ঢাকা, শুক্রবার, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

ঢাকা কি কখনও তিলোত্তমা-শহর হতে পারবে || আহমদ রফিক

আহমদ রফিক : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-১২-০২ ৮:২৭:৫০ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-১২-০২ ৫:০৮:৩৯ পিএম

শিশুপাঠ্য বইতে একদা লেখা থাকত: ঢাকা বুড়িগঙ্গার তীরে অবস্থিত শহর। মুঘল আমলের শহর ঢাকা (বর্তমানের পুরনো ঢাকা) ইংরেজ আমলে এসে ‘খাজা-কুট্টি-শাঁখা’ ও ‘মসজিদের শহর’ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে। পাকিস্তান আমলে পূর্ববঙ্গের প্রাদেশিক রাজধানী-শহর ঢাকায় দ্রুত উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। অতি ধীরে সুস্থে এর উন্নতি, মূলত পাকিস্তানি শাসকদের পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে দ্বিমুখী নীতির কারণে। তাদের লক্ষ্য ছিল পশ্চিম পাকিস্তান, বিশেষত পাঞ্জাব-সিন্ধুর একচেটিয়া উন্নতি- শিল্পে বাণিজ্যে অর্থনৈতিক সামাজিক অবকাঠামোগত বিচারে। মসলিন-খ্যাত ঢাকা তার আভিজাত্য হারিয়েছে অনেক অনেক বছর আগে।

কেন্দ্রীয় রাজধানী হওয়ার সুবাদে শুরুতে করাচি, এরপর রাওয়ালপিন্ডি, পরে নবনির্মিত ইসলামাবাদের জৌলুস পশ্চিম পাকিস্তানি উন্নয়নের প্রতীক। সমালোচনার মুখে অবহেলিত শহর ঢাকাকে সান্ত্বনা দেওয়া হয়েছে বৃহত্তর ঢাকার উত্তরাংশের গাছগাছালি কেটে, ‘মণিপুরি ফার্ম’ ধ্বংস করে দ্বিতীয় রাজধানী তথা ‘সেকেন্ড ক্যাপিটাল’ তৈরির নামে বেশ কিছু সুদর্শন ইমারত তৈরি করে। এ সবই কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার অবদান। পাকিস্তানি রাজনীতির বৈষম্যমূলক আচরণের চরম উদাহরণ পাক-আমলের শহর ঢাকা।

দুই
পাকিস্তানি আমলের পূর্ববঙ্গ তথা পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি উল্লেখিত বৈষম্যমূলক আচরণ, অর্থনৈতিক শোষণ, ভাষা ও জাতিসত্তাগত অবজ্ঞা, কেন্দ্রের রাষ্ট্রভাষা নিয়ে উর্দুর একাধিপত্য ইত্যাদি কারণে পূর্ববঙ্গীয় মুসলমানের স্বপ্নের পাকিস্তান নিয়ে মোহভঙ্গ, ভাষা আন্দোলনও বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ বাঙালিকে আত্মদর্শনে সাহায্য করে। পঞ্চাশের দশকের ভাষা আন্দোলনের উত্তর প্রভাবে এবং একাধিক বিরূপ রাজনৈতিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ষাটের দশকে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ স্থানীয় রাজনীতিকে উত্তপ্ত করে তোলে।

‘দুই পাকিস্তান’ ধারণার উন্মেষ ঘটে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানকে ঘিরে। শিক্ষিত বাঙালি বুদ্ধিজীবী এই ধারণার প্রবক্তা। ভাষা আন্দোলন যদি সূচনালগ্নে ছাত্র আন্দোলন রূপে ঐতিহাসিক পরিচিতি পায় তাহলে ষাটের দশকের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও ছয়-দফা ভিত্তিক রাজনীতি ও সংস্কৃতি প্রধানত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী, পেশাজীবীদের অবদান বলা চলে। যদিও এতে প্রগতিবাদীদেরও অবদান অনস্বীকার্য|

রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আন্দালনের এই ধারায় প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করে। যদিও এর সূচনা পঞ্চাশের দশকের ভাষা আন্দোলনে, যুক্তফ্রন্টের একুশ দফার নির্বাচনী ইশতেহারে এবং তৎকালীন রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে। আর সে উপলক্ষে পাকিস্তানি শাসকশ্রেণীর দমননীতি, বৈষম্যমূলক শোষণনীতি বাঙালির শিক্ষিত ও পরে অশিক্ষিত শ্রেণীতে পাকিস্তান-প্রীতির অবশেষটুকুও আর থাকে না। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ঢাকা ও কাগমারিতে সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্মেলনগুলোর প্রকাশ গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদে ও প্রগতিশীল বামপন্থায়।

দুই পাকিস্তানের মধ্যে বিভেদ রেখা ক্রমে বড় হতে থাকে। পারস্পরিক বিরূপতাও তথ্য ও যুক্তিতে ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠতে থাকে। এবং তা উভয় দিক থেকে। পাকিস্তানে বারবার সামরিক শাসন বিষয়টিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকে। এদিক থেকে প্রেসিডেন্ট আইউব খাঁ, ইয়াহিয়া খাঁ’র মধ্যে পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। পরিণামে তাদের সূচিত পঁচিশে মার্চের গণহত্যা ও আরোপিত যুদ্ধের ফয়সালা হয় একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে। অবশেষে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে ৯ মাস যুদ্ধের মাধ্যমে।

তিন
যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ ভাঙাচোরা অর্থনীতি নিয়ে তার যাত্রা শুরু করে। সামাজিক সন্ত্রাস, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে যায়। একদিকে সুশাসনের অভাব অন্যদিকে দুর্নীতি ক্রমশ মাথা চাড়া দিতে থাকে। এর মধ্যেই রাজনৈতিক নৈরাজ্যের পথ ধরে ষড়যন্ত্রের হাত ধরে বাংলাদেশি সামরিক বাহিনীর কারো কারো উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রেক্ষাপটে পনেরো আগস্টের শোকাবহ হত্যাকাণ্ড, রাজনীতি ও শাসন ব্যবস্থার আদর্শগত পরিবর্তন, ১৯৭২ এর সেকুলার সংবিধানের ধর্মীয় স্বাতন্ত্রবাদী পরিবর্তন এবং জাতীয়তাবাদী চেতনার ভিন্নতায় বিভাজিত জাতীয়তাবাদ (বাঙালি ও বা্ংলাদেশী) এক ধরনের রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক দুর্যোগ ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে। বিনষ্ট হয় জাতীয় ঐক্য।এটা দুই জেনারেল শাসকের দান।

রাজনীতিতে পড়ে পাকিস্তানি শাসকের অপচ্ছায়া। ধর্মীয় রক্ষণশীলতা ও সাম্প্রদায়বাদি চেতনার প্রকাশ ক্রমশ বাড়তে থাকে। ফলে যে সামাজিক রাজনৈতিক দূষণ তার প্রভাব প্রকাশ পায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর থেকে থেকে হামলার ঘটনায়। এর সর্বশেষ উদাহরণ ব্রাহ্মণবাড়িয়া, গোবিন্দগঞ্জ, অভয়নগর এসব স্থানের দরিদ্র সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলায়। তাতে সংশ্লিষ্ট সাংসদ ও রাজনৈতিক নেতা-উপনেতা-পাতিনেতা, নীতিহীন সরকারি কর্মকর্তা(যেমন ইউএনও) এবং আইনশৃঙ্খলারক্ষক পুলিশ বাহিনীর কিছু সদস্য।

এমন সামাজিক রাজনৈতিক অবস্থায় সংসদীয় শাসক দ্বারা কিছু কিছু খাতে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটা সত্ত্বেও দুর্নীতির বিস্তার ঘটে উঁচু থেকে নিচু পর্যন্ত। এ দূষণ শ্রেণী নির্বিশেষে, দল নির্বিশেষে। সমাজে গণতান্ত্রিক মানবিক মূল্যবোধের অভাব, গুম-অপহরণ-ছিনতাই, ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড সমাজকে দূষিত, বিষাক্ত করে তুলেছে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অশুভ বার্তা হলো এসবের বিরুদ্ধে সমাজের সুস্থ অংশ (শিক্ষিত-অশিক্ষিত) প্রতিবাদহীন। এ ছাড়া দলীয় রাজনীতির প্রভাবে বিভাজিত ন্যায়-অন্যায়ের বিচার।

সংবাদপত্রে প্রতিদিন রক্তমাখা খবর বা প্রতিবেদনে শিশধর্ষণ, শিশুহত্যা, নারী ধর্ষণ, নারী হত্যা, হিংসা-প্রতিহিংসায় সামাজিক নিষ্ঠুরতার প্রকাশ শুদ্ধ চেতনার মানুষের জন্য উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক দলে অর্ন্তদ্বন্দ্ব হত্যার নেশায় পরিণত। এমনকি তা ব্যক্তিস্বার্থে একই দলের সদস্যদের মধ্যে প্রকাশ পাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে আইন শৃঙ্খলারক্ষক বাহিনীতে। তারা নিয়ন্ত্রণহীন। সম্প্রতি মহা পরিদর্শকের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠামূলক প্রতিক্রিয়ায় তার প্রকাশ ঘটেছে।

চার
বিশদ বিবরণে না গিয়েও বলা যায়, এ দুরবস্থার ব্যাপক বিস্তার লক্ষ করা যাচ্ছে গোটা সমাজে, বিশেষভাবে রাজধানী ঢাকায়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঘটন সামাল দিতে হিমশিম সরকার। অন্য দিকে আন্তর্জাতিক মহলে কিছু কিছু ঘটনায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রিক ভাবমূর্তি ইতিবাচক। যেমন কিছু অর্থনৈতিক সূচকে, তেমনি একটি খবর সম্প্রতি প্রতিটি জাতীয় দৈনিকে মোটা হরফের শিরোনামে প্রকাশিত: ‘বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বিশ্বপ্রামাণ্য ঐতিহ্য’। এ স্বীকৃতি জাতিসংঘের একটি শাখা সংস্থা ইউনিসেফ-এর।

এমন কিছু ইতিবাচকতার পাশাপাশি নেতিবাচক দিকগুলো এখনো দূষিত সমাজ ব্যবস্থার প্রতিফলন হয়ে উঠেছে। এবং তা যেমন দেশীয় জরিপের পরিসংখ্যানের তেমনি একাধিক আন্তর্জাতিক জরিপের ফলাফলে প্রকাশ পেয়েছে এবং পাচ্ছে। সেগুলোর বিচার-বিশ্লেষণ আমাদের ভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে বাধ্য করে। তখন প্রশ্ন ওঠে রাজধানী ঢাকার গুণগত অবস্থান নিয়ে। দুঃখের প্রকাশ ঘটে সংবাদপত্রের এমন শিরোনামে: ‘আর কত সূচকে ঢাকা নিচে নামবে!’ অর্থাৎ পতনের প্রবলতাই অধিক।

এখন যুক্তিবাদী মনের প্রশ্ন: একদা মসলিনের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ঢাকার এ দুরবস্থা কেন একুশ শতকের আন্তর্জাতিকতায় পৌঁছে? ঢাকা কি কখনো কবিদের আকাঙ্খিত ‘তিলোত্তমা’ শহর/নগর বা মহানগর হয়ে উঠতে পারবে? শহর ঢাকা নিয়ে তাদের গর্ব ও অহংকার তাদের দুর্ভাবনা ও মানসিক যন্ত্রণা সবার চেয়ে বেশি। এ দুর্ভাবনার পেছনে বাস্তব তথ্যের সমাহার নিতান্ত কম নয়।

বিদেশি সংস্থার সাম্প্রতিক জরিপে প্রকাশ যৌন সহিংসতার বিচার-বিবেচনায় বিশ্বের অন্যান্য মহানগরের তুলনায় ঢাকা তথা বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। আর সার্ক বিবেচনায় নারীদের জন্য সবচেয়ে খারাপ মহানগরের মধ্যে ঢাকার স্থান বিশ্বের মধ্যে সপ্তম।লন্ডন সাময়িকী ‘দ্য ইকোনমিস্ট’-এর ভাষ্যমতে ২০১৭ সালের হিসেবে নিরাপত্তার বিচারে বিশ্বের ৬০টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ৫৮-তে। উল্লিখিত ‘ইকোনমিস্ট’-এর অন্য একধিক বিচারে দেখা যায় বিশ্বে বসবাসের অযোগ্য নগরগুলোর মধ্যে ঢাকা রয়েছে তৃতীয় স্থানে, অর্থাৎ অযোগ্যতার বিচারে তৃতীয় স্থানের অধিকারী ঢাকা। এ জাতীয় সূচকের জরিপে দেখা যায় ঢাকা শহরের অবস্থান খুবই নাজুক। একে আমরা যতই নগর বা মহানগর নামে আখ্যায়িত করি না কেন। বিশ্ব বিচারে শহর ঢাকাকে নিয়ে লজ্জায় মুখ ঢাকতে হয়।

বায়ু দূষণ, পরিবেশ দূষণ, নদী দূষণ, একদা শ্যামল সবুজের ধারালো কুঠারাঘাত, খালবিল নদী জলাশয় ভরাটের অনাচার, অবিশ্বাস্য যানজট, অনেক কর্মঘণ্টা নষ্ট ও অসহ্য ক্লান্তি, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু, বর্জ্য নিষ্কাশনে চরম অদক্ষতা, ইটভাটায় ব্যাপক কার্বন নিঃসরণের কৃষ্ণছায়া, বিশুদ্ধ পানীয় জলের অভাব, জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত নগর উন্নয়ন ইত্যাদি বহু কিছু ঢাকার বর্তমান দুরবস্থার জন্য দায়ী।

প্রশ্ন উঠবে, এসব দুরবস্থার দায় কার বা কাদের? গায়ে গায়ে লাগানো বহুতল ভবনের অবিশ্বাস্য উচ্চতায় গর্বের চেয়ে লজ্জার ভাগটুকু বেশি। পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার চরম অব্যবস্থাপনার জন্য বহুতল ভবনসংখ্যা কম দায়ী নয়। ভাবা যায় চলন্ত বাসে তরুণী রূপা ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা? শুধু সমাজ ও অবকাঠামোর বাস্তব দুরবস্থাই ঢাকার জন্য শেষ কথা নয়। ব্যক্তি ও সমাজের মানসিক দূষণ ও অবক্ষয়ের জরিপেও ঢাকার অবস্থান হবে সবার নিচে।

এর দায় যেমন শহর পরিকল্পনাবিদদের, তার চেয়েও বেশি দায় বিভিন্ন পর্যায়ের শাসক কর্তৃপক্ষের| সেই সঙ্গে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের অযোগ্যতায়, ব্যক্তিক ও দলীয় স্বার্থের সবর্নাশা বিস্তার ঢাকার চরম দুরবস্থার জন্য দায়ী। কতৃপক্ষ কী জবাব দেবেন? ঢাকার মুখ দেখতে গিয়ে মুখ ঢাকতে হবে তাদের সবাইকে। হায় তিলোত্তমা হবার স্বপ্নে বিভোর ঢাকা!

লেখক: প্রাবন্ধিক, রবীন্দ্র গবেষক



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২ ডিসেম্বর ২০১৭/তারা

Walton
 
   
Marcel