ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২৩ নভেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:
তিব্বতের স্বাধীনতার দাবি ত্যাগ করলেন দালাই লামা        সর্বত্র বাংলা ভাষার প্রচলনে হচ্ছে ‘ভাষানীতি’        ‘রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন মানবতাবিরোধী অপরাধ’        কেরানীগঞ্জে ৩০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র করবে যুক্তরাষ্ট্র        ‘গণতন্ত্র অব্যাহত রাখতে সেনাবাহিনী অবদান রাখবে’        মির্জা ফখরুলের দুই মামলা হাইকোর্টে স্থগিত        রোহিঙ্গা ফেরতে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর        ২ কোটি টাকার বেশি থাকলে দিতে হবে সারচার্জ        মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার হুমকি যুক্তরাষ্ট্রের        মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক চায় চীন       

ঈদ না ইদ || অধ্যাপক ড. রতন সিদ্দিকী

অধ্যাপক ড. রতন সিদ্দিকী : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৬-২৭ ৮:১৭:১৫ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৯-০৬ ১:৩৩:১৬ পিএম

সাম্প্রতিক সময়ে ঈদ না ইদ লেখা হবে- এ নিয়ে বিস্তর বিতর্কের সূচনা হয়েছে। এ বিতর্কের জন্মকরণ বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মহোদয়ের মন্তব্য। তিনি বলেছেন ‘ইদ’ লিখতে। অমনি ঈদের পক্ষের মানুষেরা সংক্ষুব্ধ হয়ে মাঠ গরম করে ফেলেছেন। অন্যদিকে ইদ পক্ষও চুপ করে বসে নেই। এমন এক উত্তপ্ত ময়দানে লড়াই-এ নামতে হলো আমাকে সাহিত্য সম্পাদকের অনুরোধে। যখন নেমেছি তখন বলতে দ্বিধা নেই- আমি ইদের পক্ষে। দ্ব্যর্থহীনভাবে পক্ষে।

মূদ্রণযন্ত্র প্রবর্তনের পূর্বে লিপিকরদের ইচ্ছাকৃত বানান ব্যবহারের কারণে যে বাবান বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছিল তাই পরবর্তীকালে বাংলা বানানে বিচিত্র বিভ্রান্তির জন্ম দেয়। সে কারণে একই শব্দের একাধিক বানান প্রচলিত হয়েছে। ফলে সঠিক বানান নিয়ে তৈরি হয় সংশয়। এ সংশয় দূরিকরণের জন্য ১৯৩৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় রাজশেখর বসুকে সভাপতি ও চারুচন্দ্র ভট্টাচার্যকে সম্পাদকীয় দায়িত্ব দিয়ে একটি কমিটি গঠন করে। তাঁরা ১৯৩৬ সালের ৮ মে ‘বাংলা বানানের নিয়ম’ নামে কতিপয় প্রস্তাব পেশ করেন। তাঁদের প্রস্তাবসমূহের বিরোধীতা করেছেন অনেকে। আবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো মনীষীরাও প্রস্তাবের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। অবশেষে ১৯৩৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সেই প্রস্তাবনা বাংলা বানানের নিয়ম নামে প্রকাশ করে। ঐ সময়ে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ও প্রকাশ করে চলতি ভাষার বানান। প্রায় একই বাংলা বানানের এ দুটো নিয়ম চলতে থাকে।

এরপর ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ ও ১৯৭১ সালে বাঙালির স্বাধীনতা লাভ। স্বাধীন বাংলাদেশে বাংলা বানানের নিয়মাবলি করার প্রথম উদ্যোগ নেয় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড। ১৯৮৮ সালে জাতীয় কর্মশালার মাধ্যমে তারা প্রণয়ন করে বাংলা বানানের নিয়মাবলি। যা কেবল প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকে অনুসৃত হয়। এরপর উদ্যোগ গ্রহণ করে বাংলা একাডেমি। তারা বাংলা বানানের সমতা বিধানের জন্য প্রণয়ন করে প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম। যার সর্বশেষ সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে ২০১২ সালে।

এই যে ১৯৩৫ সাল থেকে বাংলা বানানের নিয়মাবলি প্রচলনের প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছে সেখানে বারংবার বলা হয়েছে- ‘সকল তৎসম অর্থাৎ তদ্ভব, দেশি, বিদেশি, মিশ্র শব্দে কেবল ই এবং উ এবং এদের কারচিহ্ন ব্যবহৃত হবে।’ যেমন- আরবি, ইমান, ইদ, উনিশ, কাহিনি, গাড়ি, দাদি, পাখি, শহিদ ইদ্যাদি। এক সময় আরবী (আরবি), ঈমান (ইমান), ঊনিশ (উনিশ), কাহিনী (কাহিনি), গাড়ী (গাড়ি), শহীদ (শহিদ) লেখা হতো। আমরা পূর্বের প্রচলিত বানানের স্থলে নতুন নীতিমালায় প্রবর্তীত বানানগুলি লিখতে অভ্যস্থ হয়েছি। বর্তমানে মনে নিয়ে মেনেও নিয়েছি। তা হলে ‘ইদ’ বানান লিখতে সমস্যা কোথায়? মানতে অসুবিধা কোথায়?

ইদ শব্দটি আরবি শব্দ। অর্থাৎ অতৎসব বা বিদেশি শব্দ। সেক্ষেত্রে ‘ই’ ব্যবহৃত হওয়াই যুক্তিসঙ্গত। উল্লেখ্য আরবি বিশেষ্য শব্দ ‘ইদ’ ও ফরসি ‘গাহ’ শব্দ মিলে ইদগাহ। যা বর্তমানে ইদগা (ইদের নামাজ পড়ার স্থান) হিসেবে প্রচলিত হয়েছে। বানানবিধি অনুযায়ী ইদ শব্দটিই শুদ্ধ। এটিই লেখা উচিৎ। তবে এ কথা সত্য বহুবছর ধরে ঈদ লিখে অভ্যস্থ হওয়ার কারণে ইদ লিখতে মন প্রস্তুত নয়। তাই বিতর্কের জন্ম হয়েছে। এমন অপ্রস্তুত মনের দ্বান্দ্বিকতা এক সময় পাখি, বাড়ি, গাড়ি, দাদি, সরকারি লেখার ক্ষেত্রেও ঘটেছিল। বর্তমানে তা সয়ে গেছে। বিশ্বাস রাখছি ইদ বানান এক সময় আমাদের মনও মনে নেবে। নতুনকে মানবার জন্য মনকে তৈরি হতে দিতে হয়। আমাদের সকলের মন তৈরি হচ্ছে। এখনও সম্পূর্ণ প্রস্তুত হতে পারেনি।

এক সময়  Dacca এর পরিবর্তে Dhaka, পিকিং এর পরিবর্তে বেইজিং, বার্মার পরিবর্তে মায়ানমার, Calcutta পরিবর্তে Kolkata মেনে নিতে আমাদের খুব কষ্ট হয়েছে। পরে মেনেও নিয়েছি এবং মনেও নিয়েছি। আশা করছি ইদ বানান এক সময় মেনেও নেব, মনেও নেব। আর ইদ বানান ‘ইদ’ লিখলে উৎসবের আনন্দে একচুলও ঘাটতি হবে না। তাই ইদ, ঈদ নয়।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৭ জুন ২০১৭/তারা

Walton
 
   
Marcel