ঢাকা, শুক্রবার, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:
উপকূলের পথে

কমলনগর রক্ষায় ৮ কিলোমিটার বাঁধ জরুরি

রফিকুল ইসলাম মন্টু : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০২-১২ ৪:১৫:৫৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০২-১২ ৪:১৫:৫৪ পিএম

রফিকুল ইসলাম মন্টু, লক্ষ্মীপুরের কমলনগর ঘুরে : ভাঙন থামছে না। মানুষগুলো বাড়িঘর, দোকানপাট এমনকি প্রিয় স্বজনের কবরস্থানও স্থানান্তর করছেন এক স্থান থেকে অন্য স্থানে। গত কয়েক বর্ষায় ব্যাপক ভেঙেছে এখানকার মেঘনাতীর। শুধু বর্ষা নয়, ভাঙন এখন বারোমাস। ভাঙনতীরের মানুষের কষ্ট, আহাজারি দেখার কেউ নেই। গেল বর্ষায় তো এই এলাকার মানুষ রীতিমত আতঙ্কে রাত জেগে থাকতেন। সবার ভয়- কখন জানি কি হয়!

এ চিত্র উপকূলীয় জেলা লক্ষ্মীপুরের কমলনগর এলাকার। চর ফলকন, সাহেবের হাট, কাদির পণ্ডিতের হাট, পাটারীহাট, লুধুয়াসহ বিস্তীর্ণ জনপদ ভেঙে চলেছে বেশ কয়েকবছর ধরে। বহু মানুষ এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। অনেকে আবার ব্যবসা ও কাজের প্রয়োজনে কোনমতে রাস্তার ধারে কিংবা অন্যের জমিতে ডেরা তুলে বসবাস করছেন।  সূত্র বলছে, লক্ষ্মীপুরের রামগতি ও কমলনগর উপজেলায় মেঘনা নদীর ভাঙন প্রতিরোধে ১৯৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয় ২০১৪ সালে। দু’বছর পরে ২০১৬ সালের ২৩ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে বাঁধ নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ২০১৭ সালের ১৪ মার্চ লক্ষ্মীপুরের জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রামগতি-কমলগর নদীর তীর রক্ষা বাঁধের উদ্বোধন করেন। এসময় তিনি দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজের আশ্বাস দেন। কিন্তু দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ এখনও শুরু হয়নি। আগামী বর্ষার আগে দ্বিতীয় পর্যায়ের বাঁধের কাজ সম্পন্ন না হলে কমলনগরের বড় অংশ নদীভাঙনে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন এলকাবাসী। 

সরেজমিন তথ্য সংগ্রহকালে ভাঙন তীরবর্তী এলাকার মানুষ বলছেন, ইদানিং ভাঙন আরো ভয়াল রূপ নিয়েছে। বিকট শব্দে এক একটি বড় এলাকা নিয়ে তালিয়ে যায়। আগে কোথাও কোন ফাটল দেখা যায় না, অথচ হঠাৎ মাটি দেবে যায়। এসময় বিকট শব্দে আশাপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বর্ষাকালে ভাঙনের ভয়ে সারারাত মানুষ নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকে।    



কমলনগরের মেঘনার তীর ধরে হাঁটলে শুধুই ধ্বংসস্তুপের চিহ্ন চোখে পড়ে। সুপারি বাগান, নারিকেল বাগান, কলা বাগান, সয়াবিন ক্ষেত, বাড়িঘর, মাছঘাট, রাস্তাঘাটসহ সবই যেন প্রতিদিনই চেহারা বদল করছে। ফসল তোলার আগেই বহু সবুজ ফসলি মাঠ বিলীন হচ্ছে নদীতে। স্কুল-মাদ্রাসা-মসজিদ নদীতে হারিয়ে যাচ্ছে। এই এলাকায় মেঘনাতীর এখন সন্ধ্যায় এক রকম, আর সকালে অন্যরকম। ভাঙনের তাড়া খেয়ে মানুষ ছুটে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে। ঐতিহ্যবাহী লুধুয়া বাজার, জগবন্ধু গ্রাম এখন আর চেনাই যায় না। 

লুধুয়ার মেঘনাতীর ধরে হাঁটার সময় চোখে পড়ে সেই পুরনো ভাঙন। ক্রমাগত ভাঙনে লুধুয়া ক্রমাগত পিছু হটছে। পুরনো লুধুয়া হয়তো এখন নদীর মাঝখানে। তবুও এলাকাটির নাম লুধুয়াই রয়ে গেছে। লুধুয়া নামের সেই ঐতিহ্যবাহী বাজারটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। ক্ষতবিক্ষত লুধুয়া বাজারে তথ্যসংগ্রহকালে দু’জন বয়সী ব্যক্তির সঙ্গে দেখা। পরিচিত মুখ দেখে এরা দু’জনই একটু এগিয়ে এলেন। বিবরণ দিলেন ভাঙনের ভয়াল রূপ সম্পর্কে। একজন আতিক মাঝি, আরেকজন দুলাল বেপারী। দুজনেরই বয়স সত্তর ছুঁয়েছে। বহুবার এই প্রতিবেদককে লুধুয়া দেখেছেন তারা। তাই কিছু কথা বলার আগ্রহ। জানালেন, দু’জনেরই একসময় বেশ সহায় সম্পদ ছিল। তা এখন নদীর মাঝখানে। বড় বাড়ি ছিল, বাড়িতে বড় উঠোন ছিল, পুকুর ছিল, আবাদী জমিও ছিল। এখন তারা ভাঙন তীরবর্তী এলাকায় ছোট্ট ঘরে কোনমতে গাদাগাদি করে আছেন। তিনবেলা খাবার জোটানোও কষ্টকর।

পলিথিনে মোড়ানো ছোট্ট ঘরের দিকে তর্জনী তুলে আতিক মাঝি বলেন, এটাই এখন আমাদের শেষ আশ্রয়। এরপর কোথায় যাবো জানি না। দুলাল বেপারী হাতে থাকা লাঠি নদীর দিকে তুলে বললেন, নদীর ওপারে একটা বড় চর ছিল। আমরা সেই চরে ছিলাম। কোথাও কোন ভাঙন ছিল না। সেই চর ভেঙে যাওয়ার পর আমরা এপারে আসি। এখান থেকেও নদী ছিল অনেক দূরে। আমাদের সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। এর পরের ঠিকানা জানি না।  

জানা গেছে, কমলনগরে মেঘনার ভাঙন রোধে নদীর তীর রক্ষা বাঁধের প্রথম পর্যায়ের এক কিলোমিটারের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। কিন্তু ভাঙনের মুখে থাকা বিস্তীর্ণ জনপদ রক্ষায় এই বাঁধ যথেষ্ট নয়। গোটা উপজেলা রক্ষায় অন্তত আরও ৮ কিলোমিটার বাঁধ প্রয়োজন। দ্রুত সময়ের মধ্যে বাঁধ নির্মাণের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ শুরু না হলে যেটুকু হয়েছে, তাও নদীর ভাঙনে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে মারাত্মক হুমকিতে পড়বে উপজেলা সদরসহ বেশ কয়েকটি ইউনিয়ন।



স্থানীয় বাসিন্দারা বলেছেন, দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ভাঙন রোধে এক কিলোমিটার তীর রক্ষা বাঁধের নির্মাণ কাজ চলছে। ওই বাঁধের ৯৩০ মিটার কাজ শেষ হয়েছে। চলমান কাজের সাথে বাঁধের দু’পাশে আরও ৮কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ জরুরি। এই এলাকা বর্তমানে অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। ক্রমাগত ভেঙে চলেছে মেঘনা। সরেজমিন মাতাব্বরহাট তীর রক্ষা বাঁধ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নির্ধারিত এক কিলোমিটার বাঁধের কাজ শেষ পর্যায়ে। যেটুকু বাঁধ রয়েছে, তা ব্যতিত আশপাশের এলাকায় ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। ভাঙন রয়েছে বাঁধের দুই পাশেও। সম্প্রতি ভাঙন বাঁধ অতিক্রম করেছে। এর ফলে নতুন বাঁধ মারাত্মক হুমকিতে রয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে দ্বিতীয় পর্যায়ে বাঁধ নির্মাণ করা না হলে আগামী বর্ষায় নির্মাণাধীন বাঁধসহ কমলনগরের বিস্তীর্ন এলাকা নদী ভাঙনে হারাতে পারে।

কমলনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত সাইফুদ্দিন আজম বলেন, মূল ডিপিপি’তে ২০১৬-১৭ অর্থ বছর থেকে কমলনগরে দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রায় সাড়ে ৮ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের দিক নির্দেশনা থাকলেও স্থানীয়র নেতৃত্ব ও কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও যথাযথ পদক্ষেপের অভাবে আজও দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ শুরু হয়নি। চলতি ফেব্রুয়ারি থেকে চলমান বাঁধের উত্তর ও দক্ষিণ পাশে বিশেষ বিবেচনায় কমপক্ষে সাড়ে ৪ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা না হলে নির্মাণাধীন এক কিলোমিটার বাঁধও আগামী বর্ষায় নদীতে হারিয়ে যেতে পারে। নদীর তীর রক্ষা বাঁধের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এজিএম মাসুদ রানা বলেন, নির্ধারিত এক কিলোমিটার বাঁধের ৯৩০ মিটার (প্রায় ৯০ শতাংশ) কাজ শেষ হয়েছে। গত বর্ষায় অতিবৃষ্টি ও তীব্র জোয়ারের মুখে পড়ে শতভাগ কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। অবশিষ্টসহ আরও ৬০০ মিটার বাড়ানো হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের অনুমতি পেলে কাজ শুরু হবে।

এদিকে অপর একটি সূত্র বলেছে, দ্বিতীয় পর্যায়ে নদী তীর রক্ষায় কমলনগরের ৮ কিলোমিটার বাঁধের কাজ বাস্তবায়নের জন্য লক্ষ্মীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড মন্ত্রণালয়ে ডিপিপি প্রেরণ করেছে; সেটি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, বাঁধের কাজ শুরু হওয়ায় নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখেছি। দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ শুরু না হওয়ায় সে আশার আলো নিভে যেতে বসেছে। কমলনগরে ব্লক নির্মাণ করে নদী পথে ভোলায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ওই পাড়ে (ভোলায়) কাজ হয়; অথচ কমলনগর ভাঙছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী বর্ষায় ওইটুকু বাঁধও থাকবে না।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC