াজ

Walton Laptop