ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৪ মাঘ ১৪২৫, ১৭ জানুয়ারি ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

আনিসুল হকের জাদুটা কোথায়?

মিনার মনসুর : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৭-১২-০৩ ১:১২:৫৬ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৩-০৪ ১:৪৫:০৭ পিএম

মিনার মনসুর : ‘আনিসুল হকের সঙ্গে আমার পূর্ব পরিচয় নেই। পরিচয় বলতে শুধু ‘সংবাদ’-এ কর্মরত থাকাকালে একবার তার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। তিনি যে আমার খুব পছন্দের মানুষ ছিলেন তাও নয়। বরং চিকনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাবের পর এ প্রসঙ্গে এক সংবাদ সম্মেলনে তার শরীরী ভাষা ও বক্তব্য আমাকে ক্ষুব্ধ করেছিল। সেটা আমি খোলাখুলি লিখেছিও। তার পরও বিপন্ন এক মহানগরের নগণ্য একজন নাগরিক হিসেবে আমি এখন তীব্রভাবে তার অভাব অনুভব করছি। আনিসুল হক আপনি ফিরে আসুন। রুগ্ন রাজধানীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আপনাকে ভীষণ প্রয়োজন।’

‘আনিসুল হক ফিরে আসুন’ শিরোনামে ফেসবুকে আমি এ কথাগুলো লিখেছিলাম অক্টোবরের ৭ তারিখে। এ আকুতি আমার একার ছিল না। বিস্ময়করভাবে আমার চেনাজনদের মধ্যে যারা একেবারেই রাজনীতিবিমুখ- তাদের আবেগটা বরং একটু বেশি ছিল। কারণ, আমার মনে হয়েছে, তারা এ মানুষটিকে ধরে রাজনীতি ও রাজনীতিকদের প্রতি তাদের হৃত আস্থা পুনরুদ্ধার করতে চেয়েছিলেন; অনেকটা ডুবন্ত মানুষ যেভাবে খড়কুটো ধরে বাঁচার চেষ্টা করে সেভাবেই। আনিসুল হক রাজনীতিক ছিলেন না- এমনকি তার আচার-আচরণও জনতুষ্টিমূলক ছিল না। তারপরও অতি অল্প সময়ে তিনি জনমনে ব্যাপক আস্থা জাগাতে সক্ষম হয়েছিলেন। বহুদিন পর সর্বস্তরের মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে এ লোকটা পারবে। তার ওপর ভরসা করা যায়।

কেন বা কীভাবে এটা হলো- তা আমি একটু নিবিড়ভাবে বোঝার চেষ্টা করেছি। কথা বলেছি রাজধানীর রিকশাওয়ালা, হকার, বিপন্ন মধ্যবিত্ত ও উঁচু নাকওয়ালা সুশীল থেকে শুরু করে সমাজের বিত্তবান-অভিজাত শ্রেণির বহু মানুষের সঙ্গে। বলা যায়, তাদের প্রায় সকলেই আনিসুল হককে পছন্দ করতেন। ব্যতিক্রম কেবল রাজনীতিকরা। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন যে তারা এখন যত কুম্ভীরাশ্রুই বর্ষণ করুন না কেন, আমার মনে হয়েছে রাজনীতিকদের বড় অংশই আনিসুল হককে পছন্দ করতেন না। পরিবারের অব্যাহত আবেদন-নিবেদন সত্ত্বেও মৃত্যুপথযাত্রী একজন মানুষকে ঘিরে গত কয়েকমাস যাবৎ যে নির্দয় ‘ষড়যন্ত্র তত্ত’ বাজারজাত করা হয়েছে তার পেছনে রাজনীতিকদের একটি অংশের হাত ছিল বলে আমার ধারণা। এটা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে যে রাজনীতিকদের বর্তমান ‘হাইব্রিড’ বা ‘ভুঁইফোড়’ প্রজন্ম নিজের শরীরের বিটকেলে গন্ধের কারণে দুর্গন্ধমুক্ত বা ভালো কোনো কিছু আর সহ্য করতে পারছেন না।

এ প্রেক্ষাপটে রাজনীতির বাইরের রাজনীতিবিমুখ বিপুলসংখ্যক মানুষ কেন আনিসুল হককে পছন্দ করতেন- সেটা জানাটা আমাদের ‘রক্তশূন্য’ রাজনীতির স্বার্থেই খুব জরুরি বলে আমার মনে হয়েছে। বাংলাদেশে শুধু নয়, বিশ্বজুড়েই রাজনীতি ও রাজনীতিকদের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার ক্ষেত্রে ভাটার টান এখন অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় যে তীব্র তা অস্বীকার করার উপায় নেই। এমনকি রাজনীতির বাইরের যেসব মানুষ রাজনীতিতে জড়াচ্ছেন এবং অধিষ্ঠিত হচ্ছেন সরকার বা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদে তাদেরও জনগণ সন্দেহের চোখে দেখছে। ব্যবসায়ী আনিসুল হকের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হলো কেন? কী জাদুতে অতি অল্প সময়ে তিনি জয় করে নিলেন গভীর সংশয় ও হতাশাপীড়িত বিপুলসংখ্যক মানুষের মন?

আনিসুল হকের মধ্যে যে জাদু একটা ছিল তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু কী সেটা? বাগ্মিতা? স্মার্টনেস? আধুনিকমনস্কতা? গণমাধ্যমে দেখলাম, কেউ কেউ এসব বিষয়ের ওপর যথেষ্ট গুরুত্বও দিয়েছেন। তবে আমার মনে হয়- এগুলোর যদি আদৌ কোনো ভূমিকা থেকেও থাকে তা ছিল একেবারেই গৌণ। কেউ কেউ অবশ্য স্বপ্নের কথাও বলেছেন। তাকে আখ্যায়িত করেছেন ‘স্বপ্নের ফেরিওয়ালা’ বলে। এ পর্যবেক্ষণটি গুরুত্বপূর্ণ বলে আমার মনে হয়েছে। তবে আনিসুল হকের আসল জাদু সেখানেও নয়। এখানে বলা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, কথার চমৎকারিত্ব বা প্রতিশ্রুতির ফানুস দিয়ে এখন আর মানুষের মন জয় করা সম্ভব নয়। কারণ গত প্রায় অর্ধশতকজুড়ে অবিরাম এসব দেখে দেখে আর শুনে শুনে তাদের চোখ আর কান পচে গেছে।

আনিসুল হকের জাদুটা হলো তিনি যা বলেছেন তা তিনি করে দেখিয়েছেন। কথাটা যত সহজে আমি বলে ফেললাম বাস্তব অবস্থাটা মোটেও তত সহজ ছিল না। দশকের পর দশক ধরে এদেশের মানুষ রাজনীতিকদের কাছ থেকে কেবল গালভরা সব প্রতিশ্রুতিই শুনে এসেছে। অথচ ক্ষমতা হাতে পাওয়ার পর বৃহৎ কোনো পরিবর্তন দূরে থাক, প্রতিশ্রুতিদাতার বাড়ির সামনে জমে থাকা আবর্জনার স্তূপটাও সরেনি। বরং দিনদিন তা আরো ফুলেফেঁপে উঠেছে। উদাহরণ হিসেবে তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ডের কথা বলা যায়। সম্পূর্ণ অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এ ট্রাক স্ট্যান্ডটি বছরের পর বছর ধরে রাজধানীবাসীর কণ্ঠরোধ করে দাঁড়িয়েছিল। অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে এ পথের যাত্রী ও পথচারীদের। কিন্তু সবাই শুধু যে তা দেখেও না দেখার ভান করেছে তাই নয়, দখলদারদের সঙ্গে গলাগলিও করেছে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে। রাজধানীর মানুষ দীর্ঘদিন যাবৎ এ ধরনের যে-কটি গুরুতর সমস্যায় জর্জরিত হচ্ছে প্রত্যেকটির চিত্রই প্রায় অভিন্ন।

প্রশ্ন হলো, আনিসুল হক যা পারলেন, অন্যরা তা পারেননি কেন? এর সবচেয়ে সরল উত্তরটি হলো, তিনি অন্যদের মতো আবর্জনা বা বর্জ্যজীবী ছিলেন না। অপ্রিয় হলেও সত্য যে গুটিকয় ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ রাজনীতিক ও ক্ষমতাবানের আয়-উপার্জনের প্রধান উৎসই হলো এইসব বর্জ্য। যত বিশৃঙ্খলা যত বর্জ্য তত লাভ। অতএব, দুর্গন্ধে দুর্ভোগে জনগণের সর্বনাশ হলেও এসবই হলো তাদের পৌষমাস। তাই বিস্তর হাঁকডাক সত্ত্বেও কখনোই ফুটপাত-খালবিলনদী-জলাশয় অবৈধ দখলমুক্ত হয় না। বন্ধ হয় না লক্কড়ঝক্কড় গাড়ি আর লাইসেন্সবিহীন চালকদের দাপট। সবাই জানেন, এসব বর্জ্যতুল্য সমস্যা থেকে আসে বিপুল অঙ্কের টাকা। তার ভাগবাটোয়ারা চলে। অবৈধ পন্থায় উপার্জিত এ অর্থ দিয়েই চাঁদাবাজ ছিঁচকে সন্ত্রাসী একদিন পরিণত হন দেশবরেণ্য নেতা ও দাতায়।

আনিসুল হক যে কেবল এ ধরনের বর্জ্যাসক্তি থেকে মুক্ত ছিলেন তাই নয়, তার মধ্যে ছিল ভালো কিছু করার অন্তর্গত এক প্রবল তাড়না। যতদূও জানি, তাতে কোনো স্বার্থগন্ধ ছিল না। ছিল না রথ দেখা ও কলা বেচার কসরৎ। তার ‘নিয়ত’ স্বচ্ছ ছিল বলেই দেশ ও জনস্বার্থে যে-কাজটি করা ন্যায়সঙ্গত বলে তার মনে হয়েছে, তাতেই তিনি ঝাঁপিয়ে পড়তে দ্বিধা করেননি। তোয়াক্কা করেননি  কোনো প্রকার ভয়ভীতি ও বাধার। অতি অল্প সময় তিনি মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, কিন্তু যেসব উদাহরণ তিনি সৃষ্টি করে গেছেন তা কারো কারো পক্ষে শত বছরেও সম্ভব হয়নি।

কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় টুঙ্গীপাড়ার তরুণ শেখ মুজিব যখন তৎকালীন মুসলিম লীগ রাজনীতির মাঠ কাঁপাচ্ছেন, তখন রাজনীতিতে তার চেয়ে ধনে-মানে-বিদ্যায়-বুদ্ধিতে চৌকস আরো অনেকেই ছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তখনই সবাইকে ছাপিয়ে উঠেছিলেন। এ প্রসঙ্গে অসাধারণ একটি উক্তি করেছিলেন সেই সময়ের মুসলিম লীগের জাঁদরেল নেতা আবুল হাশিম। তিনি বলেছেন, শেখ মুজিব ছিলেন ‘ম্যান অব অ্যাকশন’। তিনি কথায় নয়, কাজে বিশ্বাস করতেন। তাকে যখনই যে-কাজ দেওয়া হতো তিনি বিনা আপত্তিতে খুবই নিষ্ঠার সঙ্গে তা সম্পাদন করতেন। পরোয়া করতেন না ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতি কিংবা সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের।

আমার ধারণা, আনিসুল হকের জাদুটাও সেখানেই। তিনিও ছিলেন ‘ম্যান অব অ্যাকশন’। জাতির দুর্ভাগ্য হলো, আমাদের যখন তাঁর মতো নিবেদিতপ্রাণ আরো অনেক ‘কাজের লোক’ দরকার, ঠিক তখনই তিনি আমাদের ছেড়ে গেলেন। এ শূন্যতা যে পূরণ হবার নয় তাতে সন্দেহ নেই। তবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কথাটি হলো, নানা ধরনের আবর্জনার সঙ্গে সহাবস্থানকারী রাজধানীবাসীকে ক্ষণেকের জন্যে তিনি যে স্বস্তির স্বাদ দিয়ে গেছেন তা নিশ্চিতভাবে তাদের জাগিয়ে রাখবে। প্ররোচনা দেবে পরিবর্তনের। আমাদের পরশ্রীকাতর আত্মকেন্দ্রিক রাজনীতি আদৌ তা ধারণ করতে পারবে কিনা তা সময়ই বলে দেবে।

ধানমন্ডি: ৩ ডিসেম্বর ২০১৭

লেখক: কবি ও সাংবাদিক



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৩ ডিসেম্বর ২০১৭/তারা

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC