ঢাকা, শনিবার, ৮ আশ্বিন ১৪২৪, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

প্রবাসী বাংলাদেশিদের মান-অপমান ও মূর্খের বয়ান

​অজয় দাশগুপ্ত : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৯-০৭ ৪:১৬:৩৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৯-০৭ ৭:৪১:২০ পিএম

অজয় দাশগুপ্ত : রাজনীতির বাইরেও অনেক বিষয় বিতর্কের সূত্রপাত করে বৈকি।  আমাদের ধারণা উত্তেজনা, আনন্দ, বেদনা বা সব প্রতিক্রিয়ার একমাত্র উৎস রাজনীতি। আসলে কি তাই? এবারের ঈদে আনন্দের উৎস ছিলেন একজন গায়ক। পেশায় তিনি সফল উদ্যোক্তা। তাঁর ব্যক্তিজীবন সাফল্যময়। একাধিক চ্যানেলের চেয়ারম্যান ভদ্রলোক সারা দেশের মানুষকে যে আনন্দ দিয়েছেন, যেভাবে এক সুতোয় টান টান উত্তেজনায় বেঁধে রেখেছিলেন আর কেউ তা পারেনি। এতগুলো চ্যানেল, এত টকশো, এত গান-নাচ, এত নাটক, এত আয়োজন- সব মাতিয়ে তিনিই ছিলেন শীর্ষে। যে যাই বলুক ষোল কোটি মানুষের দেশে এভাবে দৃষ্টি কেড়ে নেয়া সহজ ব্যাপার নয়। আমি তাঁকে অভিবাদন জানাই। তিনি প্রমাণ করেছেন মানুষ আসলে রাজনীতি বা মারামারি, হানাহানির বাইরে আনন্দ আর নির্মল বিনোদনের দিকে ধাবিত হতেই ভালোবাসে।

বলছিলাম উত্তেজনার কথা। কোনো কারণ ছাড়াই অনেকে সামাজিক মিডিয়ায় নানা ব্যাপারে বাহাস তৈরি করে। এর পেছনে যে মানসিকতা তার নাম হয় ‘মানসিক রোগ’ নয় তো ‘দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা’। দুটোই ব্যক্তি বা সমাজের জন্য ভালো কিছু নয়। সে যাই হোক, এবার এমন একটি বিষয় ভাইরাল হতে চলেছে যার সাথে আমরা, মানে প্রবাসীরা জড়িত। ঘটনা নতুন কিছু নয়। এর আগেও এসব কথা শুনেছি। যারা দেশ ছেড়ে চলে গেছেন বা নানা কারণে দেশের বাইরে জীবনযাপন করছেন, তাদের দেশ-ভাবনা বা দেশ নিয়ে কাজ করা, এমনকি চিন্তা করা নিয়েও আনেকে নানা কথা বলেন। এমনও শুনি ইচ্ছেকৃতভাবে দেশত্যাগীদের নাকি দেশ ও দেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি, খেলা এসব বিষয়ে কথা বলা না-জায়েজ। কিন্তু কেন?

গোড়াতেই বলি, অভিবাসন খুব বেশি কালের ঘটনা না হলেও দেশান্তরী হবার বিষয়টি প্রাকৃতিক এবং অনাদিকালের। আমি যে দেশে থাকি সে দেশ অস্ট্রেলিয়া  বলতে মানুষ বোঝে ক্যাঙ্গারুর দেশ। এই যে ক্যাঙ্গারুর দেশ, এর পেছনে বড় কারণ এই প্রাণীটি ইউনিক। দুনিয়ার আর কোনো দেশে আপনি চিড়িয়াখানা ব্যতীত আর কোথাও এমন ক্যাঙ্গারু দেখতে পাবেন না। ধরুন, যদি অস্ট্রেলিয়ার কোনো দেশের সাথে মাটি বা স্থল সীমান্ত থাকতো, তাহলে কি তারা ক্যাঙ্গারুর বিদেশ ভ্রমণ বা প্রজনন ঠেকাতে পারত? সমুদ্র দিয়ে ঘেরা একমাত্র দেশ বলে ক্যাঙ্গারু আর কোনো দেশে যেতে পারেনি। অন্যদিকে দেখুন সুদূর সাইবেরিয়ার পাখিও গভীর শীতে বাংলাদেশে চলে আসে। প্রকৃতির এই নিয়মে মানুষও দেশান্তরী হতে শিখেছে। কথায় কথায় আমরা বলি, কলম্বাস আমেরিকা, ভাসকো-দ্য-গামা ভারতের আবিষ্কারক। বলি হুয়েন সাং এসেছিলেন, বলি অতীশ দীপংকর আমাদের সেই বাঙালি যিনি জয় করেছিলেন অন্য দেশের মনন। কেন বলি? মোঘলরা আসার আগে কি ভারত আসলে এক দেশ ছিল? সেখানে নানা রাজা-বাদশা আর তাদের নবাবী আমল ঘুঁচিয়ে মোঘলরাই এক করেছিল ভারতকে।

যারা কায়দা করে কথা বলেন, যারা আধুনিক ভাষায় প্রবাসীদের বিষয়ে বিরোধিতা করেন, তারা ভুলে যান তাদের এই ভাষার পেছনে আছে ইংরেজের অবদান। ফোর্ট উইলিয়াম, ডি রোজিও ছাড়া আমাদের ভাষা বা শিল্প কি আসলেই এভাবে এগুতে পারত? যারা চায়ের কাপে ঝড় তোলেন তাদের এই চা-পানের বিষয়টিও ইংরেজদের দেয়া। আজকাল ক্রিকেট নিয়ে হইচই, ক্রিকেটকে জাতীয় গর্ব বলা আমরা কি জানি না কারা শিখিয়েছে এই খেলা আমাদের? এত জানার পরও খামোখা বাংলাদেশি প্রবাসী জনগোষ্ঠীর পিণ্ডি চটকানোর মূল উদ্দেশ্য বুঝিয়ে বলার দরকার পরে না। হাজারো উন্নতি বা অগ্রগতির পরও এটাই সত্য বাংলাদেশের মানুষের বিদেশে পাড়ি দেয়া দেশের জন্য মঙ্গলের। কারণ এত ছোট একটি দেশে এত বিশাল জনসংখ্যা কোনো দিক থেকেই সম্ভব বা সম্ভাবনার হতে পারে না। যত মানুষ বিদেশে যাবে তত মাটির ওপর চাপ কমবে। ঘনত্ব কমবে।

তা ছাড়া আমরা যদি অর্থনীতির দিকে তাকিয়ে দেখি, তাহলে দেখব প্রবাসীদের পাঠানো টাকা এদেশের কত বড় শক্তি! বিগত একুশ বছরের প্রবাসী জীবনে আমি যত দেশে গেছি দেখেছি বাংলাদেশিদের দেশপ্রেম প্রশ্নাতীত। একমাত্র জাতি যারা জাতীয় সংগীত গাওয়ার সময় সত্যি নয়ন জলে ভেসে যায়। যাদের কাছে পতাকা কেবল একখণ্ড কাপড় না। এর ভেতর তারা তাদের অস্তিত্ব আর পরিচয় খুঁজে পায়। একটা কথা প্রাকৃতিকভাবে সত্য দূরের টান প্রচণ্ড। দূরে থাকা বাংলাদেশিরা তাদের দেশ ও মাটিকে কতটা এবং কীভাবে মিস করেন তা না দেখলে, না জানলে বোঝা মুশকিল। তাছাড়া আমি এই জ্ঞানী ও মূর্খ লোকদের একটা কথা বলতে চাই- ভালো করে দেখুন ইতিহাসে দেখবেন, সে বাঙালিই সফল যারা জীবনে কোনো না কোনো একটা সময় বিদেশে কাটিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুকুমার রায়, মধুসূদন, ঋষি অরবিন্দ থেকে আমাদের হুমায়ূন আহমেদ, জাফর  ইকবাল সবার বেলায় এটা ধ্রুব সত্য। তাছাড়া এখন যখন যোগাযোগ হাতের মুঠোয়, বিশ্ব যখন তালুবন্দি তখন ঝিনাইদহ থেকে আসলে চীন বা সিঙ্গাপুর অনেক কাছের। আজ যখন মিডিয়া আপনি নিজে, তখন দূরত্ব কেবলই মানসিক। আপনি ঢাকায় থেকে যখন সকালের খবর পান বা পড়েন বা দেখেন তার চার ঘণ্টা আগে সিডনি তা জেনে যায়। নিউজিল্যান্ড জানে আরো দুই ঘণ্টা আগে। ফলে আপনি কিসের জোরে প্রবাসীদের বিরুদ্ধে বলছেন?

বাংলাদেশের রাজনীতি-সমাজনীতি বা অর্থনীতির এক বিশাল অনিবার্য অংশ তার প্রবাসী জনগোষ্ঠী। বিশ্বাস না হয় তো মন্ত্রী-মিনিস্টার বা কেউকেটাদের প্রশ্ন করুন। তারা বাইরে আসলে যে বিষয়টা মাথায় রাখেন বা আলোচনায় রাখেন তা হচ্ছে কীভাবে আমাদের মেধা ও শ্রম আরো বেশি রপ্তানি করা যায়। আধুনিক মানুষ মানে দুনিয়া জানা দুনিয়ার নানা দেশে নানা সমাজে বসবাস করা। কিন্তু তার মন ও মনের নৌকা বাধা থাকে দেশের নোঙরে। তাছাড়া সাধারণ মানুষের কি দোষ?

আওয়ামী লীগের আগামী দিনের কাণ্ডারী জয় থাকেন আমেরিকা। খালেদাপুত্র বিএনপির তারেক থাকেন বিলেত। এরশাদের সন্তানও থাকেন দেশের বাইরে। খালি আমরা থাকলে দোষ! আমরা এখানে মুচি, মেথর, ঝাড়ুদার আর কিছু না। তাতে আপনার কী? আমাদের দেশের মতো এসব দেশে বা সমাজে কেউ পেশা নিয়ে মাথা ঘামায় না। গল্প হিসেবে আমরা ব্রিটেনের প্রাধনমন্ত্রী জন মেজর একসময় ট্রাম চালাতেন শুনে পুলকিত  হই। জেনে আনন্দিত হই কোন দেশের রাজা-বাদশা বা নেতারা ছিলেন মুচি কিংবা শ্রমিক। অথচ এই একই কথা নিজেদের বেলায় মানি না।
মায়ের মুখের দিকে তাকান, যে ছেলে বা মেয়ে বাইরে থাকে তার জন্য মা  রাতে ঘুমায় না। এক মুঠো ভাত কম খায়। কেউ জানে না মা প্রবাসী সন্তানের জন্য কত জিনিস লুকিয়ে রাখে। কত বিষয় জমিয়ে রাখে সন্তান ফিরলে তাকে বলবে বলে। দেশ মাও তাই করে। বাচাল ও নির্বোধেরা বিষয়টি টের পান না।

প্রয়াত অগ্রজ নূরুল আজাদের একটা কথা সবসময় মনে পড়ে। তিনি বলেছিলেন, মানুষ তার জন্ম ভাষা ও ধর্ম নিজে যেহেতু নির্ধারণ করে না, সেসব বিষয়ে তাদের চ্যালেঞ্জ করাও না-জায়েজ। সাধারণ হলেও এই কথাটা আসলেই অসাধারণ। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মতো আমরা প্রবাসীরাও দেশ জাতি মাটি পতাকাসহ সব কিছু ধারণ করি। যেসব মানুষ ঘামে শ্রমে মেধা ও অর্থে দেশকে এগিয়ে রাখে তাদের প্রতি আঙুল তোলার আগে নিজের দিকে তাকলে ভালো হয়। আমি বা আমরা দেশের জন্য আসলে কী করছি? দেশ ও দেশের সকলের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক চিরকালের। এই সম্পর্ক মা ও সন্তানের। সেই যোগসূত্রে জয়ী হোক বাংলাদেশ।

লেখক: সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭/তারা

Walton Laptop