ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৬ আশ্বিন ১৪২৪, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

এরদোয়ানের তুরস্ক : বিক্ষুব্ধ অঞ্চল ।। মার্ক লোয়েন

মার্ক লোয়েন : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৪-১৯ ৮:৫৫:৫০ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৪-১৯ ১০:০৮:২৩ পিএম

(কী হচ্ছে তুরস্কে? কী আছে তার ভাগ্যে? তুরস্ককে কোথায় নিতে চাইছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান? এসব জানতে পড়ুন বিবিসির তুরস্ক প্রতিনিধি এমি অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্ত সাংবাদিক মার্ক লোয়েনের বিশ্লেষণাত্মক লেখা। আজ থাকছে তৃতীয় পর্ব। ভাষান্তর করেছেন- রাসেল পারভেজ )

রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের তুরস্কে চলমান ঘটনা প্রবাহে দুটি বিষয় বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে। এক. নতুন করে তিন মাস জরুরি অবস্থা জারি। দুই. গণভোটে জেতায় এরদোয়ানকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিনন্দন।

ট্রাম্পের অভিনন্দন এরদোয়ানের জন্য বৈশ্বিক স্বীকৃতির ভিত্তি রচনা করেছে। কিন্তু ইউরোপের নেতা ও পর্যবেক্ষকরা মারাত্মকভাবে বিভক্ত হয়ে পড়া তুরস্কে বিরোধীদের দাবি আমলে নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। বিরোধীরা দাবি করেছে, ভোট পুনর্গণনার। এর ফলে তুরস্ক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অবস্থানগত পার্থক্য এখন জলের মতো পরিষ্কার। প্রশ্ন উঠেছে, তুরস্ক তবে কি নতুন সংকটের মুখে পড়েছে? এর উত্তর পেতে মার্ক লোয়েনের ধারাবাহিক বিশ্লেষণের দিকে তাকানো যাক।

দ্বিতীয় পর্বের পর থেকে : ইস্তাম্বুলের গেজি পার্ক শহরের মধ্যে একটি বিরল সবুজ স্থান, যা কনক্রিট দিয়ে ঘেরা। ইস্তাম্বুলের ঐতিহাসিক কেন্দ্রস্থল তাকসিম স্কয়ারের পাশে পার্কটি যেন বৃক্ষ আর তৃণের স্বর্গ। যদিও গার্ড়ির হর্ন কানে জ্বালা ধরায়।

গেজি পুরস্কারজয়ী কোনো পার্ক নয়। তবে ২০১৩ সালের এক মধ্যরাতে ঐতিহাসিক গুরুত্ববাহী হয়ে ওঠে এটি। পার্ক তুলে দিয়ে এ স্থানে সরকার বৃহৎ শপিংমল গড়ে তোলার ঘোষণা দেওয়ার পর এরদোয়ানের নেতৃত্বের জন্য এটি অন্যরকম টার্নিং-পয়েন্টের প্রতীক হয়ে ওঠে।

বেশ কয়েকজন পরিবেশবাদী সরকারের এ পরিকল্পনার বিরোধিতা করে পার্কে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান নিয়ে তাদের প্রতিবাদ জানায়। ২৮ মে ভোরে পুলিশ তাদের তাবু জ্বালিয়ে দেয় এবং তাদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে।



এই সেই পার্ক, যেটি আধুনিক তুরস্কের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পথবিক্ষোভে আগুন ধরিয়ে দেয়।

গেজি পার্ক নিয়ে বিক্ষোভকারী এক প্রকাশক ফোটি বেনলিসয় বলেন, ‘এটি (পার্ক) শক্তি জোগাচ্ছিল।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা বুঝতে পারছিলাম, ইতিহাস সৃষ্টি করছি আমরা।’

পুলিশি সহিংসতা সত্ত্বেও লাখ লাখ মানুষ তুরস্কজুড়ে বিক্ষোভে নেমে আসে। তাদের কাছে বিক্ষোভের প্রকৃত অর্থ ছিল আরো বেশি কিছু।

এরদোয়ান কম বয়সে ইউরোপপন্থি সংস্কারবাদী থাকলেও ক্রমেই তিনি কর্তৃত্ববাদী চেহারায় হাজির হতে থাকেন।

উৎসবের আমেজে আন্দোলনমুখর হয়ে ওঠে গেজি পার্ক। এ ধরনের পরিস্থিতি অন্যান্য অঞ্চলেও দেখা যায়। এ বিক্ষোভে পরিবেশবাদীদের সঙ্গে যোগ দেয় বামপন্থি, ফুটবল ফ্যান, কুর্দি ও অন্যক্ষেত্রের লোকজনও। বেশি দিন না হলেও বিভিন্ন মতাদর্শের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ধারক হয়ে ওঠে পার্কটি।

কিন্তু তাকসিম স্কয়ারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভ সম্পর্কে ফোটি বেনলিসয় বলেন, এটি ছিল বিক্ষুব্ধ মানুষের অঘোষিত জোট।



ভবন বানানো, উন্মুক্ত স্থানগুলোর বাণিজ্যিকীকরণ, এরদোয়ানপন্থি ব্যবসায়ীদের হাতে টেন্ডার তুলে দেওয়াসহ নানা কারণে ক্ষমতাসীন একে পার্টির আগ্রাসী নগর পরিকল্পনায় ক্রমেই অসন্তোষ বাড়তে থাকে। যদিও এসবের বিরোধিতা করে আসছিল একাংশের নারী, এলজিবিটি, ছাত্রসমাজ ও সামাজিক অধিকারকর্মীরা।

রক্ষণশীলতা ক্রমেই চড়াও হতে থাকে। মদ বিক্রি ও গর্ভপাতের বিরুদ্ধে কড়াকড়ি আরোপ করে সরকার। নারীদের আরো বেশি সন্তান নেওয়ার আহ্বান জানান প্রেসিডেনট এরদোয়ান।

তুরস্কের সবচেয়ে বড় মসজিদ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। তবে অভিযোগ ছিল, সংরক্ষিত বনভূমিতে এ মসজিদ নির্মাণ করা হচ্ছে এবং এটি ইস্তাম্বুলের আকাশ শাসন করবে।

সরকারের কিছু লোকজন বিক্ষোভকারীদের প্রতি নমনীয় হলেও প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান আরো শক্ত হন। তিনি তাদের ‘লুটেরা’ হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং অভিযোগ করেন, তারা মসজিদে বসে মদ পান করেছেন। তবে ওই মসজিদের ইমান এ ধরনের অভিযোগ পরে প্রত্যাখ্যান করেন।

বেনলিসয় বলেন, এরদোয়ানের প্রথম দিককার শাসনামলে গণতান্ত্রিক, উদারপন্থি, বামপন্থি ও কুর্দিরা আকৃষ্ট হন। তবে গেজির বিক্ষোভের পর তার কথাবার্তায় তুরস্কের একাংশের মানুষের বিরুদ্ধে অপরাংশের মানুষের আধিপত্যের বিষয়টি উঠে আসে। তার সমর্থনকারীদের রক্ষা করে অন্যদের বিরুদ্ধে বিবাদে জড়িয়ে পড়েন তিনি।

এরদোয়ানের প্রতি সমর্থন ও বিরোধিতার মেরুকরণ আরো ঘনীভূত হয়, যখন দুর্নীতিবিষয়ক তার ফোনালাপ ফাঁস হয়। ২০১৩ সালের শেষ দিকে তিনি ও তার ঘনিষ্ট সহযোগীরা দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হন। কিন্তু তিনি কঠোর ভাষায় এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন।

অটোম্যান সাম্রাজ্যের আমলে তুরস্ককে যেভাবে দেখা হতো, সেই ভাবধারা দাঁড় করাতে চেষ্টা করেন এরদোয়ান। তুরস্কে একটি পুরোনো প্রবচন আছে- ‘একজন তুর্কির একমাত্র বন্ধু একজন তুর্কিই।’ বিষয়টি এরদোয়ানের সময় আবার সামনে উঠে আসে।

তখন প্রতি সপ্তাহেই নতুন ‘ষড়যন্ত্রমূলক তত্ত্ব’ দাঁড় করানো হচ্ছিল। ক্ষমতার প্রতি ক্রমেই লিপ্সীত হয়ে ওঠা প্রধানমন্ত্রী (এরদোয়ন) নিজ দলে ভিন্নমত পোষণকারীদের যখন তখন বহিষ্কার করছিলেন ও দূরে ঠেলে দিচ্ছিলেন।

বাকস্বাধীনতাকে চরমভাবে কোণঠাঁসা করা হয়। এরদোয়ানের প্রথম বছরগুলোর অগ্রগতি থমকে যায়। সমালোচনাকারী সাংবাদিক, লেখক ও শিল্পীদের ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ হিসেবে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করা হয়।

তুরস্কে বর্তমানে ১৫০ জন সাংবাদিক হয় জেলে না হয় বিচারের মুখে রয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন ওরেল অনদেরোগ্লু। তিনি দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণমূলক সংগঠন রিপোর্টার্স উইথআউট বর্ডার-এর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন। ‘বিশ্ব গণমাধ্যম স্বাধীনতা দিবস’ উপলক্ষে কুর্দিদের পত্রিকা অজগুর গানডেম-এর একটি সম্পাদকীয় বৈঠকে অংশ গ্রহণ করেন তিনি।

পত্রিকাটির বিরুদ্ধে কুর্দিদের হয়ে ‘সন্ত্রাসী অপপ্রচার’ ছড়ানোর অভিযোগ আনে সরকার এবং এটি বন্ধ করে দেয়। সরকারি কৌঁসুলিরা এখন চাইছেন, এ অভিযোগে ওরেল অনদেরোগ্লুর ১৪ বছরের সাজা হোক। এ বিষয়ে অনদেরোগ্লুর ভাষ্য হলো : এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আমরা চাইছিলাম, ইউরোপীয় পরিবারের সদস্য হোক তুরস্ক। কিন্তু এরপর গুপ্তঘাতকের মতো ন্যক্কারজনকভাবে হাতকড়া পরানো হলো আমাকে।



দশ দিন কারাভোগ করেছেন অনদেরোগ্লু এবং জুলাইয়ে বিচারের মুখোমুখি হন। কঠিন সেই সময়ের কথা মনে করে তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে। তিনি বলেন, আমার স্ত্রী ও ছেলে আমার সঙ্গে দেখা করতে এলে মধ্যে কাঁচের দেয়াল রেখে আমাকে কথা বলতে দেওয়া হয়। তখন আমি বুঝেছিলাম, আমার সঙ্গে কতটা অবিচার করা হচ্ছে।

ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান চেষ্টার পর থেকে বহু গণমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ‘সন্ত্রাসীদের পক্ষে অপপ্রচার’ ও ‘প্রেসিডেন্টের মর্যাদাহানী’র অভিযোগ এনে বিভিন্নভাবে সাংবাদিকদের অভিযুক্ত করা হয়েছে।

তুরস্কের সবচেয়ে প্রাচীন মূলধারার সংবাদপত্র কামহুরিয়াত-এর কার্যালয়ে অভিযান চালানো হয় এবং সম্পাদকদের গ্রেপ্তার করা হয়। আর যেসব সাংবাদিক এরদোয়ানের বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় তুলতেন তাদের অনেকে দেশ ছেড়ে চলে যান অথবা কারাবন্দি হন।

এরদোয়ান দাবি করেন, তুরস্কের গণমাধ্যম বিশ্বে সবচেয়ে বেশি স্বাধীন। আবার এ-ও বলে থাকেন, যারা কারাগারে আছেন তারা সাংবাদিক নয়, তারা হয় সন্ত্রাসী, চোর নয়তো শিশুদের যৌননিগ্রহকারী।

অনদেরোগ্লু দাবি করেন, তুরস্কের ৮০ শতাংশ গণমাধ্যম এরদোয়ান নিয়ন্ত্রণ করেন। এ পরিস্থিতি মোকাবিল করে কাজ করেন সাংবাদিকরা। এরদোয়ানের বিরুদ্ধে কোনো সমালোচনাকে রাষ্ট্রবিরোধী সমালোচনা হিসেবে ধরা হয়। আমাদের পেশার সংজ্ঞা বিভিন্ন কায়দায় তুরস্কের অভিধান থেকে মুছে ফেলা হয়েছে।

দ্বিতীয় পর্ব : এরদোয়ানের তুরস্ক : পূণ্যভূমি।। মার্ক লোয়েন
প্রথম পর্ব : এরদোয়ানের তুরস্ক : টার্নিং পয়েন্ট ।। মার্ক লোয়েন



রাইজিবিডি/ঢাকা/২০ এপ্রিল ২০১৭/রাসেল পারভেজ

Walton Laptop