ঢাকা, বুধবার, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২৩ মে ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

টুনটুনিদের মৃত্যু ও আমাদের অব্যবস্থাপনা

জাফর সোহেল : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৮-০৫-১৫ ৪:৫২:২৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৫-১৫ ৪:৫২:২৭ পিএম

জাফর সোহেল : চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে স্যান্ডেলগুলো; কোনটি ছিঁড়ে গেছে এক পাটি, কোনটি আর জোড়া হিসেবে নেই, একা হয়ে গেছে; সঙ্গের পাটি হারিয়ে গেছে ভিড়ে; যেমনটা হারিয়ে গেছে  সেগুলোর মালিকেরাও। এলোমেলো এই ভিড়ের মধ্যে টুনটুনির স্যান্ডেল কোনটি তা আর ঠাওর করা যায় না। আর করেই বা কী হবে, ১৩ বছরের উৎসুক কিশোরীর যে ততক্ষণে আর স্যান্ডেল পরার ইচ্ছে নেই। শুধু কি স্যান্ডেল? টুনটুনির আর কোন কিছুরই দরকার নেই- ছোলা বুট, শুকনো সেমাই, লাল চিনি, তেল, পেয়াঁজ- কোন কিছুই নয়; সে এখন সবকিছুর ঊর্ধ্বে। এত উপরে যে সেখান থেকে তাকে আর নামানো যাবে না। টুনটুনি হারিয়ে গেছে সাতকানিয়ায় এক ধনকুবেরের জাকাত বিতরণে অব্যবস্থাপনার কারণে। ৯ জনের প্রাণ কেড়ে নেয়া ভিড়ে সেও ছিল, একটি ভরাট পুঁটলির আশায়। তারা তাকে তা দিতে পারেননি; দিয়েছেন মৃত্যু।

এমন ছবি বাংলাদেশ আগেও দেখেছে, অনেকবার। তবু কারও হুঁশ হয়নি। না প্রশাসন, না দাতাদের। চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার নলুয়া ইউনিয়নের জায়গাটির নাম ‘হাঙ্গরমুখ’। সেখানকার ধনকুবের শাহজাহান সাহেব। তার ইচ্ছে, জাতিকে দেখাতে হবে, আমি এ যুগের দাতা মহসীন কিংবা হাতেম তাঈ! তাই সাতকানিয়াসহ গোটা দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্তত ৪০ হাজার মানুষকে মাইকিং করে সোমবার নিয়ে যাওয়া হয় সেই হাঙ্গরমুখে। হাঙ্গরমুখ যে সত্যিকারের হাঙ্গর হয়ে উঠতে পারে সে ঝুঁকির কথা মাথায় নেননি তিনি। যার ফল গুণে গুণে ৯টি তাজা প্রাণ হারিয়ে যাওয়া।

মাঠের ধারণ ক্ষমতা ১০ হাজার মানুষের হলেও কর্তৃপক্ষের বেওয়ারিশ দাওয়াতে সেখানে হাজির হন কমবেশি ৪০ হাজার মানুষ। প্রত্যেকেই দীনহীন, প্রত্যেকেই সাহায্যপ্রার্থী। প্রত্রিকার ভাষ্য অনুযায়ী, সকাল থেকেই সেখানে শুরু হয় হুড়োহুড়ি, ঠেলাঠেলি। সেই লড়াইয়ে বিজয়ীরা সামনে এগিয়ে যায় দু কেজি ছোলা, দু কেজি সেমাই আর এক কেজি চিনির জন্য। এমনকি বান্দরবান থেকেও এসেছেন কেউ কেউ। এসেছেন আশপাশের প্রায় সব উপজেলা থেকেই। কারণ, সর্বত্রই ছুটে গিয়েছিল দাতাদের প্রচারের মাইক! বিষয়টা অনেকটা এই- আমি হাতেম তাঈ, তা কেবল আমি জানলেই হবে না, দুনিয়া জানতে হবে। দুনিয়া জানাতে হলে একটু বিলাসী হতেই হয়, জাকাত দিচ্ছি তো হয়েছে কি, প্রচার লাগবে না? এর আগে ২০০৫ সালেও এই একই ব্যক্তির একই কোম্পানির অব্যবস্থাপনার কারণে ৬ জনের প্রাণ গেছে। সেই ঘটনার কোন বিচার হয়নি। অতএব এই ঘটনা যে আবার ঘটবে না তার গ্যারান্টি ছিল না। ঘটেছেও তাই। একই ঘটনা আবার ঘটেছে। স্থানীয় ইউএনও গণমাধ্যমকে বলেছেন, তিনি কিছুই জানেন না, তাঁকে জানানো হয়নি। এমনকি তাঁর দাবি, জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন কাউকেই জানানো হয়নি। এই না জানানো এবং ফলশ্রুতিতে ৯ জন মানুষের মৃত্যু বাংলাদেশী আইনে কতটা অপরাধ?

৩০৪ ধারা নামে একটি আইন রয়েছে, অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ডের বিচারের জন্য। এই ঘটনায় কি সেই আইন তৎপর হবে, নাকি অতীতের সব ঘটনার মতো এটিও একটি ‘পত্রিকার খবর জনিত ঘটনা’তেই সীমাবদ্ধ থাকবে? এই প্রশ্নের উদ্রেকের ফলে কেউ আবার চোখ উপরে তুলে বলবেন না, ভাই সাহেব আপনি এখুনি চটেছেন কেন? তাদের জন্য বলি, একটু ফিরে তাকান ময়মনসিংহের নুরানি জর্দার মালিকের জাকাত বিতরণের সেই ঘটনার দিকে। আমি বলছি, তাদের অব্যবস্থাপনা নিয়ে। জাকাতের কাপড় দিতে গিয়ে সেদিন ঝরে গিয়েছিল ২৭ জনের প্রাণ। কী বিচার হয়েছে? প্রথমে দুএকজনকে জেলে পুরেছে, পরে ছেড়ে দিয়েছে। সেই মামলার প্রত্যেক আসামী জামিনে আছে; মামলার বিচার কাজ এখনো শেষ হয়নি। এমনকি সোমবার মামলাসংশ্লিষ্ট এক আইনজীবীকে জিজ্ঞেস করলে তিনি এই মামলার কী হাল-হকীকত তা জানাতে পারেননি! তারপর এই চট্টগ্রামেরই নগরপিতা মহিউদ্দিন চৌধুরীর কুলখানিতে পায়ের তলায় দলিত হয়ে যে মানুষগুলো মারা গেছে তাদের ক্ষেত্রে কী হয়েছে? কারো কোন দায় নেই? মানুষগুলো এমনি এমনি মরে গেছে? ১৯৮৬ সাল থেকে এরকম অন্তত ১০টি ঘটনায় শতাধিক মানুষ মরেছে, কোন ঘটনার বিচার হয়নি। হবে কী করে, এরা যে গরীব, গরীব মানুষের বিচার করার সময় কোথায়? দেশের রথি মহারথিদের বিচারের শুনানি করতে করতেই তো দিন চলে যায়।

সাতকানিয়ার এই ঘটনায় সবশেষ তথ্যে জানা গেছে, পুলিশ সদর দপ্তর থেকে নির্দেশ এসেছে দায়ীদের বিরুদ্ধে পুলিশি মামলা দায়ের করতে। সেই মামলা হয়ত ঠিকঠাক হবে, দু একজন আসামী গ্রেপ্তারও হবেন। কিন্তু বিচার কি আদৌ হবে? বাংলাদেশের মজ্জার মধ্যেই যে ঢুকে গেছে- প্রভাবশালীদের আর টাকাওয়ালাদের বিচার করাটা একটা কঠিনতম কাজ! এই কঠিন কাজ করতে যারা অগ্রণী থাকার কথা, প্রশাসনের লোক, তাঁরা নানাভাবে এত বেশি প্রভাবান্বিত যে, স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়া তাদের পক্ষে আর সম্ভব হয় না। এমনও হয়, কোন একজন দায়িত্বশীল তার কাজ ঠিকঠাক এগিয়ে নিচ্ছেন, একদিন হঠাৎ দেখলেন তিনি বদলি হয়ে গেছেন! আমরা শুধু আশাকরি, এই ব্যাপারগুলো আর হবে না। না হওয়াটা শুরু হোক ‘হাঙ্গরমুখ’ থেকেই। প্রশাসনকে না জানিয়ে হাজার হাজার মানুষের জন্য বেহাল আয়োজন এক ধরনের দৌরাত্ম্যই বটে। তাদের মাথাতেই ছিল, এ আর এমন কী- পুলিশকে না জানালেও চলবে! এমনকি ঘটনার পরেও এদের অপরাধ বোধ বলতে কিছু নেই। সংবাদ সম্মেলন করে এরা বলছে, এদের কোন দায় নেই, সব ঠিকঠাক ছিল, ভালো ব্যবস্থাপনা ছিল! গরমে নাকি সবাই কাহিল হয়ে মরে গেছে! বয়স্ক দু একজন নারী হয়ত গরমে কাহিল হতে পারেন, ছোট্ট টুনটুনিও কি গরমে কাহিল হয়ে গেছে? হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রত্যেকের গায়ে অঘাতের চিহ্ন আছে, পায়ে দলনের চিহ্ন আছে। এরপরও দাতা হাতেম তাঈরা নিজেদের দোষ দেখবেন না!

এমন দাতাবিলাসী সমাজে আরও আছেন। এদের অব্যবস্থাপনার হাত থেকে গরীব ‘টুনটুনি’দের রক্ষায় সরকার মহাশয়কে এখনই উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। আর বিচার করতে  হবে, এই নয়জন মানুষের প্রাণহানির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের। সেই ব্যক্তিরা যত প্রভাবশালী হোক। আমরা এমন ছবি আর দেখতে চাই না, যেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থেকে মালিকের জন্য বিলাপ করছে কিছু সঙ্গীহারা স্যান্ডেল! এমন ছবি খুবই মর্মান্তিক! এমন ছবি কেবল হাহাকার তোলে বুকের ভেতরে। প্রশ্ন ওঠে, কোন দেশে আছি আমরা? ঢাক ঢোল পিটিয়ে সাধ্যের অতিরিক্তি মানুষ ডেকে এনে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া কেন? অবশ্যই সাধ্য অনুযায়ী জাকাত দিতে হবে। কিন্তু সেজন্য আয়োজন যেন সুষ্ঠু হয় সেই দায়িত্বও নিতে হবে। শুনেছি দান করলে এমনভাবে করা উচিত, ডান হাত দিলে বাম হাত জানবে না। ইসলামে বলা হয়েছে, জাকাতের অর্থ এমন কাউকে এমন পরিমাণ দেয়া, যাতে তাকে পরের বছর আর জাকাতের সাহায্য নিতে না হয়। অর্থাৎ কাউকে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করা। আর আমরা কী করছি? আমরা ১০০ জনকে যা দিতে পারব তা দিচ্ছি ১০০০ জনকে। আর তার আগে, দানের মহিমা দেখানোর জন্য ডেকে আনছি ৪০ হাজার জনকে! এই মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি।

লেখক : সাংবাদিক



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৫ মে ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
   
Walton AC