ঢাকা, মঙ্গলবার, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২১ নভেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

আর কত দিন অপেক্ষা করতে হবে?

ফেরদৌস জামান : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-১১-০৬ ৩:৪১:১৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-১১-০৬ ৩:৪১:১৭ পিএম

ফেরদৌস জামান : বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এ বছর শীত একটু তাড়াতাড়ি বা যথা সময়েই এলো বলা যায়। বিশেষ করে ভোররাতে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের পাশাপাশি রাজধানীতেও শীত অনুভূত হচ্ছে। যে কারণে ঢাকার ফুটপাথ থেকে শুরু করে বিপণি বিতানগুলোতে ইতিমধ্যেই গরম কাপড়ের বিকিকিনি শুরু হয়েছে। মনে আছে গত বছর শীতের সোয়েটার কেনার জন্য গিয়েছিলাম নয়া পল্টনের পলওয়েল সুপার মার্কেটে। লক্ষ্য করলাম, শীতের বাজার ভালোভাবে ধরার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছোট ছোট ব্যবসায়ীরা আগেভাগেই এসে হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন। সঙ্গে জুটেছে মহানগরীর খুচরা ক্রেতারাও।

মার্কেটটিতে সোয়েটার, জ্যাকেট, মাফলার, টি-শার্ট, শার্ট-প্যান্ট, বাচ্চাদের কাপড়, জুতা-স্যান্ডেলসহ অনেক কিছু পাওয়া যায়। প্রতিটি দোকানের ভেতরে-বাইরে সাজানো থরে থরে পণ্য, যার প্রায় শতভাগ বিদেশ থেকে আমদানী করা। ক্রেতার ভিড় ঠেলে প্রবেশ করলাম সুবিধাজনক এক দোকানে। আমার চাহিদা মতো বিক্রয়কর্মী বেশ কয়েকটি সোয়েটার দেখালেন। নিজেও নেড়েচেড়ে পরখ করলাম- কোনটা কেনা যায়? একই সোয়েটারের এত এত ডিজাইন দেখে চোখ গুলিয়ে গেল। এক পর্যায়ে জানতে চাইলাম, তাদের দোকানে কোন দেশের পণ্য বেশি বিক্রি হচ্ছে?

প্রশ্নের উত্তরে স্বত্ত্বাধিকারী নিজেই এগিয়ে এলেন এবং দোকানের কর্মচারী ও নিজেকে দেখিয়ে বললেন ‘আমরা ছাড়া এখানে সবই চায়না মাল’। একটু খোলাসা করে জনতে চাইলে বললেন, বর্তমান বাজারে প্রতিযোগিতা এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, চায়না ছাড়া অন্য কোনো দেশের পণ্য বিক্রি করে পোশায় না। কারণ জানতে চাইলে পেছন থেকে একটি ফুল হাতা টি-শার্ট বের করলেন। তারপর হাতের কাছ থেকে একই ডিজাইনের আরেকটি টি-শার্ট টেনে নিয়ে পাশাপাশি মেলে ধরে বললেন, দুইটির মধ্যে দামের তফাত কত হতে পারে বলতে পারেন?

আমি অনুমান করতে পারলাম না। কিছুক্ষণ পর নিজ থেকেই বললেন, বাইশশ টাকা। কারণ, প্রথমটি মেইড ইন থাইল্যান্ড এবং দ্বিতীয়টি চাইনিজ। দেখে বোঝার উপায় নেই, দুটি আলাদা মানের। অবশ্য হাতে নিয়ে পরখ করলে বোঝা যায় তফাত কোথায়! এ নিয়ে আমার আগ্রহ লক্ষ্য করে তিনি জানালেন, আজকাল ক্রেতারা যতটা পারা যায় কম দামে আকর্ষনীয় ডিজাইনের জিনিস খোঁজে। সেক্ষেত্রে চাইনিজ পণ্যই ভরসা। মান যাচাইয়ের ব্যাপারে তারা উদাসীন। তাদের কাছে ডিজাইন মুখ্য। আর এই সুযোগে ব্যবসায়ীরা মানের দিকে না তাকিয়ে একই ডিজাইনের পণ্য যে যত পারছে কম দামে এনে ক্রেতার হাতে তুলে দিচ্ছে। তাতে মান ঠিক থাকছে না।

এর পরিপ্রেক্ষিতে কি বলা যায় না যে, প্রতিযোগিতায় আমরা অন্যকে ফাঁকা মাঠ ছেড়ে দিয়ে বগলের নিচে হাত লুকিয়ে গ্যালারিতে বসে আছি? মাঝখান থেকে চুরি হয়ে যাচ্ছে আমাদের রুচি, ভোক্তাচিন্তা- সর্বোপরী সতেরো কোটি জনসংখ্যার এক বিশাল বাজার। ডিজাইনের ক্ষেত্রে বাহার বা চমকের দিকটি ঠিকঠাক রেখে একটি চাইনিজ পণ্য তুলনামূলক অনেক কম দামে পাওয়া সম্ভব। কারণ ক্রেতার চাহিদার দিক বিবেচনায় রেখে তারা পণ্য তৈরি করে। আমদানীকারকগণও সেভাবেই তাদের কাছে পণ্যের অর্ডার দেন। অথচ ইউরোপে দেখেছি ইলেক্ট্রনিক্স পণ্যের প্রায় সত্তুর থেকে আশি ভাগ বাজার চীনের দখলে। আমেরিকা মহাদেশ সম্বন্ধেও একই কথা শুনেছি। কিন্তু সেখানকার পণ্যগুলো খুবই উন্নত। মান নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকে না। আসলে তফাত চাহিদায়। অর্থাৎ, কে কোন মানের পণ্যের অর্ডার দিচ্ছে, সে অনুযায়ী চীন তা প্রস্তুত করছে। অতএব, পণ্যের মানের বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে ক্রেতার চাহিদার উপর।

এই সুযোগে সারা পৃথিবীর ভোক্তার মানসিকতা ও ক্রেতার ক্রয় ক্ষমতার বিষয়টি মাথায় রেখে চীন ব্যবসা করে যাচ্ছে। সুতরাং, দেখা যায় থাইল্যান্ড, ইন্ডিয়া বা অন্য কোনো দেশ থেকে আমদানী করা একটি পণ্যের দাম যা দাঁড়ায়, সে তুলনায় চাইনিজ পণ্য তার অর্ধেকেরও কমে মিলে যায়। বর্তমান বাস্তবতা হলো, চাইনিজ শিল্প এতটাই উন্নত ও দক্ষ হয়ে উঠেছে যে, যে কোনো দামের মধ্যে তারা পণ্য তৈরি করে দিতে সক্ষম। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, মশা তাড়ানোর কয়েলের মতো সামান্য পণ্যটিও এখন আমাদের চীন থেকে আমদানী করতে হচ্ছে। পরিস্থিতি দেখে মনে হয় গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী মোয়া-মুড়কি আর বাতাসা-জিলাপি আমদানীর দিন বেশি দূরে নয়। এটি একটি দিক।

দ্বিতীয় দিকটি হলো, সমাজের একটি শ্রেণী বিদেশী পণ্য ছাড়া দেশীয় পণ্যে আস্থা রাখতে পারেন না। পণ্যের মান তাদের কাছে গৌন, বিদেশী হওয়াটাই মুখ্য। এটি সম্পূর্ণরূপে মনস্তাত্বিক ব্যাপার। সুতরাং এই আলোচনায় সেদিকে যাওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও সুযোগ কোনোটিই নেই। উল্লেখিত এই শ্রেণী ছাড়া বাকি প্রায় সকলেই দেশী পণ্য খোঁজে। আসলে দেশী জিনিস ব্যবহার করতে কার না মন চায়? আর কিছু না হোক অন্তত এতটুকু দেশপ্রেম যে আমাদের আছে তা হলফ করে বলা যায়। প্রশ্ন হলো, সে হিসেবে চাহিদার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ পণ্যটি কি আদৌ আমাদের চোখে পড়ে? একদিন এ দেশেই মসলিন তৈরি হতো! রপ্তানী হতো মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর-আফ্রিকা এমনকি ইউরোপের দেশে দেশে! হাজার বছর পূর্বে এই মসলিন দিয়ে মিসরীয় অভিজাতগণ পর্যন্ত মরদেহ মমি করে রাখার বাসনা পোষণ করতেন! অথচ, মসলিন তো লক্ষ যোজন দূরের কথা আজকের বাস্তবতা হলো, চোখে পড়ার মতো ভালো মানের খাদি কাপড় পাওয়াও এখন কষ্টসাধ্য। দেশীয় প্রতিষ্ঠান ওয়ালটনের কল্যাণে আমরা কিছু ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য পাচ্ছি। যা আমাদের দেশেই তৈরি হচ্ছে। এবং দেশের চাহিদা মিটিয়ে ওয়ালটন উৎপাদিত পণ্য বিদেশেও রপ্তানী হচ্ছে। আরো কিছু প্রতিষ্ঠান দেশীয় পণ্য উৎপাদনে কাজ করছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের এই তালিকা খুব দীর্ঘ নয়।

চাহিদা পূরণে আমাদের প্রয়োজনীয় পণ্য দেশে উৎপাদন করা অসম্ভব কিছু নয়। দরকার রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা। দক্ষতা দিয়ে পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে তবে দুঃসাধ্য নয়। সক্ষমতা ও কর্ম দক্ষতার বিষয়ে বলতে গেলে এই গুণ আমাদের অতীতে যেমন ছিল এখনও আছে। আমরা জানি ঔপনিবেশিক ব্রিটিশের সর্ববৃহৎ উপনিবেশ তথা বাজার ছিল ভারতবর্ষ। শিল্পে কাঁচামালের নিশ্চিত যোগান এবং সেই শিল্পজাত পণ্য-দ্রব্যের বাজার বিস্তারের লক্ষে তারা দীর্ঘ দিন এই অঞ্চল শোষণ করেছে। শুধু তাই নয়, পুঁজির স্বার্থে এখানকার স্থানীয় শিল্প বিকাশের সম্ভাবনা ও ধারা সুপরিকল্পিতভাবে তারা নষ্ট করেছে। ফলে আমাদের পূর্বপুরুষরা যে সামন্তীয় অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে ক্রমেই অগ্রসর হচ্ছিল জাতীয় শিল্প বিকাশের দিকে- তা রুদ্ধ হয়ে যায়।  বিকাশের প্রধান অন্তরায় পশ্চাদপদ সামন্তীয় ব্যবস্থাকে তারা (ব্রিটিশ) পুনরায় তাজা করে তুললো এবং বাঁচিয়ে রাখল দীর্ঘ দিন। ফলে থেমে গেল এখানকার বিকাশ আর লাভবান হতে থাকল তারা। বিকাশের ধারা থেমে গেলেও সুদীর্ঘ কাল ধরে তিলে তিলে অর্জিত এখানকার মানুষের কর্মদক্ষতা ও সৃজনশীলতা তারা নিঃশেষ করতে পারেনি। যদি তাই হতো তাহলে আজ বিশ্বের উন্নত দেশের প্রথম শ্রেণীর ব্র্যান্ডগুলো তাদের গার্মেন্টস পণ্য, পাদুকা, স্পোর্টস আইটেমসহ অন্যান্য কিছু বাংলাদেশ থেকে তৈরি করে নিতে আসত না।

এ দেশের বিজ্ঞানী পাটের জিন তত্ত্ব আবিষ্কার করে, কৃত্রিম কিডনি তৈরির নেতৃত্ব দেয়। বিশেষজ্ঞরা মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক তথা পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে বড় তেল ও খনিজ সম্পদ উত্তোলনকারী সংস্থার উচ্চ পদে প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালন করে। মহাকাশ গবেষণা সংস্থাসহ বিশ্বের অন্যান্য বৃহৎ সংস্থায় আমাদের দেশের ছেলেরাই কাজ করে। আর যন্ত্র নির্মাণের যোগ্যতার কথা যদি বলা হয় তাহলে বলব, ধোলাইখাল-জিঞ্জিরার কারিগরদের অসাধারণ কর্মদক্ষতা ও মেধার বিষয়টি। সঠিকভাবে ওদের আমরা আজও কাজে লাগাতে পারলাম না! সুতরাং, এ কথা বলার কোনো যৌক্তিকতা নেই যে, বাঙালি অযোগ্য। অভাব রয়েছে পৃষ্ঠপোষকতা এবং অনুকূল পরিবেশের। এ জন্য আমাদের দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতাও অনেকটা দায়ী। ক্ষমতায় যারা থাকেন তাদের উচিৎ সঠিক পরিকল্পনা করা এবং দেশপ্রেম, সততা ও নিষ্ঠা দিয়ে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা। সমস্যা এখানে। দুর্নীতি আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। এর মধ্যেও কাজ হচ্ছে। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। বেসরকারি অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান দেশের মানুষের জন্য পণ্য তৈরি করছে। কিন্তু কোথায় যেন একটা শূন্যতা। বুকের ভেতর বড় বেশি বেদনা জাগায়। মনে হয়, আমরা আরো অনেক কিছু করতে পারতাম। কেন পারলাম না সেই কথাটি সবার একটু ভেবে দেখা দরকার। এমন দিন নিশ্চয়ই আসবে যেদিন প্রতিযোগিতার বিশ্ববাজারে আমাদের দেশের মানসম্পন্ন পণ্যটিও থাকবে। প্রত্যাশার এই দিন দেখতে এ দেশের মানুষকে আর কত দিন অপেক্ষা করতে হবে তা কি কারও জানা আছে?



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৬ নভেম্বর ২০১৭/তারা

Walton
 
   
Marcel