ঢাকা, শুক্রবার, ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২৪ নভেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

আন্তর্জাতিক রাজনীতির বলি হবে রোহিঙ্গারা?

শাহেদ হোসেন : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৯-০৬ ৭:২৫:৪০ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৯-০৬ ১১:৪৮:৪৭ এএম

শাহেদ হোসেন : এক দশক আগে আমার একটি ঈদ অনুষ্ঠানের জন্য গীতিকার বন্ধু  তুহিন  একটি গান লিখেছিল, যার মধ্যে একটি লাইন ছিল না-মানুষই সব, না-মানুষই সব। আমি বেশ অবাক হয়ে ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম- অমানুষকে না-মানুষ বানালে কেন? একটু উষ্মার সঙ্গেই ও জবাব দিয়েছিল, ‘বধির-অনুভূতিহীন-জান্তব মানুষদের জন্য স্বরবর্ণের প্রথম বর্ণটি আমি বসাতে চাই না।’ আদতে কেবল আমরা নয়, গোটা বিশ্বই যে বধির আর না-মানুষদের কাতারে মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের নির্যাতনের চিত্র চোখে আঙ্গুল দিয়েই দেখিয়ে দিচ্ছে।

মিয়ানমারে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের সংখ্যাটা কত? আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হিসেবে ঝেড়েমুছে ১০ লাখ। ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্ষুদ্রসংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তিলে তিলে নিশেঃষ করে দেওয়ার কাজটি করে যাচ্ছে মিয়ানমার সরকার। আগে করতো সামরিক জান্তা, এখন করছে গণতন্ত্রী সরকার, যার প্রধান আবার শান্তিতে নোবেল বিজয়ী। আরো দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, দশকের পর দশক ধরে বিশ্ব শান্তিরক্ষার ইজারা নেওয়া পশ্চিমা দেশগুলোসহ সারা পৃথিবী নীরব দর্শকের মতো রোহিঙ্গা নির্যাতন দেখে যাচ্ছে। না-মানুষদের মতোই স্বেচ্ছাবধির সেজে বসে আছেন মুসলিম বিশ্বের নেতারা। এমনকী মিয়ানমারের অন্য প্রতিবেশী শক্তিশালী দুই দেশ ভারত-চীন রীতিমতো চোখে ঠুলি দিয়ে বসে আছে। যেখানে প্যারিস কিংবা ক্যালিফোর্নিয়ায় সন্ত্রাসী হামলা হলে ফুঁসে ওঠে পুরো বিশ্ব, সেখানে ‘জাতিগতভাবে নির্মূলের’ শিকার রোহিঙ্গাদের বেলায় এতোটা নির্লিপ্ততা কেন ?

প্রতিবেশী ভারতের ব্যাপারটা দিয়েই শুরু করা যাক। প্রতিদিন চোখের সামনে মৃত্যুর বিভীষিকা দেখে হাজার হাজার  রোহিঙ্গা যখন বাংলাদেশে আসছে সেখানে ভারত সে দেশে আশ্রয় নেওয়া ৪০ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। হিন্দুস্তান টাইমসের সহযোগী সম্পাদক প্রশান্ত ঝাঁ গত জানুয়ারিতে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের নীরবতার বিষয়ে একটি নিবন্ধ লেখেন। এতে তিনি ঐতিহাসিকভাবে মিয়ানমারের সঙ্গে ভারতের দ্বিধান্বিত নীতি নিয়ে গবেষণা করেছেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান কার্নেগি ইন্ডিয়ার কনস্ট্যানটিনো জেভিয়ার।

জেভিয়ার বলেছেন, বঙ্গোপসাগর থেকে চীনকে দূরে রাখা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সংযুক্তির ক্ষেত্রে মিয়ানমারের গুরুত্ব রয়েছে। তা ছাড়া প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দেশের মানুষের কাছেও রোহিঙ্গা ইস্যুটি বাংলাদেশের হিন্দু নির্যাতনের মতো ঘটনার চেয়ে অনেক কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

প্রকাশ ঝাঁ রোহিঙ্গাদের ইস্যুতে নয়া দিল্লির নীরবতার অন্যতম কারণ হিসেবে বলেছেন, এখানে ভারতের নিরাপত্তার স্বার্থও রয়েছে, যা নির্ভর করছে মিয়ানমারের শাসকদের সদিচ্ছার ওপর। ২০১৫ সালে মণিপুরে নিরাপত্তা বাহিনীর বহরের ওপর নাগা বিদ্রোহীদের হামলার ঘটনা ঘটে। এরপর ভারতীয় বাহিনী ইয়াঙ্গুনের নীরব সম্মতিতে মিয়ানমারের সীমান্তে গোপন অভিযান চালায়। এই সমঝোতা ক্ষতিগ্রস্ত হোক ভারত তা চায় না।

এতো গেল ভারতের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত স্বার্থ। মিয়ানমারের সঙ্গে ভারতের অর্থনৈতিক স্বার্থও জড়িত আছে। রাখাইন রাজ্যের সিতওয়েতে একটি এলএনজি টার্মিনাল তৈরি করার কথা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে ভারত। এটি মিয়ানমারের জ্বালানি পণ্য চাহিদা পূরণে সহায়ক হবে । মিয়ানমারে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সংরক্ষণাগার ও বিতরণকেন্দ্র তৈরির চেষ্টাও করছে ভারত। তাই স্বভাবতই মিয়ানমার সরকার বিরাগভাজন হয় এমন কোনো কিছুই করতে চাইবে না ভারত- চাই সেটা রোহিঙ্গাদের জাতিগত নির্মূলই হোক না কেন।

মিয়ানমার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক জোট আসিয়ানের সদস্য। এই জোটে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ব্রুনাইয়ের মতো তিনটি মুসলিম দেশ রয়েছে। অথচ রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে এই তিনটির কোনো দেশই এ পর্যন্ত আসিয়ানে কোনো প্রস্তাব আনেনি। এমনকি গত এপ্রিলে ৩০তম আসিয়ান সম্মেলনে এ ব্যাপারে কোনো টু শব্দও করেনি সদস্য দেশগুলো।

গত বছর অক্টোবরে রোহিঙ্গা নির্যাতনের পরিপ্রেক্ষিতে মালেয়েশিয়ার ইসলামপন্থি দলগুলো ব্যাপক বিক্ষোভ করে। ডিসেম্বরে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ডাকা সমাবেশে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক রোহিঙ্গা নির্যাতনের নিন্দা জানিয়ে বলেছিলেন, ‘তাদের (রোহিঙ্গা) আমাদের রক্ষা করতেই হবে। তারা আমাদের মুসলমান ভাই, তাদের জীবনের মূল্য আছে। ’ ওই সমাবেশের কয়েক মাস আগেই নাজিবের বিরুদ্ধে ওয়ানএমডিবি ফান্ড কেলেঙ্কারিতে নাজিবের রাজনৈতিক পদ টলটলায়মান হয়ে উঠেছিল। ওই বক্তব্য যে স্রেফ সস্তা জনসমর্থণ অর্জনের জন্য ছিল তা পরবর্তীতে নাজিব সরকারের নিস্তেজ পদক্ষেপেই বোঝা গিয়েছিল।

আসিয়ানের আর দুটি মুসলিম দেশের মধ্যে ইন্দোনেশিয়া কদাচিৎ বিবৃতি দিয়েই খালাশ। আঞ্চলিকভাবে অপেক্ষাকৃত ধনী দেশ হলেও ব্রুনেই এ পর্যন্ত রোহিঙ্গা ইস্যুতে টু শব্দও করেনি।

মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো তাদের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার ও ঘর সামাল দিতেই বেশি ব্যস্ত। আরব অঞ্চলেই অবস্থিত ফিলিস্তিন ইস্যুতেইতো তাদের নীরবতা হতাশাজনক। সেখানে তারা আবার রোহিঙ্গা ইস্যুতে কথা বলবে তা আশা করা বাতুলতা মাত্র।

মিয়ানমারের সঙ্গে বিশাল সীমান্ত এলাকা রয়েছে চীনের। সেই চীন কি রোহিঙ্গা ইস্যুতে কথা বলেছে? উত্তর হচ্ছে-না। এর কারণ হচ্ছে মিয়ানমারের বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার হচ্ছে চীন। মিয়ানমার থেকে কাঠ, স্বর্ণ ও মূল্যবান পাথর আমদানি করে চীন। আর মিয়ানমারও চায় চীন থেকে বিদ্যুৎ ও অস্ত্র আমাদানি করতে। গত এপ্রিলে মিয়ানমারের সঙ্গে অপরিশোধিত তেলের পাইপলাইন নির্মাণ নিয়ে সমঝোতাও হয়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মিয়ানমারের সঙ্গে চীনের ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্য হয়েছে। এছাড়া আঞ্চলিক ক্ষমতার প্রাধান্য বিস্তারেও মিয়ানমারকে বড় একটি মাধ্যম বিবেচনা করে চীন।

ভারতের সঙ্গে টক্কর দিতে রাখাইন রাজ্যের কিয়াকফু এলাকায় বঙ্গোপসাগরে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করতে চায় বেজিং। তাই রোহিঙ্গা ইস্যুতে নেপিদকে কখনোই চাপ দেয়নি চীন, আর ভবিষ্যতে দেওয়ার সম্ভাবনাও ক্ষীন। বরং গত মাসে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে চীন মন্তব্য করেছে, এটি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যা, যা তাদের নিজেদেরই সমাধান করতে হবে।

গণতন্ত্রের তল্পিবাহক পশ্চিমা বিশ্বের নীরবতাও এ ক্ষেত্রে চোখে পড়ার মতো। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজের পতন দাবির আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষে ২/১ জন বিদ্রোহীর মৃত্যু হলে যুক্তরাষ্ট্রের মুখ থেকে নিন্দার তুবড়ি ছোটে। অথচ বছরের পর বছর ধরে হাজার হাজার রোহিঙ্গা যেখানে নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়ে মরছে সেখানে যুক্তরাষ্ট্র চুপ কেন? গত বছর অক্টোবরে রাখাইনে যখন রোহিঙ্গা হত্যাযজ্ঞ ও বিতাড়ন চলছে, যুক্তরাষ্ট্র তখন মিয়ানমারের ওপর আরোপিত থাকা কঠোর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে।

১৯৮৯ সালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে দরিদ্র দেশগুলোর জন্য দেওয়া বাণিজ্য সুবিধার তালিকা থেকে মিয়ানমারকে বহিষ্কার করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। অথচ যখন মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন চলছে তখনই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সুর তুলে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করলো ওবামা প্রশাসন। আদতে যতোটা গণতন্ত্রপ্রীতি তার চেয়ে অনেক গুন বেশি আর্থিক ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার নিয়েই বেশি চিন্তিত ছিল ওবামা প্রশাসন।

বুশ আমলে জারি করা নিষেধাজ্ঞার কারণে মার্কিন ব্যবসায়ীরা মিয়ানমারের তেল-গ্যাস আর মূল্যবান পাথরের মতো খনিজ সম্পদ খাতে বিনিয়োগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল। অথচ চীন সেখান থেকে মুনাফা তুলে নিচ্ছে। এটাতো বরদাশত করা যায় না। ভূকৌশলগত কারণে মিয়ানমারের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চীনের সবচেয়ে বেশি প্রভাব রয়েছে মিয়ানমার ও উত্তর কোরিয়ার ওপর।

‘ত্যাড়া’ উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক স্বাভাবিক সম্ভব নয়। তাই বলে সম্ভাবনাময় মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করলে সেই ক্ষতি হয়তো কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া যাবে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রকে তার প্রশান্ত মহাসাগর ও মধ্যপূর্বাঞ্চলের  সামরিক ঘাঁটিতে সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখতে মালাক্কা প্রণালী হয়ে যেতে হয়। এই যাওয়ার পথে মিয়ানমারের অবস্থানের কারণে বঙ্গোপসাগরে ঘাঁটি গড়ার চেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের বহুদিনের লালায়িত স্বপ্ন।

ব্যক্তির পক্ষে স্বার্থপরতা থেকে সরে এসে মানবতার পতাকা উড্ডিন করা সম্ভব। তবে রাষ্ট্রের পক্ষে, বিশেষ করে ক্ষমতাধরদের বেলায় এটি বেশ কঠিন। রোহিঙ্গাদের বেলাতেও তাই ক্ষমতাধর দেশগুলো নীরব ভূমিকা পালনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তবে মানবতাকে পাশ কাটিয়ে স্রেফ স্বার্থের মোহে এই নীরবতা কতদিন অবলম্বন করবে তাই এখন দেখার বিষয়।

 

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৫ সেপ্টেম্বর ২১০৭/শাহেদ/এনএ

Walton
 
   
Marcel