ঢাকা, শুক্রবার, ৯ আষাঢ় ১৪২৫, ২২ জুন ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

কোচ বড় নাকি খেলোয়াড়?

শচীন বর্মণ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৮-০৩-১৪ ১০:২৭:২২ এএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৩-১৪ ২:৩৫:১২ পিএম

শচীন বর্মণ: নিদাহাস ট্রফিতে খেলার বাইরে বাংলাদেশ ক্রিকেটের অন্যতম বড় ইস্যু প্রধান কোচ নিয়োগ নিয়ে। বাংলাদেশ সর্বোচ্চ সাফল্য ছুঁয়েছে কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহের হাত ধরেই। গত কয়েক বছরে টাইগার ক্রিকেটের উন্নতির অন্যতম কারিগর ধরা হয় তাকেই। কিন্তু ক্রিকেটাররা যদি মন-মনন দিয়ে পরিকল্পনাগুলো মাঠে বাস্তবায়ন না করতেন তাহলে সাফল্য কি মাঠের বাইরে বসেই এনে দিতে পারতেন হাথুরুসিংহে? কোচ নাকি খেলোয়াড়? কে বড়? প্রশ্নটা অদ্ভুত তো? বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে কয়েকমাস ধরেই এই প্রশ্নটা ঘুর-পাক খাচ্ছে।

কে বড়? এই তর্কে যাওয়ার আগে একটি ‘বলিউড’ সিনেমার উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। সিনেমাটার নাম ‘শামিতাভ’। অমিতাভের (অমিতাভ বচ্চন) শেষ তিন অক্ষর ও দক্ষিণের নায়ক ধানুশের শেষের দুই অক্ষর দিয়ে সিনেমাটার নির্মাতা আর বালকি। অভিনয়েও অমিতাভ ও ধানুশ। সিনেমায় অমিতাভ সিনহার (অমিতাভ বচ্চন) কণ্ঠ মন কেড়ে নেয়। কিন্তু তারপরও তার গলার স্বর রেডিও থেকে বলিউড সবাই নাকচ করে দিয়েছিলো। আবার দানিশ (ধানুশ) অভিনেতা হিসেবে দারুণ! কিন্তু তার কণ্ঠস্বরে পক্ষাঘাত। তাও দানিশ স্বপ্ন দেখে বড় অভিনেতা হওয়ার। কিন্তু কণ্ঠস্বর ছাড়া অভিনেতা? এমন সংলাপহীন ছবি বড়জোর একটা কি দুটো একজন অভিনেতা করতে পারেন তার অভিনয় জীবনে। অতএব মিশ্রণ হলো হুইস্কি আর জলের। অমিতাভের গলা আর দানিশের অভিনয়। দু’জনে মিলে হলো ‘শামিতাভ’। সিনেমার কাহিনীতে দানিশ, অমিতাভকে ছাড়াই একটি সিনেমা তৈরি করে। আবার অমিতাভ নিজের কণ্ঠ দিয়ে আরেকজনের অভিনয়ে আরেকট সিনেমা করে। ফ্লপ করে দানিশের ‘বোবা’ চরিত্রের সিনেমাটি। হিট হয় নতুন নায়ককে দিয়ে তৈরি করা অমিতাভের সিনেমা। তবে এক সময় দেখা যায় দানিশ-অমিতাভের মিশ্রণ ছাড়া কিছুতেই পরিপূর্ণতা পাচ্ছে না।

বাংলাদেশের ক্রিকেটে কাল্পনিক অর্থে যদি দানুশকে খেলোয়াড় এবং অমিতাভকে কোচ (হাথুরুসিংহে) ধরা হয় তাহলে কি খুব বেশি বেমানান হবে? ২০১৪ সালের শেষ দিকে হাথুরুসিংহে যখন দায়িত্ব নেন তখন বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত জয়ের কাছাকাছি গিয়েও হেরে যাচ্ছিল। এরপরই শ্রীলঙ্কান কোচের পরিকল্পনা ও মাঠে খেলোয়াড়দের সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অবিশ্বাস্য সব সাফল্য পেতে শুরু করে। ২০১৫ সালে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে খেলে বাংলাদেশ। ঘরের মাটিতে পাকিস্তান, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জেতেন মাশরাফি মুর্তজার দল। র‌্যাংকিংয়েও দ্রুত উপরের দিকে উঠতে থাকতে। ক্রিকেট বিশ্বে বাংলাদেশের ঈর্ষনীয় সাফল্যের আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়ে যায়। গত বছর ইংল্যান্ডে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতেও সেমিফাইনাল খেলেছে বাংলাদেশ। বিশ্বমিডিয়াতেও বেশ কয়েকবার এসেছে- হাথুরুসিংহেই বদলে দিল বাংলাদেশকে। আবার কেউ কেউ ‘হাথুরুরবাংলা’ বলাও শুরু করেছিল। অনেকটা ‘শামিতাভ’র মতো। হাথুরুসিংহের তিক্ষ্ম পরিকল্পনা নিয়ে কারোরই কোনো সন্দেহ থাকার কথা নয়।

আসল বাস্তবায়নটা কিন্তু খেলেই আনতে হয়েছে। এই সময়ে মোস্তাফিজুর রহমান, সৌম্য সরকার, সাব্বির রহমানদের মতো দারুণ প্রতিভা পেয়েছে বাংলাদেশ। আবার অধিনায়ক মাশরাফির দুর্দান্ত নেতৃত্ব। সিনিয়র ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, মুশফিকুর রহিম-রুবেল হোসেনরাও নিজেদের সেরাটা দিয়ে খেলেছেন। সাফল্য এসেছে তাই দুয়ে মিলেই। তবে হঠাৎ করেই খেলোয়াড়রা মনে করা শুরু করেন আমরা মাঠে খেলি আর সাফল্যের বেশির ভাগটা পেয়ে যান কোচ! হাথুরুসিংহেও হয়তো ভেবেছিলেন, দেখি আমি ছাড়া কীভাবে সাফল্য আসে? তাই দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজের পর বাংলাদেশের দায়িত্ব ছেড়ে হাথুরসিংহে চলে যাওয়ার পর মাশরাফিদের কাঁধে দায়িত্ব পড়ে নিজেদের প্রমাণ করানোর। সেই পরীক্ষাটা দিতে হয় দেশের মাটিতেই ত্রিদেশীয় সিরিজ ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দ্বিপাক্ষিক সিরিজে। প্রতিপক্ষে ছিলেন সেই হাথুরুসিংহেই। অনেকটা অমিতাভকে ছাড়া দানিশ ও দানিশকে ছাড়া অমিতাভের কণ্ঠের সিনেমার মতো। লড়াইটাও বাংলাদেশ দল ও হাথুরুসিংহের হয়ে দাঁড়ায়। খেলোয়াড়দের মুখের বুলি আর সাফল্য এনে দেয়ার বাস্তব পরীক্ষাটাও বিসিবি ভালো করে পরখ করে দেখে নিয়েছে।

ত্রিদেশীয় সিরিজের শুরুটা দুর্দান্ত হলেও এখানেও দেখা যায় দানিশকে ছাড়া অমিতাভের কণ্ঠের সিনেমার মতো হাথুরুসিংহেরও শ্রীলঙ্কা দলের জয় হয়। আলোচনাটা বেড়ে যায় তখনই। তাহলে কি কোচই সাফল্যের শেষ কথা। তবে নিদাহাস ট্রফিতে আবার সেই শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে রেকর্ড রান তাড়া করে জিতে মুশফিক-তামিমরাও দেখিয়েছেন খেলোয়াড়রাই পারেন কঠিন পরিস্থিতিতে জয় এনে দিতে।

শেষটা মেলানোর জন্যই ওই ‘শামিতাভ’র শেষ দিকের কাহিনীটাই আনা প্রয়োজন। একজন আরেকজনকে ছাড়া পরিপূর্ণ নয়। সঠিক পরিকল্পনা যেমন খেলোড়দের কাজটা সহজ করে দিতে পারে, তেমনি খেলোয়াড়রাই পারফরম্যান্স দিয়ে জয় তুলে নিতে পারে। বাংলাদেশের ক্রিকেটে তাই ভালো একজন কোচ অবশ্যই দরকার। আর খেলোয়াড়দের প্রয়োজন একাগ্রচিত্তে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করা। তাই দুয়ের মিশ্রণ সঠিক হওয়ার জন্য দ্রুতই বাংলাদেশ দলের জন্য একজন ভালো কোচের প্রয়োজন।

খেলায় অবশ্যই খেলোয়াড়ই প্রাণ। তবে কোচ ছাড়াও যে একটা দল অসম্পূর্ণ!



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৪ মার্চ ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
   
Walton AC