ঢাকা, শনিবার, ৮ আশ্বিন ১৪২৪, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও নিরাপত্তা মানবিক বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ

শাহনেওয়াজ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৯-১১ ৩:৩১:০৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৯-১২ ২:৩৬:১৪ পিএম

খান মো. শাহনেওয়াজ: প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর মানুষদের নতুন করে বাংলাদেশে দলে দলে প্রবেশের শুরু আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহে। মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশ থেকে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। ফলে সীমান্ত এলাকায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সামাজিক ও মানবিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে।

আশ্রয়ের জন্য প্রতিদিনই আসছে রোহিঙ্গারা; বিপুল সংখ্যায়, স্রোতের মতো। জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, গত দুই সপ্তাহে প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। রাখাইন প্রদেশের (আগে এর নাম ছিল আরাকান রাজ্য) সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর নির্যাতনের শিকার। সেখানে রোহিঙ্গাদের নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে, তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে, ধর্ষণ ও উচ্ছেদ করা হচ্ছে। এই অবস্থায় রোহিঙ্গারা প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয়ের সন্ধানে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে।

ঘটনার সূত্রপাত গত ২৫ আগস্ট। এদিন ভোররাতে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সশস্ত্র সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (এআরএসএ) সদস্যরা রাখাইন প্রদেশের উত্তর অংশে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর ৩০টি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলা চালায়। এতে নিরাপত্তা বাহিনীর ১২ জন সদস্য নিহত হয়। মিয়ানমার সরকারের হিসাব অনুযায়ী উভয়পক্ষের লড়াইয়ে ৭০ জন রোহিঙ্গা বিদ্রোহী প্রাণ হারায়। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতনের প্রতিশোধ নিতে এই হামলা চালানো হয়েছে বলে এআরএসএ দাবি করে। এদিকে এই হামলাকে কেন্দ্র করে সেদিনই শুরু হয় নিরাপত্তা বাহিনীর দমন তৎপরতা। তারা নির্বিচারে রোহিঙ্গাদের নিধন শুরু করে। ধর্ষণ ও লুটপাট করে রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়ে উচ্ছেদ শুরু করে। রোহিঙ্গারা প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে বাংলাদেশের পথ ধরে। নাফ নদী ও সমূদ্র পথ পাড়ি দিয়ে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। জীবন বাঁচানোর জন্য পালিয়ে আসা অসহায় এই মানুষদের আশ্রয়ের বিষয়টি এখন মানবিক বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, প্রাণ বাঁচাতে বিপদ কাঁধে নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেও কিছু ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন এ দেশেরই কিছু বিবেকহীন মানুষের হাতে। সীমান্ত পার করে দেওয়ার কথা বলে তাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে অর্থ। অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তাদের সঙ্গে অযৌক্তিক ও নির্দয় আচরণ করা হচ্ছে। সীমান্ত পার করে দেওয়ার জন্য জনপ্রতি কমপক্ষে পাঁচ হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে- এমন সংবাদও প্রকাশিত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মাঝপথে এসে আরো বেশি অর্থ দাবি করা হচ্ছে এবং দাবি অনুযায়ী অর্থ দেওয়া না হলে সীমান্ত পার করে দেওয়া হবে না বলে ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করারও অভিযোগ উঠেছে। বাড়িঘর, সম্পদ সব হারিয়ে অন্য ভূ-খণ্ডে যাওয়ার পথে অমানুষের হাতে শেষ সম্বলটুকু খোয়ানোর মতো কষ্ট আর কি হতে পারে!  

বাংলাদেশের মাটিতে এই মুহূর্তে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি মানবিক দিক থেকে বিবেচনা করা জরুরি। আতঙ্কগ্রস্ত রোহিঙ্গাদের অনেকে গুলিবিদ্ধ, বোমার আঘাতে আহত অবস্থায় বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এদের মধ্যে নারী, শিশু ও বৃদ্ধের সংখ্যাই বেশি। অসহায় এই মানুষদের অর্থ নেই, খাবার নেই; চোখের সামনে যা আছে তা কেবল অন্ধকার।

দমন পীড়নের শিকার হয়ে মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আগমন নতুন নয়। মিয়ানমারে তাদের নাগরিকত্ব নেই, সব ধরণের রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত। ১৯৮২ সালে দেশটির সামরিক জান্তা সংবিধান সংশোধন করে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়। নতুন আইনে তাদেরকে রাষ্ট্রহীন মানুষ হিসেবে উল্লেখ করা হয় এবং তাদের ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। বলা হয়, ১৮২৩ সালের আগে যারা বার্মায় (বর্তমানে মিয়ানমার) এসেছে কেবল তারাই দেশটির নাগরিক। ১৯৪৮ সালে মিয়ানমার স্বাধীনতা লাভ করে এবং স্বাধীনতার পর সেখানে রোহিঙ্গাদের কোনো সমস্যা হয়নি। সব নাগরিক সুযোগ-সুবিধাই তারা পেয়েছে। ১৯৬২ সালে মিয়ানমারে সামরিক শাসন জারি হয়। এরপর থেকেই রোহিঙ্গাদের প্রতি শুরু হয় বিমাতাসুলভ আচরণ। নিজ ভু-খণ্ডে তারা পরবাসী হয়ে যায়। নিরাপত্তা বাহিনী এমনকি রাখাইন জাতিগোষ্ঠীর কট্টরপন্থীদের হাতে তারা প্রতিনিয়ত নিপীড়নের শিকার হতে থাকে। এক পর্যায়ে তারা আশ্রয়ের খোঁজে বাংলাদেশে পাড়ি জমাতে শুরু করে।

বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ এবং দেশটিতে তারা সংখ্যালঘু। এদের বেশিরভাগের বাস রাখাইন প্রদেশে। বলা হয়ে থাকে, রোহিঙ্গারা বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ জাতিগোষ্ঠী যাদের কোনো দেশ নেই। মিয়ানমার সরকার মনে করে তারা বহিরাগত এবং বাংলাদেশ থেকে সেখানে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। ২০১২ সালে রাখাইনে বৌদ্ধ-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বেধে গেলে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায়। নিরাপত্তা বাহিনীর চোখের সামনে রোহিঙ্গা মুসলিম অধ্যুষিত গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। লুটপাট চালিয়ে তাদের নিঃস্ব করে ফেলা হয়। চলে ধর্ষণ ও গণহত্যা। এই পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গারা প্রাণ নিয়ে স্রোতের মতো বাংলাদেশে আসতে থাকে। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসময় দুই লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।

মিয়ানমার সরকারের বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে রোহিঙ্গাদের কিছু তরুণ চরমপন্থা অবলম্বন করে এবং গড়ে ওঠে সশস্ত্র সংগঠন এআরএসএ। বিশ্লেষকদের অনেকে এই সংগঠনকে জঙ্গি সংগঠন হিসেবে অভিহিত করেন। মূল ধারার রোহিঙ্গা নেতারাও বলেন, এই সংগঠনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নেই। এআরএসএ- এর সশস্ত্র সদস্যরা সর্বপ্রথম নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয় ২০১৬ সালের অক্টোবরে তিনটি সীমান্ত চৌকিতে হামলা চালানোর মধ্য দিয়ে। এই হামলায় নয় জন পুলিশ নিহত হয়। এর প্রতিশোধ নিতে নিরাপত্তা বাহিনী নৃশংস হয়ে ওঠে। জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয় এবং লোকজনকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করে। পলায়নরত রোহিঙ্গাদের ওপর গুলি চালিয়ে অনেককে মেরে ফেলে। নারীদের গণধর্ষণ করা হয় এবং শিশুদের জ্বলন্ত আগুনে ছুড়ে ফেলে পুড়িয়ে মারা হয়। এসময় নিরাপত্তা বাহিনী ও তাদের দোসরদের হাতে এক হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা নিহত হয়। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়, এসময় প্রায় ৮৫ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। প্রতিবেদনে উল্লেখিত এক পর্যবেক্ষণে বলা হয়, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছে।

বাংলাদেশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা আগে থেকেই বাংলাদেশে অবস্থান করছে। গত দুই সপ্তাহে পালিয়ে এসেছে আরো প্রায় তিন লাখ। এর ফলে মোট প্রায় আট লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর চাপ সামলাতে হচ্ছে বাংলাদেশ সরকারকে।

মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী একটি জাতিগোষ্ঠীর ওপর যে আচরণ করছে তা নিন্দনীয়। এর বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী কণ্ঠস্বর সোচ্চার হয়ে উঠেছে। তারা এটাকে গণহত্যা বলে অভিহিত করে তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছে এবং রাখাইন প্রদেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছে। রাখাইনে শান্তি প্রতিষ্ঠা হোক, রোহিঙ্গাদের প্রতি ন্যায়সঙ্গত আচরণ করা হোক, তারা বিবেচিত হোক মানুষ হিসেবে।

লেখক: সাংবাদিক

 

 

 


রাইজিংবিডি/ঢাকা/১১ সেপ্টেম্বর ২০১৭/শাহনেওয়াজ/তারা

Walton Laptop