ঢাকা, মঙ্গলবার, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২১ নভেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

বেলফোর ঘোষণার শতবর্ষ : কারা ছিলেন নেপথ্যে?

রাসেল পারভেজ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-১১-০৫ ১০:০৮:৪৪ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-১১-০৫ ৪:৪৫:৩০ পিএম
বেলফোর ঘোষণার মূলনায়ক আর্থার জেমস বেলফোর ১৯২৭ সালে জেরুজালেমে হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ে ইহুদি রাষ্ট্রের পক্ষে বক্তব্য দেন

|| রাসেল পারভেজ ||

আজ থেকে শত বছর আগে ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নীলনকশা হিসেবে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের অনুমোদনে একটি ঘোষণা দেওয়া হয়। সেই সময়ের ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার বেলফোর এ ঘোষণা দিয়েছেন বলে একে ‘বেলফোর ঘোষণা’ বলা হয়।

আর্থার বেলফোর ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য একটি আবাসভূমি গড়ে তোলার পক্ষে ব্রিটিশ সরকারের সমর্থন জানিয়ে তৎকালীন ব্রিটেনে ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী নেতা ব্যারন রথসচাইল্ডের কাছে ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর একটি চিঠি দেন। জায়নিস্ট ফেডারেশন অব গ্রেট ব্রিটেন অ্যান্ড আয়ারল্যান্ডর কাছে চিঠিটি পৌঁছে দেওয়ার জন্য রথসচাইল্ডের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ওই চিঠির ভাষ্যই ইতিহাসে ‘বেলফোর ঘোষণা’ নামে পরিচিত।

২ নভেম্বর ২০১৭- বেলফোর ঘোষণার শতবর্ষ পূর্তি হলো। ফিলিস্তিনিরা প্রতিবছর দিনটিকে ‘কলঙ্কিত দিবস’ হিসেবে পালন করে। এই ঘোষণার জেরে ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা হরণ করে জোরপূর্বক ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্ম দেয় পশ্চিমা বিশ্ব। তখন থেকে ইসরায়েলের হাতে নিষ্পেষিত, নিপীড়িত ও নিগৃহীত হচ্ছে ফিলিস্তিনিরা। এখন নিজ ভূমে পরবাসী তারা। বিশ্বের সবচেয়ে নিপীড়িত জাতি বলা হয় ফিলিস্তিনিদের।

ইসরায়েল রাষ্ট্র জন্ম দেওয়ার বেলফোর ঘোষণা কি এক রাতেই তৈরি করা হয়েছিল, নাকি এর পেছনে ফিলিস্তিন ভূখণ্ড ভাগাভাগি করে নেওয়ার সুদীর্ঘ ষড়যন্ত্র ছিল? এই প্রশ্নের উত্তর-হ্যাঁ। ঐতিহাসিক অনেক সত্য চাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি। বেশ কয়েক বছর ধরে ইউরোপ ও আমেরিকার প্রভাবশালী সরকার ও নেতারা ফিলিস্তিন ভাগাভাগির চক্রান্তে লিপ্ত ছিল, যার প্রকাশ পায় বেলফোর ঘোষণার মাধ্যমে।

কী ছিল বেলফোর ঘোষণায়?

আর্থার বেলফার চিঠিতে যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, তা ছিল এমন-

মহান সরকারের পক্ষ থেকে অনেক আনন্দের সঙ্গে আপনাকে জানাচ্ছি, নিম্নবর্ণিত ঘোষণা ইহুদিদের ইহুদিবাদী আকাঙ্ক্ষার প্রতি সমর্থন, যা মন্ত্রিসভায় পেশ করা হয় এবং মন্ত্রিসভার অনুমোদন পায়।

ইহুদি জনগণের জন্য ফিলিস্তিনে জাতীয় আবাসভূমি প্রতিষ্ঠাকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে (ব্রিটিশ) সরকার এবং এ উদ্দেশ্য পূরণে তাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা সমর্থন করবে, এটি নিশ্চিত করা হচ্ছে, ফিলিস্তিনে বিদ্যমান অ-ইহুদি সম্প্রদায়ের নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকার অথবা অন্য কোনো দেশে ইহুদিরা যে অধিকার ও রাজনৈতিক মর্যাদা ভোগ করছে, তার কোনো হানি হয়, এমন কিছু করা হবে না।

এই ঘোষণা আপনি যদি জায়নিস্ট ফেডারেশনকে অবহিত করেন, তাহলে আমি কৃতজ্ঞ থাকব।

আপনার বিশ্বস্ত
আর্থার জেমস বেলফোর

বেলফোর ঘোষণার প্রভাব
বেলফোরের ঘোষণায় ফিলিস্তিনি মুসলিমদের নাম বলা হয়নি, বলা হয়েছে অ-ইহুদি সম্প্রদায়। যেখানে সেই সময়ে ফিলিস্তিনের মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশেরও কম ছিল ইহুদিরা, সেখানে বাকি ৯০ শতাংশ মানুষকে অ-ইহুদি বলে তাদের নগণ্য দেখানো হয়েছে। এর পেছনে দূরভিসন্ধি ছিল ব্রিটিশ সরকারের, যার বাস্তবতা দেখা যায় ১৯৪৮ সালে, যখন ‘ফিলিস্তিনি জাতির বিরুদ্ধে নিধন’ চালানো হয়। হত্যা, গণহত্যা, নির্যাতন, নিপীড়নের মাধ্যমে কয়েক শত ফিলিস্তিনি গ্রাম খালি করে সেখানে ইহুদিদের বসতি তৈরি করা হয়। ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনিদের রক্তে ভেজা জমিনে জন্ম হয় ইসরায়েলের। ওই বছর ফিলিস্তিনের মাত্র ১০ ভাগ ভূখণ্ড নিয়ে ইহুদি রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করা হলেও এখন তাদের দখলেই চলে গেছে ৯০ শতাংশ। ৭০ বছরে শতাংশের হিসাব একেবারে উল্টে গেছে। ১৯৪৮ সালে ভূখণ্ডের হিসাব ছিল: ফিলিস্তিন ৯০ঃ ইসরায়েল ১০। ২০১৭ সালে হয়েছে: ফিলিস্তিন ১০ঃ  ইসরায়েল ৯০।

কারা ছিলেন এই নীলনকশার নেপথ্যে?
আর্থার বেলফোর: এই ঘোষণার চূড়ান্ত লেখক। ১৮৪৮ সালে স্কটল্যান্ডে জন্ম নেওয়া বেলফোর ১৯৩০ সালে ইংল্যান্ডে মারা যান। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু তার পরবর্তী সময়ের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড লয়েড জর্জের আমলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।



অভিজাত ব্রিটিশ পরিবারের সন্তান বেলফোর সেই সময়ে (প্রথম বিশ্বযুদ্ধ) যুক্তরাজ্যের যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভাকে এই ঘোষণা দেওয়ার জন্য রাজি করান। তখনকার প্রভাবশালী দুই নেতা চাইম ওয়েজম্যান ও লর্ড ব্যারন রথসচাইল্ডকে ঘোষণার খড়সা তৈরি করতে বলেন তিনি।

বেলফোর কতটা ঔপনিবেশিক মানসিকতার মানুষ ছিলেন, তার প্রমাণ পাওয়া ১৯১৯ সালে তার প্রণীত একটি স্মারকে :

ফিলিস্তিনে... সে দেশের বর্তমান বাসিন্দাদের আশা-প্রত্যাশা নিয়ে আলাপ-আলোচনা করার প্রস্তাব না দিয়েই আমরা এগিয়েছি। সঠিক বা ভুল, ভালো অথবা মন্দ যাই হোক, ইহুদিবাদের গোড়া সুদীর্ঘ সময়ের ঐতিহ্যে নিহিত, যা বর্তমানের প্রয়োজনে, ভবিষ্যতের প্রত্যাশার দিক থেকে এখন ওই প্রাচীন ভূমিতে বসবাসকারী সাত লাখ আরবের আশা-আকঙ্ক্ষার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

লন্ডনে জিউস এজেন্সির অফিসে চাইম ওয়েজম্যানের সঙ্গে কাজ করতেন বেলফোরের ভাতিজি ব্লানচে ডাগডেল। ব্লানচে তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, বেলফোর ছিলেন একজন খ্রিষ্টান ইহুদি। ইহুদি ও তাদের ইতিহাসের প্রতি বেলফোরের আজীবন আগ্রহ ছিল, যা তার মায়ের ওল্ড টেস্টামেন্ট প্রশিক্ষণ এবং স্কটিশ হিসেবে তার বেড়ে ওঠার মধ্যে দিয়ে তৈরি হয়।

কিন্তু কারো কারো মতে, বেলফোর একজন ইহুদিবিদ্বেষী ছিলেন এবং ইহুদিবাদী প্রকল্পে তার আগ্রহ ছিল শুধু ব্রিটিশদের কৌশলগত সফল্যের জন্য। প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগের আগে ১৯০৫ সালে তিনি ‘অ্যালিয়েন অ্যাক্ট’ নামে একটি আইন করার চেষ্টা করেছিলেন। বলা হয়ে থাকে, এই আইনের মাধ্যমে পূর্ব-ইউরোপীয় ইহুদি সম্প্রদায়কে তিনি ইউরোপের অন্য অঞ্চলে বিতাড়িত করতে চেয়েছিলেন। তবে আইনটিতে এ বিষয়ে পরিষ্কার করে কিছু বলা ছিল না।

লিওনেল ওয়াল্টার রথসচাইল্ড : ১৮৬৮ সালে ইংল্যান্ডে জন্মগ্রহণকারী এ ব্যক্তি ছিলেন সেদেশের ব্যাংকিং ব্যবসায় প্রভাবশালী ইহুদি রথসচাইল্ড পরিবারের সন্তান। চাইম ওয়েজম্যানের ঘনিষ্ঠ ছিলেন তিনি।

১৯১০ সালে পার্লামেন্ট থেকে পদত্যাগ করলেও ব্রিটিশ ইহুদি সম্প্রদায়ের পুরোধা হিসেবে সক্রিয় থেকে তিনি ইংলিশ জায়নিস্ট ফেডারেশনের প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। বেলফোর ঘোষণা গ্রহণ করেছিলেন তিনিই। ইহুদিবাদের লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ওয়েজম্যানকে নিয়ে ১৯১৭ সালে তাকে একটি বিবৃতির খড়সা লিখতে বলেছিলেন বেলফোর।



বেলফোরকে দেওয়া রথসচাইল্ডের খসড়ার মূল প্রস্তাবনায় বলা হয়েছিল- ‘ফিলিস্তিনকে ইহুদি জনগণের জাতীয় আবাসভূমি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হোক।’ কিন্তু মন্ত্রিসভায় কারো কারো আপত্তির কারণে শব্দগুলো ধোঁয়াশাপূর্ণ করে ৬৮ শব্দের একটি বাক্যে ঘোষণার খসড়া চূড়ান্ত করা হলো। যেখানে ফিলিস্তিনকে বাদও দেওয়া হলো না আবার রাখাও হলো না।  

ব্রিটিশ সরকারের ভেতরে ও বাইরে ওয়েজম্যান ও অন্য প্রভাবশালী ইহুদিদের পাশাপাশি রথসচাইল্ডের প্রবল চাপের মুখে বেলফোর ঘোষণা জারি করা হয়। ১৯৩৭ সালে ইংল্যান্ডে মারা যান রথসচাইল্ড।

চাইম ওয়েজম্যান : প্রভাবশালী এই ইহুদি নেতার জন্ম ১৮৭৪ সালে সাবেক রুশ সাম্রাজ্যে; বর্তমানে তার জন্মস্থান বেলারুশের অন্তর্গত। রাশিয়ান বংশোদ্ভূত ইহুদি ও রসায়নবিদ চাইম ওয়েজম্যান নবগঠিত ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট হন। বেলফোর ঘোষণা প্রণয়ন ও জারির নেপথ্যে তার ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য।

থিয়োডর হার্জলকে যদি ‘রাজনৈতিক ইহুদিবাদের জনক’ বলা হয়, তাহলে ওয়েজম্যানকে বলতে হয় সেই ‘মতবাদের বাস্তবায়নকারী’। সুইজারল্যান্ড থেকে রসায়ন বিজ্ঞানে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। এরপর পাড়ি জমান ইংল্যান্ডে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ইংল্যান্ড সরকারের বিজ্ঞানী হিসেবে কাজ শুরু করেন।

বিজ্ঞানে তার কিছু অবদান রয়েছে। বিশেষ করে বিস্ফোরকের জন্য সিনথেটিক অ্যাসিটন তৈরি করার পর ব্রিটিশ সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে তার ভালো যোগাযোগ গড়ে ওঠে। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড লয়েড জর্জ, তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেলফোর ও মার্ক সিকেসের সান্নিধ্য পান তিনি। জর্জ লয়েড তার আত্মজীবনীতে কয়েকবার উল্লেখ করেছেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অবদান রাখার পুরস্কার হিসেবে ওয়েজম্যানকে বেলফোর ঘোষণা দিতে বলা হয়েছিল। এর আগে তিনি ব্রিটেনের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছিলেন।

বেলফোরের অনুরোধে ইহুদিদের স্বার্থের সঙ্গে মানানসই খসড়া ঘোষণা লিখেছিলেন ওয়েজম্যান ও রথসচাইল্ড। ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ব্রিটেন সরকারের প্রতিশ্রুতি আদায়ে দুই বছর ধরে হাড়হাড্ডি পরিশ্রম করেছিলেন ওয়েজম্যান। তিনি বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন, ইহুদি রাষ্ট্র হবে ইংল্যান্ডের স্বার্থেই।



আজকের গার্ডিয়ান পত্রিকার সেই সময়ে নাম ছিল ম্যানচেস্টার গার্ডিয়ান। ১৯১৪ সালে পত্রিকাটিতে তিনি একটি চিঠি লেখেন। তাতে তিনি বলেন-

ব্রিটিশ প্রভাব বলয়ের মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনের পতন ঘটাতে হবে এবং সেখানে ইহুদি বসতি স্থাপনে ব্রিটেনকেই উদ্যোগী হতে হবে, ব্রিটেনের অধীনে থাকা অবস্থায় আমাদের হাতে ২০-৩০ বছর সময় থাকবে, যে সময়ে সেখানে ১০ লাখ বা তারও বেশি ইহুদি পাঠানো সম্ভব হবে। তারা দেশের উন্নয়ন করতে পারবে, নিজেদের সভ্যতার পুনঃপ্রতিষ্ঠতা করবে এবং সুয়েজ খালের জন্য খুবই কার্যকরী সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলবে।

১৯০৭ সালে প্রথমবার ফিলিস্তিন সফরে গিয়েছিলেন ওয়েজম্যান। তখন তিনি দেশটিকে এভাবে বর্ণনা করেছিলেন, ‘সব মিলে যন্ত্রণাময় একটি দেশ, তুর্কি সাম্রাজ্যের সবচেয়ে অবহেলিত অংশ।’

ওয়েজম্যানের আরেকটি উক্তি ইহুদিদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয়। ১৯১৯ সালে তিনি বলেছিলেন- ‘ইহুদিদের জাতীয় আবাসভূমি বলতে আমি এমন শর্তসমূহের কথা বলছি, যখন দেশ গঠন হয়ে যাবে তখন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অভিবাসী আমরা সেখানে পাঠাব এবং চূড়ান্তভাবে ফিলিস্তিনে এমন একটি সমাজ গড়ে তুলব যেখানে ফিলিস্তিন মানে হবে ইহুদি যেমন ইংল্যান্ড থেকে ইংলিশ অথবা আমেরিকা থেকে আমেরিকান।’

১৯৫২ সালে ইসরায়েলে মারা যান ওয়েজম্যান।

ডেভিড লয়েড জর্জ : ১৮৬৩ সালে ইংল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন ইহুদি-দরদী ব্রিটেনের এই প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী। ১৯১৬ থেকে ১৯২২ সাল পর্যন্ত ব্রিটেনের জোট সরকারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিনি। তার সরকারের আমলে বেলফোর ঘোষণা জারি করা হয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলার সময় কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য তিনি ওয়ার কেবিনেট (যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভা) গঠন করেছিলেন এবং ওই মন্ত্রিসভায় ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রকল্পকে নীতিনির্ধারণী আলোচনায় সামনে এনেছিলেন। ইহুদিদের নিয়ে তার একটি উল্লেখযোগ্য বাণী রয়েছে: ‘আমার নিজের জনগণের চেয়ে ইহুদিদের সম্পর্কে অনেক অনেক বেশি ইতিহাস পড়ানো হয়েছে আমাকে।’ তাকে বোঝানো হয়েছিল, ব্রিটিশ শাসনের অধীনে আসবে ফিলিস্তিন এবং ব্রিটেনের নিয়মেই চলবে। এতে তিনি তুষ্ট ছিলেন।

লয়েড জর্জ তার স্মৃতিকথায় কেন তিনি ইহুদিবাদকে সমর্থন করেছেন, তার বেশ কিছু কারণের একটি তালিকা দিয়েছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কারণ হলো- ইহুদিদের অর্থনৈতিক সম্পদ, খ্রিষ্টান ইহুদি বিশ্বাস, ব্রিটেনের ইহুদি সংঘ বাগে আনা এবং ইহুদিবিদ্বেষের শিকার ইহুদিদের প্রতি সমবেদনা জানানো।



লয়েড জর্জ লিখেছেন- যুদ্ধের সময় অবদানের পুরস্কার হিসেবে ওয়েজম্যানকে বেলফোর ঘোষণা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কিছু ইতিহাসবিদ এ বিষয়ে আপত্তি তোলেন। পরে ওয়েজম্যান ও রথসচাইল্ড মিলে ঘোষণার খসড়া প্রস্তুত করেন।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুবাদে ‘রাজনৈতিক ইহুদিবাদের জনক’ থিওডর হার্জলের সঙ্গে ‘উগান্ডা প্রকল্প’ নিয়ে নিবিড়ভাবে কাজ করেছিলেন লয়েড জর্জ। ব্রিটিশ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় ইহুদিদের উগান্ডায় বসতি স্থাপনের ব্যবস্থা করাসম্পর্কিত পরিকল্পনায়ই ইতিহাসে উগান্ডা প্রকল্প নামে পরিচিত। সেই প্রকল্প বাদ হয়ে যায় এবং পরে ইহুদিদের ফিলিস্তিনে পাঠানো হয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর কমান্ডার এডমন্ড অ্যালেনবিকে বড়দিনের ছুটির আগেই জেরুজালেম অধিগ্রহণ করতে নির্দেশ দেন লিয়ড জর্জ। তার নির্দেশে ১৯১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে ব্রিটিশ সেনারা জেরুজালেমে প্রবেশের পর তিনি এ ঘটনাকে ‘ব্রিটিশ জনগণের জন্য বড়দিনের উপহার’ বলে বর্ণনা করেছিলেন। ১৯৪৫ সালে ওয়েলসে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন লিয়ড জর্জ।

হারবার্ট স্যামুয়েল : ইংল্যান্ডের মন্ত্রিসভায় প্রথম ইহুদি হিসেবে ১৯০৯ সালে মন্ত্রীর দায়িত্ব পান স্যামুয়েল। ১৮৭০ সালে ইংল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তিনি ছিলেন জার্মান বংশোদ্ভুত ব্রিটিশ।

১৯১৪ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রতিমন্ত্রী এডওয়ার্ড গ্রের সঙ্গে এক আলোচনায় স্যামুয়েল বলেছিলেন, ‘সম্ভবত ইহুদি জনগণের বহু পুরোনো আকাঙ্ক্ষা পূরণের সুযোগ হতে পারে এবং সেখানে (ফিলিস্তিন) ইহুদি রাষ্ট্রের পত্তন করা যেতে পারে।’ এর কয়েক সপ্তাহ পর জিউস কমনওয়েথ গঠনের প্রস্তাব রেখে ‘ফিলিস্তিনের ভবিষ্যৎ’ শিরোনামে একটি মেমোরেন্ডাম ব্রিটিশ মন্ত্রিসভায় উত্থাপন করেছিলেন তিনি। কিন্তু তার এ প্রস্তাব তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এইচএইচ অ্যাসকুইথের সমর্থন পেতে ব্যর্থ হয়।

পরে সংশোধন করে ওই মেমোরেন্ডাম আবার ব্রিটিশ সরকারের কাছে পেশ করেন স্যামুয়েল। এবার তিনি ইহুদিদের ফিলিস্তিনে অভিবাসিত করানোর সুযোগ দিয়ে সেখানে তাদের সংখ্যা বাড়ানোর পরামর্শ দেন। সেখানে বসতি স্থাপনের পর ইহুদিরা স্বশাসনে চলার সক্ষমতা অর্জন করবে। তার বিশ্বাস ছিল, এভাবে ইহুদিদের মাধ্যমে বিশ্বে ইংল্যান্ডের জয় হবে। তিনি ব্রিটিশ সরকারকে বলেছিলেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সুয়েজ খালের পাশে ব্রিটেনের স্বার্থেই একটি বন্ধু-রাষ্ট্র রাখা উচিত।

ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ওয়েজম্যান ও স্যামুয়েল কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছিলেন। লক্ষ্য পূরণে ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে তাদের ভবিষ্যৎ-করণীয় কী হতে পারে, তাও ঠিক করেছিলেন তারা দুজন।



বেলফোর ঘোষণা বাস্তবায়নের জন্য ব্রিটিশ সরকারের সহায়তায় ফিলিস্তিনে জায়নিস্ট কমিশন গঠন করা হয়, যার সভাপতি ছিলেন ওয়েজম্যান। ১৯১৮ সালে এই কমিশনের কর্মকর্তা নিযুক্ত হন স্যামুয়েলের ছেলে এডউইন স্যামুয়েল। বেলফোর ঘোষণা বাস্তবায়নের জন্য কী কী করার আছে, সে বিষয়ে ব্রিটিশ সরকারকে পরামর্শ দিতেন কমিশনের কর্মকর্তারা।

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জ ফিলিস্তিনে জায়নিস্ট হাইকমিশনার হিসেবে স্যামুয়েলকে পাঠান। ১৯২০-১৯২৫ সাল পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন। স্যামুয়েলকে বলা হয় ‘২ হাজার বছরের মধ্যে জেরুজালেমের প্রথম হিব্রু গভর্নর।’

কখনো সখনো তিনি বলেছিলেন, ফিলিস্তিনে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে সেদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ফিলিস্তিনি আরবদের ক্ষতি হবে। কিন্তু তার এ অবস্থানের বিপরীতে ফিলিস্তিনে ইহুদিদের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য তিনি যেসব উদ্যোগ নিয়েছিলেন, সেসব ইতিহাসে বহুল সমালোচিত ও নিন্দিত। সেখানে তিনি তার প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদে এক ইহুদিকে বসিয়েছিলেন। বিপরীতে ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় স্বায়ত্তশাসিত ‘আধা-রাষ্ট্র’ ধরনের প্রশাসনও গঠন করতে দেননি তিনি।

মার্ক সিকেস : বেলফোর ঘোষণার ক্ষেত্রে সাবেক ব্রিটিশ কূটনীতিক স্যার মার্ক সিকেসের নাম খুব বেশি উচ্চারিত না হলেও তিনি হলেন ইতিহাসের সেই কুখ্যাত ‘অ্যাংলো-ফ্রেন্স’ নামে চুক্তির সহলেখক, যে চুক্তি করা হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে মধ্যপ্রাচ্য ভাগাভাগি করে নেওয়ার জন্য।

ফরাসি কূটনীতিক ফ্রাঁসোয়া জর্জেস পিকৎতের সঙ্গে চুক্তিটি প্রণনয় করেছিলেন সিকেস। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়ে ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইতালি ও রাশিয়ার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের ভূখণ্ড ভাগ করে নেওয়ার নীলনকশা করা হয়েছিল ওই চুক্তিতে। নভেম্বর ১৯১৫ থেকে মার্চ ১৯১৬ সাল- ওই সময়ে চুক্তিটি নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন তিনি এবং তাদের প্রচেষ্টায় ১৯১৬ সালের মে মাসে চার দেশের মধ্যে গোপন এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

১৮৭৯ সালে লন্ডনে জন্মগ্রহণ করেন সিকেস। পেশাজীবনে চতুর কূটনীতিক ছিলেন। ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় পর্দার আড়ালে তার ব্যাপক ভূমিকা ছিল। ব্রিটিশ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ ও প্রভাবশালী ইহুদিদের মধ্যে চাইম ওয়েজম্যানের সক্রিয় যোগাযোগ অব্যাহত ছিল তার সহায়তায়।



মধ্যপ্রাচ্যের বিষয়াবলি নজরদারি করার জন্য ওয়ার কেবিনেটের সহকারী মন্ত্রী ছিলেন সিকেস। তিনিও বিশ্বাস করতেন, ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র হলে তা ফ্রান্সের প্রভাব কমিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের স্বার্থ রক্ষা করবে। বেলফোর ঘোষণা জারি করার প্রচেষ্টায় তারও ব্যাপক ভূমিকা ছিল।

পোলিশ ইহুদি ও তৎকালীন তুখোড় কূটনীতিক নাহুম সকোলোকে দিয়ে ফ্রান্স সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করিয়েছিলেন তিনি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ফিলিস্তিন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে যাবে- এ বিষয়ে ফরাসি সরকারের সমর্থন আদায় করেছিলেন সিকেস।

ওয়েজম্যান তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ১৯১৭ সালে ইহুদিদের একটি গ্রুপের সঙ্গে বৈঠকে সিকেস বলেছিলেন, ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় তার পূর্ণ সমর্থন আছে। ১৯১৭ সালের ৩১ অক্টোবর বেলফোর ঘোষণায় ব্রিটিশ মন্ত্রিসভা চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়, যেখানে সিকেসের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ছিল।

১৯১৯ সালে প্যারিসে মারা যান সিকেস।

নাহুম সকোলো : বেলফোর ঘোষণার নেপথ্যের খেলোয়াড়দের মধ্যে নাহুম সকোলোর নাম খুব বেশি উচ্চারিত হয় না ঠিকই কিন্তু তিনি ছিলেন পর্দার আড়ালে বড় ষড়যন্ত্রকারী। বেলফোর ঘোষণার পক্ষে সমর্থন আদায়ে আন্তর্জাতিক মহলে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালান তিনি। চাইম ওয়েজম্যানের ঘনিষ্ট বন্ধু নাহুম সকোলো সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি লুইস ব্র্যান্ডেইস ও ভ্যাটিকানে পোপ পঞ্চদশ বেনেডিক্টের সঙ্গে দেখা করে বেলফোর ঘোষণা জারির জন্য তাদের সমর্থন আদায় করেন।



শুধু তাই নয়, ঘোষণা জারির আগে ফ্রান্স, ইতালি ও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সব মিত্রশক্তির সমর্থন আদায় করেছিলেন সকোলো। তার সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল ১৯১৭ সালের মে মাসে ফ্রান্স সফরে গিয়ে ফিলিস্তিনে ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের প্রতি ফরাসি সরকারের পূর্ণ সমর্থন আদায় করা।

এসব চক্রান্তকারী ও ষড়যন্ত্রীদের গোপন আঁতাতে ফিলিস্তিনি আরবদের ভূখণ্ডে আজ ইসরায়েলের বর্বর উপনিবেশে চলছে। আর তাতে অন্ধের মতো সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব। এর শেষ কোথায়? ফিলিস্তিনিরা কি মরতেই থাকবে আর বিশ্ববিবেকের ঠিকাদাররা চেয়ে চেয়ে তা দেখবে? বেলফোর ঘোষণার শতবর্ষ পরে হলেও এখন সময়ের দাবি, আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় ‘স্বাধীন ফিলিস্তিন’ প্রতিষ্ঠা করা হোক। 

লেখক: সাংবাদিক, বিশ্লেষক- আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি


 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৫ নভেম্বর ২০১৭/তারা/এনএ

Walton
 
   
Marcel