ঢাকা, শুক্রবার, ৫ শ্রাবণ ১৪২৫, ২০ জুলাই ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

রমনা বটমূলে বাংলা বর্ষবরণ পঞ্চাশ পেরিয়ে

পিয়াস মজিদ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৪-১৪ ৬:৩০:৪৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৪-১৫ ৮:১২:৪৭ এএম

|| পিয়াস মজিদ ||

বুদ্ধদেব বসুর স্মৃতিগদ্যে ঢাকার রমনা উদ্যানের অনুপম বর্ণনায় মুগ্ধ হয়েছেন অনেকেই। নিরঙ্কুশ সবুজে ছাওয়া এই উদ্যানের বটমূল এখন হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৯৬৭ সালে সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ছায়ানট’ রমনা বটমূলে বাংলা নতুন বছর আবাহনের যে সূচনা করে তা নেহায়েত সাংস্কৃতিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; পঞ্চাশ বছরের ধারাবাহিকতায় হয়ে উঠেছে বাঙালির অসাম্প্রদায়িক জাতীয় উৎসব। আজ বিশ্বজোড়া বাঙালি জানে পহেলা বৈশাখ মানে আরও অনেক কিছুর পাশাপাশি রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ উৎসবও। কোনো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ব্যতীত সর্বস্তরের জনমানুষের স্বতঃস্ফূর্ত-সপ্রাণ অংশগ্রহণে বাংলা নতুন বছরের প্রথম প্রভাত যেন বিগত বছরের সকল গ্লানি-জরা দূর করে সর্বময় শুভতার আকুলতা প্রকাশ করে। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, অতুলপ্রসাদ, দ্বিজেন্দ্রলাল, সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ঋতুকেন্দ্রিক, আত্মশক্তি-উদ্বোধক, দেশাত্মবোধক, কর্মোদ্দীপক এবং গণচেতনা জাগরুক সংগীতের মাঙ্গলিক ধ্বনি ও সুরে রমনা বটমূল মুখর করে চলেছে বাঙালি চেতনার মনোমঞ্চ।

১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর পাকিস্তান সরকার কর্তৃক পূর্ববাংলার বেতার-টেলিভিশনে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার বন্ধকরণ এবং ১৯৬৭ সালে ‘রবীন্দ্রনাথ আমাদের জাতীয় আদর্শবিরোধী কবি এবং এই জন্য তার গান নিষিদ্ধ হওয়া দরকার’ শীর্ষক পাকিস্তানের তথ্য-প্রচারমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিনের অর্বাচীন উক্তির প্রতিবাদে বাংলার কবি-লেখক-বুদ্ধিজীবী-সংস্কৃতিকর্মীরা রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। যে বাঙালিত্বের বোধ পাকিস্তান তার ‘অখণ্ডতা’ রক্ষার পথে বাঁধা অনুভব করে দমন করতে চেয়েছে বাঙালি সেই বোধ বুকে নিয়েই বুঝিয়ে দিয়েছে তারা একলা চলার অভীক। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বৈশাখ-বর্ষাকে সঙ্গে নিয়ে এভাবে শত বিরুদ্ধতাতেই বিকাশ ঘটেছে বাংলাদেশের মানুষের সংস্কৃতিক চেতনা।

 

রমনা বটমূলে বর্ষবরণ উৎসব স্থবির রীতিমাত্র হয়ে থাকেনি বরং চঞ্চল ঝরনার মতোই তার রূপপ্রবাহ ছুটে গেছে দিগ্বিদিক। তাই আমরা দেখি একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষাশহিদ স্মরণে ঢাকার শহিদ মিনারের মত যেমন গ্রাম-গঞ্জে গড়ে উঠেছে অসংখ্য শহিদ মিনার তেমনি রমনার প্রাভাতিক উৎসবের আদলে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বৃক্ষতলে, খোলা ময়দানে চালু হয়েছে বর্ষবরণ উৎসব


১৯৬৩ সালে অর্থাৎ বাংলা ১৩৭০-এর পহেলা বৈশাখ ঢাকায় যে ছায়ানট সংগীত বিদ্যায়তনের যাত্রা শুরু হলো, প্রতিষ্ঠার বছর চারেকের মধ্যেই সে সংগঠন ১৯৬৭ সালে রমনার বটমূলে সূচনা করল বর্ষবরণ উৎসব। ভোরসকালের শারদোৎসব, সন্ধ্যারাত্রির বসন্তোৎসব তো বাঙালির অভিজ্ঞতায় ছিল; বৈশাখবরণের এ উৎসব সৃষ্টি করল নতুন ঐতিহ্য। ছায়ানট সভাপতি সন্‌জীদা খাতুন লিখেছেন:

‘ছায়ানটের সকাল বেলার অনুষ্ঠান ‘পহেলা বৈশাখ’। এ উৎসবের বাঁধা জায়গা রমনা। খোলা মাঠে গান হয় না বলে বিজ্ঞ সঙ্গীতজ্ঞেরা আমাদের নিরুৎসাহ ও নিরস্ত করতে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আমরা জানতাম এ দিনের গান কেবল গাইবার আনন্দে গাওয়া! কেউ শুনল কিনা তা আমাদের গ্রাহ্য করবার দায় নেই। নববর্ষ-সম্মিলন হচ্ছে সরবে। পাকুড় গাছের পাতা দুলিয়ে বইছে প্রভাতের ঝিরি ঝিরি বাতাস। সমবেত কণ্ঠে গাইছি ‘আনন্দধ্বনি জাগাও গগনে’- প্রচলিত ধর্মাচরণের কোনোই স্পর্শ নেই, তবুও সঙ্গীতের সংবেদন মনকে আশ্চর্য ভক্তিমাখা আনন্দরসে আপ্লুত করেছে এই প্রভাতে! সূর্য অন্ধকারকে বিদূরিত করে। মানুষ আলোর পিয়াসী। আমরা আলোকের ঝরনাধারায় অন্তরকে ধুয়ে নিতে চেয়েছি, অন্তরের যে ধুলার আস্তরণ তা মোচন করতে চেয়েছি, একে কোন বিশেষ মতের ধর্মাচরণ বলে জানি না, মানি না। মানবসমাজের অভিসার তো আলোর অভিমুখেই। এর জন্য বিশেষ কারো বন্দনা করবার প্রয়োজন দেখি না- আপন আত্মাকেই আমরা বলতে চাই- জাগো- উদ্ভাসিত হও। (সন্‌জীদা খাতুন : ‘প্রবন্ধসংগ্রহ’, নবযুগ প্রকাশনী, ঢাকা ২০১০)

বর্ষবরণ উৎসবের পথে পথে ছিল পাথর ছড়ানো। পাকিস্তানি আমলে তো বটেই স্বাধীন বাংলাদেশেও সামরিক স্বৈরশাসকদের সাংস্কৃতিক নীতিগত বৈরিতা তুচ্ছ করে বছর-বছর এ উৎসব করেছে ছায়ানট। ২০০১-এ রমনার বটমূলে বর্ষবরণ মঞ্চে যখন চলছিল নজরুলের ‘এ কী অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লীজননী’ গানটি ঠিক তখনই মৌলবাদীদের ভয়ঙ্কর বোমা বিস্ফোরণে প্রকম্পিত হলো চারদিক। তাৎক্ষণিক সাতজনসহ মোট দশজন মানুষের প্রাণ গেল। কিন্তু এভাবে সন্ত্রাসের পথে রোধ করা যায়নি বটমূলের বর্ষবরণ উৎসব। পরের বছরই সংস্কৃতিবিরোধী এই সন্ত্রাসকে ধিক্কার দিয়ে মানুষ বিপুল উৎসাহে সমবেত হয়েছে রমনায়। সকল কাঁটা ধন্য করে ফুল ফোটার মতোই সকল শঙ্কা উজিয়ে বটমূলে ঘোষণা করেছে চিরনূতনের বার্তা।

রমনা বটমূলে বর্ষবরণ উৎসব স্থবির রীতিমাত্র হয়ে থাকেনি বরং চঞ্চল ঝরনার মতোই তার রূপপ্রবাহ ছুটে গেছে দিগ্বিদিক। তাই আমরা দেখি একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষাশহিদ স্মরণে ঢাকার শহিদ মিনারের মত যেমন গ্রাম-গঞ্জে গড়ে উঠেছে অসংখ্য শহিদ মিনার তেমনি রমনার প্রাভাতিক উৎসবের আদলে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বৃক্ষতলে, খোলা ময়দানে চালু হয়েছে বর্ষবরণ উৎসব। বৃক্ষের কাছ থেকে সহিষ্ণুতা আর বিকাশের বার্তা যেন নিতে চাইছে কেন্দ্র ছাড়িয়ে প্রান্তের মানুষও। আসছে ১৪২৫-এর পহেলা বৈশাখের প্রভাতে রমনা বটমূলে আবার বসবে অর্ধশতাব্দীর ঐতিহ্যে লালিত এই উৎসব। সম্মেলক কণ্ঠে ধ্বনিত হবে ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো, তাপসনিশ্বাসবায়ে সব মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে।’ উপমহাদেশজুড়ে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিরুদ্ধে সংগীতের নমিত কণ্ঠে উচ্চারিত হবে সামষ্টিক শাণিত প্রত্যয়। পঞ্চাশ বছরের এ উৎসব এভাবে অন্তরে অন্তরে জ্বেলে যাবে অনন্ত আলোর দীপ।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৪ এপ্রিল ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Walton