ঢাকা, শনিবার, ৭ আশ্বিন ১৪২৫, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

চাকরিতে বিদেশপ্রীতি যেন এক ফ্যাশন

মাছুম বিল্লাহ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৫-২২ ২:৫২:০৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৫-২২ ২:৫২:০৮ পিএম

মাছুম বিল্লাহ : ‘যাহারা বাক্যে অজেয়, পরভাষাপারদর্শী, মাতৃভাষাবিরোধী, তাহারাই বাবু। মহারাজ। এমন অনেক মহাবুদ্ধিসম্পন্ন বাবু জন্মিবেন যে, তাঁহারা মাতৃভাষায় বাক্যালাপে অসমর্থ হইবেন! যিনি নিজ গৃহে জল খান, বন্ধুগৃহে মদ খান, বেশ্যাগৃহে গালি খান  এবং মুনিব সাহেবের গৃহে গলাধাক্কা খান, তিনিই বাবু। যাঁহার স্নানকালে তৈলে ঘৃণা, আহারকালে আপন অঙ্গুলিকে ঘৃণা এবং কথোপকথনকালে মাতৃভাষাকে ঘৃণা, তিনিই বাবু।’

আবদুল হাকিম ‘বাবু’ প্রবন্ধে বলেছেন এই কথাগুলো। আমরাও ইদানিং এই জাতীয় কিছু লক্ষণ বিভিন্ন অফিস ও প্রতিষ্ঠানে দেখতে পাই। আমাদের দেশের অনেক ছেলেমেয়ে বিদেশ গিয়ে, বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে ভালো ফল অর্জন করে, ভালো চাকরি করেন এবং দেশের জন্য সুনাম কুড়ান। আবার কেউ কেউ আছেন দেশে তেমন কোনো ভালো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ হয়নি। তারা হয় নিজের পয়সার জোরে কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অথবা অন্য কোনো উপায়ে বিদেশে পাড়ি জমান। বিদেশে ভালো প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করার সুযোগ পাওয়ার কথা নয় এবং পায় না সত্যিকার অর্থে । তাদের অনেকেই বিদেশে বিভিন্ন ধরনের কাজ করে সময় কাটান, অর্থ উপার্জন করেন এবং কিছু বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে একটি সার্টিফিকেট নিয়ে দেশে ফিরে আসেন।

এ ধরনের ব্যক্তি বিদেশ থেকে ফিরে এলে দেশের বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান তাদের নিয়োগ দেয়ার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ে। তারাও বিষয়টিকে লুফে নেয়। তারা ভাব দেখায় যে, তারা বাংলা বলতে পারে না। বাংলা বলতে কষ্ট হয়। বাংলা বললেও প্রায়ই ইংরেজি মিশিয়ে মিশিয়ে বলে এবং সঠিকভাবে বলে না। ভাবখানা এমন দেখাতে চায় যে, বহু বছর বিদেশে থেকে থেকে বাংলা একেবারে ভুলেই গেছে। আর বাংলা ভুলে যাওয়াটা বিরাট এক কদরের ব্যাপার! অনেক  প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তি মনে করেন যে, তাদের প্রতিষ্ঠানে এদেরকেই দরকার । বাংলা বলতে পারছে না, বিদেশে জীবন কাটিয়েছে, কত কিছুই না তারা প্রতিষ্ঠানকে দেবে। তাই তাদের প্রারম্ভিক বেতন হয়তো অনেক অভিজ্ঞ এবং দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া, খুবই ভালো ফল করা প্রার্থীদের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দেওয়া হয়।

উত্তর আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যারা বৃত্তি নিয়ে পড়াশোনা করতে যান তাদের মধ্যে বুয়েট থেকে পাশ করা, ইংরেজি মিডিয়াম থেকে ভালো ফল লাভ করা প্রার্থী বেশি। এদের মধ্যে কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও আছেন। বাকী যারা যান তাদের পক্ষে ঐসব বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ হারের টিউশন ফি প্রদান করা সম্ভব হয় না। ফলে, দু’এক সেমিস্টার পরেই তারা কাজের খোঁজে বের হন। চুপেচাপে কাজ করতে থাকেন। এভাবে চলতে চলতে এক সময় অবৈধ হয়ে যান। তখন তাদের লুকিয়ে লুকিয়ে অল্প পয়সায় কাজ করতে হয় । কেউ কেউ মাটি কামড় দিয়ে ওখানে থেকে যান। আবার কেউ কেউ দেশে চলে আসেন। গ্রেট ব্রিটেনে যারা পড়তে যান, তাদের অবস্থা তো আরও খারাপ । সেখানে শিক্ষার্থীদের কাজের সুযোগ এখন নেই বললেই চলে। এদের মধ্যে অনেকেই দেশে চলে আসেন । তখন কিছু প্রতিষ্ঠান এদেরকে মনে করে বিশাল কিছু নিয়ে এসেছে বিদেশে থেকে। তাই, দেশ থেকে পাশ করা ভালো প্রার্থীদের তারা পাত্তাই দিতে চায় না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হিডেন নীতি হচ্ছে, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মেধাবী তরুণ-তরুণী ও বিজ্ঞানীদের পরম আদর করে ওখানে রেখে দেওয়া। তাদের ভালো চাকরি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে রেখে দেয় যাতে তারা সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবদান রাখতে পারেন। আর তাদের পরবর্তী বংশধর নিশ্চয়ই আরও মেধাবী হবে, এবং তারা আরও বেশি অবদান রাখতে পারবে। বাকীদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেভাবে চায় না। বরং অমেধাবী বা কম মেধাবীদের থেকে তাড়িয়ে দিতে চায়।

কানাডায় প্রচুর বাংলাদেশি ইমিগ্রান্ট আছে, তাদের অনেকেই ’হোয়াইট কালার জব’ পান না। কয়েক বছর বিভিন্ন ধরনের কাজ করার পর দেশে চলে আসেন। দেশে এসে অনেক প্রতিষ্ঠানে বড় বড় পদে বসে যান কারণ ঐসব প্রতিষ্ঠানের হর্তাকর্তারা মনে করেন, তারা ওসব দেশে কি যেন করে এসেছেন! বিদেশের কর্মকর্তাদের বেতন তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা, আর দেশিদের ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। ওসব দেশে তারা কি করেন বাস্তবে যারা দেখে এসেছেন একমাত্র তারাই বলতে পারেন। এক কথায় ওসব দেশে খুব ভালো কিছু পেলে তারা এদেশে আসতেন না। বিদেশে যাওয়া বিষয়টিকে একটি কারণেই আমাদের সমর্থন করা উচিত আর সেটি হচ্ছে তারা বিদেশের মাটিতে যাই করুক না কেন , দেশের জন্য ডলার তো আনছেন বা পাঠাচ্ছেন।

দেশে দক্ষ ও যোগ্য জনশক্তি থাকাতেও কিছু খাতে চাকরির ক্ষেত্রে বিদেশীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মনীতি লঙ্ঘন করেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিদেশী কর্মী নিয়োগ চলছে। এ প্রবণতা শুধু বিদেশী কম্পানি বা সংস্থায়ই নয়, খোদ দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতেও এখন বিদেশী কর্মী রাখা রীতিমতো ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। বিদেশী থাকলেই যেন প্রতিষ্ঠানের দাম বেড়ে যায়। দেশের যোগ্য ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠী যেখানে দিনের পর দিন ঘুরে, জুতার তলা ক্ষয় করেও চাকরি পাচ্ছেন না, সেখানে বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা বৈধ-অবৈধভাবে এ দেশে জাঁকিয়ে বসে চাকরি করে যাচ্ছেন। পকেটে পুরছেন লাখ লাখ টাকার বেতন, আর এ টাকার বেশিরভাগই অবৈধ পথে নিজের দেশে পাঠাচ্ছেন। আবার ওইসব প্রতিষ্ঠানে দেশের যেসব নাগরিকদের চাকরি মিলছে তারা অনেক কম বেতনে বিদেশী বসের অধীনে এমনকি বিদেশী সহকর্মীর চেয়েও কম বেতনে চাকরি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এ যেন নিজ দেশে পরবাসী অবস্থা। অবৈধ বিদেশী কর্মীদের ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোরও কোন নজরদারি নেই।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে বাংলাদেশে ৫৫টি দেশের নাগরিক কাজ করেন। তবে বিভিন্ন ধরনের চাকরিতে ভারতীয়দের প্রাধান্য সবচেয়ে বেশি। সিপিডির হিসেবে একমাত্র পোশাক খাতেই পাঁচ লাখ ভারতীয় বাংলাদেশে কাজ করেন। আর শ্রমিক নেতাদের তথ্যমতে পোশাক খাতে দশ লাখ ভারতীয় বাংলাদেশে কাজ করেন। এই যদি হয় অবস্থা তাহলে দেশী শ্রমিক, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা সদ্য গ্রাজুয়েটদের এবং দেশি বিশেষজ্ঞদের চাকরির কি হবে? দেশে এমনিতেই শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা  দিন দিন বেড়ে চলেছে। তারপর যদি বিদেশী লোকজন এভাবে জাঁকিয়ে বসে তাহলে দেশের ফ্রেশ গ্রাজুয়েটগণ যাবে কোথায়? এখন প্রায়ই পত্রিকার পাতায় দেখি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা অনেক গ্রাজুয়েট চাকরি না পেয়ে আত্মহত্যা করছে আর শিক্ষিত লোকদের বিপথে যাওয়া, অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জন তো স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেদিন এক ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে টাকা, মোবাইল, মানিব্যাগ সবই হারিয়েছি। দেখলাম ছেলেটি বেশ স্মার্ট এবং পড়ালেখা করছে বলে মনে হলো। এ ধরনের শিক্ষিত ছিনতাইকারী সমাজে বেড়ে যাবে যদি তারা চাকরি না পায়। চাকরি প্রদানকারী সংস্থাগুলোর আর একটি ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, ব্যাংক ড্রাফট জমা নেওয়া। এমনিতেই লোকজন বেকার, তারপর এ যেন ‘মরার ওপর খড়ার ঘা’ অবস্থা। এটি এখনই বন্ধ করে দেওয়া উচিত। অনেক উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশেও চাকরি প্রার্থীদের কোন অর্থ তো জমা দিতেই হয় না বরং তাদের আরও অর্থ প্রদান করা হয়, যাতায়াত ভাতা ও রিফ্রেশমেন্টের জন্য।

বিনিয়োগ বোর্ড, বেপজা ও এনজিও ব্যুরোতে বিদেশী কর্মী নিবন্ধিত সাড়ে ষোল হাজার । প্রকৃত সংখ্যা এর বহুগুণ বেশি। বাংলাদেশে আটটি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল বা ইপিজেডে এখন অনুমতি নিয়ে বৈধভাবে কাজ করেন তিন হাজারের মতো বিদেশী। বিনিয়োগ বোর্ডের অনুমতি নিয়ে দেশে কাজ করেন ১৩ হাজার বিদেশী কর্মী। আর এনজিও ব্যুরোর অনুমতি নিয়ে কাজ করা বিদেশি কর্মীর সংখ্যা ৫০০। সব মিলিয়ে ১৬,৫০০। সিপিডির ২০১৫ সালে এক গবেষণায় দেখা গেছে প্রায় ৫ লাখ ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশে কাজ করেন এবং তারা দেশে এক বছরে ৩.৭৬ বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ ৩০ হাজার কোটি টাকা পাঠিয়েছেন। বাংলাদেশ ভারতের পঞ্চম রেমিট্যান্স প্রদানকারী দেশ। বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের আটটি বিভাগে আসন সংখ্যা ৪৮০। এ ছাড়াও টেক্সটাইল ইনস্টিটিউটগুলোতে ডিপ্লোমা পড়ানো হয় ( বরিশাল, দিনাজপুর, টাঙ্গাইলে) সব মিলিয়ে প্রতিবছর টেক্সটাইল বিষয়ে পড়ালেখা করে চাকরির বাজারে ঢোকে দুই থেকে আড়াই হাজার লোক। তাদের আমরা নিয়োগ না দিয়ে যদি বিদেশ থেকেই লোকজন আমদানী করতে থাকি তা হলে এর ভবিষ্যত কি তা বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তাদের একটু গভীরভাবে চিন্তা করা উচিত। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সবাইকে ভেবে দেখতে হবে।

লেখক: শিক্ষা গবেষক



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২২ মে ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Walton