ঢাকা, মঙ্গলবার, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২১ নভেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

দেশ স্বাধীন হয়েছে কিন্তু টার্গেট বদলায়নি || মিনার মনসুর

মিনার মনসুর : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-১১-০৩ ৮:০২:৫১ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-১১-০৩ ১:১২:৫৭ পিএম

জাতীয় চার নেতা মরে প্রমাণ করেছেন যে তাঁরা তাঁদের নেতার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি। বিশ্বাসঘাতকতা করেননি মা, মাটি, মানুষ এবং মাতৃভূমির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সঙ্গে। অথচ সময়টা ছিল চরম বিশ্বাসঘাতকতার। বঙ্গবন্ধুর বিশাল হৃদয়ের বটবৃক্ষ ছায়ায় যারা হৃষ্টপুষ্ট হয়েছিলেন- তাদের অনেকেই সেদিন নাম লিখিয়েছিলেন বিশ্বাসঘাতকের খাতায়। কোরাসে কণ্ঠ মিলিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর খুনিদের সঙ্গে। উজ্জ্বলতম ব্যতিক্রম চারটি মানুষ। দু’-দু’বার অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁদের। একবার একাত্তরে। আবার পঁচাত্তরেও। কিন্তু মুহূর্তের জন্যেও মাথা নত করেননি তাঁরা। বিচ্যুত হননি নেতার প্রতি নিষ্ঠা এবং নীতি ও আদর্শ থেকে। মূলত সে জন্যেই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করা হয়েছিল আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী এই চার জাতীয় নেতাকে। তারপর দীর্ঘ ৪২ বছর অতিক্রান্ত হতে চলেছে; কিন্তু ঘাতক এবং নেপথ্যের কুশীলবরা কি যথার্থই শাস্তি পেয়েছে? সত্য যে অনেক বাধাবিপত্তি পার হয়ে জেলহত্যার বিচার হয়েছে। কিন্তু তাতে প্রয়াত নেতৃবৃন্দের আত্মা শান্তি পেয়েছে কিনা- তা জানা কারও পক্ষে সম্ভব না হলেও রায় ঘোষিত হওযার পর টেলিভিশনের পর্দায় যারা তৎকালীন তরুণ সংসদ সদস্য সোহেল তাজের অব্যক্ত বেদনায় নীল হয়ে যাওয়া অবয়বটি দেখেছেন উত্তরটি তাদের অজানা নয়।

জাতির জনকের বিশ্বস্ত সহচর বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের (১৯২৫) ছেলে সোহেল। তাঁর বাবাকে যখন সামরিক উর্দিপরিহিত ঘাতকরা বর্বরোচিত কায়দায় হত্যা করে তখন তিনি শিশু। এই শিশুটি এখন পরিণতবয়স্ক যুবক। তিনি জানেন যে তাঁর বাবা সমগ্র জীবন ব্যয় করেছেন এদেশের মানুষের মুক্তির সংগ্রামে। খুবই কঠিন একটি সময়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ শিরোধার্য করে পরিপূর্ণ নিষ্ঠার সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের। প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও যাপন করেছেন একেবারে অনাড়ম্বর জীবন। অঢেল সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নিজের জন্যে বা পরিবারের জন্যে গড়ে তোলেননি সম্পদের পাহাড়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ঘাতকরা তাঁর বাসায় গিয়ে তাঁকে মন্ত্রিত্বের লোভ দেখিয়েছিল; কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করতে এক মুহূর্তও দ্বিধা করেননি। ঘাতকদের প্রস্তাব গ্রহণ করলে হয়তো তিনি প্রাণে বেঁচে যেতেন। কিন্তু সকল প্রলোভন ও ভীতি অগ্রাহ্য করে তিনি ছিলেন অবিচল- তাঁর আদর্শ, নীতি ও নেতার প্রতি নিষ্ঠার প্রশ্নে। একাত্তরে তো বটেই, পঁচাত্তরেও। জীবন দিয়েছেন। কিন্তু নীতিনিষ্ঠা ও আদর্শের পতাকা ভূলুণ্ঠিত হতে দেননি কখনোই।

বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে যিনি প্রবাসী সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন সেই সৈয়দ নজরুল ইসলামের (১৯২৫) জন্ম কিশোরগঞ্জ। তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন বর্তমান গাজীপুর জেলার কাপাসিয়ার সন্তান। এ এইচ এম কামারুজ্জামান (১৯২৬) এবং ক্যাপ্টেন (অব.) মনসুর আলীর জন্ম যথাক্রমে রাজশাহী ও সিরাজগঞ্জে। অথচ কী অদ্ভুত মিল তাঁদের মধ্যে। একমাত্র ক্যাপ্টেন মনসুর আলী (১৯১৭) ছাড়া বাকি তিনজনেরই জন্ম বিশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে। বয়সের বিবেচনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের (১৯২০) সমসাময়িকই বলা চলে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট সেই সময়ের রাজনৈতিক চরিত্রটাও বিস্মৃত হলে চলবে না। এও লক্ষণীয় যে তাঁরা সবাই ছিলেন উচ্চশিক্ষিত। ছাত্রজীবনেই যুক্ত হয়েছেন রাজনীতির সঙ্গে। আমৃত্যু সেই রাজনীতিকেই শিরোধার্য করেছেন- যে রাজনীতির প্রথম ও শেষকথা ছিল মানুষের কল্যাণসাধন। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, লড়েছেন পাকিস্তানি দুঃশাসনের বিরুদ্ধে। সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মিলটি হলো, আওয়ামী লীগের সূচনালগ্নের কর্মী ও সংগঠক হিসেবে বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ ঝঞ্ঝামুখর রাজনৈতিক জীবনের একনিষ্ঠ সঙ্গী ছিলেন তাঁরা। ছিলেন বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা ও সুহৃদ। মৃত্যুও সেই বন্ধন ছিন্ন করতে পারেনি।

বাংলাদেশের তাবৎ বুদ্ধিজীবী ও দাতাপালিত সুশীল সমাজ যারা সৎ রাজনীতিকের খোঁজে সতত হাহাকার করেন, তারা তাজউদ্দীনের চেয়ে আদর্শ রাজনীতিক আর কোথায় পাবেন? তাঁর সন্তান যদি আজ প্রশ্ন করেন, এমন একটি মানুষকে কারার অভ্যন্তরে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো, দীর্ঘ ২৫টি বছর তার তদন্ত পর্যন্ত হতে দেওয়া হয়নি; আপনারা বাংলাদেশের সুশীল সমাজ- মানবাধিকারের চ্যাম্পিয়নরা- তখন কী ভূমিকা পালন করেছিলেন? একই প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও কামারুজ্জামানের সন্তানরাও। তবে আমাদের স্বনামধন্য বহু ‘জাতির বিবেক’ ও শান্তির পদকধারী ‘সুশীল’-এর সৌভাগ্য যে আমাদের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত নৈতিক দুর্বলতার কারণে বাংলাদেশে কখনোই তাদেরকে তেমন জোরালো কোনো প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় না। নিজেদের বিলাসবহুল জীবন এবং কৃতকর্মের জবাবদিহিতা তো হনুজ দূর অস্ত! সভ্য সমাজে কারাগারকে বিবেচনা করা হয় সবচেয়ে নিরাপদ স্থান হিসেবে। কারণ কারাগারের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব সরাসরি রাষ্ট্র বা সরকারের উপর ন্যস্ত। অথচ কারাগারের ভেতরেই অসহায়ভাবে প্রাণ দিতে হয়েছে জাতীয় চার নেতাকে। আর এটাও সুবিদিত যে, এই কাপুরুষোচিত হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছে বঙ্গবন্ধু হত্যার মধ্য দিয়ে অবৈধভাবে রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষাসনে আসীন ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের প্রত্যক্ষ নির্দেশে।

একটি জাতির ইতিহাসে বছর বছর মুক্তিযুদ্ধ হয় না। একটি শতাব্দীতে এ-রকম মাহেন্দ্রক্ষণ হয়তো একবারই আসে। মহান সেই মুক্তিযুদ্ধের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে হত্যা করা হলো। হত্যার নির্দেশদাতা ও ঘাতকরা শুধু বুক ফুলিয়ে ঘুরেই বেড়ালো না, বন্দুকের জোরে হয়ে গেলো রাষ্ট্রের দণ্ডমুণ্ডের কর্তাও। সেনাছাউনিতে বসে রাজনৈতিক দল গঠন করা হলো। উর্দি পরেই রাতারাতি রাজনৈতিক নেতাও বনে গেলেন কেউ কেউ। সেইসব দলের নেতারা সাফাই গাইলেন যে, বঙ্গবন্ধু হত্যা ও জেলহত্যার সঙ্গে তাদের কোনো সংশ্রব নেই। কিন্তু জনগণ তা বিশ্বাস করবে কেন? এ দলগুলো যখন ক্ষমতায়, তখন ঘাতকরা সরকারি চাকরি পেল; পদোন্নতি পেল। আত্মস্বীকৃত খুনিদেরকে আখ্যায়িত করা হলো জাতির ‘সূর্যসন্তান’ হিসেবে। আর বছরের পর বছর বাংলাদেশের মানুষকে দেখতে হয়েছে এইসব দুঃসহ ভাঁড়ামির দৃশ্য। আমাদের সুশীল সমাজের বিবেক তখন কোথায় ছিল? শান্তির জন্যে পদক পেতে পেতে যারা ক্লান্ত- তারাই-বা কী ভূমিকা পালন করেছেন তখন? আর আমাদের সুশীল সমাজ তো সারা পৃথিবীর মানবাধিকার রক্ষা করতে গিয়ে এতটাই গলদঘর্ম যে বঙ্গবন্ধু হত্যা ও জেলহত্যার মতো বিষয় নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় তাদের কোথায়?

আমাদের মনে রাখা দরকার, জেলহত্যাই ঘাতকদের প্রথম অপরাধ নয়। এই হত্যাকাণ্ডের মাত্র ৭৯ দিন আগে তারা মানবসভ্যতার ইতিহাসে বর্বরতার নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছিল। তারা হত্যা করেছিল আমাদের স্বাধীনতার মহান স্থপতি, বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। দশ বছরের শিশু রাসেল এবং গর্ভবতী নারীরাও রক্ষা পায়নি তাদের বর্বরতা থেকে। একই দিনে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের দুই বীর সেনানী শেখ ফজলুল হক মনি ও আবদুর রব সেরনিয়াবাতের পরিবারকে। নারী-শিশু তো ছিলই, সেইসব পরিবারে বেড়াতে আসা ব্যক্তিরাও শিকার হয়েছেন এই তাণ্ডবের। এ-রকম বর্বরতার নজির আজকের পৃথিবীতে খুব বেশি খুঁজে পাওয়া যাবে কি? দাতাঅন্তপ্রাণ আমাদের সুশীল সমাজ এ-ব্যাপারে কখনো মুখ খুলেছেন বলে তো মনে পড়ে না।  কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল ঘাতকদের বিরুদ্ধে- জানেন সকলেই। তবু পুনরায় বলি। আমাদের স্মৃতি দুর্বল। নিকট অতীতের অনেক ঘটনাও আমরা ভুলে যাই। সে জন্যে কিছু কিছু ঘটনা বারবার বলা প্রয়োজন।

বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার ঘাতকদের সসম্মানে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার সুব্যবস্থা করা হয়েছিল। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হয়েছিল আকষর্ণীয় বেতনের চাকরি। কারা দিয়েছিল? দিয়েছিল সরকার। সেই সরকার, যারা বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার রক্ত মাড়িয়ে সামরিক পোশাক পরে ক্ষমতায় এসে দল গঠন করেছিল। সেই দল, যারা এখন বলছে জেলহত্যা বা বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে তাদের কোনো সংশ্রব নেই। তারপর কী হলো? ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তি আইন পাশ করে হত্যাকারীদের সাংবিধানিকভাবে এই মর্মে সুরক্ষা দেওয়া হলো যে, বঙ্গবন্ধু ও জেলহত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কোনো বিচার করা যাবে না। কারা করলো? করলো খুনি খন্দকার মোশতাকের সরকার। কিন্তু ৫ম সংশোধনীর মাধ্যমে তা সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন কারা? কোন্ সরকার? জানি আমরা সকলেই; কিন্তু প্রকাশ করতে চাই না। এক ধরনের কুণ্ঠা আমাদের তা প্রকাশ করতে দেয় না; সাপ যেভাবে তার শিকারকে প্রথমে অবশ করে দিয়ে তারপর ধীরে ধীরে গিলে খায়, সেভাবে আমাদের মধ্যে সুকৌশলে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে এই কুণ্ঠার বিষ। প্রথমে আমরা ‘জয়বাংলা’ বলতে কুণ্ঠিত হয়েছি; তার পর একটা সময় এসেছে যখন আমরা বঙ্গবন্ধু, জাতির জনক, মুক্তিযুদ্ধ, রাজাকার-আলবদর প্রভৃতি শব্দ উচ্চারণ করতে কুণ্ঠিত হয়েছি। বলেছি, এসব পুরনো প্রসঙ্গ টেনে জাতিকে বিভক্ত করে কী লাভ! কুণ্ঠার বিষে আমাদের চৈতন্য অবশ হয়ে গেছে। তারপর ওরা সাপের মতো ধীরে ধীরে গোটা জাতিকে গিলে ফেলতে উদ্যত হয়েছিল। বললে অত্যুক্তি হবে না, নিজের জীবন বিপন্ন করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা প্রায় একাই রুখে দিয়েছেন এই মহাবিপর্যয়।

বাঙালির যা-কিছু মহৎ অর্জন তার মধ্যে স্বাধীনতা নিঃসন্দেহে শ্রেষ্ঠতম। তা নিয়ে গর্বিত হওয়ার পরিবর্তে আমরা কুণ্ঠিত বোধ করছি কেন? আমাদের কি কোনো অপরাধবোধ আছে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা নিয়ে? একজন বিদগ্ধ ব্যক্তি ব্যক্তিগতভাবে আমাকে বলেছেন, আসলে আমরা নিজেদের বাঁচানোর জন্যেই এটা করি। আমরা আর কোনো ঝামেলায় জড়াতে চাই না। আমি অবাক হয়ে জানতে চাই- আর কোনো ঝামেলা মানে? তিনি বলেন, মানে খুব সহজ। মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যারা নিজেদের আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ফেলেছিলেন তাদেরকে সে-জন্যে এখনো মূল্য দিতে হচ্ছে নানাভাবে। তিনি বলেন, ভেবে দেখুন তো ১৯৭১-এর মার্চের কালরাত্রি থেকে সেই যে হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়েছে আজ অবধি কারা তার একমাত্র টার্গেট? দেশ স্বাধীন হয়েছে কিন্তু টার্গেট কি বদলেছে? আমি অবাক হয়ে যাই ভদ্রলোকের পর্যবেক্ষণ দেখে। সত্যিই তো একাত্তরের মার্চের ভয়াবহ সেই রাতে পাকিস্তানি হানাদাররা খুঁজে খুঁজে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হত্যা করলো, যারা বেঁচে গেলেন তাদের রাজাকার-আলবদররা হত্যা করলো বিজয়ের পূর্বমুহূর্তে। এমনকি স্বাধীন বাংলাদেশে প্রাণ হারাতে হয়েছে জহির রায়হানকে। তার পরে বঙ্গবন্ধু-হত্যা, জেলহত্যা থেকে শুরু করে সর্বশেষ বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষনেতাদের হত্যাচেষ্টা পর্যন্ত চিত্র তো অভিন্ন। ভয়াবহ বোমা হামলার শিকার হয়েছে উদীচী, ছায়ানট, কমিউনিস্ট পার্টি ও আওয়ামী লীগ। আর সরাসরি আক্রান্ত হয়েছেন শামসুর রাহমান ও হুমায়ূন আজাদসহ মুক্তবুদ্ধির বহু মানুষ। কী নির্মমভাবেই না জীবন দিতে হয়েছে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়ার মতো সজ্জন মানুষকে- গাজীপুরের জনপ্রিয় নেতা আহসানউল্ল্যাহ মাস্টারকে। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা শুরু হয়েছিল তিনি দেশে ফেরার পর থেকেই। সর্বশেষ ২১ আগস্টের সেই নারকীয় গ্রেনেড হামলায় অলৌকিকভাবে তিনি বেঁচে গেলেও প্রাণ হারাতে হয়েছে দলের প্রবীণ নেত্রী আইভি রহমানসহ বহু নেতাকর্মীকে। অনেক প্রবীণ নেতাকে এখনও বয়ে বেড়াতে হচ্ছে শরীরভর্তি স্পিন্টারের দুঃসহ যন্ত্রণা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও বয়ে বেড়াচ্ছেন তার ভয়ঙ্কর অভিঘাত। কী ইঙ্গিত বহন করে এসব ঘটনা তা ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন পড়ে না।

নিজেকে বাঁচানোর অধিকার প্রত্যেকেরই আছে। নিজেকে বাঁচানোর জন্যেই যদি আমরা সত্য প্রকাশে কুণ্ঠিত হয়ে থাকি তাহলে বলতে হবে যে আমরা ইতিহাসের শিক্ষাকেই অগ্রাহ্য করছি। যারা যথেষ্ট চাতুর্যের সঙ্গে নিজেদের নিরপেক্ষ ঘোষণা করে শেয়াল আর মুরগিকে একত্রিত করার মহতী উদ্যোগ নিয়েছিলেন- তারাও কি পারছেন নিজেদের বাঁচাতে? আসলে বহু পুরনো ও পরীক্ষিত সত্যটি হলো, সত্যকে অস্বীকার করে, বিকৃত করে, খণ্ডিত করে বা গোপন করে আমরা সাময়িক লাভবান হতে পারি কিন্তু আখেরে নিজেকেও বাঁচানো যায় না, দেশকেও না। এই সত্য কি প্রতিদিন প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে না? আজ যদি জিজ্ঞেস করা হয় যে, বাংলাদেশের অগ্রগতির পথে প্রধান অন্তরায় কী? আমার বিশ্বাস, দেশি-বিদেশি সকলে একবাক্যে বলবেন যে, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। সরাসরি বললে বলতে হবে যে, হত্যা ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতিই হচ্ছে প্রধান বাধা। আর এর সূত্রপাত হয়েছিল সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে।

এমন কথা প্রায়শ শোনা যায় যে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে কার্যকর সম্পর্ক ও সমঝোতা অপরিহার্য। কিন্তু বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। সম্পর্ক গড়ে ওঠে কতগুলো বাস্তব ভিত্তির ওপর। আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম কিংবা সাবেক মন্ত্রী সোহেল তাজকে যদি জাতীয় স্বার্থে কোনো দলের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার দায়িত্ব দেওয়া হয়, তারা কি পারবেন তাদের বাবার হত্যাকারী কিংবা হত্যাকারীদের প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে মদত দেয় এমন কোনো দলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে? কিংবা তাদের দল কি পারবে অল্প বয়সে পিতৃহারা এই দুই নেতার আবেগ অগ্রাহ্য করতে? আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর বাবা-মাকে হারিয়েছেন; হারিয়েছেন তাঁর অতি আপনজনদের। এমন নির্দয়ভাবে তাঁদের হত্যা করা হয়েছে যা কোনো সন্তানের পক্ষেই সহ্য করা সম্ভব নয়। তারপর সেই ঘাতকরা যদি প্রকাশ্যে আস্ফালন করে বেড়ায় এবং কোনো রাজনৈতিক দলের আশ্রয়-প্রশ্রয় পায়, সেটা মেনে নেবে এমন কুলাঙ্গার সন্তান খুঁজে পাওয়া যাবে কি? আমাদের তথাকথিত সুশীল সমাজ ও ‘নিরপেক্ষ’ বুদ্ধিজীবীগণ এই বাস্তবতা বিবেচনায় রাখলে স্বজনহারা শেখ হাসিনা ও চার নেতার পরিবারের সদস্যদের প্রতি সুবিচার করা হবে।

সেনাছাউনিতে জন্ম হলেও বিএনপির বয়সও ৪০ হতে চলেছে। যে-কোনো দলের জন্যে এটি সুখকর একটি সংবাদ। রাজনৈতিকভাবেও তাদের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার অনেক সমৃদ্ধ হয়েছে। এখন তাদের উচিত দায়িত্বশীল আচরণ করা; বঙ্গবন্ধু হত্যা, জেলহত্যা এবং যুদ্ধাপরাধীদের ব্যাপারে নিজেদের স্বচ্ছতা ও সততা নিশ্চিত করা- যা সৈয়দ আশরাফ বারবার বলে আসছেন। সর্বোপরি, জাতির জনকের প্রতি যথোচিত সম্মান প্রদর্শন করা। সেই সঙ্গে জাতীয় শোক দিবসে বিশালাকৃতির কেক কেটে দলীয় সভানেত্রীর তথাকথিত জন্মদিন পালনের যে কদর্যতা চলে আসছে তার কলঙ্ক থেকে নিজেকে মুক্ত করা জরুরি হয়ে পড়েছে দলটির জন্যে। অন্যথায় অস্বচ্ছ ও অশুভ এই অপরাজনীতি ফ্রাংকেনস্টাইনের সেই দানবের মতো তাদেরকেও গিলে খাবে একদিন।

রক্তের বদলে রক্ত কিংবা প্রতিশোধ কোনো ভালো সমাধান নয়। বঙ্গবন্ধু একাত্তরের দালাল ও যুদ্ধাপরাধীদের একটি অংশকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। সে-জন্যে আজকের বাস্তবতায় আমরা খুবই অসন্তুষ্ট হই। কিন্তু সামগ্রিকভাবে দেখলে মনে হবে রক্তপাত ছাড়া সংকট সমাধানের সকল সম্ভাবনাই আমাদের যাচাই করে দেখা উচিত। বঙ্গবন্ধু-হত্যার প্রতিক্রিয়া হিসাবে ১৯৭৭ সালে লেখা এক কবিতায় অন্নদাশঙ্কর রায় যে-আশঙ্কা ব্যক্ত করেছিলেন সেটা অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছে পরবর্তীকালে। পুরো কবিতাটি উদ্ধৃত করার লোভ সংবরণ করা কঠিন। আশা করি, আজকের রুদ্ধশ্বাস ও রক্তাক্ত বিশ্ববাস্তবতায় বিজ্ঞ পাঠকদের কাছেও তা খুবই প্রাসঙ্গিক বলে বিবেচিত হবে।

নরহত্যা মহাপাপ, তার চেয়ে পাপ আরো বড়ো

করে যদি যারা তাঁর পুত্রসম বিশ্বাসভাজন

জাতির জনক যিনি অতর্কিতে তারেই নিধন।

নিধন সবংশে হলে সেই পাপ আরো গুরুতর,

 

সারা দেশ ভাগী হয় পিতৃঘাতী সে ঘোর পাপের

যদি দেয় সাধুবাদ, যদি করে অপরাধ ক্ষমা।

কর্মফল দিনে দিনে বর্ষে বর্ষে হয় এর জমা

একদা বর্ষণ বজ্ররূপে সে অভিশাপের।

 

রক্ত ডেকে আনে রক্ত, হানাহানি হয়ে যায় রীত।

পাশবিক শক্তি দিয়ে রোধ করা মিথ্যা মরীচিকা।

পাপ দিয়ে শুরু যার নিজেই সে নিত্য বিভীষিকা।

ছিন্নমস্তা দেবী যেন পান করে আপন শোণিত।

 

বাংলাদেশ! বাংলাদেশ! থেকো নাকো নীরব দর্শক

ধিক্কারে মুখর হও। হাত ধুয়ে এড়াও নরক।

(বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মরণে)*


*সূত্র: মিনার মনসুর ও দিলওয়ার চৌধুরী সম্পাদিত, শেখ মুজিব একটি লাল গোলাপ, (এপিটাফ প্রকাশনী, ১৯৭৯)





রাইজিংবিডি/ঢাকা/৩ নভেম্বর ২০১৭/তারা

Walton
 
   
Marcel